দাওয়াত ও তাবলীগ ব্লগ

Steegle.com - Google Sites Twitter Follow Button



কারগুজারিঃ

posted Sep 12, 2014, 10:57 AM by Abul Hiqmah   [ updated Sep 12, 2014, 11:53 AM ]

ঝলকাঠি ইজতিমার কারগুজারিঃ

 ঘটনাটা রেজা ভাইয়ের কাছ থেকে শোনা। রেজা ভাই শুনেছেন সাইফুদ্দিন ভাইয়ের কাছ থেকে, হাজরত মাওলানা ওমর ফারুক সাহেব ঝালকাঠি ইজতিমায় এই ঘটনা শুনিয়েছেন। ২০১৪ সালের ইজতিমা শেষ হয়ে গেছে, প্রতি বছর ইজতিমার ময়দানে বড় বড় ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের একটা জোড় হয়, বরাবরের মত এইবারেও জোড় হয়েছে। কিন্তু মুরব্বীরা দেখলেন যে এবারের মজমায় দুই শিল্পপতি ভাই উপস্থিত নেই। দুই ভাইই তবলিগওয়ালা এবং তিন চিল্লার সাথি। তো মাওলানা ওমর ফারুক সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি তাদের কাছে গাস্ত করবেন। তাদের কাছে গাস্ত করলেন এবং তাদের হালত জিজ্ঞাসা করলেন। কারন জিজ্ঞাসা করলেন যে কেন এবারে ইজতিমার ময়দানে যোগ দিতে পারেননি। তো ছোট ভাই বললেন যে তার মন ভাল ছিল না বলে ইজতিমার ময়দানে যেতে পারেনি। কিন্তু মাওলানা সাহবে উত্তর শুনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি এবং বার বার পীড়াপীড়ি করতে লাগ্লেন আসল কারন বলার জন্য। জোরাজোরির এক পর্যায়ে সে তার আসল কারন বলত্য রাজি হয়। সে বলা শুরু করে যে তার একটা বোন ছিল যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করত এবং মেধাবী ছাত্রি ছিল। ইজতিমার আগে তার মওত হয়ে যায়। তো দুই ভাই এবং পরিবারের সবাই মিলে তার কাফন দাফন সম্পন্ন করে। সব কাজ শেষ করার পর সবাই যে যার যার মত বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু একদিন দুই ভাইয়ের একজন তাদের কিছু জরুরি কাগজপত্র খুজে পায় না। কয়েক কটি টাকার সম্পত্তি ছিল সেগুলো। সারা যায়গায় খোঁজার পরও পাওয়া যায় না।তখন বড় ভাইয়ের মনে পড়ে যে বোনের মউতের দিন কাগজগুলি তার পাঞ্জাবির পকেটে ছিল, কাজেই তার মনে হতে থাকে যে কাগজগুলি কবরের মধ্যে পড়ে গেছে কিনা। এই সমস্যা নিয়ে তারা আলেমদের কাছে যান এবং পরামর্শ চান। তো আলেমরা কবর খুড়ার অনুমতি দান করেন। অনুমতি পাওয়ার পর কবর কে খুড়া হয় এবং তার ভায়েরা যে দৃশ্য দেখে তাতে তাদের পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তারা দেখে যে তাদের বোনের গায়ে যে কাফনের কাপড় ছিল সেটা নেই এবং লাশটি পুরোপুরি উলঙ্গ অবস্থায় পড়ে আছেতারা আর দেখতে পায় যে লাশের মুখ থেকে কি যেন বেরিয়ে আছে, বড় ভাই সেটাকে ধরতে যায় আর তার হাতে আগুনের তাপ লাগে। এই অবস্থা দেখার পর বড় ভাই যায়গায় অজ্ঞান হয়ে যান এবং ইজতিমা পর্যন্ত সময়েও তার জ্ঞান ফিরে না। এই ঘটনা শোনানোর উদ্দেশ্য হল আজকে আমি নিজের উপর কিংবা মহল্লায় বেশ মেহেনত করি কিন্তু নিজের ঘর নিয়ে কোন ফিকির করি না, এই কারনে ঘরে ঘরে তালিমের হাল্কা করতে হবে, ইমানের মুজাকারার হালকা করতে হবে।

চিল্লার সফরের মর্ম স্পর্শ কারগুজারি |

posted Sep 12, 2014, 10:48 AM by Abul Hiqmah

প্রতিদিন সকালে গাস্তে বের হতাম| এক দিন এক সকালে গাস্তে বের হয়ে এক
ছেলে দাওয়াত দিচ্ছিলাম |তাকে বললাম,আল্লাহ তা'আলা আমাদের বড়
একটা কালেমা দিয়ে দুনিয়াতে পাঠাইছেন| কালেমা টা কি?
কালেমা ছেলেটি বলতেই পারে নাই|পরে তাকে কালেমাটি পড়ালাম| আমাদের নবীর নাম জিজ্ঞাসা করলাম তাও সে বলতে পারে নি|পরে তাকে নবীর নাম বলে মসজিদে আসার দাওয়াত দিয়ে চলে আসলাম| ভাবতেই পারে নি একজন মুসলমান
কিভাবে কালেমা বলতে পারে না কিভাবে নবীর নাম বলতে পারে না|এরকম কত
আছে আল্লাহ পাক ভালো জানেন|এদের কাছে কালেমা কে পৌছাবে?
এরা তো আমাদেরই ভাই|এদের কাছে কালেমা পৌছানো তো আমাদেরই জিম্মাদারী|
আল্লাহ পাকের মেহেরবানি যে দাওয়াত ও তাবলিগের মাহনতে বহু মুসলমান তো দ্বীনের পেয়েছে তার সাথে বহু অমুসলমান ইসলামের ছায়া তলে এসেছে | আল্লাহ জাল্লা শানহু আমাদেরকে এ নবীওয়ালা কাজে এসতেকামাতের সহিত লাগার তৌফিক দান করুন|আমিন আর কাছু ভাই ইসলামপন্থী হয়ে দাওয়াত ও তাবলীগের বিরোধীতা করে, খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার! দাওয়াত ও তাবলীগ কি মানব রচিত কোন কাজ? কোরআন হাদিসে কি এর কোন ভিত্তি নেই? ইলিয়াস (রহ.) এর বিরোধীতা করতে গিয়ে তারা তাবীগকেই অস্বীকার করে বসেছে!!! কখনো কি চিন্তা করেছে এতে তারা
ঈমানের অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে??? আল্লাহ আমাদেরসহ সবাই কে দ্বীনের
সহি বুঝ দান করুন| আমিন

দাওয়াহ ও তাবলীগের মাসজিদ ভিত্তিক পাঁচ আমাল

posted Sep 11, 2014, 11:45 AM by Abul Hiqmah   [ updated Sep 11, 2014, 12:37 PM ]


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বর্তমান যুগে দ্বীন ইসলামের জন্য অনেক ভাইবোন অনেকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন নামে বিভিন্ন মেহনত বা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাবলীগ জামাতও এমনই একটি মেহনত বা আন্দোলন, যার দ্বারা হাজারো মানুষ দ্বীনের প্রতি উৎসাহী হয়েছেন। নিজের জীবনের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার হুকুম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ নিয়ে এসেছেন। আমার নিয়্যাত এই মেহনতের বা কাজের কিছু কিছু দিক লেখার মাধ্যমে তুলে ধরা। যতটুকু আল্লাহ তায়ালা তাওফীক দেন।

তাবলীগের নাম কমবেশি সবাইই শুনেছেন। তারা যে তিন দিন/চল্লিশ দিনের জামাতে বের হয়, সেটাও সবাই মোটামুটি জানেন। কিন্তু তাবলীগের আরও কিছু কাজ আছে, যা সাধারণত যারা তাবলীগের সাথে বেশ কিছুসময় যুক্ত থাকেন তারাই জানেন। এমনই একটি বিষয় হচ্ছে “পাঁচ কাজ”। অনেক সময় একে “পাঁচ আমল” বা “মসজিদওয়ারী আমল”-ও বলা হয়ে থাকে। “মসজিদওয়ারী আমল” বলার কারণ হল- এক একটি মসজিদকে কেন্দ্র করে এই আমলগুলো করা হয়। এই পাঁচ কাজ হল সবার জন্য দ্বীনের মেহনতের ব্যাপারে সাধারণভাবে তাবলীগ জামাতের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি নির্দেশনা। এতে নিয়মমাফিক পাঁচটি কাজের কথা বলা হয়- তালীম, মাশওয়ারা, আড়াই ঘন্টা, গাশত, জামাত। এগুলো একে একে এখানে তুলে ধরছি।

পাঁচটি কাজের মধ্যে তিনটি কাজ দৈনিক করতে বলা হয়। তার মধ্যে প্রথমটি হল “তালীম”। তাবলীগ জামাতের নিয়মে বলা হয় “দুই তালীম”। কারণ দৈনিক দুই বার তালীম করতে বলা হয়, একটি ঘরে আরেকটি মসজিদে। তালীমের জন্য দুইটি কিতাব নির্ধারণ করে দেওয়া আছে- ফাযায়েলে আমাল(ফাযায়েলে সাদাকাত ও হাজ্জও এর অন্তর্ভুক্ত) এবং মুন্তাখাব হাদীস। একদিন ফাযায়েলে আমাল আবার একদিন মুন্তাখাব হাদীস। এই দুটি কিতাবেই অনেকগুলো অংশ আছে। তালীমের সময় প্রত্যেক অংশ থেকে অল্প অল্প করে পড়া হয়। তালীমের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে ঘরের বা মসজিদের সবাই একত্রিত হবে। একজন পড়বে, বাকীরা শুনবে। একজনই প্রতিদিন পড়বে না। ঘরের তালীমের ক্ষেত্রে অবশ্য পর্দার দিকে খেয়াল রাখতে হবে যেন গায়রে মাহরামরা একসাথে না বসে। মসজিদে এবং ঘরে প্রতিদিন আধাঘন্টা করে তালীমের কথা বলা হয়। তবে না পারলে যতটুকু পারা যায় সেটুকুই যেন করে, বাদ না দিয়ে দেয়। মানুষের অন্তরের মধ্যে দ্বীনের ইলম তথা কুরআন ও হাদীসের ইলমের একটা চাহিদা আছে। তালীমের দ্বারা সেটাই পূরণের চেষ্টা করা হয়। তবে অবশ্যই সম্পূর্ণ চাহিদা না, একজন মুসলিমের মধ্যে সাধারণভাবে সব সময় ইলমের যেই চাহিদাটা কাজ করে সেটার কথাই বলা হচ্ছে।

দৈনিক কাজগুলোর দ্বিতীয়টি হয় “মাশওয়ারা” বা “পরামর্শ করা”। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে মসজিদে সবাই একত্রিত হয়ে মাশওয়ারা করা হয়। জামাতে গেলে মাশওয়ারার নিয়ম সম্পর্কিত বিশদ আলোচনা করা হয়। তবে সাধারণভাবে মাশওয়ারার ভিতরে সবার কাছে কারগুজারী জানতে চাওয়া হয় যে গত মাশওয়ারার পর থেকে কে কতটুকু দ্বীনের মেহনত করেছে, বিশেষ করে দাওয়াত দিয়েছে। এটা অবশ্য ঠিক হিসাব নেওয়া না। বরং এর মাধ্যমে সবার মধ্যে দাওয়াতের একটা আগ্রহ এবং চেষ্টা তৈরি হয়। আবার মাশওয়ারার মাধ্যমে অনেককে কিছু কিছু দায়িত্বও দেওয়া হয়। সেই দায়িত্ব কীভাবে কতটুকু পালন করা হয়েছে, সেটাও কারগুজারীর মধ্যে চলে আসে। এরপর ঐদিনের তাকাজা কী কী আছে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সাধারণত পাঁচ কাজের অন্যান্য যে কাজগুলো আছে, সেগুলো কীভাবে ঠিকঠাকমত করা যায়, সেটাই তাকাজা থাকে। এজন্য কিছু দায়িত্ব একজন বা দুজনের উপর ভাগও করে দেওয়া হয়। এই লেখাতেই একটু পর অন্যান্য কাজগুলোর ব্যাপারে পড়লে এটা আরও ভাল করে বোঝা যাবে আশা করি। মাশওয়ারার মাধ্যমে সবাই দ্বীনের জন্য নিজেদের ফিকির বা চিন্তাগুলোকে একসাথে করে মিলেমিশে কাজ করা শেখে। সবার চিন্তা এবং কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য আসে। অনেকের মধ্যে দ্বীনের ফিকির তৈরি হয়। আবার দৈনিক এক মসজিদের মাশওয়ারার মত, ইউনিয়ন, থানা, জেলা, দেশ এভাবে সারা দুনিয়ার কাজের ব্যাপারেও নির্দিষ্ট সময় পর পর মাশওয়ারা হয়ে থাকে। এভাবে সবার মধ্যেই দ্বীনের ব্যাপারে একাত্মতা তৈরি হয়।

দৈনিক কাজ তিনটার শেষটাকে বলা হয়- “আড়াই ঘন্টার মেহনত”। “আড়াই ঘন্টা” কথাটি এসেছে সাধারণভাবে ২৪ ঘন্টার দিনের দশ ভাগের একভাগ আড়াই ঘন্টা হওয়ার কারণে। তাবলীগ জামাতের পক্ষ থেকে সবাইকে উৎসাহিত করা হয়, যেন সবাই প্রতিদিন নিজের সময়ের দশ ভাগের এক ভাগ আল্লাহ তায়ালার জন্য দ্বীনের মেহনতে দিয়ে দেন। অবশ্য সময়ের এই পরিমাণটা এমন কড়া কোন নিয়ম না। কেউ যদি অল্প একটু সময়ও পারে, তাকে সেটুকুই দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়। আবার পুরাতন সাথীদেরকে আট ঘন্টা(তিন ভাগের এক ভাগ) দেওয়ার জন্যও বলা হয়। এটা আসলে সাধারণভাবে সবার জন্য একটা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেওয়া। প্রয়োজনে কম-বেশি করলে দোষ হয়ে যাবে না। এতে মেহনতের সুবিধা হয়। কারও আগে বাড়তেও সুবিধা হয়। নয়ত আলাদাভাবে দিনে আড়াই ঘন্টা বা আট ঘন্টা সময় দেওয়ার দলীল খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়ত পরোক্ষ কিছু দলীল পাওয়া যেত পারে। যেমন- প্রত্যেক ভাল আমালের সাওয়াব দশগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সাহাবীরা (রাযি.) এবং সালফে সালিহীনরা এমন কোন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াই দ্বীনের জন্য এর চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেছেন। আমাদের সামনে একটা নির্দিষ্ট সময়/লক্ষ্য দেওয়া হয় আমাদের কাজকে সহজ করার জন্য। এর বেশি কিছু না। তাবলীগের কাজের অন্যান্য সময় যেমন চল্লিশ দিন, তিন দিন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই কথাই প্রযোজ্য।

এখন কথা হল, এই আড়াই ঘন্টা সময়ে কী করা হয়। তাবলীগের পাঁচ কাজের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হল- মসজিদভিত্তিক একটি এলাকার সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানো। এজন্য মসজিদওয়ার জামাত(যেই জামাত এই পাঁচ কাজ করছে) একটি খাতাও রাখে যেখানে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের লিস্ট রাখা হয়। এটা অবশ্য থাকতেই হবে এমন জরুরী কিছু না। এই লিস্টের সবার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। এর সাথে সাথে যদি কেউ অসুস্থ থাকেন কিংবা নিয়মিত কোন মুসল্লী যদি অনুপস্থিত থাকেন, তাদের সাথেও দেখা করার চেষ্টা করা হয়। কী বলা হয় তাদের কাছে গিয়ে? তাদের কাছে অল্প সময় ঈমানের বিষয়ে কিছু দাওয়াত দিয়ে মসজিদভিত্তিক যে পাঁচ আমাল চলছে, তাতে জোড়ার জন্য বা সময় দেওয়ার জন্য বলা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিন দিনের জামাতে সময় দিয়ে আসলে পাঁচ কাজে জোড়া সহজ হয়। এজন্য তিন দিনের জামাতের ফিকির এবং মেহনতও এই আড়াই ঘন্টা সময়ের মধ্যে করা হয়। সাধারণত দুই জন করে একসাথে যান। একজন কথা বলেন, অন্যজনের কাজ থাকে মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শোনা এবং যে ভাইয়ের কাছে যাওয়া হয়েছে তার জন্য মনে মনে দুআ করতে থাকা। এছাড়া পাঁচ কাজের অন্যান্য কাজ যেমন গাশতের জন্য কোন তাকাজা থাকলে কিংবা মাশওয়ারায় অন্য কোন দায়িত্ব দেওয়া হলে সেটাও এই আড়াই ঘন্টার সময়ের মধ্যেই করা হয়।

এরপরে যে কাজটির কথা আসে তা হল গাশত। এটি সাপ্তাহিকভাবে দুইবার করা হয়- একটি নিজেদের মসজিদের মহল্লায়/এলাকায়, অপরটি আশেপাশের অন্য কোন মসজিদের এলাকায়। এজন্য বলা হয়ে থাকে “দুই গাশত”। গাশত বলতে সাধারণত কয়েকজন মিলে লাইন ধরে যেয়ে দাওয়াত দেওয়ার যে আমলটি দেখা যায়, সেটির কথাই বোঝান হয়। যতদূর জানি, গাশত ফারসি শব্দ। সাধারণভাবে যার অর্থ ঘোরাফেরা করা। তাবলীগের জামাতের ভাষায় দাওয়াতের জন্য বাইরে যাওয়াকেই গাশত বলে। আর বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য না করে সাধারণভাবে যার সাথে দেখা হয় তাকেই দাওয়াত দিয়ে আসা হয় বলে লাইন ধরে চলা এই গাশতকে বলে উমুমী(সর্বসাধারণের) গাশত। আরবিতে এই গাশতকে বলে “জাওলা”। একটি নামাযকে সামনে রেখে এই গাশত করা হয়। বাইরে কয়েকজন যান দাওয়াত দিতে। তাদের মধ্যে একজন রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যান, আর নির্দিষ্ট আরেকজন দাওয়াত দেন। দাওয়াত হয় খুব সংক্ষিপ্ত। আর দাওয়াতের শেষে বলা হয়, নামাযের পরে মসজিদে বয়ান হবে তাতে শরীক হতে। নামাযের পরে মসজিদে বয়ান হয়। আর গাশত চলাকালীনও মসজিদের ভিতরে “ঈমান-এক্বীনের কথা” একটি মজলিশ আকারে চলতে থাকে। সংক্ষেপে এই হল “গাশত”। এর আরও নানা নিয়ম-কানুন আছে, যা দেশ-কাল হিসেবে ভিন্ন হতে পারে।

এখন কথা হল, এতসব নিয়ম মেনে আলাদাভাবে গাশত করার প্রয়োজন কী? সাধারণভাবে দাওয়াত দিলেই তো হয়। বিশেষ করে যে “আড়াই ঘন্টা” সময় দেওয়ার কথা বলা হল, সেখানে তো দাওয়াতের আমাল করাই হচ্ছে। আর এতসব নিয়ম-কানুন তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবীদের থেকে প্রমাণিতও নয়। আগেই বলেছি, উমুমী গাশতের একটা বড় একটা বৈশিষ্ট্য হল- এখানে নির্দিষ্ট কারও কাছে যাওয়া হয় না, কোন একটা এলাকায় বা দিকে যার যার সাথেই দেখা হয়, সবাইকেই দাওয়াত দেওয়া হয়। এর ফলে উমুমী গাশতের মাধ্যমে এমন অনেক মানুষের কাছে ঈমানের মূল কথাগুলোর দাওয়াত পৌঁছে যায়, যার কাছে অন্য কোন ভাবে দ্বীনের কথা খুব কমই পৌঁছে। বলতে পারেন এতে আদৌ তাদের কোন লাভ হয় কিনা। যদি কোন ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে নাও পাওয়া যায়, তো মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব পালনের কিছু চেষ্টা তো করা হয়। যারা গাশত করে, ঈমানী কথাগুলোর দ্বারা তাদের তো অন্তত লাভ হয়। তাবলীগের কাজের মুরুব্বীরা সব সময়ই বলেন, দাওয়াত দেওয়ার সময় অন্যদের চেয়ে নিজের দিকে বেশি খেয়াল করতে। নিজের জন্য দাওয়াত দিতে। আর এতে অংশগ্রহণকারীদের মনে দাওয়াতী দায়িত্ববোধও তৈরি হয়। আর অনেকেই কথাগুলো শুনে মসজিদে আসেন। সামান্য হলেও এই দাওয়াতের একটা প্রভাব যে সবার উপরেই পড়ে তা বলা যায়।

এখন নিয়ম-কানুনের কথায় আসা যাক। গাশত বা তাবলীগের অন্যান্য কাজেও নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রে একটা কথা মাথায় রাখলে ব্যাপারটা বোঝা সহজ হয়ে যায়। সেটা হল- “উসূল(বা নিয়ম-কানুন) বানানো হয়েছে কাজকে সহজ করার জন্য”। উমুমী গাশতের মধ্যে অনেক নিয়ম-কানুন। অনেকের মধ্যে বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া আছে। কোন দায়িত্ব কেমনভাবে পালন করতে হবে সেগুলোও বলে দেওয়া আছে। সবাই নিজের ভাগের দায়িত্বটুকু ঠিকমত পালন করলেই দাওয়াতের কাজ হয়ে যাবে। এর মধ্যে যেই অংশগুলো একটু কঠিন সেগুলো পুরোনোরা করবেন, বাকীগুলোতে নতুনরাও অংশগ্রহণ করবে এবং শিখবে। এভাবে গাশতের মাধ্যমে দাওয়াত দেয়ার সাথে সাথে দাওয়াত শেখাও হয়। আর এতসব নিয়মের কারণেই গাশত তুলনামূলকভাবে সহজ অন্যান্য দাওয়াতের আমলের(যেমন আড়াই ঘন্টা) চেয়ে নিয়মিত হয় এবং বেশি মানুষ অংশ নেন। আর এই নিয়মগুলো এমন না যে, কখনই পরিবর্তিত হবে না। বরং দেশ বা অন্য অবস্থা হিসেবে গাশতের নিয়ম আলাদা আছে। এবং সেগুলো বিভিন্ন কারণে পরিবর্তনও করা হয়। অবশ্য তার মানে এই না, যে কারও ইচ্ছা হল, আর নিয়ম বদলে নিল। বরং যে নিয়ম বা উসূল আছে, সেটাই মেনে চলতে হবে।

পাঁচ কাজের মধ্যে সর্বশেষ যে কাজটি, তা হলে প্রতি মাসে তিন দিনের জামাতে যাওয়া। আমার নিয়্যাত আছে, জামাতে বের হয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কী কী আমল বা কাজ করা হয়, তা নিয়ে আলাদাভাবে লেখার। সেজন্য এখানে আর বেশি কিছু লিখছি না। শধু এতটুকু বলে রাখি, অনেক মানুষের জীবনে দ্বীন ইসলাম প্রবেশ করেছে এই জামাতে সময় দেওয়ার কারণে।

তাবলীগ জামাতের কাজ অনেক আগে শুরু হলেও এই পাঁচ কাজের ধারণা এসেছে সম্ভবত গত নব্বয়ের দশকে। তার আগেও এসব কাজগুলোর কোন কোনটি ছিল। কিন্তু পাঁচ কাজ হিসেবে বলে দেয়া হয়নি। আমার মনে হয়, একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারব, সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের ইসলামের মৌলিক জিনিসগুলো পৌঁছে দেওয়া এবং চর্চা করার জন্য এই পাঁচ কাজের কাঠামো কতখানি ফলপ্রসূ। আল্লাহ তায়ালা এই কাজের মধ্যে বরকত দিন এবং এর মধ্যের ভুল-ত্রুটিগুলোকে সংশোধনের তাওফীক দিন।

ইন্টারনেটে তাবলীগ জামাত বিষয়ে নানা লেখা পাওয়া যায়। যার অধিকাংশই হল এর সমালোচনা এবং সেই সমালোচনার জবাব। আমার নিয়্যাত হল, এভাবে সমালোচনা-জবাব ইত্যাদিতে না যেয়ে তাবলীগের বিভিন্ন কার্যক্রমকে আমি যতটুকু দেখেছি সেভাবে তুলে ধরা। তার ফাঁকে ফাঁকেই হয়ত অনেক কিছুর উত্তর অনেকে পেয়ে যাবেন। সবার কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, মন্তব্যের মধ্যে আমাদের আলোচনা এই লেখার আলোচ্য বিষয় অর্থাৎ “পাঁচ কাজের” মধ্যেই রাখতে। অন্যান্য বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা ধীরে ধীরে নাহয় আলোচনা করা যাবে। জাযাকুমুল্লাহু খাইর।  


তাবলীগ জামাত সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু প্রশ্ন

posted Jan 6, 2012, 12:15 PM by Abul Hiqmah   [ updated Jan 6, 2012, 12:20 PM ]

প্রকাশক- ভাই ইউসুফ সুলতান

প্রশ্ন :
আস-সালামু আলাইকুমঅনেক ব্যস্ততার মাঝে কেমন আছেন ভাই?আর টিভি তে আপনের প্রোগ্রাম কেমন হচ্ছে ভাই,অনেক ইচ্ছা থাকা সত্বে ও দেখতে পারি না ৯-৬টা চাকুরির কারনেদোয়া করি আল্লাহ তালা আপনাকে দীন ইসলামের বেশি বেশি খিদমত করার তওফিক দ্বীন

অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের মত আমি তাবলীগ জামাতকে পছন্দ করি,কারন আমি ইসলামকে ভালবাসিআমি চেষ্টা করি যখনই যেখান থেকে সুযোগ পাই ইসলাম থেকে জানতে যদি কেউ সহিহ সুন্নাহ-হাদিসের ভিত্তিতে কথা বলেআমি তাবলীগ জামাতের সাথে মিশতে চাই কিন্ত ওদের অনেক জিনিষ আমার কাছে খটকা লাগে, তাই আমি আজ এসেছি কিছু তাবলীগ জামাতের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন নিয়েআমি জানি ভাই আপনি অনেক ব্যস্ত,কিন্ত আপনি যদি আপনার ব্যস্ততার ফাকে একটু সময় আমাকে দেন তাহলে আমার অনেক অনেক বড় উপকার হয়,আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে যে আমি পুরোপুরি তাবলীগের সাথে জড়াব কিনা

১.ফাজায়েলে আমল কতটুকু গ্রহনযোগ্য যেখানে সহীহ হাদীস গ্রন্থের(বোখারী/মুসলিম ইত্যাদি)কোন রেফারেন্স নাইকিন্ত মুন্তাখাব হাদীসের রেফারেন্স রয়েছে

২.ওরা বলে ঈমানের দাওয়াত দিলে ঈমান বাড়ে,তাই নিজের ঈমান বাড়ানোর জন্য ওরা ঈমানের দাওয়াত দেয়কথাটা কতটুকু গ্রহন যোগ্য?কোন সহিহ রেফারেন্স আছে কি?

৩.ওরা প্রায়ই এ আয়াতের ব্যাখ্যা দেয় তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি,তোমাদের বের করা হয়েছে মানুষের কল্যানের জন্য………” তাই ওরা মানুষকে দাওয়াত দেয়ার পথে বের হয়আসলে এটা কি আমাদের মত আম জন-সাধারনের দায়িত্ব নাকি যারা জানে(যেমনঃ আলিম) তাদের দায়িত্ব?

৪.ওরা বলে দাওয়াতের কাজ করার জন্য আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন।(বিদায় হজ্জের ভাষনে আজ আমার কথা তাদের মাঝে পৌছে দাও যারা অনুপস্থিত………”) তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নির্দেশে অনেক অনেক সাহাবী(রাঃ) দেশ দেশান্তরে বের হয়ে গিয়েছিলেন ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্যতাই তাবলিগী ভাইয়েরা ও ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্য বের হনএটাকে ওনারা বলেন নবী ওয়ালা দায়িত্বযা নবীজী(সাঃ) ওনার উম্মতের জিম্মায় রেখে গেছেন
আসলে তা কতটুকু সহীহআর ওনারা যে পদ্ধতিতে এই দায়িত্ব পালন করেন তা কতটুকু সহীহ?

৫.ওনারা এই বের হওয়াকে আল্লাহর পথেবের হওয়া বলেনএভাবে আল্লাহর পথে বের হওয়ার যে পদ্ধতি ওনারা অনুসরন করেন(যেমনঃ দুরের মসজিদে ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লায় বের হওয়া) এটা কি সহিহ?

৬. ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লার ভিত্তি কি?আমার মনে হয় একটা হাদীস আছে যে যে একাধারে ৪০ দিন তাকবীরে ঊলার সাথে জামাতে শরীক হবে,তার অন্তর থেকে আল্লাহ তালা মুনাফেকী দূর করে দিবেন বা এ জাতীয় কিছু……”

৭.ওনারা বলেন এভাবে আল্লাহর পথে বের হয়ে এক রাকাত নামাজ ৪৯ কোটি রাকাত নামাজের সমান যেটা কাবা শরীফের ১ লাখ রাকাতের চেয়ে অনেক বেশি ছোয়াব/মর্যাদা পুর্নতা কি সত্যি? এভাবে আল্লাহর পথে বের হয়ে এক টাকা ব্যয় করা সাতশত টাকার সমান ছোয়াবকোন সহিহ হাদীস কি আছে এ ব্যাপারে?

৮.আসলে কোন কোন কাজ করলে তাকে আল্লাহর রাস্তায় থাকা বলা যায়?উনাদের রাস্তা কি তালিবে ঈলমের রাস্তা নাকি আল্লাহ রাসুল (সাঃ) বর্নিত সত্যই আল্লাহর রাস্তা যে রাস্তায় থেকে মারা গেলে শহীদের মর্যাদা পাওয়া যাবে

৯.আল্লাহ তালা বলেছেন সৎ কাজের আদেশ দিতে এবং অসৎ কাজের বাধা প্রদান করতেকিন্তু অসৎ কাজের বাধা প্রদানেরক্ষেত্রে তাবলীগ জামাতের নিশ্চুপ ভাব আমাকে ব্যাথিত করে।(যেমনঃ সাম্প্রতিক সময়ে নারী নীতি,সংবিধানে ইসলাম,বিসমিল্লাহ ইত্যাদি ব্যাপার)

আমি তাবলীগসহ ইসলামের সবাইকে ভালবাসিআমি কোন রাজনইতিক/ইসলামি দলের সাথে জড়িত না কিন্তু মনে প্রানে চাই সমাজবদ্ধভাবে কোন ইসলামি দলের সাথে জড়াতেকেননা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন ইসলামী জিন্দেগি হলো সামাজিক জিন্দেগীর জীবন,যে এই সমাজ থেকে একা থাকবে তাকে শয়তান এমন ভাবে বিপথ গামী করবে যেভাবে বাঘ বকরীর পাল থেকে বিছিন্ন বকরীকে খেয়ে ফেলে

আল্লাহ তালা বলেছেন আমি যা জানি না তা বিজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিতেভাই আমি আপনার শরনাপন্ন হলামআপনার মুল্যবান সময় থেকে আমার জন্য একটু সময় বের করবেন যেন আপনার একজন ভাই আপনার কাছ থেকে কোরআন ও সুন্নাহের জ্ঞানময় ও মুল্যবান পরামর্শ পায়আল্লাহ তালা আপ নাকে উত্তম ক ল্যান দান করুন ও আপনার প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষন করুনআমীনআমার প্রশ্নগুলো আপনার ইমেল থেকে শুরু করে আপনের ওয়েবসাইট সব জায়গায় পাঠালাম যেন আপনার নজর এড়িয়ে না যায়

উত্তর :

ওয়ালাইকুম আসসালাম

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর :

১.ফাজায়েলে আমল কতটুকু গ্রহনযোগ্য যেখানে সহীহ হাদীস গ্রন্থের(বোখারী/মুসলিম ইত্যাদি)কোন রেফারেন্স নাইকিন্ত মুন্তাখাব হাদীসের রেফারেন্স রয়েছে

-এখানে বুখারী, মুসলিম শরীফের রেফারেন্সও আছেযেগুলো বুখারী-মুসলিম এ নেই, সেগুলো অন্য কিতাব থেকে আনা হয়েছেএটা কোনো সমস্যা নয়

২.ওরা বলে ঈমানের দাওয়াত দিলে ঈমান বাড়ে,তাই নিজের ঈমান বাড়ানোর জন্য ওরা ঈমানের দাওয়াত দেয়কথাটা কতটুকু গ্রহন যোগ্য?কোন সহিহ রেফারেন্স আছে কি?

-ঈমানের দাওয়াতের অর্থ ঈমানের কথা বলাএ কথা নি:সন্দেহ যে, যে বিষয়ের কথা বলা হয়, চর্চা হয়, সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা বাড়ে বৈ কমে না

৩.ওরা প্রায়ই এ আয়াতের ব্যাখ্যা দেয় তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি,তোমাদের বের করা হয়েছে মানুষের কল্যানের জন্য………” তাই ওরা মানুষকে দাওয়াত দেয়ার পথে বের হয়আসলে এটা কি আমাদের মত আম জন-সাধারনের দায়িত্ব নাকি যারা জানে(যেমনঃ আলিম) তাদের দায়িত্ব?

-যার যতটুকু জ্ঞান আছে, ততটুকুই অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়া উচিৎএখানে সাধারণ আর আলেমের কোনো পার্থক্য নেইআলেম হলেই সব জানা থাকবে, না হলে কিছুই জানবে না এমনটি নয় বরং প্রকৃত আলেম সে-ই, যে যতটুকু জানে তার ওপর আমল করে

৪.ওরা বলে দাওয়াতের কাজ করার জন্য আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন।(বিদায় হজ্জের ভাষনে আজ আমার কথা তাদের মাঝে পৌছে দাও যারা অনুপস্থিত………”) তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নির্দেশে অনেক অনেক সাহাবী(রাঃ) দেশ দেশান্তরে বের হয়ে গিয়েছিলেন ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্যতাই তাবলিগী ভাইয়েরা ও ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্য বের হনএটাকে ওনারা বলেন নবী ওয়ালা দায়িত্বযা নবীজী(সাঃ) ওনার উম্মতের জিম্মায় রেখে গেছেন
আসলে তা কতটুকু সহীহআর ওনারা যে পদ্ধতিতে এই দায়িত্ব পালন করেন তা কতটুকু সহীহ?

-এটি بلغوا عني و لو آية’  হাদীসের অর্থরেফ : সহীহ বুখারী : ৩৪৬১, তিরমিযী : ২৬৬৯ (http://yousufsultan.com/posts/reference-of-hadith-balligu-anni-walao-ayah/

 

তাদের পদ্ধতিতে রয়েছে কালেমা, নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ্ব, সামাজিক আচার-আচরণ ইত্যাদির শিক্ষাএটাকে আমরা রাসূলের স. আদর্শ শেখার একটি প্রতিষ্ঠান বললে বেশি বলা হবে নাএখানে সহীহ-গায়র সহীহ বিচার করার প্রশ্নই আসার কথা নয়

৫.ওনারা এই বের হওয়াকে আল্লাহর পথেবের হওয়া বলেনএভাবে আল্লাহর পথে বের হওয়ার যে পদ্ধতি ওনারা অনুসরন করেন(যেমনঃ দুরের মসজিদে ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লায় বের হওয়া) এটা কি সহিহ?

 

-আসলে এটা দাওয়াতের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপএখানে পদ্ধতির চেয়ে ফলাফলের গুরুত্ব বেশিতবে দূরে কোথাও যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই নিজের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করে যেতে হবেএমন যেন না হয় যে পরিবার রইল অভুক্ত, অসহায়, আর আমি চলে গেলাম দূরে কোথাও, চিল্লায়

৬. ৩/৭/৪০ দিনের চিল্লার ভিত্তি কি?আমার মনে হয় একটা হাদীস আছে যে যে একাধারে ৪০ দিন তাকবীরে ঊলার সাথে জামাতে শরীক হবে,তার অন্তর থেকে আল্লাহ তালা মুনাফেকী দূর করে দিবেন বা এ জাতীয় কিছু……”

-জ্বিএ জাতীয় হাদীসগুলোই এর ভিত্তি

৭.ওনারা বলেন এভাবে আল্লাহর পথে বের হয়ে এক রাকাত নামাজ ৪৯ কোটি রাকাত নামাজের সমান যেটা কাবা শরীফের ১ লাখ রাকাতের চেয়ে অনেক বেশি ছোয়াব/মর্যাদা পুর্নতা কি সত্যি? এভাবে আল্লাহর পথে বের হয়ে এক টাকা ব্যয় করা সাতশত টাকার সমান ছোয়াবকোন সহিহ হাদীস কি আছে এ ব্যাপারে?

-নি:সন্দেহে কাবা শরীফে আদায়কৃত নামাযের সওয়াব সবচেয়ে বেশিতবে কেউ পূর্ণ ইখলাসের সাথে নামায আদায় করলে কবুলিয়্যাতের ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারেন

৮.আসলে কোন কোন কাজ করলে তাকে আল্লাহর রাস্তায় থাকা বলা যায়?উনাদের রাস্তা কি তালিবে ঈলমের রাস্তা নাকি আল্লাহ রাসুল (সাঃ) বর্নিত সত্যই আল্লাহ রাস্তা যে রাস্তায় থেকে মারা গেলে শহীদের মর্যাদা পাওয়া যাবে

 

-আল্লাহর কালিমা সমুন্নত হয় এমন যে কোনো পথই আল্লাহর রাস্তাতা শিক্ষা-দীক্ষা, মসজিদ, শাহাদাত, তাবলীগ যে কোনো পথই হতে পারে 


৯.আল্লাহ তালা বলেছেন সৎ কাজের আদেশ দিতে এবং অসৎ কাজের বাধা প্রদান করতেকিন্তুঅসৎ কাজের বাধা প্রদানেরক্ষেত্রে তাবলীগ জামাতের নিশ্চুপ ভাব আমাকে ব্যাথিত করে।(যেমনঃ সাম্প্রতিক সময়ে নারী নীতি,সংবিধানে ইসলাম,বিসমিল্লাহ ইত্যাদি  ব্যাপার)

 

-অসৎ কাজ থেকে বাধা দেয়ার বিভিন্ন পর্যায় আছেরাজনৈতিক কোনো কিছু মোকাবিলা করার জন্য রাজনৈতিক ভাবেই তাতে বাধা দিতে হয়বর্তমান ইস্যুগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক ইস্যুএসবে জড়িয়ে তাবলীগ জামাত তাদের বৃহত্তর খিদমতে বাধা ডেকে আনতে চায় নাএ কথা নিশ্চয় জানেন আশা করছি যে, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু আরব দেশেও বর্তমানে তাবলীগ নিষিদ্ধবৃহত্তর স্বার্থে অনেক সময় অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়

 

ধন্যবাদ

তাহরীকে ঈমান; কিছু অবান্তর প্রশ্ন ও তার জবাব। ৪র্থ পর্ব।

posted Jan 1, 2012, 3:11 AM by Abul Hiqmah   [ updated Aug 26, 2012, 12:06 PM ]

প্রসঙ্গঃ ৩ চিল্লা ও ৬ মাসের দলীল।

লিখেছেন আল মুহাজির শাইখ ০৮ নভেম্বর ২০১১, রাত ১২:৫৪

******************কয়েকটি পূণোরুক্তিঃ******************

লেখাটির উদ্দেশ্যঃ ব্লগিং এর সামান্য অভিজ্ঞতায় যা জানতে পেরেছি তা হলো, সত্য-মিথ্যাকে গুলিয়ে ফেলে কিংবা মিথ্যার আঘাতে সত্যকে নিষ্পেষিত করে ধোঁকাবাজি করাই অনেকের নিকট ব্লগিং-এর স্বার্থকতা। এমনই কিছু 'ব্লগার-কলঙ্ক' বিশ্বজনীন "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর অবিতর্কিত মেহনতের সমালোচনায় পেশাদারী মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন, এবং মিমাংসিত কিছূ অবান্তর প্রশ্নের অবতারণা করে সরলমনা দাঈ ও মুবাল্লিগদের সাথে প্রতারণার পাঁয়তারা করছেন। এমতাবস্থায় আমার উপর ওয়াজিব হয়ে পড়েছে, আমার সাধ্যানুযায়ী এসব মিথ্যাচারের কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জবাব দিয়ে সর্বসাধারণের আকীদা সংশয়মুক্ত রাখা। তাই সিরিজ আকারে সেই সব বানোয়াটি আপত্তির যথাযথ জবাবের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই ধারাবাহিকতায় এটি ৩য় পর্ব। ধারাবাহিকভাবে সিরিজটি চলতে থাকবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

বলে নিতে চাইঃ "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর ভাইদের কথা অত্যন্ত সাবলীল, বিনয়ী, নম্র ও মিষ্টি হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে আমি আমার উত্তরপর্বে অনেক ক্ষেত্রেই চরম ভাষা ব্যবহার করেছি। কারণ,
১) আমি তাদের মত এখনো অত ভালো হতে পারি নাই। শুধু সত্যের পক্ষাবলম্বনে আমাকে তাদের পক্ষে কলম ধরতে হলো।
২) বাতিলের মুকাবেলা করার জন্য একটু কঠিন হাতিয়ার ব্যবহার না করলে সামান্য সুযোগে আঁধমরা সাঁপের ফুঁসে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই সর্বশান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনয়ী ও নম্রতার গুণকে আপাতত বিশ্রাম দেওয়া হলো।

বলাবাহুল্য, আমার এই পোস্টটি সূরা নাহলের ১২৫ নং আয়াত অনুযায়ী হিকমতপূর্ণ দাওয়াত নয়, বরং একই আয়াত অনুযায়ী নিরুত্তরকারী জবাব। তাই ভিন্নতার জন্য আমি দায়মুক্ত।

একটি স্বীকারোক্তিঃ এ লেখাটি আমার একজন শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদের প্রবন্ধ থেকে সংগৃহিত। ঈষৎ পরিমার্জন ও ব্লগে প্রকাশের উপযোগী করে প্রকাশ করা হলো।

এটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝার জন্য আগের পর্বগুলো প্রথমে পড়ে নেওয়ার অনুরোধ করছি।

এখানে ক্লিক করে আগের পর্বগুলো দেখে নিন
*১ম পর্ব। প্রসঙ্গঃ অবতরণিকা*
*২য় পর্ব। প্রসঙ্গঃ মুসলমানদেরকে দাওয়াত দেওয়ার দলীল*
*৩য় পর্ব। প্রসঙ্গঃ চিল্লার দলীল*


পূর্ব প্রকাশিতের পরঃ
***********************************************************
*******************৪ ও ৬ মাসের দলীল*******************

কুরআন ভিত্তিক দলীলঃ

فسيحوا في الأرض أربعة أشهرو اعلموا أنكم غير معجزي الله، و أن الله مخزي الكافرين
অর্থঃ তোমরা যমীনে পরিভ্রমণ করো চার মাসকাল, এবং ভালো করে বুঝে নাও যে, সর্বশক্তিমান ও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহকে কোনভাবেই তোমরা পরাভুত করতে পারবে না। বরং আল্লাহই মুশরিকদেরকে চরম লাঞ্চিত করে ছাড়বেন। (সূরা তাউবাহ, আয়াতঃ ২)

হাদীস ভিত্তিক দলীলঃ

عن البراء رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم بعث خالد بن الوليد إلى أهل اليمن، يدعوهم إلى الإسلام. قال البراء: فكنت فيمن خرج مع خالد، فأقمنا ستة أشهر يدعوهم إلى الإسلام فلم يجيبوه. ثم إن النبي صلى الله عليه وسلم بعث عليا رضي الله عنه فأمره أن يقفل خالدا، إلا رجل كان يمم مع خالد أحب أن يعقب مع علي فليعقب معه. فكنت فيمن عقب مع علي. فلما دنونا من القوم خرجوا إلينا، فصلى بنا علي، ثم صفنا صفا واحدا، ثم تقدم بين أيدينا وقرأ عليهم كتاب رسول الله صلى الله عليه وسلم، فأسلمت همدان جمعا. فكتب علي إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم، فلما قرأ الكتاب خر ساجدا ثم رفع رأسه فقال: " السلام على همدان ، السلام على همدان ". هذا حديث صحيح [ ص: 282 ] أخرج البخاري بعضه بهذا الإسناد .

অর্থঃ হযরত বারা রা. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইয়ামান প্রদেশে তাবলীগের উদ্দেশ্যে হযরত খালীদ ইবেন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠান। আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। আমরা দীর্ঘ ৬মাস যাবত সেখানে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অনবরত করে চলেছিলাম, কিন্তু তাদের কেউ তখনো আমাদের দাওয়াত কবুল করছিলো না। অতপর হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে রাসূল আমীরের দায়িত্ব দিয়ে খালীদ রাযিয়াল্লাহু কে ফিরে যেতে বলেন এবং তাঁর সাথে যারা ফিরতে চায় তারা ফিরতে পারবে আর যারা থেকে যেতে চায় তারা থাকতে পারে। আমি হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আরো সময় বাড়িয়ে নিলাম।

অতপর, আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাদেরকে নিয়ে নামাজ আদায় করলেন। পরে আমরা কাতারব্ন্দী হয়ে দাড়ালাম, এরপরে তিনি আমাদের মাঝে এগিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর দাওয়াতনামা পড়ে শুনালেন। সাথে সাথে হামদান গোত্রের সবাই একই সাথে ইসলাম কবুল করে নিলেন।

এই খুশির সংবাদ লিখে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহর নিকট পত্র পাঠালেন। যখন রাসূল উক্ত পত্রখানি পড়লেন, তখন সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। অতপর, মাথা উঠিয়ে বললেন, হামদানগোত্রের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, হামদানগোত্রের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।

অন্য রেওয়াতে আছে, উক্ত জামাত নিয়ে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ৪ মাস পর ফিরে এলেন, বিদায় হজ্বের সময়। অতএব, উভয় আমীরের নেতৃত্বে আমাদের সময় অতিবাহিত হলো, প্রায় ১ বৎসর। (হায়াতুস সাহাবাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ১৭৯/ বুখারী শরীফ ২য় খণ্ড।)

অনুরূপ বর্ণনার আরেকটি হাদীস ইবনে কাছীর রহ. এর "السيرة النبوية" নামক গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের ২০৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে।

এ হাদীসের সারাংশ দাড়ায়, হযরত খালেদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে ৬ মাস ও আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে ৪ মাস ও তারো চেয়ে বেশী সময় তাবলীগী সফর করার প্রমাণ মিলেছে।

এছাড়াও সাহাবাগণ কতৃক ৩ দিন, ১০ দিন, ১৫ দিন, ৪০ দিন, ৬০ দিন, ৪ মাস, ৬ মাস, ১ বছর, ২ বছর, ৫ বছর, ২৭ বছর, এমনকি গোটা জীবনটাই পৃথিবীর প্রান্তর থেকে প্রান্তরে তাবলীগে কাটাবার প্রমাণ অসংখ্য ইতিহাসগ্রন্থে স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে।

বিস্তারিত জানতে নীচের সূত্রগুলো দেখুনঃ

প্রাচীন ও জগদ্বিখ্যাত আরবী ইতিহাস ভিত্তিক দলীলঃ

১) ইবনে সা'আদ রচিত 'তাবাক্বাত' গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ৫১-৫৪ পৃষ্ঠায় ৭দিন ও ১৫দিনের জামাতের কথা লেখা আছে।
উক্ত জামাতের আমীরঃ স্বয়ং রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
রোখঃ সুলাইম গোত্র, মদীনা মুনাওয়ারাহ।
সময়কালঃ ৪র্থ হিজরীর সফর মাস।

২) আল্লামা ওয়াক্বিদীইবনে ইসহাক রাহ. যথাক্রমে ৭ দিন ও ৩ দিনের কথা উল্লেখ করেছেন।

৩) ইবনে সা'আদ এর ২য় খণ্ডের ৩৫-৩৬পৃষ্ঠায় ৬০ দিনের তাবলীগী জামাতের কথা সুস্পষ্ট করে বলা আছে।

৪) তাবারী/ আখবারূর রাসূল ওয়াল মুলূক গ্রন্থকার ইমাম আবু জাফর রাহ. ৬০দিনের জামাতের কথা পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছেন।

৫) ইবনে ইসহাক নামক ইতিহাসেও তা উদ্ধৃত হয়েছে।
আমীরঃ স্বয়ং রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
সময়কালঃ ৩য় হিজরীর জুমাদাল ঊলা মুতাবিক ৬২৪খৃষ্টাব্দের অক্টোবর/নভেম্বর মাসে এ জামাত রওয়ানা হয়।

রোখঃ আলফুর থেকে বাহরাইন পর্যন্ত এ বিস্তীর্ণ এলাকা তাবলীগের কাজ করতে করতে এগিয়ে যেতেন, ঠিক এ যুগের সালের বা পায়দল জামাতের মতই।

৬০ দিনের ব্যপারে সকল ইতিহাসবেত্তাই সমমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু মতভেদ স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতি নিয়ে। কেউ বলেন ৬০ দিন, কেউ বলেন ১০দিন।

যেমন, তাবারী ও ইবনে ইসহাকের মতে রাসূলুল্লাহ উক্ত জামাতে ৬০ দিন ছিলেন। আর বালজুরী, ওয়াকেদী ও ইবনে সা'আদের মতে ১০দিন ছিলেন। উভয় পক্ষেই সহীহ হাদীসের দলীল পর্যাপ্ত দলীল আছে।

অতএব, এখান থেকে ৬০ দিনের প্রমাণ যেমন মিললো, ঠিক তদ্রুপ ১০ দিনেরও মজবুত দলীল পাওয়া গেলো।

মোট কথা, আল্লাহর রাসূল যে ৬০ দিনের জামাতে বের হয়েছিলেন, এ বিষয়ে সকল ইতিহাসবীদ একমত পোষণ করেছেন।

৬) তাবাকাত গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৩৩৩ ও ৩৩৪ পৃষ্ঠায় আছে, আমর বিন মুররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু ৬ষ্ঠ হিজরী মুতাবিক ৬২৭খৃষ্টাব্দে মদীনার পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল জুহায়না এলাকায় তাবলীগ করে ২১ এর উর্দ্ধে ব্যক্তিকে তাশকীল করে মদীনায় এনেছেন।

৭। ক) তাবারী কিতাবের ৩য় খণ্ডের ৩৪ পৃষ্ঠায় আছে, হযরত আবু কাতাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু ৮ম হিজরীর শা'বান মাস মুতাবিক ৬২৯ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ১৫ জনের এক জামাত নিয়ে খাজিরাহ আলগাবাহ এলাকায় তাবলীগ করে গাতফান বংশের অধিকাংশ জনগণের এক বিরাট জামাত তাশকীল করে মদীনায় নিয়ে আসেন। এই বিষয়ে আরো সমভাষ্য দিচ্ছেন, ইবনে হিশাম ২য় খণ্ডের ৬২৯ পৃষ্ঠায় , ইবনে সা'আদ ১৩২ পৃষ্ঠায়।

খ) একই কিতাবের ৩য় খণ্ডের ১২৬-১২৮ পৃষ্ঠায় আরো বর্ণিত আছেঃ হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ১০ম হিজরীর রবিউল আউয়াল মাস মুতাবিক ৬৩১খৃষ্টাব্দের জুন মাসে ৪০০ জনের বিরাট জামাতসহ নাজরান এলাকায় তাবলীগ করে বনু আ.মাদান-বনু হারিস বংশের বহু মানুষকে নগদ উসূল করে আনেন। এ সফর ছিলো ৬মাসব্যাপী।

তাবারীতে একথাও লখো আছে যে, এ জামাত যুদ্ধের জন্য প্রেরিত হয়নি, বরং শুধুমাত্র তাবলীগের জন্যই প্রেরিত হয়েছিলো।

গ) তাবারীতে আরো লেখা আছে, হযরত কা'ব রাযিয়াল্লাহু আনহু ৮ম হিজরীর রবিউল আউয়াল মুতাবিক ৬২৯খৃষ্টাব্দের জুলাই মাসে ১৫ জনের জামাত নিয়ে 'যাতুল আতলাহ নামক স্থানে তাবলীগ করে কুযাযাহ গোত্র থেকে দু'জামাত প্রায় তাশকীল করেন।

ঘ) হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ামানে ৮ জনের জামাত নিয়ে ১০ম হিজরী মুতাবিক ৬৩১খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ৪মাসের জন্য প্রেরিত হন।

আরো বিস্তারিত দেখুন, তাবারীর ৩য় খণ্ডে, ১৩১-১৩২পৃষ্ঠায় ও বুখারীর ৬২৩ পৃষ্ঠায়।

সারাংশ হলো, সময় কোন মূখ্য বিষয় নয়, আসল বিষয় হলো দায়িত্ববোধোদয়। এ হৃদয়-আকাশে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিখিয়ে দেওয়া দায়িত্ববোধ কতটুকু উদয় হয়েছে? তাঁর ফিকিরে ফিকিরবান হতে পেরেছি কি?
আমি ডাক্তার হয়েছি, ব্যবসায়ী হয়েছি, আলেম হয়েছি, সবই হয়েছি। কিন্তু মুসলমান কি হতে পেরেছি? হতে কি পেরেছি, রাসূলুল্লাহর সুযোগ্য উম্মত?

শেষ কথাঃ দিন কোন ধর্তব্য বিষয় নয়, আসল লক্ষণীয় বিষয় হলো দ্বীন।

**********************************************************************************

এটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট। পরবর্তী পর্বগুলোতেও সবাইকে সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ করছি।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

**********************************************************************************

তাহরীকে ঈমান; কিছু অবান্তর প্রশ্ন ও তার জবাব। ৩য় পর্ব।

posted Jan 1, 2012, 3:02 AM by Abul Hiqmah

প্রসঙ্গঃ চিল্লার দলীল।

লিখেছেন আল মুহাজির শাইখ ০৫ নভেম্বর ২০১১, রাত ০২:০১

******************কয়েকটি পূণোরুক্তিঃ******************

লেখাটির উদ্দেশ্যঃ ব্লগিং এর সামান্য অভিজ্ঞতায় যা জানতে পেরেছি তা হলো, সত্য-মিথ্যাকে গুলিয়ে ফেলে কিংবা মিথ্যার আঘাতে সত্যকে নিষ্পেষিত করে ধোঁকাবাজি করাই অনেকের নিকট ব্লগিং-এর স্বার্থকতা। এমনই কিছু 'ব্লগার-কলঙ্ক' বিশ্বজনীন "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর অবিতর্কিত মেহনতের সমালোচনায় পেশাদারী মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন, এবং মিমাংসিত কিছূ অবান্তর প্রশ্নের অবতারণা করে সরলমনা দাঈ ও মুবাল্লিগদের সাথে প্রতারণার পাঁয়তারা করছেন। এমতাবস্থায় আমার উপর ওয়াজিব হয়ে পড়েছে, আমার সাধ্যানুযায়ী এসব মিথ্যাচারের কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জবাব দিয়ে সর্বসাধারণের আকীদা সংশয়মুক্ত রাখা। তাই সিরিজ আকারে সেই সব বানোয়াটি আপত্তির যথাযথ জবাবের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই ধারাবাহিকতায় এটি ৩য় পর্ব। ধারাবাহিকভাবে সিরিজটি চলতে থাকবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

বলে নিতে চাইঃ "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর ভাইদের কথা অত্যন্ত সাবলীল, বিনয়ী, নম্র ও মিষ্টি হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে আমি আমার উত্তরপর্বে অনেক ক্ষেত্রেই চরম ভাষা ব্যবহার করেছি। কারণ,
১) আমি তাদের মত এখনো অত ভালো হতে পারি নাই। শুধু সত্যের পক্ষাবলম্বনে আমাকে তাদের পক্ষে কলম ধরতে হলো।
২) বাতিলের মুকাবেলা করার জন্য একটু কঠিন হাতিয়ার ব্যবহার না করলে সামান্য সুযোগে আঁধমরা সাঁপের ফুঁসে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই সর্বশান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনয়ী ও নম্রতার গুণকে আপাতত বিশ্রাম দেওয়া হলো।

বলাবাহুল্য, আমার এই পোস্টটি সূরা নাহলের ১২৫ নং আয়াত অনুযায়ী হিকমতপূর্ণ দাওয়াত নয়, বরং একই আয়াত অনুযায়ী নিরুত্তরকারী জবাব। তাই ভিন্নতার জন্য আমি দায়মুক্ত।

একটি স্বীকারোক্তিঃ এ লেখাটি আমার একজন শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদের প্রবন্ধ থেকে সংগৃহিত। ঈষৎ পরিমার্জন ও ব্লগে প্রকাশের উপযোগী করে প্রকাশ করা হলো।

এটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝার জন্য আগের পর্বটি প্রথমে পড়ে নেওয়ার অনুরোধ করছি।

এখানে ক্লিক করে আগের পর্ব দু'টি দেখে নিন *১ম পর্ব* *২য় পর্ব*

পূর্ব প্রকাশিতের পরঃ
***********************************************************

******প্রশ্নঃ চিল্লা কোথায় পেলেন? এটির শরয়ী অবস্থান কী?******

উত্তরঃ এ সবই কুরআন ও হাদীসের নস থেকে নেওয়া। কোনটিই নবোদ্ভাবিত কিছু নয়। শরীয়তের সুস্পষ্ট ও সুক্ষ্ম দলীল দ্বারা এসব সুস্পষ্ট প্রমাণিত।

তবে, শরয়ী দলীল জানার আগে দলীল নিষ্কর্ষণের উপায় বা সূত্র জানা অপরিহার্য। কেননা, সূত্র-জ্ঞানের অভাবও অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের উদ্ভাবক।

তাই বলছি, কুরআন থেকে দলীল বা প্রমাণ উদ্ভাবনের মূলসূত্র ৪টিঃ
১) কুরআনী শব্দ বা বাক্যের আভিধানিক অর্থ।
২) কুরআনী শব্দের ব্যবহারের ভিন্নতা।
৩) কুরআনী শব্দের সুপ্ত আবেদন বা নির্দেশনা।
৪) কুরআনী শব্দের উদ্দেশ্য। (নূরুল আনওয়ার, পৃষ্ঠাঃ ১৩)

উক্ত নিয়ামনুসারে কুরআন ভিত্তিক চিল্লার দলীলঃ
১) و إذ واعدنا موسي أربعين ليلة
যখন আমি মূসা আলাইহিস সালামকে ৪০রজনীর প্রতিশ্রুতি দিলাম (সূরা বাকারাহ, আয়াতঃ ৫১)

২) و وعدنا موسي ثلثين ليلة و أتممناها بعشر فتم ميقات ربه أربعين ليلة
অর্থঃ আর আমি মূসা আলাইহিস সালামকে ৩০রাতের ওয়াদা দিয়েছি, আর তা পূর্ণ করেছি আরো ১০বাড়িয়ে, ফলে তার মেয়াদ পূর্ণ হলো ৪০রজনীতে। (সূরা আ'রাফ, আয়াতঃ ১৪২)

উক্ত আয়াতে চিল্লার (৪০ দিন) শেষে ঘর ছেড়ে তূর পাহাড়ে হিজরতের মাধ্যমে তাওরাত দিয়েছেন। সুতরাং, চিল্লার শিক্ষক ও উদ্ভাবক স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা নন কি?

***********************************************************************************

হাদীস ভিত্তিক চিল্লার প্রমাণঃ

১) عن أنس بن مالك رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلي الله عليه و سلم : من صلي لله أربعين يوما في جماعة يدرك التكبيرة الأولي كتبت له برائتان: براءة من النار، و براءة من النفاق. (رواه الترمذي، باب ما جاء في فصل التكبيرة الأولي، رقم 241 قال الحافظ المنذري: رواه الترمذي و قال: لا أعلم أحدا رفعه إلا ما روي مسلم بن قتيبة عن طعمة عن عمرو قال المعلي رحمه الله: و مسلم و طعمة و بقية رواته ثقات، الترغيب 1/263)ـ
অর্থঃ হযরত আনাস ইবেন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ৪০দিন তাকবীরে উলার সঙ্গে জামাতে নামায পড়ে সে দু'টি পরোয়ানা লাভ করবে।
ক) জাহান্নাম থেকে মুক্তির পরোয়ানা
খ) মুনাফেকী থেকে মুক্তির পরোয়ানা (তিরমিযী শরীফ)

২)عن عبد الله قال حدثنا رسول الله صلى الله عليه وسلم، وهو الصادق المصدوق، قال: إن أحدكم يجمع في بطن أمه أربعين يوماً، ثم علقة مثل ذلك، ثم يكون مضغة مثل ذلك، ثم يبعث الله ملكاً فيؤمر بأربعة: برزقه وأجله، وشقي أو سعيد، فوالله إن أحدكم - أو: الرجل - يعمل بعمل أهل النار، حتى ما يكون بينه وبينها غير باع أو ذراع، فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل الجنة فيدخلها، وإن الرجل ليعمل بعمل أهل الجنة، حتى ما يكون بينه وبينها غير ذراع أو ذراعين، فيسبق عليه الكتاب، فيعمل بعمل أهل النار فيدخلها (رواه البخاري، كتاب القدرـ رقم الحديث 1226/6221)ـ

উক্ত হাদীসে মায়ের উদরে প্রতি চিল্লায় শিশুর শারীরিক পরিবর্তনের কথা বর্ণিত হয়েছে। মায়ের পেটে যেমন ৩চিল্লা অবস্থানের পর শিশু প্রাণ পায় তেমন চিল্লার পেটে মানবজীবন ঈমানীপ্রাণ পায়।

৩)عن أبي هريرة قال: رباط يوم في سبيل الله أحب إلي من أن أوافق ليلة القدر في أحد المسجدين، مسجد الحرام، ومسجد رسول الله صلى الله عليه وسلم، ومن رابط ثلاثة أيام في سبيل الله فقد رابط، ومن رابط أربعين يوما فقد استكمل الرباط. (مصنف عبد الرزاق، الجزء الثاني و العشرون في باب ما جاء في فضل الرباط)ـ

৪)عن ابن عمر رضي الله عنهما : أنه قدم على عمر من الرباط ، فقال : كم رابطت ؟ قال : ثلاثين يوما ، فقال عمر : عزمت عليك ألا رجعت حتى تتمها أربعين يوما .

৫) عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: "تمام الرباط أربعون يوما". وفيه أيضا حدثنا عيسى بن يونس عن معاوية بن يحيى الصدفي عن يحيى بن الحرث الرماني عن مكحول قال: "قال رسول الله صلى الله عليه وسلم تمام الرباط أربعون يوما. (في مصنف ابن أبي شيبة جزء 45)ـ

৬)عن يزيد بن أبي حبيب يقول: "جاء رجل من الأنصار إلى عمر بن الخطاب فقال أين كنت؟ قال في الرباط، قال كم رابطت؟ قال ثلاثين، قال فهلا أتممت أربعين. (في مصنف عبد الرزاق)ـ

৭) عن أبي أمامة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: "تمام الرباط أربعين يوما، ومن رابط أربعين يوما لم يبع ولم يشتر ولم يحدث حدثا خرج من ذنوبه كيوم ولدته أمه. (معجم الكبير جزء 20 )ـ


উক্ত হাদীস ৫টিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, আল্লাহর রাস্তার ন্যুনতম পূর্ণ মেয়াদ ৪০ দিন। আরো বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

৮)عن واثلة بن الأسقع قال ـ قال لي رسول الله صلي الله عليه و سلم و تهاجر؟ قلت ـ نعم ـ قال هجرة البادية أو هجرة الباتة؟ قلت ـ أيهما أقضل؟ قال ــ هجرة الباتة و هجرة الباتة أن تثبت مع رسول الله و هجرة البادية أن برجع إلي باديتك (أخرح الكبراني في المعجم الكبير) ـ

উল্লেখিত হাদীসটি থেকে টি জিনিস বুঝা যায়ঃ
১) নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য হিজরতের বিধান, চাই তা ৪০দিন হোক, কিংবা কমবেশী।
২) হিজরতে বাত্তার যে বর্ণনা দেওয় হয়েছে সে অনুযায়ী উম্মেতর জন্য এখন হিজরতে বাত্তাহ করার কোন সুরতই থাকতে পারে না, তবে হিজরতে বাদিয়াহর সুরত অদ্যাবধি বাকী আছে। যেমনঃ ৩ দিন, ১০ দিন, ৪০ দিন, ৪ মাস, ৭ মাস, ১ বছর, ৩ বছর, ইত্যাদি। যদি দ্বীনকে সমুন্নত রাখার উদ্দেশ্যে দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা, শিক্ষা দেওয়া বা পৌছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হিজরত করা হয়, তবে তা এই হাদীসের আলোকে 'হিজরতে বাদিয়া'র অন্তর্ভুক্ত হবে। তেমনি ভাবে ১০ বা ১২ বছরের জন্য মাদ্রাসা ইত্যাদিতে দ্বীনী উলূম হাসিল করার উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় এলাকা ছাড়াও হিজরতে বাদিয়ার অন্তর্ভুক্ত।

সারাংশঃ যারা দুনিয়ায় চিল্লা দিবে, আখেরাতে তাদের আর চিল্লা-পাল্লা করে ছুটোছুটি করতে হবে না। সুতরাং, চিল্লার মাঝে শুনি ঈমানের ধ্বনি, চিল্লার মাঝে পাই শান্তির বাণী।

**********************************************************************************

এটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট। পরবর্তী পর্বগুলোতেও সবাইকে সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ করছি।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

**********************************************************************************

তাহরীকে ঈমান; কিছু অবান্তর প্রশ্ন ও তার জবাব। ২য় পর্ব।

posted Jan 1, 2012, 2:51 AM by Abul Hiqmah

প্রসঙ্গঃ মুসলমানদেরকে দাওয়াত দেওয়ার দলীল

লিখেছেন আল মুহাজির শাইখ ০৩ নভেম্বর ২০১১, রাত ০৮:৪৪

লেখাটির উদ্দেশ্যঃ ব্লগিং এর সামান্য অভিজ্ঞতায় যা জানতে পেরেছি তা হলো, সত্য-মিথ্যাকে গুলিয়ে ফেলে কিংবা মিথ্যার আঘাতে সত্যকে নিষ্পেষিত করে ধোঁকাবাজি করাই অনেকের নিকট ব্লগিং-এর স্বার্থকতা। এমনই কিছু 'ব্লগার-কলঙ্ক' বিশ্বজনীন "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর অবিতর্কিত মেহনতের সমালোচনায় পেশাদারী মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন, এবং মিমাংসিত কিছূ অবান্তর প্রশ্নের অবতারণা করে সরলমনা দাঈ ও মুবাল্লিগদের সাথে প্রতারণার পাঁয়তারা করছেন। এমতাবস্থায় আমার উপর ওয়াজিব হয়ে পড়েছে, আমার সাধ্যানুযায়ী এসব মিথ্যাচারের কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জবাব দিয়ে সর্বসাধারণের আকীদা সংশয়মুক্ত রাখা। তাই সিরিজ আকারে সেই সব বানোয়াটি আপত্তির যথাযথ জবাবের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই ধারাবাহিকতায় এটি ২য় পর্ব। ধারাবাহিকভাবে সিরিজটি চলতে থাকবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

বলে নিতে চাইঃ "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর ভাইদের কথা অত্যন্ত সাবলীল, বিনয়ী, নম্র ও মিষ্টি হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে আমি আমার উত্তরপর্বে অনেক ক্ষেত্রেই চরম ভাষা ব্যবহার করেছি। কারণ,
১) আমি তাদের মত এখনো অত ভালো হতে পারি নাই। শুধু সত্যের পক্ষাবলম্বনে আমাকে তাদের পক্ষে কলম ধরতে হলো।
২) বাতিলের মুকাবেলা করার জন্য একটু কঠিন হাতিয়ার ব্যবহার না করলে সামান্য সুযোগে আঁধমরা সাঁপের ফুঁসে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই সর্বশান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনয়ী ও নম্রতার গুণকে আপাতত বিশ্রাম দেওয়া হলো।

বলাবাহুল্য, আমার এই পোস্টটি সূরা নাহলের ১২৫ নং আয়াত অনুযায়ী হিকমতপূর্ণ দাওয়াত নয়, বরং একই আয়াত অনুযায়ী নিরুত্তরকারী জবাব। তাই ভিন্নতার জন্য আমি দায়মুক্ত।

একটি স্বীকারোক্তিঃ এ লেখাটি আমার একজন শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদের প্রবন্ধ থেকে সংগৃহিত। ঈষৎ পরিমার্জন ও ব্লগে প্রকাশের উপযোগী করে প্রকাশ করা হলো।

এটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝার জন্য আগের পর্বটি প্রথমে পড়ে নেওয়ার অনুরোধ করছি।

এখানে ক্লিক করে আগের পর্বটি দেখে নিন *১ম পর্ব*

***********************************************************

বিচিত্রময় এ বিশ্ব চরাচরের সৃষ্টবস্তু যেমন বৈচিত্রপূর্ণ, সৃষ্টি কৌশলও তেমন বিচিত্র, বৈচিত্রমণ্ডিত তেমন সৃষ্টিত্বত্তও। অবাক বিষ্ময়ে তাই সব নয়নই যেন আশ্চর্য বিষ্মিত! মহান মালিক, তিনি শুধু সৃজনেই স্রষ্টা নন; বিজনেও। এ মহা বৈকুণ্ঠের সেরা বৈচিত্রের মাঝে তাই জেগে ওঠে বিচিত্রময় প্রশ্নচর। এ জাগরণ প্রতিকুলতার নয়; প্রতিভার উদগীরণ। এ জাগরণ প্রতিহিংসার নয়; বুদ্ধির বিকিরণ। এটি জ্ঞান সাগরের চরোদ্ভাবন। প্রাকৃতিক এটি, তাই স্বাভাবিক! এ জাগরণ স্বাভাবিক হলেও বোধন সঠিক হওয়া বিধেয় নয় কি? এ পোস্টখানা সেই সঠিক বোধন-এরই যৌগিক উপকরণ, তাত্বিক ও তাথ্যিক বিবরণ, হাদীস ও কুরআন কেন্দ্রিক সংকলন। এতে প্রধাণতঃ দুটো বিষয় পাওয়া যাবে।

শক্তি ২ প্রকার।
১)
মৌলিক শক্তি
২)শাখ্যিক বা বাহ্যিক শক্তি

মহান আল্লাহ তা'আলা মূল শক্তিকে নিজ হাতে রেখেছেন, আর শাখা শক্তিকে মানুষের হাতে দিয়েছেন। মানুষ এ শক্তি প্রয়োগ করে, তাই কর্ম সম্পন্ন হয়। এজন্য চর্মচক্ষুর স্থুলদর্শনে মনে হয় মানুষই কর্তা। কিন্তু মূলত, তিনিই সকল কাজের সুপ্ত সম্পাদক। নিজেকে আড়ালে রেখে সব কিছুই করে থাকেন, করে থাকেন নিয়ন্ত্রন ও পরিচালন। এ কথাটিই কবির ভাষায় বলা যায়ঃ

"সীমার মাঝে অসীম তুমি
বাজাও আপন সূর,
আমার মাঝে তোমার প্রকাশ
তাই এ্যাতো সুমধুর।"


একমাত্র অসীম শক্তিমান আল্লাহ ও তার কালাম পাক কুরআনই মৌলিক শক্তি। বাকী সমস্তই সৃষ্টবস্তুর সৃষ্টশক্তি। যা শাখাগত শক্তির অন্তর্ভূক্ত। যেমনঃ অর্থশক্তি, অস্ত্রশক্তি, জনশক্তি, রাষ্ট্রশক্তি, বৈদ্যুতিক শক্তি, বৈজ্ঞানিক শক্তি প্রভৃতি। শুধু মৌলিক শক্তির বিশ্বাসকেই খাঁটি ঈমান বলা হয়। এ ঈমানের সাথেই আল্লাহর মদদের সমস্ত ওয়াদা সম্পৃক্ত। আর শাখ্যিক শক্তির বিশ্বাসকে বলা হয় শিরক। এমন ঈমানদারের উপরই আল্লাহর আযাব-গযব আসে।

এই খাঁটি ঈমান অর্জনের জন্য ২টি কাজ করতে হয়ঃ
১)
ঈমান গ্রহণ করতে হয়, তা জন্মগত হোক কিংবা অর্জনগত হোক।
২) ঈমানের চর্চা ও মেহনত করতে হয়।

ঈমানের চর্চা ৫ভাবে করা যায়।
১)
হিজরত করা
২) আপ্রাণ সাধনা করা
৩) আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া
৪) আগুন্তক জামাতকে আশ্রয় দেওয়া
৫) আগুন্তক জামাতকে নুসরাত বা সহায়তা করা (সূরা আনফাল, আয়াতঃ ৭৪)

এ ৫ ভাবে ঈমানের চর্চা বা অনুশীলন করলে আল্লাহ পাক মুসলমানের ঈমানকে খাঁটি করে দিবেন। সমস্ত নবীগণই এ খাঁটি ঈমানের জন্যই তাবলীগ করতেন।

তাদের তাবলীগের মূল বৈশিষ্ট ছিলো ২টি।
১) বিনা বিনিময়ে দাওয়াত দেওয়া
(সূরা ইউনুস, আয়াতঃ ৭২, সূরা হুদ, আয়াতঃ ২৯,৫১, সূরা শূরা, আয়াতঃ ২৩, সূরা শুআরা, আয়াতঃ ১০৯,১২৭,১৪৫,১৬৪,১৮০, সূরা সাবা, আয়াতঃ ৪৭)

২) আল্লাহমুখী দাওয়াত দেওয়া (সুরা আ'রাফ, আয়াতঃ ৬৫,৭৩,৮৫, সূরা হুদ, আয়াতঃ ৫০,৬১,৮৪, সূরা আম্বিয়া, আয়াতঃ ২৫, সূরা নামল, আয়াতঃ ৪৫, সূরা শুআরা, আয়াতঃ ২৩-৩০, সূরা আনকাবুত, আয়াতঃ ৩৬, সূরা মুদ্দাসসির, আয়াতঃ ১-৩)

এ দুটো বৈশিষ্ট যে দাওয়াত বা প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকবে সেই দাওয়াতই নবুয়াতী দাওয়াত হবে; অন্যথায়, দাওয়াতী কাজ হতে পারে কিন্তু নবুয়াতী কাজ হতে পারে না।

দাওয়াতী পদ্ধতির এ বিভিন্নতাও বিভিন্ন প্রশ্নের উৎস। বলাবাহুল্য, এই মহান 'দাওয়াতী মিশন' নিয়ে তামাম জাহানে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের মধ্যে বিভিন্ন কারণে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে, এসবের সমাধানের অন্বেষায় কুরআন-হাদীসের দলীল চেয়ে হন্যে হয়ে পড়েছিলাম বিজ্ঞ উলামা হযরাতগণের খেদমতে। শেষ পর্যন্ত আমার সেই আশা পূরণ হলো, সশরীরে দাওয়াতী কাজে যোগদানের মাধ্যমে। যখন দাওয়াতী আন্দোলনে সক্রীয় হওয়ার ফলে তা'লীম ও তাবলীগের অপূর্ব সমন্বয় ঘটলো তখন অজ্ঞতা ও প্রচ্ছন্নতার ঘোর অমানিশা কাটতে শুরু করে। পরবর্তীতে আরো মুতালা'আ ও তাহকীকের পর সেগুলো কাগজের বুকে আমানত রাখার ইচ্ছা করলাম, যা দীর্ঘকাল বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন চিরকুটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। সেটিই আজ সাধারণ শিক্ষিত ভাইদের নিকট প্রকাশ করে (কারণ, উলামায়ে কেরামের নিকট আরো 'দন্তোপড়ী' জবাব রয়েছে) সাধ্যানুযায়ী ঈমানী দায়িত্ব পালনে ব্রত হলাম। কোন দল বা ব্যক্তি বিশেষের সমালোচনার উর্দ্ধে থেকে শুধু কুরআন ও হাদীসের আলোকে সমাধান দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে।

সম্মানিত পাঠকবর্গ একমাত্র জানা ও মানার নিয়তে এই সিরিজটি পড়ে থাকলে খাঁটি ঈমান গঠনে সহায়তা হবে ইনশা আল্লাহ।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

********************************************************

বর্তমানে বিশ্বের ৭টি মহাদেশ-ই তাবলীগ জামাতের নূরানী পদধুলীতে নূরান্বিত, দীপ্ত পদভারে মুখরিত। তাবত বাতিল শক্তির অন্তর-মনিকোঠায় এমন দুঃসাহসী পদাঘাত ইতোপূর্বে খুব কম সংঘটনই আঁকতে পেরেছে। শুধু স্থলেই নয়, বরং ইদানিং পৃথিবীর দ্বীপে দ্বীপে শুরু হয়েছে তাদের পদচিহ্ন অঙ্কন। যেখানেই আল্লাহর বান্দা, সেখানেই দাঈ ইলাল্লাহ; এমন ব্যপক ও সুবিস্তৃত মেহনতের সাথে জুড়ে ধন্য হতে চান যুগশ্রেষ্ঠ উলামায়ে কেরামও। দেশ-বিদেশের সকল উলামায়ে রাসেখীন স্বীকৃতি দিয়েছেন, তবুও এ ব্যপারে বহু প্রশ্নের অবতারণা হয়ে থাকে বিভিন্ন কারণে। ইলমের অভাবই তার অন্যতম কারণ। এই পোস্টে তারই দলীল ভিত্তিক জবাব দেওয়া হয়েছে; যা সর্বশ্রেণীর, বিশেষতঃ তাবলীগে নব-আগুন্তুকগণের জানার ক্ষেত্রে বিশেষ উপকার হবে ইনশা আল্লাহ।

*********************************************************

প্রশ্নঃ নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদেরকে দাওয়াত দিতেন আর তাবলীগী ভাইরা মুমিন-মুসলমানদের দাওয়াত দেয় কেন?

এটা বৈধ না বিদআত? নবীজী তো মুসলমানদের কাছে কখনো জামাত পাঠাননি।



উত্তরঃ মুসলমানগণকে দাওয়াত দেওয়া শুধু বৈধই নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার আদেশও। এ আদেশ কুরআনে রয়েছে, হাদীসে রয়েছে, ইতিহাসেও রয়েছে, রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাস্তব জীবনের সার্বিক আমলনামায়। নেই শুধু আমাদের জানা।

আরবীতে একটি মূলনীতি আছে, عدم الوجدان لا يدل علي عدم الوجود অর্থাৎ, অজানা কখনো অনস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে না। তাই উক্ত প্রশ্নের উত্তরে প্রমাণস্বরূপ ৩টি আয়াত, ৫টি হাদীস ও ৪টি ইতিহাস পেশ করা হচ্ছেঃ


কুরআন ভিত্তিক দলীলঃ

১) و ذكر فإن الذكري تنفع المؤمنين
অর্থাৎ, (ঈমানী কথা) আলোচনা করতে থাকো (অর্থাৎ দাওয়াত দিতে থাকো), কেননা নিশ্চয় ঈমানী আলোচনা (দাওয়াত ইলাল্লাহ) মুমিনদের উপকারে আসবে। (সূরা যারিয়াত, আয়াতঃ ৫৫)

২) يايها الذين آمنوا آمنوا بالله و رسوله
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান আনো। (সূরা নিসা, আয়াতঃ ৩৫)

এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারগণকেই সম্বোধন করে ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন ঈমানকে আরো তাঁজা ও সুসংহত করার উদ্দেশ্যে। কারণ, তিনি চান নির্ভেজাল, খাঁটি ও তাঁজা ঈমান। (তাফসীরে রুহুল বায়ান ও রূহুল মা'আনীর মত)

৩) قل لم تؤمنوا و لكن قولوا أسلمنا و لما يدخل الإيمان في قلوبكم، و إن تطيعوا الله و رسوله لا يلتكم من أعمالكم شيئا
মর্মার্থ, তোমরা ঈমানদার নও; কিন্তু মুসলমান। যদি তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করো তবে তোমাদের বিন্দুমাত্র অমলও নষ্ট করা হবে না। (সূরা হুজুরাত, আয়াতঃ ১৪)

এখানেও আল্লাহ তা'আলা মসজিতে নববীতে নবীর পেছনে নামাজ সম্পাদনকারী গ্রাম্য মুসলমানগণকেই ঈমান ও আমলের দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াত দেওয়ার আদেশও দিয়েছেন, আরো দিয়েছেন ক্ষমা। এ আয়াত থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় ঈমানহীন মুসলমানও ছিলো।

নবীর যুগে ৫ শ্রেণীর মানুষ ছিলো, যারা আজও আছেঃ

১. খাঁটি মুসলমান
২. খাঁটি কাফের
৩. পাপী মুসলমান (ফাসেক)
৪. মুনাফিক মুসলমান (যারা মুসলমানদের সাথেই থাকতো)
৫. ঈমানহীন মুসলামন (যারা কোনমতে শুধু কালিমার বিশ্বাস নিয়ে পড়ে আছে, কিন্তু বিশ্বাস ও আস্থার পরিপূর্ণতা ও অবিচলতা নেই অথবা ঈমানবিধ্বংসী কাজে লিপ্ত, কিন্তু বংশীয় পরিচয়ে সে মুসলমান)

কে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত তা আল্লাহই জানেন। হায় আল্লাহ! আমাদের সবাইকে ১ম শ্রেণীর মুসলমান হওয়ার তাউফীক দান করুন। আমীন।

হাদীস ভিত্তিক দলীলঃ

১) আবদে কায়সের মুসলিম-প্রতিনিধি দলকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত দিয়ে তাদেরকেও দাওযাত দেওয়ার আদেশ দিয়ে বলেনঃ এ কথাগুলো মুখস্থ করে নাও এবং নিজের বংশধরদের কাছে পৌছে দেবে অর্থাৎ দাওয়াত দেবে। (ফাতহুল কাদীর, ইযালাতুল খাফা, সহীহ বুখারী, তাবলীগ জামাতের সমালোচনা ও তার সদুত্তরঃ শাইখুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রাহ.)

উল্লেখ্য যে, হাদীসের উল্লেখিত "নিজের বংশধর"দের মধ্যে অনেকে মুসলমানও ছিলেন।
দেখুন বুখারী শরীফের হাদিসঃ
و عبد القيس علي أن يحفظوا الإيمان و العلم و يخبروا من وراءهم ـ رواه البخاري ـ

২) হযরত আযিম বিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হচ্ছেঃ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আযল ও ক্বাররা গোত্রের মুসলমানদের কাছে ৬ জনের একটা জামাত পাঠিয়েছেন।

সেই সৌভাগ্যবান ৬ জন হলেন,
১. হযরত মারছায রাদিয়াল্লাহু আনহু
২. আসিম রাদিয়াল্লাহু আনহু
৩. হাবীব রাদিয়াল্লাহু আনহু
৪. খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু
৫. যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু
৬. আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু।

الاستيعاب গ্রন্থের এবারত দেখুনঃ
قد بعث رسول الله صلي الله صلي الله عليه و سلم لـ"عضل و قارة مرثذ بن أبي مرثذ، عاصم بن ثابت، حبيب بن عدي، خالد بن الكبير، زيد بن دثنة، عبد الله بن طارق ليتفقهوا في الدين و يعلمهم القرآن و شرائع الإسلام - الاستيعاب ـ الجزء الثاني، رقم الصفحة :خمس و ثلاثمأة

৩) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানের মুমিনদের কাছেই পাঠিয়েছিলেন। (মুসলিম শরীফ, অধ্যায়ঃ সাহাবায়ে কেরামের জীবনী)

৪) عن جرير ابن عبد الله قال: بايعت رسول الله صلي الله عليه و سلم علي إقام الصلاة و إيتاء الزكاة و النصح لكل مسلم ـ حياة الصحابةـ

মর্মার্থ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ৩টি কাজ করার জন্য শপথ পড়িয়েছেন। ১.নামাজ কায়েম করা, ২.যাকাত আদায় করা, ৩.দুনিয়ার সমস্ত মুসলমিদের কাছে তাবলীগ করা। (মুসলিম শরীফ, অধ্যায়ঃ সাহাবায়ে কেরামের জীবনী। আলকাউসার অভিধানের ৫৭৩ পৃষ্ঠায় বলা আছে, النصح শব্দ যখন আল্লাহ তা'আলার ক্ষেত্রে পযোজ্য হয় তখন তার অর্থ দাড়ায় "খাঁটি হওয়া", আর বান্দার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে অর্থ হয় "উপকার করা, তাবলীগ করা, উপদেশ দেওয়া, ইত্যাদি)

৫) عن قيس سمعت جريرا يقول بايعت رسول الله صلي الله عليه و سلم علي شهادة أن لا إله إلا الله و أن محمدا رسول الله و إقام الصلاة و إيتاء الزكاة و السمع و الطاعة و النصح لكل مسلم ـ الصفحة التاسعة الثمانون و مأتين ـ

অর্থাৎ, হযরত কায়েস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি হযরত জারীর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছি যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট কয়েকটি বিষয়ে শপথ পড়েছি। ১. কালিমায়ে তাইয়িবার সাক্ষ্যপ্রদান
২. নামাজ কায়েম করা
৩. যাকাত আদায় করা
৪. (আল্লাহ ও তার রাসূলের আদেশসমূহ) মনযোগ সহকারে শোনা
৫. (আল্লাহ ও তার রাসূলের) নিঃসর্ত আনুগত্য করা
৬. সমস্ত মুসলমানের নিকট তাবলীগ করা। (হায়াতুস সাহাবাহ, বুখারী শরীফ, পৃষ্ঠাঃ ২৮৯)

উপরোক্ত ১নং আয়াতে "মুমিনগণ" ও উক্ত হাদীসদ্বয়ে "মুসলিমগণ" শব্দ ব্যবহার করে মুমিন-মুসলিমদেরকে বিশেষভাবে দ্বীন বুঝিয়ে দাওয়াত দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। (রূহুল বায়ান ও রূহুল মা'আনী ও বিভিন্ন তাফসীরের মত)

এছাড়াও আরো এতদসংক্রান্ত আরো হাদীস পাবেন নাসায়ী শরীফের ২য় খণ্ডের ১৬১-১৬৩ পৃষ্ঠায় ও মুসলিম শরীফের ২য় খণ্ডের ১৩০-১৩১ পৃষ্ঠায়। দেখে নেওয়ার জন্য অনুরোধ থাকলো।


ইতিহাস ভিত্তিক দলীলঃ

১) স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাররা, সিরিয়া ও ইয়েমেন প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় এবং আমল; আবদে কায়স ও বনু হারিস গোত্রের মুমিন-মুসলমানদের কাছেই তাবলীগ ও তালিমের জন্যেই অনেক জামাত পাঠিয়েছিলেন। (বুখারী শরীফ, অধ্যায়ঃ باب تحريض النبي صلي الله عليه و سلم অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উৎসাহদান, ইবনে খালদূন, পৃষ্ঠাঃ ৮১৮, ইবনে সা'দ রচিত "তাবাকাত", ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ১৩৭, তাফসীরে তাবারী, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ৯৪, উসদুল গাবাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ৩৭৬-৩৭৮)

২) ফাতহুল কাদীর ঘোষণা দিচ্ছেঃ সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম তাবলীগের উদ্দেশ্য একুফা ও কারকীসিয়া সফর করেছেন। হযরত উমর, হযরত সাকিল বিন ইয়াসার ও হযরত আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখের এক জামাত সিরিয়া প্রেরিত হয়েঠছিল। এসব জামাত মুসলমানদের উদ্দেশ্যেই প্রেরিত হয়েছিলো। (ফাতহুল কাদীর, ইযালাতুল খাফা, হায়াতুস সাহাবাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ১৪৩-১৪৫)

৩) কায়স ইবনে আসিম রা. এর আমীরত্বে তামীমের বিভিন্ন মুসলিম গোত্রেই তাবলীগের উদ্দেশ্য ৯ম হিজরী/৬৩১খৃষ্টাব্দ ১২ জনের এক জামাত বের হয়েছিলো। (আল ইস্তী'আব, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠাঃ ৩০৫)

৪) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবদুল্লাহ বিন তারিকের নেতৃত্বে আযল ও ক্বাররা গোত্রের মুসলমানদের কাছেই ৬২৫ খৃষ্টাব্দে ৬ জনের এক জামাত পাঠান।

সেই সৌভাগ্যবান ৬ জন হলেন,
১. হযরত মারছায রাদিয়াল্লাহু আনহু
২. আসিম রাদিয়াল্লাহু আনহু
৩. হাবীব রাদিয়াল্লাহু আনহু
৪. খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু
৫. যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু
৬. আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু।


الاستيعاب গ্রন্থের এবারত দেখুনঃ
قد بعث رسول الله صلي الله صلي الله عليه و سلم لـ"عضل و قارة مرثذ بن أبي مرثذ، عاصم بن ثابت، حبيب بن عدي، خالد بن الكبير، زيد بن دثنة، عبد الله بن طارق ليتفقهوا في الدين و يعلمهم القرآن و شرائع الإسلام - الاستيعاب ـ الجزء الثاني، رقم الصفحة :خمس و ثلاثمأة

শেষ কথাঃ উক্ত আয়াত, হাদীস, ইতিহাস ও নবীর বাস্তব জীবনের কর্মপন্থা এবং মুসলমানদের ঈমানী অবস্থা তাদের দাওয়াতের দলীলভিত্তিক সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করছে। অতএব, এটি পরিস্কার যে, মুসলমানদেরকে দাওয়াত না দেওয়া সুস্পষ্ট কুরআন-সুন্নাহ বিরুধী জঘন্য অপরাধ ও ইসলামের অমোঘ বিধান রহিত করণের নামান্তর। নাউযু বিল্লাহ।

সারাংশঃ মুসলমানদের কাছে দাওয়াত দেওয়া বিদআত নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার কঠোর নির্দেশ।

***********************************************************

এটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট। আজ মাত্র একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো, পরবর্তীতে একটি পোস্টে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হবে ইনশা আল্লাহ।

সবাইকে সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ করছি।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

তাহরীকে ঈমান; কিছূ অবান্তর প্রশ্ন ও তার জবাব। ১ম পর্ব।

posted Jan 1, 2012, 2:43 AM by Abul Hiqmah

প্রসঙ্গঃ অবতরণিকা

লিখেছেন আল মুহাজির শাইখ ০৩ নভেম্বর ২০১১, রাত ০৪:১২

লেখাটির উদ্দেশ্যঃ ব্লগিং এর সামান্য অভিজ্ঞতায় যা জানতে পেরেছি তা হলো, সত্য-মিথ্যাকে গুলিয়ে ফেলে কিংবা মিথ্যার আঘাতে সত্যকে নিষ্পেষিত করে ধোঁকাবাজি করাই অনেকের নিকট ব্লগিং-এর স্বার্থকতা। এমনই কিছু 'ব্লগার-কলঙ্ক' বিশ্বজনীন "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর অবিতর্কিত মেহনতের সমালোচনায় পেশাদারী মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন, এবং মিমাংসিত কিছূ অবান্তর প্রশ্নের অবতারণা করে সরলমনা দাঈ ও মুবাল্লিগদের সাথে প্রতারণার পাঁয়তারা করছেন। এমতাবস্থায় আমার উপর ওয়াজিব হয়ে পড়েছে, আমার সাধ্যানুযায়ী এসব মিথ্যাচারের কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জবাব দিয়ে সর্বসাধারণের আকীদা সংশয়মুক্ত রাখা। তাই সিরিজ আকারে সেই সব বানোয়াটি আপত্তির যথাযথ জবাবের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই ধারাবাহিকতায় এটি ১ম পর্ব। এই পর্বে শুধু পটভূমি তৈরী করেছি মাত্র, পরবর্তী পর্ব থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।

বলে নিতে চাইঃ "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"এর ভাইদের কথা অত্যন্ত সাবলীল, বিনয়ী, নম্র ও মিষ্টি হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে আমি আমার উত্তরপর্বে অনেক ক্ষেত্রেই চরম ভাষা ব্যবহার করেছি। কারণ,
১) আমি তাদের মত এখনো অত ভালো হতে পারি নাই। শুধু সত্যের পক্ষাবলম্বনে আমাকে তাদের পক্ষে কলম ধরতে হলো।
২) বাতিলের মুকাবেলা করার জন্য একটু কঠিন হাতিয়ার ব্যবহার না করলে সামান্য সুযোগে আঁধমরা সাঁপের ফুঁসে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই সর্বশান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনয়ী ও নম্রতার গুণকে আপাতত বিশ্রাম দেওয়া হলো।

বলাবাহুল্য, আমার এই পোস্টটি সূরা নাহলের ১২৫ নং আয়াত অনুযায়ী হিকমতপূর্ণ দাওয়াত নয়, বরং একই আয়াত অনুযায়ী নিরুত্তরকারী জবাব। তাই ভিন্নতার জন্য আমি দায়মুক্ত।

একটি স্বীকারোক্তিঃ এ লেখাটির একটি বিরাট অংশ আমার একাধিক শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদের প্রবন্ধ থেকে গৃহিত। ঈষৎ পরিমার্জন ও ব্লগে প্রকাশের উপযোগী করে প্রকাশ করা হলো।

********************************************************

"দাওয়াত" একটি আরবী শব্দ, যার অর্থ ডাকা, আহবান করা। ইসলামের দাওয়াতের সারকথা হচ্ছে, মানুষকে দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির দিকে আহবান করা।

তদ্রুপ "তাবলীগ"ও একটি আরবী শব্দ। যার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীসমূহ অবিকলভাবে আল্লাহর বান্দা ও রাসূলের উম্মতগণের নিকট পৌছে দেওয়া।

আর এ মহত দু'টি কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্যই বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহত মুসলিম জামাতকে "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত" বলা হয়।

প্রসঙ্গতঃ বলা প্রয়োজন যে, "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত" এটি কোন স্বতন্ত্র দল, গ্রুপ বা গতানুগতিক সংগঠন নয়, বরং এটি হচ্ছে একটি নীরব বাতিলঘাতী আন্দোলন ও অত্যাসম্ভী বিপ্লব। এমনকি এই দায়ী ও মুবাল্লিগ জামাতের গতানুগতিক কোন প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইত্যাদী কোন ব্যক্তিও নেই। বরং যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই মুবারক নবুওয়তী জিম্মাদারীকে পূণঃবিন্যস্ত করেছেন, তিনি সকল আত্মকেন্দ্রিকতার সীমা পেরিয়ে এবং নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেকের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরাসরি সীরাতে রাসূল, হায়াতে সাহাবা এবং পরবর্তী দাঈ-ইলাল্লাহদের যুগের দাওয়াতের ইতিহাসের প্রতি গভীর মনোনিবেশ করেছেন। পাশাপাশি সমাকালীন যুগশ্রেষ্ঠ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় উলামায়ে কেরাম ও মুরুব্বীদের সঙ্গে মাশওয়ারা ও মতবিনিময় করেছেন। এরপর এসবের আলোকেই বর্তমান কর্মপদ্ধতিটি প্রস্তুত করেছেন।

বর্তমানেও এই জামাতে কোন পদনির্ভর আসন নেই। একজন মুখলিস আমীরের পূর্ণ আনুগত্যে ইখলাসের সাথে সকল দাঈ ও মুবাল্লিগগণ বিশ্বব্যপী আপন জিম্মাদারী পালনার্থে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এমন ইখলাস ও অনাড়ম্বরতার নযিরবিহীন নমুনা দেখাতে গোটা দুনিয়া বারবার ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে দুনিয়াভিত্তিক ও দুনিয়াকেন্দ্রিক দলগুলো। পার্থিব সার্থবাদীরা এমন নূরানী পরিবেশ ও নূরানী শাহীদারী জনমেও দেখেনি। তাই অনেকটা হিংসা পরায়ণ হয়েই ক্ষেপে ওঠে আল্লাহর নিরীহ এই মুখলিস বান্দাদের উপর।

অন্যান্য জোট বা সংঘের চেয়ে এই জামাতটি এজন্যই অনন্য বৈশিষ্ট ও স্বতন্ত্র আবেদনের অধিকারী। কারণ, বর্তমান পৃথিবীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য সংঘ, সংগঠন এবং সভা-সম্মেলনের কোনো অভাব নেই। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এত বেশি সভা-সমাবেশ নিয়মিত বা তাৎক্ষণিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যার হিসাব রাখাও অসম্ভব। এসব সম্মেলনের উদ্দেশ্য যদি হত অন্তত মানুষের পার্থিব কল্যাণ সাধন, তবুও একটা কথা ছিল। কিন্তু তা নয়। এসবের আসল উদ্দেশ্যই হল শক্তিধরের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও শক্তিহীনের ক্ষতি সাধন। যেখানে সম্মেলন ও সংঘবদ্ধতার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দুর্বল ও অসহায়ের সাহায্য এবং কল্যাণের কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রদান সেখানে এসবের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ শক্তিশালী জালেমকে সমর্থন দেওয়া আর দুর্বল নিপীড়িতদের অসহায়ত্বকে দীর্ঘায়িত করা। আর তা এমনই সূক্ষ্ম কৌশলে যে, মজলুমের ‘আহ’ করার বা তার প্রতি কৃত-অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে অনুভব করারও সুযোগ থাকে না। এটাই বর্তমান সময়ের সংঘ ও সংগঠনগুলোর নীতি। সৌভাগ্যবশতঃ দু’একটি সংগঠন যদি এমন পাওয়া যায়, যারা সেবামূলক মানসিকতা নিয়ে কাজ করে, তবে তাদেরও উদ্দেশ্য হয়ে থাকে শুধু মানুষের পার্থিব উন্নতি, যার সম্পর্ক শুধু মানুষের দেহের সাথে। প্রশ্ন এই যে, রক্ত-মাংসের সঙ্গে যুক্ত এ দেহটিই কি প্রকৃত মানুষ? তাহলে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য কী থাকল? মনুষ্যত্বই তো মানুষের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।

আজ বস্তুবাদী চিন্তা এবং অর্থ ও পদের লালসা এতই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, প্রায় সকলেই বিশেষত ক্ষমতার মসনদে আসীন ব্যক্তিরা মনুষ্যত্বের বিকাশ ও পরিচর্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে একেবারেই ভুলে গেছে। তাদের সম্পূর্ণ চিন্তাশক্তি ও কর্মশক্তি এই আসল সমস্যার বাইরেই খরচ হয়ে যায়, অথচ মনুষ্যত্বের অভাবই হল সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এর যথার্থ সমাধান ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোনো সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, সামাজিক, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যার ও কোনো সমাধান সম্ভব নয়। অথচ কিছু সাহসী ও সৎ চিন্তাশীল মানুষ যখন এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন তখন তাদের আহ্বানকে নিতান্ত অপরিচিত মনে করা হয় এবং তাদের উদ্যোগ-ইজতিমাকে অর্থহীন ও অপ্রয়োজনীয় ভাবা হয়। এ যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেই বাণীরই বাস্তব চিত্রঃ
بدأ الإسلام غريبا و سيعود كما بدأ، فطوبي للغرباء
ইসলামের সূচনা হয়েছিলো অপরিচিত অবস্থায়, এবং তা অচিরেই সেই অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে। সুতরাং সেই অপরিচিত সময়ে যারা অপরিচিত থেকেও ইসলামকে আঁকড়ে পড়ে থাকবে, তাদের জন্য মহা-সুসংবাদ। আলহাদীস।

প্রকৃত মানবতা বা ইনসানিয়াতের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট হলোঃ

১) খালিকের মা’রিফাত অর্জন (সূরা যারিয়াত, আয়াতঃ ৫৬)। কেননা, এ তো সহজ কথা যে, ইনসানকে সবার আগে পেতে হবে সৃষ্টিকর্তার পরিচয় এবং তাঁকে হতে হবে সকল সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল।

২) হৃদয়-জগতের পবিত্রতা (সূরা আ'লা, আয়াতঃ ২৪, সূরা শামস, আয়াতঃ ৯)।

৩) চিন্তার বিশুদ্ধতা ও বুদ্ধির পরিশুদ্ধতা (সূরা বাকারাহ, আয়াতঃ ২৬৯)। যেন সবাই ক্ষণস্থায়ীর জন্য চিরস্থায়ীকে বিসর্জন দেওয়ার নির্বুদ্ধিতা থেকে রক্ষা পেয়ে যায, এবং সৃষ্টি জগতের বিভিন্ন রহস্য উদঘাটনের গর্বে আত্মহারা হয়ে কিংবা চরম গাফলত ও উদাসীনতায় আত্মবিস্মৃত হওয়ার লজ্জায় নিমজ্জিত থেকে কেউ যেন পরকালীন প্রস্তুতি গ্রহণে অবহেলা না করে বসে।

৪) আভিজাত্য, উন্নত চরিত্র ও উত্তম আখলাকের অধিকারী হওয়া (সূরা আলু ইমরান, আয়াতঃ ১৫৯)।

৫) আমানতদারী (সূরা মু'মিনূন, আয়াতঃ ৮)। খালেক ও মাখলুক প্রত্যেকের আমানত আদায় করার মানসিকতা সৃষ্টি করা।

সকল পেরেশানী, যাকে প্রকৃত পক্ষেই পেরেশানী বলা যায়-তার সমাধান ইনসানকে ইনসানিয়াত শেখানোর মধ্যেই নিহিত রয়েছে। অথচ এই সহজ সরল সাদামাঠা কথাটি বোঝতেও ঐসব ডবল শিক্ষিতদের পক্ষে সম্ভব নয়, যারা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর শিক্ষার সাথে জানাশোনাও রাখে নি এমনকি জানার আগ্রহও যাদের নেই। আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম-এর মধ্যে সর্বশেষ যিনি প্রেরিত হয়েছেন, তিনি হলেন মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি ব্যাপকভাবে সকল মানুষের প্রতিই প্রেরিত হয়েছেন। স্থান-কাল-পাত্র-গোত্র-বর্ণ ইত্যাদি সকল সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে তিনি সবার জন্যই রাসূল। তাঁর আনীত শিক্ষা ও নির্দেশনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া ছাড়া এই সত্য উপলব্ধি করা আদৌ সম্ভব নয়। শুধু ঈমানের সম্পদে সম্পদশালীরাই এই মহাসত্য উপলব্ধি করতে পারেন এবং ঈমানের মিষ্টতা যিনি যে পরিমাণ অর্জন করেছেন তিনি ততটা গভীরভাবে তা উপলব্ধি করে থাকেন। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে, আজ যারা উন্নতি-অগ্রগতির সবচেয়ে বড় দাবিদার এবং মানবতার শিরোপা যাদের অধিকারে, তারাই সবচেয়ে বেশি মানবতার দুশমন। তো যে নিজেই রিক্তহস্ত সে অন্যকে কী দিতে পারে? সারকথা এই যে, মনুষ্যত্বের অভাবই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা আর এই বাস্তব সমস্যার একমাত্র সমাধানের ব্যাপারে যদি কিছু চিন্তা-ভাবনা এবং সাধ্যমতো কিছু কাজ হয়ে থাকে তবে তা অবশ্যই ঈমানওয়ালারাই করে যাচ্ছে।

একমাত্র ঈমানওয়ালারাই দাওয়াত- তালীম, তাবলীগ, তারবিয়্যাত-তাযকিয়া, ওয়াজ-নসীহত, দ্বীনী মোযাকারা, সাধ্য অনুযায়ী সীমিত আকারে ‘আমর বিল-মারূফ নাহি আনিল মুনকার’ এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে সাধ্যমতো ‘জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ’র মাধ্যমে পৃথিবীতে ইনসানিয়াতের সবক প্রচারে যথাসাধ্য মশগুল রয়েছেন। এটা ভিন্ন কথা যে, ঈমানওয়ালাদের ঈমানী দুর্বলতা তাঁদের খেদমতগুলোকে মানে ও পরিমাণে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করতে পারছে না। কিন্তু এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিশ্বের মুক্তি ও উন্নতি ঈমানদারদের ঈমানী তরক্কীর মধ্যেই নিহিত আছে এবং পৃথিবীর ক্ষতি ও অকল্যাণও হয়েছে ঈমানদারদের ঈমানী অবনতির কারণে। এই অবক্ষয়ের যুগেও ব্যাপক দাওয়াতের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য খেদমত আল্লাহ তা'আলা যে মহাপুরুষের মাধ্যমে আঞ্জামের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি হলেন, হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. (১৩০৩-১৩৬৩ হি.), এবং তার মেহনত ও মাকবুলিয়াতের ফসলই হলোঃ "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত"। যদিও সবাই এই জামাতকে "দাওয়াত ওয়া তাবলীগের জামাত" বলে সম্বোধন করে থাকে, কিন্তু হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. বলতেন, "যদিও অনেকে এই জামাতকে "দাওয়াত ওয়া তাবলীগ জামাত" নামে সম্বোধন করে থাকে, কিন্তু আমি এই জামাতের এখনো কোন নামকরণ করি নাই। যদি আমি কোন নামকরণের মনস্থ করতাম তাহলে এই মেহনতের নাম দিতাম "তাহরীকে ঈমান" বা ঈমানী আন্দোলন।

হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. কুরআন ও হাদীসের অনেক বড় মুহাক্কিক আলেম ছিলেন। তিনি ছিলেন হিন্দুস্থানের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ দুই দ্বীনী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম দেওবন্দ ও মাজাহিরুল উলূম সাহারানপুর মাদরাসার সন্তান। তিনি কিতাব ও সুন্নাহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন। সীরাতুন্নবী ও সাহাবা-জীবনী বিস্তৃতভাবে অধ্যয়নের পাশাপাশি তাঁদের জীবনের দাওয়াত অংশটি মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন। পরবর্তী দাঈ-ইলাল্লাহদের যুগের দাওয়াতের ইতিহাসও পাঠ করেছেন। বড়দের সঙ্গে মশওয়ারা ও মতবিনিময় করেছেন। এরপর বর্তমান প্রচলিত কর্মপদ্ধতিটি প্রস্তুত করেছেন। কাজ আরম্ভ করে যতই অগ্রসর হয়েছেন ততই তাঁর অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কাজের মধ্যে মজবুতি এসেছে। তাঁর ব্যথিত হৃদয়ের আহাজারি ও আল্লাহর বান্দাদের প্রতি তাঁর দরদ আল্লাহ তা'আলা কবুল করে নিয়েছেন। ফলে তাঁর কাজ পুষ্পিত ও পল্লবিত হয়েছে এবং আজ পর্যন্ত লক্ষ-কোটি মানুষ এই মেহনতের মাধ্যমে সিরাতে মুস্তাকীমের সন্ধান পেয়ে চলেছে। এরপর যে ব্যক্তি যে পরিমাণ উসূলের পাবন্দী করেছেন এবং হক্কানী উলামা-মাশায়েখের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত রেখেছেন তিনি তত বেশি উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছেন।

তাঁর এই মুবারক মেহনতের অন্যতম একটি মূল উদ্দেশ্য এই যে, বর্তমানে কালেমা পাঠকারী মুসলিমগণও দুনিয়ার মোহ ও বস্তুবাদিতার যে ব্যধিতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়ে আছে, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে অনুভূতি সৃষ্টি করা এবং তা থেকে মুক্তিলাভের প্রেরণা জাগ্রত করা। এটাই এ কাজের রূহ বা প্রাণ। আর এর কর্মপদ্ধতি এমন সুনিপুনভাবে বিন্যস্ত যে, আত্মসংশোধনের সাথে সাথে অনুভূতিহীন মানুষের মধ্যেও দ্বীনের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি জাগ্রত করার এক সুপ্ত মেহনত তার মননশীলতায় চলতে থাকে।

বর্তমানে বিশ্বব্যপী মুসলিম উম্মাহ সবচে' বেশী যে বিষয়টির প্রয়োজন উপলব্ধি করছে, তা হলো সমগ্র মুসলিমশক্তির ঐক্য ও একতা। এ বিষয়ে হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ. তার মালফূযাতের ১৬৫নং-এ উল্লেখ করেন, আমাদের এই আন্দোলনের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানের যাবতীয় জযবার উপর দ্বীনের জযবাকে জয়যুক্ত করা এবং এই পথে একই উদ্দেশ্য পয়দা করার পাশাপাশি ইকরামে মুসলিমের উসূলকে যিন্দা করে পুরো মুসলমি উম্মাহকে এই হাদীসের পরিপূর্ণ অর্থে পরিণত করা।
المسلمون كجسد واحد সমস্ত মুসলিম জাতি এক দেহের মত।

********************************************************

দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব ও ফযীলত এত অধিক, যা কোনো মানুষ বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে পারে না। পবিত্র কালামের অসংখ্য আয়াত যার উজ্জ্বল সাক্ষী। আল্লাহ তা'আলা বলেন "ঐ ব্যক্তির কথার চেয়ে ভালো কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর প্রতি আহবান করেছে, সৎ কাজ করেছে এবং বলেছে, আমি অনুগতদের একজন" (সূরা হামীম আসসাজদাহ : ৩৩)

আল্লামা শাববীর আহমদ উছমানী রাহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, এই আয়াতে ঐ সকল বিশেষ প্রিয়ভাজন বান্দার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা একক আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাস স্থাপন করে নিজেদের স্থিরতা ও দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে। এখানে তাদের অপর একটি উচ্চ মর্যাদার কথা আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ উত্তম ও উৎকৃষ্ট লোক সেই ব্যক্তি যে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিজেকে নিবেদিত করে তাঁর আনুগত্য ও নির্দেশ পালনের ঘোষণা দেয়, তাঁর মনোনীত পথে চলে এবং দুনিয়াবাসীকে তাঁর দিকে আসার আহবান জানায়। তার কথা ও কাজ অন্যদেরকে আল্লাহর পথে আসার জন্য প্রভাবিত করে। লোকজনকে সে যে সকল ভালো কাজের দাওয়াত দেয় সে নিজেও সেগুলো আমল করে। আল্লাহর বন্দেগী ও আনুগত্যের ঘোষণা প্রদানে কোন সময়ে কোন স্থানে সামান্যতম সংকোচও বোধ করে না। তার জাতীয় পরিচিতি শুধু ইসলাম। সকল প্রকারের সংকীর্ণতা ও গোষ্ঠীপ্রীতি ত্যাগ করে নিজে খাঁটি মুসলমান হওয়ার ঘোষণা প্রদান করে এবং যার দাওয়াত দেওয়ার জন্য সাইয়েদুনা মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দণ্ডায়মান হয়েছিলেন এবং যার জন্য সাহাবায়ে কিরাম রা. নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
সূরা নাহলের ১২৫নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "ডাকো স্বীয় প্রতিপালকের পথে পরিপক্ক কথা বুঝিয়ে এবং উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে। আর তাদেরকে বিতর্কে নিরুত্তর করো উত্তম পন্থায়।"

এই আয়াতে খোদ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা'লীম দেওয়া হচ্ছে মানুষকে কিভাবে পথে আনতে হবে। এর তিনটি পন্থা বলা হয়েছে।
১) الحكمة,
২) الموعظة الحسنة,
৩) الجدال بالتي هي أحسن

الحكمة অর্থাৎ মযবূত দলিল-প্রমাণের আলোকে হিকমত ও প্রজ্ঞাজনোচিত ভঙ্গিতে অত্যন্ত পরিপক্ক ও অকাট্য বিষয়বস্তু পেশ করতে হবে, যা শুনে সমঝদার ও জ্ঞানবান রুচিসম্পন্ন লোক মাথা ঝুঁকিয়ে দিতে বাধ্য হয়। দুনিয়ার কাল্পনিক দর্শনাদি তার সামনে ম্লান হয়ে যায়। কোনো রকম জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তা-চেতনার বিকাশ যেন ওহী-বর্ণিত তত্ত্ব ও তথ্যকে পরিবর্তন করতে না পারে।

الموعظة الحسنة -এর দ্বারা মনোজ্ঞ ও হৃদয়গ্রাহী উপদেশকে বোঝানো হয়েছে, যা কোমল চরিত্র ও দরদী আত্মার রস ও আবেগে থাকবে পরিপূর্ণ। নিষ্ঠা, সহমর্মিতা, দরদ ও মধুর চরিত্র দিয়ে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ পন্থায় যে নসীহত করা হয় তাতে অনেক সময় পাষাণ-হৃদয়ও মোম হয়ে যায়, মৃত দেহে প্রাণ সঞ্চার হয় এবং একটি হতাশ ও ক্ষয়ে যাওয়া জাতি গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠে। মানুষ ভয়-ভীতি ও আশাব্যঞ্জক বক্তব্য শুনে লক্ষ্যস্থলের দিকে ছুটে চলে প্রবল বেগে, বিশেষত যারা অতটা সমঝদার, ধীমান ও উচ্চ মেধা-মস্তিষ্কের অধিকারী নয়, অথচ অন্তরে সত্য-সন্ধানের স্পৃহা প্রবল, তাদের হৃদয়ে মনোজ্ঞ ওয়ায-নসীহত দ্বারা এমন কর্ম-প্রেরণা সঞ্চার করা যায়, যা উঁচু জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দ্বারাও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

হ্যাঁ, দুনিয়ায় সব সময় একটা দল এমনও থাকে, যাদের কাজই হচ্ছে প্রতিটি বিষয়ে জটিলতা সৃষ্টি করা এবং কথায় কথায় হুজ্জতবাঁজি করা ও কূটতর্কে লিপ্ত হওয়া। এরা না হিকমতপূর্ণ কথা কবুল করে, না ওয়ায-নসীহতে কান দেয়। তারা চায় প্রতিটি বিষয়ে তর্ক-বিতর্কের ময়দান উত্তপ্ত থাকুক। অনেক সময় প্রকৃত বোদ্ধা, ন্যায়নিষ্ঠ ও সত্যানুসন্ধিৎসু স্তরের লোকদেরও সংশয়-সন্দেহ ঘিরে ধরে, আলোচনা-পর্যালোচনা ছাড়া তখন তাদেরও সন্তোষ লাভ হয় না। তাই الجدال بالتي هي أحسن এর বিধান রাখা হয়েছে-‘আর তাদেরকে বিতর্কে নিরুত্তর কর উত্তম পন্থায়।’

অর্থাৎ কখনো এমন অবস্থার সম্মুখীন হলে তখন উৎকৃষ্ট পন্থায় সৌজন্য ও শিষ্টাচার এবং সত্যানুরাগ ও ন্যায়-নিষ্ঠতার সাথে তর্ক-বিতর্ক করো। প্রতিপক্ষকে নিরুত্তর করতে চাইলে তা উত্তম পন্থায় করো। অহেতুক বেদনাদায়ক ও কলজে-জ্বালানো কথাবার্তা বলো না, যা দিয়ে সমস্যার কোনো সুরাহা হয় না; বরং তা আরও প্রলম্বিত হয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে সন্তুষ্ট করা ও সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। রুক্ষতা, দুর্ব্যবহার, বাক-চাতুর্য ও হঠকারিতা কখনো সুফল দেয় না। (তাফসীরে উছমানী ২/৬২৮-৬২৯)

অন্য জায়গায় আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন "মহাকালের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নহে, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও সংযমের উপদেশ দেয়।’ (সূরা আসর)

এক কথায়, অনিবার্য বিপদ ও ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষের চারটি বৈশিষ্টার্জন অপরিহার্যঃ

১) আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনা এবং তাদের হিদায়াত ও প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা, চাই তা দুনিয়া সম্পর্কিত হোক, কিংবা আখিরাত সম্পর্কিত।

২) সেই ঈমান ও ইয়াকীনের প্রভাব কেবল মন-মানস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না রাখা; বরং সর্বাঙ্গে তা ফুটিয়ে তোলা এবং বাস্তব জীবনেও আন্তরিক বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানো।

৩) কেবল নিজের ব্যক্তিগত সংস্কার ও কল্যাণ নিয়েই তুষ্ট না থাকা, বরং দেশ ও জাতির সামষ্টিক স্বার্থকেও সম্মুখে রাখা। দু'জন মুসলমান একত্র হলে নিজের কথা এবং কাজের দ্বারা একে অপরকে সত্য দ্বীন মেনে চলার এবং প্রতিটি কাজে সত্য ও সততা অবলম্বনের তাকীদ করা।

৪) প্রত্যেকে একে অপরকে এই নসীহত ও ওসীয়ত করা যে, সত্য ও ন্যায়ের ক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিগত ও জাতীয় সংস্কার-সংশোধনের ক্ষেত্রে যত বাধা-বিপত্তি, যত অসুবিধা ও বিপদাপদ দেখা দিবে, এমনকি যদি মন-মানসের বিরোধী কাজও বরদাশত করতে হয় তাহলেও ধৈর্য্য ও সবরের সঙ্গে তা বরদাশত করতে হবে। পুণ্য ও কল্যাণের পথ থেকে পা যেন কখনো ফসকে না যায় এই ওসীয়ত করতে হবে। যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তির মধ্যে এই চারটি গুণের সমাবেশ ঘটবে এবং যিনি নিজে পূর্ণাঙ্গ হয়ে অন্যদেরকে পূর্ণাঙ্গ করার চেষ্টা চালাবেন, কালের পৃষ্ঠায় তিনি অমর হয়ে থাকবেন। আর এমন ব্যক্তি যেসব নিদর্শন রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন তা ‘বাকিয়াতে সালেহাত’ তথা অবশিষ্ট নেক কাজ হিসেবে সর্বদা তার নেকীর খাতায় সংযোজিত হবে। বস্তুতঃ এই ছোট সূরাটি সমস্ত দ্বীন ও হিকমতের সার-সংক্ষেপ। ইমাম শাফেয়ী রাহ. যথার্থ বলেছেন যে, কুরআন মজীদে কেবল যদি এই সূরাটিই নাযিল করা হতো, তাহলে (সমঝদার) বান্দাদের হিদায়াতের জন্য যথেষ্ট ছিল। পূর্ববর্তী মনীষীদের মধ্যে দু'জন একত্র হলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় তারা একে অপরকে সূরাটি পাঠ করে শুনাতেন। (তাফসীরে উছমানী ৪/৭৪৫)

আল্লাহ তা'আলা সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদানের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন "তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকতেই হবে, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দিবে ও অন্যায় কাজ হতে বিরত রাখবে। আর তারাই সফলকাম। (সূরা আল ইমরান, আয়াতঃ ১০৪)

আল্লাহ তা'আলা আরো ইরশাদ করেন, "আর তুমি বুঝাতে থাক। কারণ বুঝানো ঈমানদারদের উপকারে আসে।" (সূরা যারিয়াতে, আয়াত : ৫৫)

এসব আয়াতের ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে এত বেশী নিমগ্ন ও ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যেন তিনি জীবনের বিনিময়ে হলেও তাঁর উম্মতকে হিদায়াত করে ছাড়বেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, "যদি তারা (আপনার দাওয়াত) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে আমিতো আপনাকে (দাওয়াত গ্রহণ করিয়ে জাহান্নাম থেকে) হেফাযতকারী হিসেবে পাঠাইনি। আপনার জিম্মাদারী হলো, শুধু তাবলীগ করা। (সূরা শুরা, আয়াতঃ ৪৮) অর্থাৎ দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব আপনি পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন। এখন আপনার এত দুঃখিত ও অনুতপ্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সত্য না মানার যা দোষ তা সত্যদ্রোহীদের উপরই বর্তাবে। তবে বুঝোনো আপনার দায়িত্ব। তাই দাওয়াত ও তাবলীগের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখুন। যার ভাগ্যে ঈমান আছে আপনার উপদেশে সে উপকৃত হবে, ঈমান আনবে এবং যারা ইতোপূর্বে ঈমান এনেছে তারা আরও বর্ধিত হারে উপকৃত হবে। আর অস্বীকারকারীদের জন্য আল্লাহর প্রমাণ পূর্ণ হবে। (তাফসীরে উছমানী ৪/৩২১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "হে বস্ত্রাবৃত! উঠুন, সতর্কবাণী প্রচার করুন এবং আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।’ (সূরা মুদ্দাসসির : ১-৩)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের জন্য এত বেশী ফিকির করতেন এবং উদ্বিগ্ন থাকতেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "তারা যদি এ বিষয়ে বিশ্বাস না করে তবে তাদের পেছনে মনস্তাপ করতে করতে হয়ত আপনি প্রাণপাত করে ফেলবেন।" (সূরা কাহফ : ৬)

অর্থাৎ এই কাফিররা যদি কুরআনের কথা না মানে, তো আপনি তাদের দুঃখে মোটেই পেরেশান হবেন না। আপনি দাওয়াত ও তাবলীগের দায়িত্ব আদায় করেছেন ও করে যাচ্ছেন, কেউ না মানলে আপনার অতটা মর্মাহত ও চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এই ভেবে অনুতাপ করাও সমীচীন নয় যে, আমি এমন মেহনত কেন করলাম যা সফল হল না? আপনি সর্বাবস্থায় সাফল্যমন্ডিত। দাওয়াত ও তাবলীগ এবং মানবতার প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার যে কাজ আপনি করছেন তা আপনার মর্যাদা বৃদ্ধির সহায়ক। হতভাগার দল কবুল না করলে ক্ষতি তাদেরই। (তাফসীরে উছমানী ২/৭০১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত হওয়ার কারণে আমাদের উপরও দাওয়াতের কাজ জরুরি। যেমন সূরা ইউসুফে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "বলুন, এটিই আমার পথ। আল্লাহর দিকে আমি আহ্বান করি বুঝে-শুনে, আমি (করি) এবং যারা আমার সঙ্গে আছে (তারাও করে)। আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং আমি শরীক সাব্যস্তকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সূরা ইউসুফ, আয়াতঃ ১০৮)

অর্থাৎ এই খাঁটি তাওহীদের পথই আমার পথ। আমি বিশ্ব মানবতাকে আহবান করি যে, সমস্ত ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনা ছেড়ে এক আল্লাহর অভিমুখী হও এবং তাঁর তাওহীদ, তাঁর গুণাবলি ও বিধি-বিধান ইত্যাদির বিশুদ্ধ জ্ঞান বিশুদ্ধ পন্থায় অর্জন কর। আমি ও আমার সঙ্গীগণ অকাট্য দলিল-প্রমাণ এবং বিশুদ্ধ উপলব্ধি ও ব্যুৎপত্তির আলোকে এই সত্য সরল পথে প্রতিষ্ঠিত আছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এক আলো দান করেছেন, যাতে সব সাথীর দেল-দেমাগ সমুজ্জ্বল হয়ে গেছে। কারও অন্ধ অনুকরণ নয়, বিশুদ্ধ তাওহীদের পথচারী প্রতিটি কদমে তার মন-মানসে আল্লাহর মারিফত ও অর্ন্তদৃষ্টির বিশেষ জ্যোতি ও পরম দাসত্বের স্বাদ উপলব্ধি করে অবচেতন মনে বলে ওঠে-‘আল্লাহ পবিত্র। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ (তাফসীরে উছমানী ২/৪৫৯)

আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকেও দাওয়াত ইলাল্লাহর গুরুত্ব বোঝে সঠিকভাবে এ মহা-দায়িত্ব পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

************************************************************

এটি একটি ধারাবাহিক পোস্ট। আজ শুধু অবতরণিকা লিখে একটি পটভুমি তৈরী করা হয়েছে মাত্র, পরবর্তী পর্ব থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে ইনশা আল্লাহ।

সবাইকে সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ করছি।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সব নেক আমলকে কবুল করুন। আমীন।


কার্গুজারী ০৩

posted Dec 29, 2011, 1:53 PM by Abul Hiqmah

পটভূমি


২০০৮ সালের মে মাসে আমাদের বাংলাদেশের এক জামাতের সাথে আমি ৩০ দিনের জন্য ভারতে সময় লাগাতে গিয়ে ছিলাম৷ আমরা দিল্লী থেকে ৮০ মাইল দুরে মেওয়াত জেলার মারকাজ মসজিদ থেকে মেহনত শুরু করি৷ তারপর আমরা ফিরোজপুরে মেয়াজী মেহেরাব সাহেবের মসজিদে দুই দিন ছিলাম৷ অনেক পুরাতন এই মসজিদের কুপের পানি খুব ভাল ছিল৷ তখন জানতে পারি এই মসজিদেই ১৯২৫ সালের কোন এক বিকেলে প্রথম উমমী গাস্ত শুরু করেন হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস সাহেব (র:)৷ আমরা হজরতজীর স্বৃতিবিজরিত মেওয়াতের অনেক এলাকায় সফর ও মেহনত শেষে সেখান থেকে নগদ জামাত পাঠিয়ে নিজামুদ্দিনে কেন্দ্রীয় মারকাজ মসজিদে ফিরে আসি৷ একদিন বাদ ফজর বয়ান শেষ হয়ে যাবার পর আল্লাহর রাস্তায় বের হবে এমন জামাত সমুহের রোকশত উপলক্ষে হজরত মাওলানা সা'আদ সাহেব (দামাত বারাকাতুহু) মসজিদে হেদায়েত দেয়ার জন্য আসেন৷ তিনি এক জামাতের সাথীদের কিছু প্রশ্ন করেন৷ তিনি জানতে চান যে তারা কেন আল্লার রাস্তায় বের হচেছন? জাবাবে সাথীরা ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দেন৷ এক সাথী বলেন যে তিনি পরহেজগার মুত্তাকী হওয়ার জন্য , আরেক সাথী বলেন তিনি সুরা ক্বেরাত সহি করতে, আরেক সাথী বলেন নামাজী হবার জন্য আল্লাহর রাস্তায় যাচেছন! হজরত মাওলানা সা'আদ সাহেব (দামাত বারাকাতুহু) বললেন ' 'আফসোস ' তোমাদের এই নিয়্যাত গুলি সঠিক নয় কারন চিল্লা শেষ হবার পর তোমরা মনে করতে আরম্ভ করবে, উদ্দেশ্য পুরা হয়ে গেছে অতএব দাওয়াতের মেহনত ছেড়ে দেয়া যেতে পারে৷ বাস্তবে অনেক সাথীরা তাই করছে৷ আসলে তোমাদের প্রত্যেকের উচিত্‍ ছিল এই ভাবে নিয়্যাত করা " যে আমি দ্বীনের দ্বা'য়ী হবার জন্য আল্লাহর রাস্তায় বের হচিছ "৷ এই মেহনতের দ্বারা আমার মধ্যে দ্বীনের দ্বা'য়ীর সেই সেফত গুলি আনার জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করতে থাকব যেগুলি সয়ং রাসুলুল্লাহ (স:) এর মধ্যে পুরো মাত্রায় ছিল৷ তাহলে তোমরা এই মেহনত নিয়ে আগে বাড়তে পারবে৷ তোমাদের মেহনতের দ্বারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ দ্বীনের লাইনে উপকৃত হতে থাকবে৷
উক্ত ঘটনাটি আমাকে বিশেষ ভাবে ভাবিয়ে তোলে এবং বিষয়টি অত্র বইটি লেখার পটভূমি হয়ে উঠে৷ এখন কোন মোবাল্লেগ যিনি সাধারণ একজন মুসলমান,আলেম নন! আধুুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত! দাওয়াতের মেহনতের বরকতে দ্বীনের উপর কিছুটা হলেও চলতে পারছিলেন এবং দাওয়াতের মেহনতের আধ্যাতি্নকতা প্রবল ভাবে অনুভব করেন৷ তারা কিভাবে দ্বীনের দ্বা'য়ী হবার চেষ্টা করবেন ? দ্বীনের দ্বা'য়ী হবার পথে একটু এগিয়ে দেয়া, সাহস যোগানো এবং কিছুটা হলেও সহাযতা করার উদ্দেশ্য নিয়ে "আপনি কিভাবে দ্বীনের দ্বা'য়ী হতে পারেন" বইটি লেখার চেস্টা করা হলো, যদিও এমন একটি বিষয় নিয়ে লেখার কোন যোগ্যতাই লেখকের নেই৷ বইটি ২১টি ভাষায় অনুবাদ করে ওয়েব সাইটে দেয়া হয়েছে৷ যাতে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মোবাল্লেগরা কিছুটা হলেও উপকৃত হন৷ যারা কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে দ্বীনের দ্বা'য়ী হিসেবে পরিগনিত হবার জন্য নিয়্যাত করবেন এবং নিজের মধ্যে দ্বীনের দ্বা'য়ীর সেফাত গুলি আনায়ন করার প্রবল প্রচেষ্ট শুরু করতে চান তারা যেন এই বইটিতে সেরকম কিছু উপযোগীতা খুজে পান তার জন্য আপ্রান চেষ্টা করা হয়েছে৷ আসলে দ্বীনের দ্বা'য়ী হবার জন্য মনের মধ্যে নিয়্যতের দৃঢ়তা , কঠোর অনুশীলন এবং এখলাসই আসল ৷ দ্বীনের দ্বা'য়ী হওয়ার মেহনত সম্পর্কে আল্লাহ তা'লা প্রবিত্র কোরআনে পাকে আয়াত নাজিল করেছেন এবং হুজুর (সা:) অনেক হাদিস রেখে গেছেন৷ দ্বীনের দ্বা'য়ী হবার মেহনত করার সুন্নত তরিকা কি এবং কিভাবে করতে হয় তা সুস্পষ্ট ভাবে হুজুর (সা:) এবং তার সাহাবীগন বাস্তবে করে তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন৷ এজন্য প্রয়োজন তাদের অনুসরণ যা হুজুর (সা:) বিদায় হজ্জের ভাষনে তা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন৷ আপনি কি এখন দ্বীনের দ্বা'য়ী হবার মেহনত শুরূ করতে চান ? আপনি কি আপনার কলবের ব্যাধি দুর করতে চান ? আপনি কি আপনার ইমান ও একীন সহি করতে চান ? তাহলে আপনার হৃদয়ের মধ্যে নিয়ে আসুন এমন এক ধরণের দৃঢ়তা যা আপনার মধ্যে এনে দিতে পারে ইস্তেকামাতের মত বিরল এক গুন৷

ইস্তেকামাত কি ?
একবার সাহাবায়ে একরাম (রা:) লক্ষ্য করলেন যে হুজুর (স:) এর দাড়ি মোবরকের কয়েক গাছি পেকে গেছে,তখন তারা আফসোস করে বললেন, হুজুর বার্ধক্য আপনার দিকে দু্রত গতিতে এগিয়ে আসছে৷ তদুত্তরে রসুলুল্লাহ (স:) বললেন " সুরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ করেছে" আয়াতটি হচেছ " ফাসতাকিম কামা ... উমির তা " অথ্যাত্‍ " ইস্তেকামাত অবলম্বন কর যেমন তোমায় নির্দেশ দেয়া হয়েছে "৷
আসলে ইস্তেকামাত হচেছ সোজা দ্বাড়িয়ে থাকা, কোন দিকে না ঝুঁকে৷ ইস্তেকামাত শব্দটি ছোট হলেও এর অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক ৷ এটা হচেছ আকায়েদ, এবাদত, লেন দেন, আচার ব্যবহার,ব্যবসা বানিজ্য,অর্থ উপার্জন এবং অর্থব্যয় তথা নীতি নৈতিকতার যাবতীয় ক্ষেএে আল্লাহর নিধ্যারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে তারই নির্দেশিত সোজা পথে চলা ৷ দ্বীনের দ্বা'য়ী বা আল্লাহর পথের অভিযাত্রীদের জণ্য ইস্তেকামাত অনেক জরুরী একটি বিষয়৷
ইস্তেকামাতের উপকরণ:
১/ এখলাস বা আন্তরিকতার সাথে দাওয়াতের মেহনত করলে দঢ়তা আসবে
২/ দৈনিক দাওয়াতের কাজ করলে জজবা বৃদ্ধি পাবে আর তা না করলে জজবা বিদায় নিবে
৩/ দাওয়াতের পরিবেশে থাকলে দৃঢ়তা আসবে৷ আর অলসতা করলে ভেংগে পড়বে
৪/ আমীরের আনুগত্য করলে দৃঢ়তা আসবে আর তা না করলে দৃঢ় হতে পারবে না
৫/ বিনয় অবলম্বন করলে দৃঢ়তা আসবে আর অহংকার করলে দৃঢ় হতে পারবে না
৬/ অন্যের দোষ তালাস না করে অন্যের গুন তালাস করলে দৃঢ়তা আসবে
৭/ কোন কোন পাপ এমন রয়েছে - যা করলে দাওয়াতের মেহনত থেকে মাহরুম হয়ে যাবার সম্ভাবনা
যেমন- গীবত , কুদৃষ্টি , অবজ্ঞা , প্রবৃত্তিপূজা ইত্যাদি৷
আল্লাহ তা'লা আমাদের সকলকে ইস্তেকামাত অবলম্বনের তৌফিক দান করেন এবং দ্বীনের দ্বা'য়ী হিসেবে কবুল করেন৷ আমিন৷

কিভাবে আপনি দ্বীনের দ্বায়ী হতে পারেন

দ্বীন হচেছ এমন এক রীতি নীতি যা মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে৷ মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে দেখতে পায় না কিন্তু দ্বীনকে অনুসরনের মাধ্যমে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে৷ দ্বীন মানুষের অন্তর আলোকিত করে, দ্বীনের জন্য মানুষের ত্যাগ সৃষ্টিকর্তার নিকট তাকে মহিমাহৃিত করে৷ দ্বীন মানুষকে আল্লাহ'তালা এবং তার সমগ্র সৃষ্টি জগত্‍ ও সমগ্র কায়েনাত সম্পর্কে সঠিক ধারনা দেয়৷ পৃথিবীতে মানব জাতির সঠিক ইতিহাস খুজে পাওয়া যায় একমাত্র দ্বীন অনুশীলনের মাধ্যমে৷ দ্বীন মানুষকে ইহলৌকিক এবং পরলৌকিক এই উভয় জীবনের বিষয়ে একই সাথে দায়িত্ববান করে তোলে, যাতে মানুষ এই উভয় জীবনেই সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হয়৷ সত্যিকার অর্থে ইমান,আমল এবং ইহসানকে সম্মিলিত ভাবে দ্বীন বলা হয়৷ ইমান হচেছ শরীয়তের যাবতীয় হুকুম আহকাম অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা এবং এগুলোকে নিজের দ্বীন হিসেবে বরণ করে নেয়া৷ পরিপূর্ণ মু'মিন সেই ব্যাক্তি যিনি শরীয়তের বিষয়গুলিকে গভীর ভাবে বিশ্বাস করেন এবং এই গুলির মৌখিক স্বীকৃতিসহ বাস্তব জীবনে পুনাংগভাবে আমল করে চলেন৷ অপর দিকে আমল হচেছ যাবতীয় বায্যিক আচরন- যেমন- দাওয়াত, ইবাদত, মু'আমেলাত- লেনদেন, মু'আশেরাত-আচার আচরন এবং আখলাক-সত্‍চারিত্রিক গুনাবলী৷ আর ইহসান হচেছ - ক্রোধ, লোভ, মোহ, হিংসা বিদ্বেস, গীবত, অপবাদ, অহংকার ইত্যাদি মন্দস্বভাব হতে পাক-পবিত্র হয়ে ইখলাস,আমানতদারী,বিনয়, নম্রতা,সততা ও ন্যায়পরায়নতা ইত্যাদি উত্তম চরিত্র দ্বারা নিজেকে সুশোভিত করা৷
মানুষের মধ্যে দ্বীন আসে এক মেহনতের মাধ্যমে, এই মেহনতের নাম দ্বীনের মেহনত৷ নবী রাসুলগন এই মেহনত করে মানুষকে দ্বীনের দিকে দাওয়াত দিতেন আর এজন্য তারা অনেক কষ্ট মোজাহেদা করতেন৷ নবীদের নিকট থেকে দাওয়াত প্রাপ্ত হয়ে মানুষ তখন অনুপ্রাণিত হয়ে দ্বীনের সুশীতল ছায়ায় আসতে থাকেন, তাদের অন্তরের মধ্যে ইমানী শক্তি বৃদ্বি পেতে আরম্ভ করে৷ তারা তাদের জীবনে দ্বীন এক্তেয়ার করে দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তির সংস্থান করতে সক্ষম হতে থাকেন৷ কিন্তু নবীদের এন্তেকালের পর মানুষ স্বীয় নফস, শয়তান আর দুনিয়ার প্রভাবে আস্তে আস্তে দ্বীন থেকে দুরে সরে যেতে আরম্ভ করে৷ তখন দ্বীনের মেহনত করার জন্য আল্লাহতা'লা আবার নবী রসুলদের দুনিয়াতে প্রেরণ করেন৷ আমাদের নবী হুজুর (স:) কে আল্লাহতা'লা যে দ্বীন দিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন তার নাম ইসলাম এবং তার এই নবুয়তের মেয়াদ হচেছ কেয়ামত পর্যন্ত৷ অথ্যাত্‍ কেয়ামতের পূর্বে আর কোন নবী রসুলকে আল্লাহ পাক দুনিয়াতে পাঠাবেন না৷ কেননা রুহের জগতে হুজুর (স:) এর উম্মতের সমুদয় রুহ গুলিকে আল্লাহতা'লা বাছাই করে আলাদা করেরেখেছিলেন যাতে এই উম্মত দ্বীনের মেহনতকে কেয়ামত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে৷ আর এই দ্বীনের মেহনত করার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে দ্বায়ী উম্মত হিসেবে গড়ে তুলতে পারে৷
কোন মানুষ যদি পূর্নাঙ দ্বীন নিজের মধ্যে আনায়ন করতে চায় তবে তাকে মোট তিনটি বিষয়ের ব্যাপারে নিজেকে পরিপূর্ন ভাবে নিয়োজিত করতে সক্ষম হতে হবে৷ প্রথমত: আল্লাহ'তালার হুকুমের উপর পুরোপুরি উঠতে হবে৷ ২য় বিষয় হচেছ হুজুর (স:) এর সুন্নত নিজের জিন্দেগীতে সম্পুর্ণ ভাবে আনায়ন করতে হবে এবং তৃতীয় বিষয় হচেছ এই দুই জিনিসের দাওয়াত ১.৬ বিলিয়ন মুসলমান সহ দুনিয়ার সব মানুষের নিকট পৌছে দেয়ার নিয়্যাত করতে হবে৷ অথ্যাত্‍ এক জন দ্বীনের দ্বায়ীর প্রধান কাজ হচেছ আল্লাহ'তালার আহকামাত্‍ এবং হুজুর (স:) এর সুন্নতের উপর নিজে আমল করনেওয়ালা বনে যাওয়া এবং সব মানুষের নিকট এর দাওয়াত দেনেওয়ালা বনে যাওয়া৷ আর এটাই হচেছ, কিয়ামতের দিন আল্লাহ' তালার নিকট দ্বীনের দ্বায়ী হিসেবে গণ্য হয়ে যাওয়ার এক মাত্র পথ৷ আখেরাতে দ্বীনের দ্বা'য়ীর মর্যাদা হচেছ সর্বোচ্চ অথ্যাত্‍ নবীদের সমান৷ আল্লাহতা'লা বলেন " যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সত্‍কর্ম সম্পাদন (আমলে সলেহা) করে , তাদের অভ্যর্থনার জন্য আছে জান্নাতুল ফেরদাউস৷" সুরা কাহাফ আয়াত ১০৭

১/ হাদিস শরীফে আখেরাতে দ্বীনের দ্বা'য়ীর মর্যাদা সমর্্পকে যা আছে তার সারমর্ম নিম্নরুপ :

ক) আখেরাতে দ্বীনের দ্বা'য়ীর মর্যাদা নবীদের সমান হবে৷ কেয়ামতের ময়দানে নবীদের সাথে দ্বীনের দ্বা'য়ীরা একই মানের চেয়ারে বসবেন৷ পার্থক্য শুধু নবীদের চেয়ারে নবুওতের সীল মোহর থাকবে৷ দ্বীনের দ্বা'য়ীদের চেয়ারে কোস সীল মহর থাকবে না৷

খ) আখেরাতে দ্বীনের দ্বা'য়ীর কোন হিসাব নেয়া হবে না৷ তাদের বিনা হিসাবে জান্নায়াতুল ফেরদাউসে দাখিল করা হবে৷ যে একটি মাত্র জান্নাতই আল্লাহতা'লা নিজ কুদরতি হাতে তৈরী করেছেন৷

গ) কেয়ামতের দিন দ্বীনের দ্বা'য়ীর সাথে হুজুর (স:) কোলাকুলী করবেন৷

এখন যে কোন মুসলমান (নারী / পুরুষ) নিজেকে দ্বীনের দ্বায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে তাকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম কানুন বা পদ্বতির ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হবে৷ যেহেতু
দ্বীনের দ্বায়ীর মর্যাদা সর্বোচ্চ অতএব এ রকম একটি যোগ্যতা হাসিল করতে প্রয়োজন সংকল্পের দৃঢ়তা , একাগ্রতা ,কঠোর পরিশ্রম এবং কোরবানী৷

প্রথমত: এখলাস অবলম্বন করে নিয়্যাত করতে হবে যে আমি নিজেকে দ্বীনের দ্বায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, এবং একজন দ্বায়ীর যে সব সেফত বা গুন রয়েছে,সেগুলি অর্জন করতে যে মেহনত প্রয়োজন তার জন্য তাকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে এবং এর তৌফিক পাবার জন্য আল্লাহ' তালার নিকট সাহায্য কামনা করতে হবে৷
দ্বিতীয়ত : নিজের জীবনের সব গুনাহ মাফ করনের জন্য তওবা করে নিতে হবে৷ তওবা করার পদ্বতি অত্র পুস্তকের দ্বিতীয় অথ্যায় থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে৷ তওবা করে নেয়ার পর নিজেকে কবীরা গুনাহ থেকে সদাসর্বদা পবিত্র রাখতে হবে এবং এর জন্য কি করনীয় তার
বিস্তারিত বর্ণনাও সেখানে দেয়া হয়েছে৷

তৃতীয় বিষয় হচেছ ৬ নম্বরের উপর নিজেকে উঠাতে হবে৷ ৬ নম্বরের বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে অত্র পুস্তকের তৃতীয় অধ্যায়ে পাওয়া যাবে৷ ইমানের পর নামাজের স্থান৷ একজন দ্বীনের দ্বায়ীর জন্য নামাজ হচেছ আল্লাহর খাজানা থেকে নেয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার৷ কিন্তু কিভাবে আপনি আপনার নামাজের মানোন্নয়ন করবেন ? নামাজের মান একটি গ্রহনযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে আপনার কি করা উচিত্‍ তা নিয়ে একটি নিরীক্ষাধমর্ী আলোচনা অত্র পুস্তকের একই অধ্যায়ে পাওয়া যাবে৷ নামাজ হচেছ বেহেস্তের চাবি আর অজু হচেছ নামাজের চাবি৷ অজুর আধ্যাতিকতা সম্পর্কে সেখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সনি্নবেশ করা হয়েছে৷

চতুর্থত: শয়তান এবং নফস সম্পর্কে জানতে হবে৷ তাহলে শয়তান কে প্রতিরোধ এবং নফসের এসলাহ করা সহজ হবে ৷ অথ্যাত্‍ নফসের বিষ দাঁত ভেংগে ফেলতে হবে এবং নখর গুলি কেটে দিতে হবে৷ শয়তানকে প্রতিরোধ এবং নফসের এসলাহ করার একটি পদ্বতি অত্র পুস্তকের চতুর্থ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে৷ নফসের এসলাহ করা সম্ভব হলে জেগে উঠবে বিবেক৷ বিবেক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে একই অধ্যায়ে৷

৫ম বিষয় হচেছ নিজের শরীর এবং স্বাস্থ্যের বিষয়ে যত্নবান হওয়া ৷ এ বিষয়টির বিস্তারিত বর্ননা অত্র পুস্তকের ৫ম অধ্যায়ে দেয়া হয়েছে৷

৬ষ্ঠ বিষয় হচেছ দ্বীনের দ্বায়ীর সেফত্‍ বা গুণসমুহ নিজের মধ্যে কিভাবে আনায়ন করা যায় তার জন্য কিরা উচিত তা বিস্তারিত ভাবে অত্র পুস্তকের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে৷ এই ছয়টি অধ্যায়ের বাহিরে হয়তো আরো কিছু আছে, একজন মোবাল্লেগকে দ্বীনের দ্বায়ীর মেহনতের দিকে আগে বাড়িয়ে দেবার৷ আপাতত উল্লেখিত এসব বিষয় নিয়ে দ্বীনের দ্বায়ী হবার মেহনত শুরু করা যেতে পারে৷ এখানে বলা উচিত্‍ , যে ব্যক্তি দ্বায়ী হবার প্রবল আগ্রহ বা তলব রাখেন, আল্লাহপাক তার আন্তরিক প্রচেষ্টাকে কখনো বিফল করেন না৷

প্রথম অধ্যায়
এখলাস অবলম্বন করে দ্বীনের দ্বায়ী হবার জন্য নিয়্যাত :
দ্বীনের দ্বায়ী হওয়ার মাধ্যমে আখেরাতে যে সব ফজিলত লাভ হবে সেগুলি স্বরণ করুন তাহলে এরকম একটি যোগ্যতা অর্জনের জন্য নিয়্যাত করতে মন প্রলুব্ধ হবে৷ শুধুমাত্র আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্যই নিয়্যাত টি এভাবে করুন৷ " আমি দ্বীনের দ্বায়ী হওয়ার নিয়্যাত করছি এবং এজন্য যে এখলাস এবং কঠোর একাগ্রতা প্রয়োজন তার জন্য নিজের সর্বাত্নক চেস্টা সাধনা এবং মহান আল্লাহতা'লার রহমত / সাহায্য কামনা করছি৷"
একদা হুজুর (স:) হযরত মু'আয (রা:) কে বলেন , হে মু'আয ! তুমি ইখলাসের সাথে আল্লাহর এবাদত করবে, তাতে অল্প ইবাদতই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে৷ হুজুর (স:) আরো বলেন " আল্লাহর নিকট মানুষের কাজের গ্রহন যোগ্যতা নিয়্যাত অনুসারে হয়৷ প্রত্যেক মানুষ তার কাজের ফলাফল আল্লাহর কাছে সেরুপ পাবে যেরুপ সে নিয়্যাত করবে৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের সন্তুষ্টির জন্য হিযরত করবে, অবশ্যই তার হিযরত আল্লাহ ও তার রাসুলের নিকট গ্রহনযোগ্য হবে৷ আর যদি কেউ পার্থিব জীবনের উদ্দেশ্যে বা কোন মহিলাকে বিবাহ করার লক্ষ্যে হিযরত করে তবে তার হিযরত হবে সে জন্যই৷"

এখলাস অবলম্বন করে কোন আমল শুরু করলেও, কিছু দিন পর কিংবা কাজের মাঝখানে এখলাসের মধ্যে ত্রুটি চলে আসতে পারে৷ তাই মাঝে মাঝে নিয়্যাতকে যাচাই করা প্রয়োজন৷ নিয়তকে যাচাই করার সবচেয়ে আহাম পদ্ধতি হলো সুরা ইয়াসিনের ২১নং আয়াতের দিকে তাকানো অথ্যাত্‍ "অনুসরন কর তাদের, যারা তোমাদের কাছে কোন বিনিময় কামনা করে না,অথচ তারা সুপথ প্রাপ্ত" এখানে দ্বীনের দ্বায়ী হওয়ার মেহনতের বিভিন্ন পর্যায়ে সন্মানিত হবার বা অসন্মানিত হবার ঘটনায় দ্বীল কোন আছর নেয় কিনা তা থেকে বুঝা যাবে এখলাস সঠিক পর্যয়ে রয়েছে কিনা৷ বিশেষ যে কোন অবস্থায় যাতে দ্বীল যাতে কোন আছর বা প্রতিক্রিয়া না দেখায় সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে৷ বিশেষত:
অন্তরে রিয়া নামক একটি খারাপ উপাদান এসে যুক্ত হয়ে না যায়৷
এখলাস অত্যন্ত সূক্ষ একটি বিষয়৷ যে কোন অবস্থায় দ্বীল আল্লাহ মূখী থাকবে মাখলুকের কাছে কিছু চাওয়া দুরে থাক চাওয়ার ভানও করা যাবে না৷ যে ব্যক্তি সকল প্রয়োজনে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে না বলে যদিও এটা কষ্টকর সেই ব্যক্তি ৩টি পুরুস্কার লাভ করবে :
১/ সে কখনও ঠকে না ( পরাজিত হয়না)
২/ সে কখনও ঠেকে না ( বাধাগ্রস্থ হয় না )
৩/ সে কখনও ঠকায় না ( তার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয় না )
এখলাস এর বিশুদ্ধতার পরিচয় :
এখলাস হচ্ছে আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো জন্য এবাদত না করা৷ এবাদতে বা দ্বীনি কাজে আল্লাহর আনুগত্যে একান্ত আন্তরিকতা সম্পর্কে আল্লাহতা'লা বলেন " জেনে রেখ ! অবিমিশ্র আনগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য৷" সুরা যুমার ৩৯:৩ আল্লাহতা'লা আরো বলেন " তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ট হয়ে তার এবাদত করতে৷" সুরা বায়্যিনাহ, ৯৮:৫
মানুষের অন্তরে এখলাসের বিশুদ্ধতা যে কোন এবাদতের শেষ পর্যন্ত থাকা অত্যন্ত জরুরী৷ এবাদত বা দ্বীনি মেহনত চলাকালীন সময়ে নিয়্যাতের মধ্যে কোন কিছু মিশ্রিত হলেই এখলাসে বিশুদ্ধতা ক্ষুন্ন হয়ে যায়৷ নিন্মের উদহারন বিষয়টিকে পরিস্কার করবে আশাকরি :

১/ সুঘ্রান বিস্তারের উদ্দেশ্যে গোছলের পর সুগন্ধি ব্যবহার করা
২/ স্বাস্থ্যের উপকার হবে এই নিয়্যাতে নামাজ পড়া ও রোজা রাখা
৩/ ধমর্ীয় কিতাব রচনার উদ্দেশ্য যদি নাম যশ কিংবা অর্থ উপার্জন হয়
৪/ খাদ্য পাকানোর কষ্ট এড়াতে রোজা রাখা
৫/ মানুষেরা দ্বায়ী ভাববে আশায় দাওয়াতের মেহনতে সব কিছু বিলিয়ে দেয়া
৬/ নিরবতার কষ্ট থেকে মুক্তি পাবার জন্য কোরআন হাদিস থেকে কিছু বলা
৭/ ভাড়া এড়ানোর উদ্দেশ্যে পদব্রজে হজ্জে যাওয়া
৮/ আর যেন চাইতে না আসে এই জন্য কোন ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়া৷
৯/ ঘর ভাড়া বাঁচানোর উদ্দেশ্যে মসজিদে এতেকাফ করা
১০/ রাত জেগে ধন সস্পত্তি পাহাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে তাহাজ্জুদ পড়া,শব্দ করে কোরআন পড়া
১১/ যুদ্ধবিশারদ হওয়ার নিয়্যাতে জিহাদে যাওয়া
১২/ পবিত্র হওয়ার জন্য বা শীতল হবার জন্য উযূ করা
১৩/ আবাস স্থলে শত্রু / অফিসে ব্যবসা বানিজ্যের ঝামেলা/ স্ত্রী পুত্র কন্যাদের হাত থেকে
বাঁচার জন্য আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে যাওয়া৷
মানুষ যখন কোন এবাদত বা যে কোন কাজ করে তখন মনে মনে একটি উদ্দেশ্য ঠিক করে সেই কাজের প্রতি অগ্রসর হয়৷ এটা মানুষের জন্মগত স্বভাব৷ এখানে উদ্দেশ্য বা নিয়্যাতের বিষয়বস্তু নিধর্্যারণে ইমানের মজবুতী বা দুবলতা কাজ করে থাকে৷ ইমান শক্তিশালী থাকলে উদ্দেশ্য বা নিয়্যাতের বিষয়বস্তু নিধর্্যারণ সঠিক হয়৷ অন্যথায় সঠিক না হবার সম্ভবনাই বেশী থাকে৷
এবাদতে বা দ্বীনি কাজে এখেলাস বিনষ্টকারী উপাদন :
এখলাস বিণষ্টকারী প্রধান উপাদান হচ্ছে রিয়া৷ রিয়ার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ট না হয়ে
লোক দেখানোর জন্য নেক কাজ করা৷ হুজুর (স:) বলেন " আমি আমার উম্মতের জন্য যে বিষয়ে
সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হলো রিয়া৷" অতএব রিয়া থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে এবং ভাল করে বুঝে নিতে হবে কি কি উপায়ে শয়তান মানুষের অন্তরে রিয়া প্রবেশ করিয়ে দিয়ে থাকে৷
ক) দেহের বায্যিক অংগভংগিতে রিয়া : যেমন
নিজেকে দুর্বল উপস্থাপন করা কিংবা চুল এলোমেলো রেখে মানুষের সমীহ আদায় করা যে লোকটি আল্লাহর অনেক বেশী এবাদত বন্দেগী করে৷
খ) পোষাক পরিচ্ছদে রিয়া :
অপরিস্কার ও ছেড়া কাপড় এই জন্যই পড়ে, যে লোকে মনে করবে এই ব্যাক্তি আল্লাহর অলি
গ) কথাবার্তায় রিয়া :
সব সময় মাথা কিংবা ঠোট নাড়িয়ে লোককে মনে করিয়ে দেয়- লোকটি অনেক বড় জাকেরীন
ঘ) এবাদতে রিয়া :
অনেক সুন্দর করে নামাজ এই জন্য আদায় করে, যাতে লোকে আবেদ বলে, কিন্তু একাকী নামাজে
তাড়াহুড়ো করে৷ এমন ভাবে দান খয়রাত করে যাতে লোকে ভাবে লোকটি অনেক বড় দানবীর৷
নেকীর আশায়ই এবাদতে লিপ্ত হয় কিন্তু মানুষ দেখলে এবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়৷
রিয়াকারী ব্যাক্তির পরিণতি :
রিয়া হচ্ছে গুপ্ত শিরক৷ রিয়াকরী ব্যাক্তি মোসরেক হিসেবে গন্য হবে এবং তাকে জাহান্নামের
জুববুল হুযন ( দুখ: কষ্টের গর্ত) নামক গর্তে ফেলে দেয়া হবে৷
দ্বিতীয় অধ্যায়
গুনাহ থেকে পবিত্রতা অর্জন

গুণাহ কি ?
আল্লাহতা'লা এবং হুজুর (স:) দেয়া দিক নির্দেশনা অথ্যাত্‍ শরিয়তের নিধ্যারিত সীমারেখার বাহিরে মানুষ যেসব কাজ করে তাকে গুণাহ বলে৷ আদম (আ:) থেকে সর্বপ্রথম গুণাহের সূত্রপাত ঘটে, ফলে আদম সন্তানের মধ্যে গুণাহ করার একটি সহজাত প্রবৃত্তি রয়েছে৷ মানুষের গুণাহ তিন ধরনের হয়ে থাকে , প্রথমত : আল্লাহতা'লার আদেশকৃত ফরজ কার্যাদি না করা৷ যেমন: ইমানের মেহনত, নামাজ, রোজা, হজ্জ, জাকাত, কাফফারা ইত্যাদি৷

দ্বিতীয়ত: আল্লাহতা'লা কতৃক নিষিদ্ধ কার্যাদি করা৷ তথা মদ্যপান, জুয়া খেলা,সুদ ও ঘুষ খাওয়া, কারো গীবত করা, জেনা করা, কাউকে অপবাদ দেয়া, চোখের ব্যবহারে কোন নিয়ন্ত্রন না রাখা প্রভৃতি৷
তৃতীয়ত: সৃষ্টির সাথে সৃষ্টির অথ্যাত্‍ বান্দার সাথে বান্দার অধিকার ও সম্পর্ক বিষয়ক গুণাহসমূহ৷ এই গুণাহ অত্যন্ত মারাত্নক৷ যেমন : ধন সম্পদ ,মান ইজ্জত,হুরমত ও ধমর্ীয় অপবাদ যেমন কাউকে কাফের, মোনাফেক কিংবা ফাসেক ইত্যাদি বলা ৷
গুনাহ দুই প্রকার : ছগিরা ( ছোট) গুণাহ এবং কবিরা (বড়) গুনাহ ৷ ছগিরা গুণাহ নানা প্রকার আমলের মাধ্যমে মাফ হয়ে যায় কিন্তু কবিরা গুনাহ মাফের জন্য একান্ত আন্তরিক অনুশোচনা বা তওবা জরুরী৷

তাওবা কি
যে কার্যক্রম পরিচালনার দ্বারা মানুষ গুনাহ হতে নাজাত প্রাপ্ত হয় তাহাই তাওবা ৷ অথ্যাত্‍ গোনাহের জন্য আল্লাহর নিকট আন্তরিক ভাবে লজ্জিত হয়ে পুনোরায় গোনাহ না করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়াকে তাওবা বলা হয়৷ মৃত্যুর পূর্ব মুহুত্ত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য তাওবা দরজা খোলা থাকে৷ " নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবা কারীকে ভালবাসেন ": সুরা বাকারা৷ আয়াত :----- আল্লাহ মুমিনদেরকেও তাওবা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন " হে মুমিনগন ! তোমরা সকলেই আল্লাহর কাছে তাওবা কর , যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার৷"
সুরা নুর আয়াত ২৪ : ৩১ রাসুলুল্লাহ (স:) বলেছেন " আমি প্রত্যহ সত্তর বারের অধিক আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও তাওবা করে থাকি৷
তাওবা করার নিয়মাবলী :
তাওবা করার পূর্বে কিছু আনুষ্ঠানিকতা করা উচিত্‍ যাতে নফস এবং শয়তানের আশাভংগ ঘটে৷
মানুষ গুনা করতে ভালবাসে, আর আল্লাহ তা'লা মানুষের গুনা মাফ করতে ভালবাসেন৷ তাই সব মুসলমানের উচিত্‍ হবে আল্লাহ'তালার এই সেফাতের উপর জুলুম না করা৷ তওবা করার দ্বারা অন্তরের প্রবিত্রতা হাসিল হয়৷ প্রধমে এখলাসের সাথে তাওবা করার নিয়্যাত করতে হবে৷ তাওবা করার জন্য দিন ও সময় নিধর্্যারন করে একটি নির্জন কক্ষ বা মসজিদ বা কোন উপযুক্ত স্থান বেছে নিতে হবে৷ গোসল করে পরিস্কার ও পাক কাপড় পরিধান করে দুই রাকাত করে চার রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিতে হবে৷ এবার তাশাহুদে বসার মত বসে সন্মুখে রক্ষিত পাত্র থেকে পবিত্র ধুলোমাটি মুখমন্ডলের সর্বত্র মাখবে ৷ চক্ষু দিয়ে পানি গড়াবে,অন্তরে লজ্জা,অনুতাপ ও দু:খের ভারে অস্থির থাকবে৷ কন্ঠস্বর বিষাদময় ও কম্পিত হয়ে পরবে৷ তখন একে একে পূর্বেকৃত পাপগুলোর কথা স্মরণ করে করে প্রত্যেক পাপের জন্য নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকবে৷
অতপর: নিজের আত্নাকে লক্ষ্য বলবে হে , আমার হৃদয় ! তোমার কি অনুতাপ করার সময় এখনো হয়নি ?
তুমি কি আল্লাহর দরবারে এখনো তওবা করবে না? আল্লাহ'তালার কঠোর শাস্তির মোকাবেলা করার শক্তি কি তোমার আছে ? এখনো কি তুমি আল্লাহ'তালাকে খুশী করা দরকার মনে কর না ? এভাবে অনুনয় বিনয় সহকারে অনেক বিলাপ ও রোনাজারী করতেই থাকবে৷
অতপর: রহমানুর রহীম আল্লাহ'তালার নিকট হস্তদ্বয় উত্তোলন করে বলতে থাকবে হে পরোয়ারদেগার !
তোমার পলাতক বান্দা আবার তোমার কাছে ফিরে এসেছে৷ পাপী ও দোষী ভৃত্য তোমার দরবারে এসে ক্ষমা চাইতেছে৷ তোমার পাপী বান্দা তোমার কাছে এই অজুহাত নিয়ে তোমার নিকট আরজু পেশ করতে সাহসী হয়ে এসেছে যে, হে প্রভু! তুমি অনন্ত অসীম দয়াময়৷ তোমার দয়াসমুহের বিন্দুমাত্র দান করে আমাকে মাফ করো৷ এ পাপীকে তোমার দয়ার ছায়ায় আশ্রয় দান করো৷ হে রব্বুল আ'লামীন ! তুমি আমার পর্ূেবকার সকল দোষ ত্রুটি মাফ করে দিয়ে আমার বাকী জিন্দেগীকে পাক-পবিত্র ও নিস্পাপ কর৷ হে দয়াময় ! যাবতীয় কল্যান ও মংগলের কুঞ্জী তোমারই হাতে৷ তুমিই তো শুধু অনুগ্রহ ও দান-দক্ষিনার কর্তা৷
অতপর: অন্তরের অন্তস্থল থেকে আল্লাহ'তালার দরবারে এই দোয়াটি করবে - হে সকল সমস্যা ও সংকট মোচনকারী মহান ত্রানকর্তা ! হে দু:খী অসহায় বান্দাদের আশ্রয়দানকারী ! হে সর্বশক্তিশালী আল্লাহ'তালা!
যার শুধু কুন (হয়ে যাও) বাক্য দ্বারা বড় বড় সৃষ্টি গুলি অস্তিত্ব প্রাপ্ত হয়৷ আমি গুণাহের গভীর সমুদ্রে নিমর্জিত৷ তুমিই শুধু আমাকে রক্ষা করতে পার৷ এ ভীষণ দু:সময়ে আমি তোমারই আশ্রয় প্রার্থী৷ হে সুমহান কর্তা! তুমি আমার তাওবা কে কবুল করো৷ তুমিই একমাত্র তাওবা কবুলকারী৷ আর তুমিই শুধু অনুগ্রহশীল ও অনুগ্রহকারী৷
অতপর: আরো অধিক পরিমানে কান্নাকাটি করে এভাবে দরখাস্ত পেশ করবে৷ হে সর্বজ্ঞাতা মহান আল্লাহ'তালা! তুমিই তো এমন কার্য বিধায়ক যে শত সহস্র কার্যও তোমাকে অন্য এক কার্য থেকে বিরত রাখে না৷ তুমি কোন হালতেই কোন কার্য হতে বেখবর নও৷ লাখো কোটি বাক্যও তোমাকে কোন লোকের বাক্য শ্রবণ করতে বাধা প্রদান করে না ৷ তুমি অসংখ্য প্রাথনাকারীর মধ্যেও একের প্রার্থনা অন্যের প্রার্থনার সাথে মিশ্রত কর না৷ বার বার প্রার্থনাকারীর প্রতি তুমি বিরক্ত হও না৷ হে মহান প্রভু ! তোমার অসংখ্য
গুনাবলীর উপর ভরসা করেই এহেন প্রার্থনা পেশ করছি৷ তুমি আমাকে ক্ষমা কর এবং তোমার দয়া লাভে ধণ্য কর৷ হে সুমহান সর্বশ্রেষ্ট দয়াময়৷ নিশ্চয়ই তুমি সর্বশক্তিমান, তুমি যা খুশি তাই করতে সক্ষম৷
এবার হুজুর (স:) ও তার তার আহাল পরিজন ও সাহাবী (রা) গনের প্রতি দুরুদ প্রেরন করে সকল মৃত মুমিন মুমিনাত ও মুসলমান ভাই বোনদের উপর ছোয়াব রেছানী করবে৷ আলোচিত বিষয় সমুহ সঠিক ভাবে আদায়ের পর এখন আপনার তওবাতুন্ন্সুহা পূর্ণ হলো৷ সাথে সাথে আল্লাহর বান্দা এরুপ বেগুনাহ হয়ে যাবে যেন এই মাত্র সে মাতৃ গর্ভ থেকে জন্ম গ্রহন করলো৷ পুনোরায় গুনাহ করার পূর্বেই যদি তার মৃতু্য হয়ে যায় তবে কাল কেয়ামতের দিন সে তার আমল নামায় কোন গুনাহ দেখতে পাবে না৷ এ এক অপূর্ব অনুভুতি, নিজেই অনুভব করা যাবে, অন্তর কলুষমুক্ত হালকা হয়ে গেছে এবং নেক আমলে মজা পাওয়া যাচেছ৷
তাওবা করে নেয়ার পর নিজেকে কবীরা গুনাহ থেকে সর্বদা পবিত্র রাখতে করনীয় :
কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হলে কবিরা গুনাহ সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানতে হবে৷
কবিরা গুনাহ কি ?
যে সকল কাজ আল্লাহ ও তার রসুল (সঃ) কতৃক হারাম হওয়ার অকাট্য দলীল পাওয়া যায় সে গুলিই কবিরা গুনাহ৷ অত্যন্ত গুরুতর কবিরা গুনাহ ৭ টি : তার দলীল হচেছ হুজুর (সঃ) বলেছেন " তোমরা ৭ টি পাপ থেকে বেঁচে থাক :
১/ আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করোনা ২/ যাদু টোনা বা কুফুরী কালাম করোনা ৩/ অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করোনা ৪/ ইয়াতীমের মাল আত্বসাত্‍ করোনা ৫/ সুদ খেওনা ৬/ যুদ্ধক্ষেএ থেকে পলায়ন করোনা ৭/ সতী সাধ্বী সরলমতি মুমিন নারীর উপর যিনার অপবাদ দিয়োনা ( বুখারী,মুসলিম)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন কবিরা গুনাহ ৭০ টি :

১/ শিরক করা ২/ মানুষ হত্যা করা ৩/ যাদু টোনা করা বা কবিরাজ দিয়ে যাদু করে অন্য মানুষকে কষ্ট দেওয়া বা স্বার্থ উদ্ধার করা ৪/ নামাজে অবহেলা করা ৫/ যাকাত না দেওয়া ৬/ সামর্থ থাকা সত্বেও হজ্জ না করা ৭/ বিনা ওযরে রমজানের রোজা ভংগ করা ৮/ পিতা মাতার অবাধ্য হওয়া ৯/ রক্ত সম্পকর্ীয় আত্বীযতা ছিন্ন করা ১০/ যিনা-ব্যভিচার করা ১১/ লাওয়াতাত বা সমকামিতা ১২/ সুদের আদান প্রদান ১৩/ ইয়াতিমের মাল আত্বসাত্‍ বা তার উপর জুলুম করা ১৪/ আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি মিধ্যারোপ করা ১৫/ জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা ১৬/ শাসক কতৃক জনগনের উপর জুলুম করা ১৭/ গর্ব অহংকার করা ১৮/ মদ্যপান বা নেশাখুরী করা ১৯/ মিধ্যা সাক্ষ্য দেয়া ২০/ জুয়া খেলা ২১/ সতী সাধ্বী সরলমতি মুমিন নারীর উপর যিনার অপবাদ দেয়া ২২/ সরকারী মাল বা সম্পদ আত্বসাত্‍ করা ২৩/ চুরি করা ২৪/ ডাকাতি করা ২৫/ মিধ্যা শপথ করা ও আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা ২৬/ যুলুম বা কারো উপর অত্যাচার করা
২৭/ জোর পূর্বক চাঁদা আদায় করা ২৮/ হারাম খাওয়া ও যে কোন হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও ভোগ দখল করা ২৯/ আত্বহত্যা করা ৩০/ কথায় কথায় মিধ্যা বলা ৩১/ বিচার কার্যে দুনর্ীতির আশ্রয় নেয়া ৩২/ ঘুষ খাওয়া ৩৩/ পোষাক-পরিচছদে নারী পুরুষের সাদৃশ্যপূর্ন বেশভুষা গ্রহন করা ৩৪/ নিজ পরিবারের মধ্যে অশ্লীলতা ও পাপাচার প্রশ্রয় দান করা ৩৫/ প্রস্রাব- পায়খানা থেকে সুন্নত তরিকায় পবিত্র না হওয়া ৩৬/ তালাক প্রাপ্তা মহিলাকে চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করা ৩৭/ রিয়া বা লোক দেখানোর জন্য সত্‍ কাজ করা ৩৮/ দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে ইলম অর্জন করা বা ইলম গোপন করা ৩৯/ আমানতের খেয়ানত করা ৪০/ দান - খয়রাতের খোটা দেয়া ৪১/ তকদিরকে অবিশ্বাস করা ৪২/ কান পেতে অন্য লোকের গোপন কথা শোনা ৪৩/ চোগলখুরি করা ৪৪/ বিনা অপরাধে কোন মুসলমানকে অভিশাপ ও গালি দেয়া ৪৫/ ওয়াদা খেলাপ করা ৪৬/ গনকের কথা বিশ্বাস করা ৪৭/ স্বামীর অবাধ্য হওয়া ৪৮/ প্রাণীর প্রতিকৃতি বা ছবি আঁকা ৪৯/ বিপদে উচ্চস্বরে বিলাপ করা ৫০/ বিদ্রোহ , দমভ ও অহংকার প্রকাশ করা ৫১/ দাস-দাসী,দুর্বল শ্রেণীর মানষ এবং জীবজন্তুর সাথে নিষ্ঠুর আচরন করা ৫২/ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া ৫৩/ মুসলমানদের কষ্ট দেয়া বা গালি দেয়া ৫৪/ আল্লাহর বান্দদের কষ্ট দেয়া ৫৫/ অহংকার ও গৌরব প্রকাশের জন্য পায়ের টাখনুর নীচে পোষাক পরা ৫৬/ পুরুষের স্বর্ণ ও রেশমী কাপড় পড়া ৫৭/মুনিবের কাছ থেকে গোলামের পলায়ন ৫৮/ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু পাখি যবেহ করা ৫৯/ যে পিতা নয়, তাকে জেনে শুনে পিতা বলে পরিচয় দেয়া ৬০/ বাদানুবাদ বা ঝগড়া করা ৬১/ প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অন্যকে না দেয়া ৬২/ মাপে ও ওজনে কম দেয়া ৬৩/ আল্লাহর আজাব ও গজব সম্পর্কে উদাসীন থাকা ৬৪/ আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া ৬৫/ বিনা ওযরে নামাজের জামা'য়াত ত্যাগ করা এবং একাকী নামাজ পড়া ৬৬/ ওযর ছাড়া জুম'আ এবং জা'মাআত ত্যাগ করার উপর অটল থাকা ৬৭/ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে শরীয়ত বিরোধী ওসিয়ত করা ৬৮/ ধোকাবাজি,ছলচাতুরী, প্রতারণা করে মানুষ ঠকানো ৬৯/ মুসলমানদের উপর গোয়েন্দাগিরী করা এবং তাদের গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেয়া ৭০/ সাহাবাদের কাউকে গালি দেয়া৷ সুএ [ কিতাবুল কাবায়ের - ইমাম শামসুদ্দীন বিন উসমান আয্-যাহাবী রহ: ]
কবিরা গুনাহ মাফ করানোর উপায়
শুধু মাত্র খালেস নিয়তে তওবা করে ক্ষমা প্রাধনা করলে আল্লাহ পাক কবিরা গুনাহ মাফ করে দিয়ে থাকেন৷ তবে ছগিরা গুনাহ বার বার করতে থাকলে তা আর ছগিরা থাকে না, কবিরা গুনাহর রুপ ধারণ করে৷
তৃতীয় অধ্যায়

ছয় নম্বর
হুজুরে পাক (সাঃ) এর সংস্পর্শে থেকে সাহাবা একরাম আজমাইন গন অনেক গুন বা সিফাত অর্জন করেছিলেন, এর মধ্য থেকে ছয়টি গুন সমস্ত সাহাবীদের মধ্যে পাওয়া যায় ৷ এই ছয়টি গুন মেহনত করে হাসিল করতে পারলে দ্বীনের উপর চলা যে কোন মানুষের জন্য সহজ হয়ে যায়৷
এই ছয়টি গুন হলো ঃ-
কালেমা
নামাজ
এলেম ও জিকির
একরামুল মুসলিমিন
তাসহীয়ে নিয়্যাত
দাওয়াতে তাবলীগ
কালেমা
" লা.... ইলাহা ইল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ " এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই - হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত বান্দা ও রাসুল৷ কালেমার উদ্দেশ্য ঃ-
এই কালেমার উদ্দেশ্য হচ্ছে মাখলুক থেকে না হওয়ার একিন এবং আল্লাহ থেকে হওয়ার একিন অন্তরে পয়দা করা ৷ কোন তরীকায় শান্তি ও কামিয়াবী নেই, একমাত্র হুজুর পাক (সাঃ) এর তরিকায় দুনিয়া এবং আখেরাতে শান্তি ও কামিয়াবী ৷
কালেমার ফযিলত ঃ-
এই কালেমার ফযিলত হচ্ছে যে ব্যক্তি এখলাছের সহিত এই কালেমা দৈনিক একশত বার পড়বে, কেয়ামতের দিন আল্লাহপাক তাকে পূর্নিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল করে উঠাবেন ৷
এই কালেমা এর গুন হাসিলের তরিকা ঃ-
(ক) দাওয়াত ঃ এই কালেমার ফজিলত জানিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে দাওয়াত দেয়া ৷
(খ) দোয়া ঃ- এই কালেমার হাকিকত অন্তরে পয়দা করার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা ৷
(গ) মস্ক ঃ- এই কালিমা নিজে বেশী বেশী করে পড়া ও এই কালেমার মসক করার জন্য আল্লাহ পাকের সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করা৷ যেমন : আল্লাহপাক আমাকে আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন৷ খুঁটি ছাড়া আছমান দাঁড় করিয়ে রেখেছেন৷ পাহাড়, চন্দ্র সূর্য, নক্ষএ এবং আঠারো হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন ৷ দুনিয়ার কোন মানুষের চেহারার সাথে অন্য মানুষের চেহারার কোন, মিল নেই ইত্যাদি ৷
নামাজ

নামাজের উদ্দেশ্য ঃ- নামাজের উদ্দেশ্য হচ্ছে নামাজের বাইরের জিন্দেগী নামাজের সিফাতে কাটানোর এক যোগ্যতা নিজের মধ্যে পয়েদা করা ৷ অথ্যাত্‍ নামাজের ভিতরে যেমন আমরা কোন গুনাহের কাজ করি না, তেমনি নামাজের বাহিরেও আমরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার যোগ্যতা অর্জন করি৷
নামাজের ফযীলত ঃ-
(ক) হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ পাক বলেন "যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মত ঠিক ঠিক ভাবে আদায় করবে, তাকে আমি আমার নিজের জিম্মায় জান্নাতে প্রবেশ করাইব "৷
(খ) হুজুরে পাক (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি এহতেমামের সহিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সহিত গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে আল্লাহ পাক তাকে পাঁচটি পুরষ্কার দিবেন৷
১/ দুনিয়াতে তার রিযিকের সংকর্ীন্যতা দূর করে দিবেন
২/ মৃত্যুর পর তার কবরের আযাব মাফ করে দিবেন
৩/ কিয়ামতের দিন তার আমলনামা ডান হাতে দিবেন
৪/ সেই ব্যক্তি পুলসিরাতের উপর দিয়ে বিজলির গতিতে পার হয়ে যাবে
৫/ আল্লাহ পাক তাকে বিনা হিসাবে জান্নাতে দাখিল করবেন ৷
নামায হাসিলের তরিকা ঃ-
(ক) দাওয়াত ঃ- নামাযের লাভ ও ফজিলত জানাইয়া অন্যকে দাওয়াত দেওয়া ৷
(খ) দোয়া ঃ- হুজুরে পাক (সাঃ) ও সাহাবা একরাম যেভাবে নামায আদায় করেছেন সেই ভাবে নামায আদায় করার তৌফিক দেওয়ার জন্য আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করা ৷
(গ) মসক ঃ- ফরজ নামাজ জামাতের সাথে পড়া, ওয়াজিব, সুন্নত নামাযের পায়বন্দি করা এবং নফল নামায বেশি করে পড়া, সম্ভব হলে প্রত্যেক দিন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া, আর উমরি কাজা নামাজ গুলি খুঁজে খুঁজে আদায় করা ৷
এলেম ও জিকির
এলেমের উদ্দেশ্য ঃ- আল্লাহপাকের কখন কি হুকুম তা সঠিকভাবে জেনে হুজুরে পাক (সাঃ) এর তরিকায়
আদায় করা ৷
এলেমের ফযীলত:-
যে ব্যক্তি এলেম শিখার জন্য ঘর হইতে বাহির হয় এবং যে কোন পন্থা অবলম্বন করে আল্লাহপাক তার জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন তার চলার পথে ফেরেস্তাগন নুরের পড় বিছিয়ে দেন, সমস্ত মাখলুক তার জন্য দোয়া করতে থাকে ৷
এলেম হাছীলের তরিকা ঃ-
(ক) দাওয়াত ঃ- এলেম অর্জনের লাভ জানাইয়া অন্যকে দাওয়াত দেওয়া ৷
(খ) দোয়া ঃ- যে এলেম শিখলে আল্লাহ পাক রাজি ও খুশি হন সেই এলেম শেখার তৌফিক লাভের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা৷
(গ) মসক ঃ- এলেম দুই প্রকার
১/ ফাজায়েলে এলেম ঃ- তালিমের হালকায় বসে ফাজায়েলে এলেম শিক্ষা করি ৷
২/ মাসায়েলে এলেম ঃ- হাক্কানী এলেমের কাছ থেকে মাসায়েল এলেম জেনে নিই ৷

জিকির
জিকিরের উদ্দেশ্য ঃ- হর হালতে আল্লাহর ধ্যান খেয়াল অন্তরে পয়দা রাখা ৷
জকিরের ফজিলত ঃ-
ক) যে দিলে জিকির আছে, সেই দিল জিন্দা, যে দিলে জিকির নাই, সেই দিল মুর্দা
(খ) যে ব্যক্তি আল্লাহর জিকির দ্বারা তার জিহবাকে তরুতাজা রাখিবে কাল কেয়ামতের দিন সে হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করিবে
জিকির এর গুন হাসিলের তরিকা ঃ-
(ক) দাওয়াত ঃ- জিকির করার লাভ জানাইয়া অন্যকে দাওয়াত দেওয়া ৷
(খ) দোয়া :- হে আল্লাহ আপনি আমাকে ও সকল উম্মতে মুহাম্মাদীকে জিকিরের গুন দান করুন৷
যে ভাবে জিকির করলে আল্লাহ পাক রাজি ও খুশী হন সে ভাবে জিকির করার তৈফিক
পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা৷
(গ) মস্ক ঃ- সকাল বিকাল তিন তসবীহ আদায় করা, আর মসনুন দোয়া গুলি যথাস্থানে যথাসময়ে আদায়
করা ৷ প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াত করা৷
একরামুল মুসলিমিন
একরামুল মুসলিমিনের উদ্দেশ্য হচেছ ঃ-
নিজের হককে দাবিয়ে রেখে অপরের হককে আগে আদায় করে দেওয়া এবং মুসলমানের চাহিদা অনুযায়ী তার ক্বদর করা৷
একরামুল মুসলিমিনের ফজিলত ঃ-
(ক) শুধুমাত্র আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য যে ব্যক্তি অন্য মুসলমানের উপকার করার জন্য রওনা হয় আল্লাহপাক তাকে দশ বছরের এতেকাফের সওয়াব দেন
একরামুল মুসলিমিনের গুন হাসিলের তরীকা ঃ-
(ক) দাওয়াত ঃ- একরাম করার ফযীলত জানাইয়া অন্য ভাইকে দাওয়াত দেওয়া ৷
(খ) দোয়া :- যে ভাবে একরাম করলে আল্লাহপাক রাজি খুশি হন সেই ভাবে একরাম করার তৌফিক
আমাকে দেন এবং অন্য মুসলমানকেও দেন এ জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা৷
(গ) মস্ক ঃ- আমি নিজে বেশি বেশি করে একরাম করব ৷ বড়দের সম্মান করব, ছোটদের স্নেহ করব এবং
আলেমদের তাযীম করব ৷

এখলাসে নিয়্যাত
এখলাসে নিয়্যাতের উদ্দেশ্য ঃ-
শুধু মাত্র আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য সমস্ত আমল সম্পাদন করা ৷
এখলাসে নিয়্যাতের ফজিলত ঃ-
(ক) আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য সামান্য আমলেই নাজাতের জন্য যথেষ্ট ৷
এখলাসে নিয়্যাত হাসিলের তরীকা ঃ-
(ক) দাওয়াত ঃ- সহী নিয়্যাতের ফযীলত জানাইয়া অন্যকে দাওয়াত দেওয়া ৷
(খ) দোয়া ঃ- সব আমল যাতে আল্লাহর জন্য হয় সেই তৌফিক যেন আমাকে দেন ও অন্য মুসলমান
ভাইকেও দেন এই জন্য দোয়া করা ্
(গ) মস্ক ঃ- যে কোন আমলের প্রথমে, মাঝখানে এবং শেষে নিয়্যাতকে যাচাই করা, নিয়্যাত সহী না
হলে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে পুনরায় নিয়্যাত করা

দাওয়াতে তাবলীগ
দাওয়াতে তাবলীগের উদ্দেশ্য ঃ-
আল্লাহর আহকামাত এবং হুজুর (দ:) এর তরিকার উপর নিজে আমল করনেওয়ালা বনে যাই এবং এর দাওয়াত দেনেওয়ালা বনে যাই৷
দাওয়াতে তাবলীগের ফজিলত ঃ-
(ক) যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে নিজ প্রয়োজনে এক টাকা খরচ করে , তাকে সাতলক্ষ টাকা দান
করার সওয়াব দেয়া হয় এবং একটা আমল করলে তার নেকী উনপঞ্চাশ কোটি গুন পর্যন্ত বাড়িয়ে
দেওয়া হয়৷
খ) দাওয়াত দওয়ার জন্য ব্যবহৃত প্রত্যেকটি বাক্যের বিনিময়ে তাকে এক বছরের নফল এবাদতের
নেকী দেওয়া হয়৷
দাওয়াতে তাবলীগের গুন হাসিলের তরিকা ঃ-

(ক) দাওয়াত ঃ-
আল্লাহর রাস্তায় বের হলে কি ফায়দা হতে থাকে, তা জানিয়ে সব মুসলমানদের দাওয়াত দেয়া ৷
(খ) দোয়া ঃ-
সাহাবা একরাম আজমাইন গন যে ভাবে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছেন এবং যে ভাবে আল্লাওয়ালা মেহনত করেছেন, সেই ভাবে মেহনত করার তৈফিক লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা৷
(গ) দাওয়াতে তাবলীগের মসক ঃ-
আল্লাহর দেয়া জান, মাল এবং সময় নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে, জান মাল সময়ের সহী এস্তেমাল শিক্ষা করা এবং সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে দ্বীনের মেহনত কে হুজুরে পাক (স:) এর তরিকায় চালু করা ৷ এজন্য জীবনের প্রথম সুযোগে ১২০ দিন বা ৩ চিল্লা দিয়ে দাওয়াতের মেহনত কিভাবে করতে হয় তা হাতে কলমে শিক্ষা করা৷ এরপর প্রতি বছর কম পক্ষে ৪০ দিন বা ১ চিল্লা দেয়া এবং সর্বদা পাঁচ কাজের এহতেমাম অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে করা ৷

কিভাবে আপনি আপনার নামাজের মান উন্নত করবেন ?

নামাজ দ্বীন ইসলামের স্তম্ভ৷ বিশ্বাসের দলিল,পূন্য কাজের মূল এবং সর্বোত্তম এবাদত৷ নামাজের বাহ্যিক ক্রিয়াকর্ম বাহির থেকে দেখা যায়৷ কিন্তু নামাজের অভ্যন্তরীন রহস্য শুধু আল্লাহপাক দেখেন আর তা হচেছ নামাজে খুশুখুজু এবং এখলাস ৷ নামাজের মধ্যে মন, মগজকে আল্লাহ তা'লার ধ্যান মূখী এবং শরীরকে স্থির রাখতে পারা হচেছ নামাজের মান উন্নয়নের পূর্ব শর্ত৷ অর্থ্যাত্‍ নামাজরত অবস্থায় আমার মনে ও মগজে কোন দুনিয়াবী কিংবা কোন দ্বীনি চিন্তা ভাবনা আসতে না পারে৷ যখন কোন ব্যাক্তি নামাজ পড়তে শুরু করে, শয়তান তখন তার মনের মধ্যে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওয়াসওয়াসা দিতে আরম্ভ করে যে তত্‍ক্ষনাত তার মগজ বা ব্রেইন তা নিয়ে ভাবতে শুরু করে, ফলে তার নামাজে আল্লাহ মূখী ধ্যান নষ্ট হয়ে যায়৷ আল্লাহ তা'লা তখন এই ব্যাক্তির উপর থেকে তার মনোযোগ সরিয়ে নেন৷ এই নামাজটি তখন একটি প্রাণহীন নামাজে পরিণত হয়৷

এজন্য বিশেষ আমল দ্বারা কলব বা অন্তরকে শয়তান প্রতিরোধ্য করে নেয়া উচিত্‍, যাতে নামাজের নিয়ত্‍ বাধার পর মন, মগজ এবং শরীর স্থির থাকা অবস্থায় নামাজ শেষ হয়ে যায়৷ ফরজ, ওয়াজেব ,সুন্নত এবং নফল- এই একেকটি নামাজে সময় লাগে মাত্র ৫ থেকে ৭ মিনিট৷ এই অল্প সময় ধরে নামাজে আল্লাহমূখী ধ্যান বজায় রাখতে না পারা খুবই দুভাগ্যের বিষয়৷ নামাজরত অবস্থায়ই হযরত আলী (রা:) এর উরুতে বিদ্ধ হওয়া তীর খোলা সম্ভব হয়েছিল, এটা ভাবলে নামাজে আল্লাহ মূখী ধ্যান কি জিনিস তা অনুভব যায়৷ হুজুর (স:) বলেন " আল্ল্াহ এমন নামাজের দিকে তাকাবেন না,যে নামাজে মানুষ তার অন্তরকে দেহসহ উপস্থিত না রাখে" তিনি আরো বলেন " যে ব্যাক্তি দু'রাকাত নামাজ পড়ে এবং তাতে দুনিয়ার কোন কথা মনে মনে না বলে, তার পূর্ববতর্ী সকল গুনাহ মাফ করা হবে৷" আল্লাহ পাক বলেন " আমার স্মরনের জন্য নামাজ কায়েম কর" সুরা------- আয়াত ------এই আয়াত থেকে বুঝা যায় নামাজে অন্তরের উপস্থিতি ওয়াজেব৷ নামাজে গাফেল থাকা স্বরনের বিপরীত৷ যে ব্যাক্তি সমগ্র নামাজে গাফেল থাকে, সে আল্লাহর স্বরনের জন্য নামাজ কায়েমকারী কি রুপে হবে ? আল্লাহ আবার বলেন " গাফেলদের অন্তভর্ুক্ত হয়ো না" সুরা------ আয়াত ------- এখানে নিষেধ পদবাচ্য ব্যাবহৃত হয়েছে, অথ্যাত্‍ গাফেল হওয়া হারাম৷ গাফেল ব্যাক্তির নামাজ, তার অশ্লীল ও মন্দ কাজ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয় না৷ এজন্যই অনেক নামাজী ব্যাক্তিকে অশ্লীল ও মন্দ কাজে লিপ্ত হতে দেখা যায়৷
নামাজে আল্লাহ মূখী ধ্যান ধরে রাখার উপায় :
নামাজে আল্লাহ মূখী ধ্যান ধরে রাখার সর্বোত্তম উপায় হচেছ এব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা৷ আরো কয়েকটি উপায়ের মধ্যে রয়েছে :
ক) নামাজে দ্বাড়িয়েই চিন্তা করা, এই নামাজটি আমার হায়াতে জিন্দেগীতে আর কোন দিন ফিরে আসবেনা ৷ এতএব নামাজটি সর্বোত্তম ভাবে শেষ করাই হবে এই সুযোগের প্রকৃত সদ্বব্যাবহার৷
খ) আমি যতক্ষন নামজরত অবস্থায় থাকছি, ঠিক ততক্ষন আল্লাহ তা'লা আমাকে দেখছেন৷ এতএব আমি কিভাবে এই নস্বর দুনিয়ার কোন বিষয় নিয়ে নামাজের মধ্যে ভাবতে পারি ?
গ) নামাজ শুরু করার পূর্বে কোন রাকাতে কোন সুরা পড়বো তা ঠিক করে নেয়া এবং এটা মনে করা যে
এই নামাজের দ্বারা আমার জন্য জান্নাত তৈরী হচেছ, অতএব আমি আমার নিজের জান্নাত তৈরীতে কেন বাঁধা দেব ? কবরে এই নামাজ আমার জন্য নূর হবে ৷ অতএব আমি কিভাবে আমার কবরের নূর তৈরীতে অসহযোগীতা করতে পারি ?
ঘ) নামাজের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমা বলে হাত বাধার পর ছানা পড়ে প্রথমেই পড়তে হবে "আ'য়ুজুবিল্লাহে ------ রজীম" অথ্যাত্‍ বিতারিত শয়তানের -----পানা চাহিতেছি" তারপর বিসমিল্লাহীর ------রহীম বলার পর সুরা ফতেহা পড়া শুরু করতে হবে৷ সমগ্র নামাজ শেষ করতে হবে ধীর স্থির ভাবে , কোন রকম তাড়াহুড়ো করা যাবে না৷ একটু সতর্কতা অবলম্বন করলেই নামাজে আল্লাহমূখী ধ্যান ধরে রাখার অভ্যাস গড়ে উঠবে৷ একটু সতর্ক থাকলেই এটা সম্ভব হয়ে উঠবে৷
আসলে, নামাজে আল্লাহ মূখী ধ্যাণ কতটা গভীর হবে তা নির্ভর করে দ্বীল বা অন্তরের পরহেজগারীর উপর৷ দ্বীলের পরহেজগারীর ঘনত্ব নির্ভর করে যাবতীয় পাপ থেকে দুরে থাকার দক্ষতার উপর৷ তাহাজ্জুদের নামাজ দ্বারা অন্তরের পরহেজগারী বাড়তে থাকে এবং আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়৷ এখানে গুনাহ থেকে সর্বদা পবিত্র থাকতে পারাটাই হচেছ আসল ৷
আমাদের নামাজের মধ্যে কোন ভূল বা সুন্নতের খেলাপ কিছু রয়েছে কিনা তা যাচাই করা দরকার আর সেরুপ কিছু থাকলে তার কি সংশোধনী কি হবে ? প্রথমে নামাজে ফরজ, ওয়াজেব এবং নামাজ ভংগের কারন গুলি কি তাহা দেখা যাক৷
নামাজের ফরয ১৩ টি [৭ টি নামাজের বাহিরে ]
১/ শরীর পাক ২/কাপড় পাক ৩/ নামাজের জায়গা পাক ৪/ সতর ডাকা ৫/ কেবলামুখী হওয়া
৬/ নামাজের ওয়াক্ত চেনা ৭/ নিয়্যাত করা
[ ৬ টি নামাজের ভিতরে ]
১/ তাকবীরে তাহরিমা বা আল্লাহু আকবার বলা ২/ দাঁড়াইয়া নামাজ পড়া ৩/ কেরাত পড়া ৪/ রুকু করা
৫/ সেজদা করা ৬/ শেষ বৈঠক

নামাজের ওয়াজিব ১৪টি

১/ সুরা ফাতিহা পড়া
২/ সুরা ফাতেহার সঙ্গে সুরা মিলানো
৩/ রুকু ও সেজদায় দেরী করা
৪/ রুকু হইতে সোজা হইয়া দাঁড়ানো
৫/ দুই সেজদার মাঝখানে সোজা হইয়া বসা
৬/ দরমিয়ানী বৈঠক
৭/ দুই বৈঠকে আত্ত্যাহিয়াতু পড়া
৮/ ঈমামের জন্য কেরাত আস্তের জায়গায় আস্তে পড়া এবং জোড়ের জায়গায় জোড়ে পড়া
৯/ বিতিরের নামাজে দোয়া কুনুত পড়া
১০/ দুই ঈদের নামাজে ছয় তকবীর বলা ৷
১১/ ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাত কেরাতের জন্য নির্ধারিত করা ৷
১২/ প্রত্যেক রাকাতের ফরজ গুলির তরতীব ঠিক রাখা ৷
১৩/ প্রত্যেক রাকাতের ওয়াজিব গুলির তরতীব ঠিক রাখা ৷
১৪/ আস্আলামু আ'লাইকুম ও'রাহ...বলিয়া নামাজ শেষ করা

১৯টি কারণে নামাজ ভঙ্গ হয়ে থাকে

১/ নামাজে অশুদ্ধ কোরআন পড়া ৷
২/ নামাজের ভিতর কথা বলা ৷
৩/ নামাজের ভিতর কাউকে সালাম দেওয়া
৪/ নামাজের ভিতর সালামের উত্তর দেওয়া
৫/ নামাজের মধ্যে বিনা ওজরে কাশি দেওয়া
৬/ নামাজের ভিতরে ওহ্ আহ্ শব্দ করা
৭/ নামাজের মধ্যে আমলে কাছির করা ( মোক্তাদি হয়ে ঈমামকে অনুসরন না করা)
৮/ নামাজের মধ্যে বিপদে ও বেদনায় শব্দ করা
৯/ নামাজের মধ্যে তিন তজবী পরিমান সতর খুলিয়া রাখা
১০/ মোক্তাতী ব্যতীত অপর ব্যক্তির লোকমা লওয়া
১১/ সুসংবাদ ও দুঃসংবাদের উত্তর দেওয়া
১২/ নাপাক জায়গায় সেজদা করা
১৩/ কেবলার দিক হইতে সীনা ঘুরিয়া যাওয়া
১৪/ নামাজের মধ্যে কোরআন শরীফ দেখিয়া পড়া
১৫/ নামাজের মধ্যে শব্দ করিয়া হাসা ৷
১৬/ নামাজের মধ্যে সাংসারিক বা দুনিয়াবী প্রার্থনা করা
১৭/ নামাজের মধ্যে হাচির উত্তর দেওয়া
১৮/ নামাজের মধ্যে খাওয়া ও পান করা
১৯/ ঈমামের আগে মুত্তাতীর নামাজে দাঁড়ানো

নামাজের মধ্যে যে সব ভূল আমরা সচরাচর করে থাকি সেগুলির সংশোধন কল্পে করনীয় :

নিয়্যাতের ক্ষেত্রে আমাদের ভূল :
ভূল :
ক) অনেকে এমন আছেন যারা নিয়্যাতের শব্দ গুলি মুখে উচ্চরন করেন কিন্তু অন্তরে সংকল্প করেন না৷ আবার অনেকে নিয়্যাতের শব্দ গুলি মুখে উচ্চরন করেন না, অন্তরেও কোন সংকল্প করেন না , শুধু হাত তুলে পেটের উপড় হাত বাঁধেন৷ এই উভয় শ্রেনীর কারোই নামাজ হবে না
সংশোধনী :
নিয়্যাত হলো অন্তরের দৃঢ় সংকল্প৷ নিয়্যাতের সময় অন্তরের কথা গুলি মুখে উচ্চরণ করা
মুস্তাহাব৷ নামাজের শুরুতে নিয়্যাতের বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে এবং নিয়্যাত আরবী ভাষায় উচ্চরণ সম্ভব না হলে নিজ মাতৃভাষায় নিয়্যাত করলেও কোন সমস্যা নেই৷
তাকবীরে তাহরীমার ক্ষেত্রে আমাদের ভূল সমূহ :
ভূল :
ক) কেউ যদি তাকবীরে তাহরীমা ইমামের আগে শুরূ করে ইমামের সাথে বা পরে শেষ করেন অথবা ইমামের সাথে শুরূ করে ইমামের আগে শেষ করেন তবে তার নামাজ হবে না৷
সংশোধনী :
মুক্তাদীকে অবশ্যই ইমামের তাকবীরে তাহরীমা অথ্যাত্‍ আল্লাহু আকবার শব্দ শেষ করার পর তাকবীরে তাহরীমা বলতে হবে৷ এছাড়া তাকবীরে তাহরীমা বলার পূর্বে হাত কান পর্যন্ত উঠানো এবং তারপর তাকবীর বলে সরাসরি হাত বেঁধে ফেলতে হবে৷ ( দুই হাত নীচে নামিয়ে সোজা করে আবার হাত উঠিয়ে বাঁধা যাবে না৷ অথবা দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরা বা কানের মধ্যে আংগুল ঢোকানো যাবে না৷ )
ভূল :
খ) কেউ যদি তাকবীরে তাহরীমা বলতে গিয়ে আল্লাহ শব্দের হামজা এবং আকবার শব্দের হামজা দীর্ঘ করে, তবে তার নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে৷ কারন এ সময় এটি প্রশ্নবোধকে পরিনত হয়ে যায়৷
সংশোধনী :
তাকবীরে তাহরীমা সহজ স্বাভাবিক ভাবে বলতে হবে এবং মাথা সোজা রাখতে হবে৷
ভূল :
গ) কেউ যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় এবং রাকাত ধরতে গিয়ে তাকবীরে তাহরীমা সহযোগে
ঝুকতে ঝুকতে তাকবীর বলে অথ্যাত্‍ তার উচ্চারিত আল্লাহ শব্দ দ্বাড়ানো অবস্থায় আর আকবার
শব্দ টি রুকুর মধ্যে গিয়ে পরে, তাহলে সেই নামাজ সহি হবেনা, দোহরিয়ে পড়তে হবে৷
সংশোধনী :
দ্বাড়ানো অবস্থায় তাকবীরে তাহরীমা বলা ফরজ৷ তাই প্রথমেই আল্লাহু আকবার বলে হাত বেধে নিয়ে সোজা হয়ে দ্বাড়ানো ৷ এরপর আবার আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যাওয়া৷ রাকাত পাওয়া না পাওয়া নিয়ে অস্থির হওয়া যাবে না৷ দৌড়ে গিয়ে জামাতের নামাজে শরিক হওয়া ঠিক নহে৷ যেতে হবে স্বাভাবিক ভাবে৷
নামাজে কিয়াম সমর্্পিকত আমাদের ভূল সমূহ
ভূল :
ক) যদি কোন মুসল্লী নামাজে এক পায়ের উপর ভর দিয়ে আরামে দ্বাড়ায়, তবে তা নামাজের
প্রতি অবহেলা প্রমান করে যা সুন্নতের পরিপন্থী ৷
সংশোধনী :
বিনা ওজরে এরুপ করা বেয়াদবী ৷ নামাজের মধ্যে দুই পায়ের উপর ভর করে সোজা হয়ে দ্বাড়ানো সুন্নত ৷
ভূল :
খ) যদি মুসল্লীরা নামাজের কাতারে আগে পিছে দ্বাড়িয়ে কাতার অাঁকাবাঁকা করেন তবে তাহলে ওয়াজিব খেলাপের গুণা হবে৷
সংশোধনী :
প্রত্যেক নামাজী নিজের পায়ের টাকনু , উভয় পাশের মুসল্লীর টাকনু বরাবর রাখেন এবং নিজেরকাঁধ অপরের কাঁধের সাথে মিলিয়ে দ্বাড়ালে, কাতার নিখুত ভাবে সোজা হয় আর এটাই কাতার সোজা করার সুন্নত তরিকা৷
ভূল :
গ) যদি কোন নামাজী মনে করেন ইমামের সাথে নামাজ পড়লে ছানা পড়তে হয় না, ক্বেরাতের মত ছানা পড়াও ইমামের দ্বায়িত্ব৷
সংশোধনী :
নামাজী ইমাম হোক,অথবা মোক্তাদী, কিংবা একাকী৷ তাকবীরে তাহরীমা বলার পর হাত বেধে সানা পড়া সুন্নতে মুআক্কাদা৷ তবে ইমামের জোড়ে কেরাত পড়া শুরু হয়ে গেলে সানা পড়বে না৷
ভূল :
ঘ) অনেক মুসল্লীকে দেখা যায় নামাজে দ্বাড়ানো অবস্থায় মাথাকে কোন একদিকে ঝুকিয়ে রাখেন৷ এটা সুন্নতের খেলাপ৷
সংশোধনী :
নামাজে দ্বাড়ানো অবস্থায় মাথাকে সাভাবিক ও সোজা রেখে নজর সেজদার স্থানে রাখা সুন্নত৷

নামাজে কি্বরাত সমর্্পিকত আমাদের ভূল সমূহ
ভূল :
ক) অনেকে ইমামের পিছনে বিড়বিড় করে সুরা ফাতেহা বা অন্য কিছু পড়তে থাকেন৷
সংশোধনী :
ইমামের কি্বরাতই মুক্তাদির কি্বরাত৷তাই ইমামের কি্বরাত পড়া কালীন সময়ে কিছু পড়া নিষেধ৷আল্লহ তা'লা সুরা আরাফে বলেন " কোরআন শরীফ যখন পাঠ করা হয়, তোমরা মনোযোগসহ চুপ করে তা শুনো৷ অবশ্যই ওই সময়ে তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত হবে৷"
ভূল :
খ) কেউ যদি মনে করেন যে নামাজে কি্বরাত মনে মনে পড়লে কি্বরাত আদায় হয়ে যায়৷ এটা ভূল
সংশোধনী :
নামাজে কি্বরাত মনে মনে পড়লে নামাজ আদায় হবে না৷ কারণ নামাজের তৃতীয় ফরজ হলো হরফ সমূহকে মুখে বিশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করে কি্বরাত পড়া যা আস্তে হলেও যেন নিজের কানে শুনা যায়৷
ভূল :
গ) কোন মুসল্লী যদি তার নামাজে সুরা কি্বরাত তসবিহ তাহলীল এত দ্রুত গড়ে যে হরফ,হরকত মদ ইত্যাদি পরিবর্তন হয, কিংবা বাদ পড়ে যায়৷ এতে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে৷
সংশোধনী :
কি্বরাত পাঠের নিয়ম হচেছ এমন সতর্কভাবে উচ্চারণ করে পড়া যাতে প্রতিটি হরফ,হরকত ও মদ সঠিকভাবে নিজ নিজ মাখরাজ থেকে সুস্পষ্টভাবে আদায় হয়৷
নামাজে রুকু সংক্রন্ত বিষয়ে আমাদের ভূল সমূহ
ভূল :
ক) অনেককে দেখা যায় রুকুতে পুরো ঝুকেন না বা রুকুতে গিয়ে বিলম্ব করেন না, রুকুতে যাওয়া মাত্রই উঠে যান৷ রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে না দ্বাড়িয়েই আবার সেজদায় চলে যান৷
সংশোধনী :
রুকুতে যাওয়ার সঠিক নিয়ম হচেছ একজন মানুষ সামনের দিকে এ-পরিমান ঝুকবে যে তার হাত ছেড়ে দিলে উভয় হাতের তালু , হাটু পর্যন্ত পৌছে৷ আর রুকুতে গিয়ে এক তসবিহ পরিমান দেরী করা ওয়াজেব এবং তিন বার তসবিহ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা আর রুকু থেকে উঠে এক তসবিহ পরিমান স্থির হয়ে দ্বাড়িয়ে থাকা ওয়াজেব৷ রুকু সমাপ্ত করে সোজা হয়ে দ্বাড়ানোকে ক্বওমা বলে৷
ভূল :
খ) অনেকে ক্বওমা সমাপ্ত করার পর সিজদায় যাওয়ার সময় সামনের দিকে রুকুর মত মাথা সামনের দিকে ঝুকিয়ে যেতে থাকেন৷ বিনা ওজরে এটা করা মারাত্নক ভূল৷ কারণ এতে রুকু দুই বার হয়ে যায়৷
সংশোধনী :
কওমা থেকে সিজদায় যাওয়ার সময় সম্পুর্ন দেহ সোজা রেখে নীচের দিক থেকে প্রথমে হাটু তারপর কোমর এবং তারপর পিঠ ও কাঁধ সামনের দিকে ভাঁজ করে সিজদায় যাবে৷ সিজদায় প্রথমে নাক তারপর কপাল মেঝে স্পর্শ করবে৷ ঠিক একই প্রক্রিয়ায় সিজদাহ থেকে উঠে দ্বাড়াবে বা বসবে৷
নামাজে সিজদাহ সংক্রন্ত বিষয়ে আমাদের ভূল সমূহ
ভূল :
ক) অনেকে সিজদায় গিয়েই উঠে যান এবং দুই সিজদার মাঝে মোটেই দেরী করতে চান না৷
অনেকে আবার সিজদায় গিয়ে তজবিহ অত্যন্ত দ্রুত পড়েন এবং ডান কিংবা বাম কাঁধ জমিনের দিকে ঝুকিয়ে রাখেন৷
সংশোধনী :
এতে সিজদার ফরজ আদায় হলেও ওয়াজেব,সুন্নত আদায় হবে না৷ ইচছাকৃত ভাবে এরুপ করলে নামাজ নষ্ট হবে, তবে অনিচছাকৃত হলে সাহু সিজদাহ করতে হবে৷ রুকু সিজদায় এক
তসবিহ পরিমান শরীর স্থির রাখা ওয়াজেব৷ সিজদায় তিন বার সঠিক উচ্চারণে তজবিহ পড়া সুন্নত এবং উভয় কাঁধকে কোন দিকে না ঝুকিয়ে সোজা স্বাভাবিক রাখতে হবে৷
সিজদাহ করার সঠিক নিয়ম :
প্রথমে হাটু তারপর উভয় হাত, তারপর উভয় হাতের তালু বরাবর মাটিতে প্রথমে নাক তারপর কপাল রাখবে৷ [পুরুষ] পেটের উভয় পাশ খোলা এবং উরু থেকে পেট দুরে রাখবে৷ আসলে পায়ের আঙ্গুল, হাটু, হাতের তালু , নাক ও কপাল সঠিক ভাবে জমীনে রাখার নাম হচেছ সিজদাহ৷
ভূল :
প্যান্ট পরিধান করা অবস্থায় যারা নামাজ পড়েন তাদের রুকু শেষে সিজদায় যাওয়ার পূর্বে দুই হাত দিয়ে প্যান্ট উচু কওে টেনে ধরার বিষয়টি নামাজের ক্ষতির কারন হয়৷
সংশোধনী :
আলেমগন বলেন, নামাজরত অবস্থায় দুই হাত একত্রে ব্যবহার করলে তা আমলে কাছির হবে অথ্যাত্‍ নামাজ ভংগ হয়ে যাবে৷ এতএব প্যান্ট বা ট্রাউজার রেডিমেইড না কিনে দর্জি দিয়ে ঢোলা করে বানাতে হবে, যাতে রুকু থেকে সেজদায় যাওয়ার সময় উহা আপনা আপনি উপরে উঠে যাবে৷ প্যান্ট বা ট্রাউজার এর নীচের অংশ টাকনু গিরার উপরে থাকবে৷
ভূল :
খ) অনেকে সিজদার পর বসা অবস্থায় ডান পা বিছিয়ে রাখেন৷ কেউ আবার ডান পা খাঁড়া না রেখে বাঁকা করে রাখেন৷
সংশোধনী :
এবিষয়ে সুন্নত তরিকা হচেছ বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসবে এবং ডান পায়ের আঙ্গুল সমূহকে কবলামুখী করে রাখবে৷
নামাজে প্রথম বৈঠকে আমাদের ভূল
ভূল:
ক) অনেকে প্রথম বৈঠকে তাশাহুদের পর ইচেছ বা অনিচ্ছায় দুরুদ পড়ে ফেলেন৷ এটি মারাত্নক ভূল৷
সংশোধনী :
চার রাকাত বিশিষ্ট ফরজ বা সুন্নতে মুয়াক্কাদার নামাজ অথবা তিন রাকাত বিশিষ্ট ফরজ বা ওয়াজেব নামাজের প্রথম বৈঠকে দুরুদের প্রথম চার শব্দ পর্যন্ত পড়লেই সাহু সেজদা দিতে হবে৷ তবে সুন্নতে যায়েদা ও নফল নামাজের প্রথম বৈঠকে তাশাহুদের পর দুরুদ শরীফ ও দুআয়ে মাসুরা পড়া উত্তম৷
নামাজে শেষ বৈঠকে সালাম ফিরানো বিষয়ে আমাদের ভূল
ভূল:
ক) পুরো সালাম বলতে অনেক খানি সময় লাগে৷কিন্তু অনেক মুসল্লী ইমামের সালাম ফিরানোর শব্দ " আস্সালামু" বলার সাথে সাথে ডানে বামে ঘাড় ফিরিয়ে ফেলেন৷ সালাম ফিরানোর সময় অন্তরে কোন নিয়্যাত রাখেন না৷
সংশোধনী :
ইমামের "আস্সালামু" বলা পর্যন্ত চেহারা কেবলামুখী রাখবে এরপর "আ'লাইকুম" শব্দ বলার পর আস্তে আস্তে ঘাড় ফেরাতে আরম্ভ করবে৷ ডান দিকে সালাম ফেরানো শেষ হলে চেহারা কেবলামুখী হয়ে স্থির হবে, তার পর বাম দিকে আস্তে আস্তে ঘাড় ফেরাতে আরম্ভ করবে৷ ইমামের আগে সালাম ফেরালে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে৷ এসময় মুসল্লীরা অন্তরে ইমাম, ডান বামের মুসল্লী, ফেরেস্তা ও নামাজী জ্বীনদের প্রতি নিয়্যাত করবে৷
ভূল:
খ) অনেক মুসবুক মুসল্লী, ইমামের প্রথম সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের ছুটে যাওয়া রাকাত আদায় করার জন্য উঠে দ্বাড়ান৷
সংশোধনী :
ইমামের উভয় দিকে সালাম ফিরানো শেষ হয়েছে এটা নিশ্চিত্‍ হওয়ার পরই মুসবুক মুসল্লী তার ছুটে যাওয়া রাকাত আদায় করার জন্য উঠে দ্বাড়াবেন৷
ব: দ্র: : এই অধ্যায়ে যে সব মাসায়েল উল্লেখ করা হয়েছে তা নিম্নলিখিত গ্রন্থসমুহ থেকে নেয়া হয়েছে৷
ক) ফাতায়ায়ে আলমগিরী খ) ফাতাওয়ায়ে তাতার খানিয়া গ) আদ্দুরুল মুখতার
ঘ) বাহরুর রায়েক ঙ) হাশিয়াতুত তাহতাবী প্রভৃতি ৷
পবিত্রতা হাসিল বা 'উযূ' এর আধ্যাতি্নকতা
'উযূ' আরবী শব্দ৷ এর অর্থ সুন্দর ,পরিস্কার,স্বচ্ছ৷ শরী"আতের পরিভাষায় নিধ্যারিত নিয়মে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাকে উযু বলা হয়৷ রসুলুল্লাহ (স:) বলেন ধর্ম পরিচ্ছন্নতার উপর প্রতিষ্ঠিত৷ নামাজের চাবি হচেছ পবিত্রতা বা উযূ৷ আল্লাহতা'লা বলেন " হে মুমিনগন যখন তোমরা নামাজ আদায় করার জন্য প্রস্তুত হও, তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল, তোমাদের কনইসহ হস্তদ্বয় ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসেহ কর আর ধৌত কর তোমাদের পা সমুহ টাকনুসহ ( সুরা মায়েদা আয়াত-৬ )
উযূর নিয়্যাত :
উযূকারী ব্যক্তি এই নিয়্যাত করবে যে " আমি পবিত্রতা অর্জন, নামাজ আদায় এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভের উদ্দেশ্যে উযূ করছি৷"
ইসলামে উযূ করার যে বিধান রয়েছে তাতে দুটি দিক রয়েছে৷ উযূ এর জাহেরী দিক আমরা প্রতিদিনই অনুশীলন করছি কিন্তু অজুর বাতেনী দিক নিয়েও ভাবা প্রয়োজন৷ উযূ করার মাধ্যমে শরীরের প্রবিত্রতার সাথে সাথে অন্তরের পবিত্রতা হাসিলও জরুরী৷ আল্লাহতা'লা বলেন
" এ মসজিদে এমন লোক রয়েছে, যারা পবিত্র থাকা পছন্দ করে৷ আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন৷" সুরা ................. তিনি আরো বলেন " আল্লাহ তোমাদের উপর কোন অসুবিধা রাখতে চান না, কিন্তু তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান" সুরা.................... রসুলুল্লাহ (স:) বলেন " পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক৷" ইমানের অনেক গুলি স্তর বা মকাম রয়েছে৷ নীচের সতরে না পৌছানো পর্যন্ত উপরের স্তরে যাওয়া যায় না৷ পবিত্রতা দিয়ে ইমানের স্তর গুলো অতিক্রম করার কাজ শুরু করতে হয়৷
এসব রেওয়ায়েত থেকে এই তথ্যই পাওয়া যায় যে মানুষের অন্তরকে পবিত্র করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ অথ্যাত্‍ মানুষ তার বায্যিক অংগে পানি ঢেলে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করবে আর অন্তর মোনাফেকী, অহংকার, লোভ, হিংসা ও পরশৃীকাতরতার ময়লা দ্বারা কুলষিত থাকবে, এটাকে আর যাহাই বলা হোক না কেন, উযূ করার মাধ্যমে সঠিক মাত্রার পবিত্রতা হাসিল হয়েছে বলা যায় না৷
আপনার অন্তকরনকে কিভাবে কুলুষমুক্ত বা পবিত্র করবেন ?
অন্তকরন এবং দেহের সমন্বয়ে মানুষ গঠিত হয়েছে৷ তবে এর মধ্যে অন্তকরন হচ্ছে আসল৷ দেহ হচ্ছে আবরণ মাত্র৷ মূলত অন্তকরন হচ্ছে হেদায়েতের কেন্দ্রবিন্দু৷ অন্তকরন কলুষমুক্ত হলে দেহের পরিচ্ছন্নতা সার্থক হয়ে উঠে৷ মানুষের অন্তকরন হচেছ সব কিছুর ভিত্তি মূল৷অন্তর ঠিক থাকলে সব কিছু ঠিকঠাক থাকবে৷অন্তর হচেছ একটি বৃক্ষের মত, অন্যান্য অংগ প্রত্যংগ হচেছ শাখা প্রশাখা৷ বৃক্ষের মূল সতেজ থাকলে ডাল পালা সব কিছুই তাজা ও সতেজ থাকে৷ অন্তর হচেছ বাদশা, অংগ প্রত্যংগ সমূহ হচেছ তার প্রজা৷ অন্তকরন হচ্ছে স্বচ্ছ আয়নার মত৷ মানুষ যখনই কোন গুনাহের কাজ করে, তখনই অন্তকরনে একটি কাল দাগ পড়ে৷ এ সম্পর্কে আল্লাহতা'লা বরেন " ওদের অন্তকরনে ওদের কৃতকর্মই মরিচা ধরিয়েছে৷" সুরা মুতাফফিকীন আয়াত :৮৩ : ১৪ আসলে যে ব্যাক্তি অন্তকরনকে পরিশুদ্ধ করে সেই দুনিয়া ও আখেরাতে সত্যিকার সফলতা ও সৌভাগ্য লাভ করবে৷ এ সম্পর্কে আল্লাহতা'লা বলেন " সে ই সফলকাম যে নিজেকে পবিত্র করে৷" সুরা শামস আয়াত ৯১ : ৯
অতএব অন্তকরনকে পবিত্র করার জন্য নিয়্যাত করা জরুরী এরপর আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে তার জন্য চেষ্টা ও সাধনা করতে হবে ৷ তারপর আল্লাহর নিকট দোয়ার মাধ্যমে অন্তর থেকে মোনাফেকী, অহংকার, লোভ, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতার ময়লা দুর করার কাজ শুরু করা যেতে পারে৷ উযূর সময় বিষয়টি স্বরণ করে মনে মনে এই কথা বলা যে এই উযূুর পানি দ্বারা আমি একই সাথে আমার অন্তরের যাবতীয় রিপুকেও ধুয়ে পরিস্কার করছি৷ এই নামাজের উযূ শেষ করার পর পরবতর্ী নামাজের উযূ পর্যন্ত আমি যাবতীয় মোনাফেকী, অহংকার, লোভ, হিংসা,অহংকার ও পরশ্রীকাতরতা পরিহার করে চলার প্রাকটিস করবো৷ প্রতি দিন পাঁচ বার এরুপ করতে থাকলে আল্লাহ পাক অন্তরকে কলুষমুক্ত করে দিতে পারেন৷ দ্বীনের দ্বায়ীর অন্তর কলুষমুক্ত থাকা খুবই জরুরী৷ মানূষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়ার সময় দাওয়াত দানকারীর অন্তর পরিচছন্ন হওয়া উচিত্‍৷
উযূুর সুন্নত সমূহ :
১/ উযূুর নিয়্যাত করা ২/ মিসওয়াক করা ৩/ বিসমিল্লাহির রহমা'নির রহীম পড়া ৪/ দুই হাত কব্জিসহ তিন বার ধোয়া ৫/ তিনবার কুলি করা ( রোজ না হলে অন্তত একবারগড়গড়া করা ৬/ দাঁড়ি খিলাল করা৷ ৭/ তিন বার নাকে পানি দেয়া ৮/ উযূর প্রত্যেক অংগ তিন বার ধৌত করা ৯/ সমস্ত মাথা একবার মোসেহ করা ১০/ উভয় কান মেসেহ করা ১১/ উযূর ফরজ গুলো আগেরটা আগে আদায় করা ১২/ এক অংগ না শুকাতে আরেক অংগ ধোয়া১৩/ পায়ের আংগুল সমূহে খিলাল করা ১৪/ মুখমন্ডল তিন বার ধৌত করা ১৫/ দুই হাত কনুইসহ তিন বার ধৌত করা৷
উযূর মোস্তাহাব সমূহ :
১/ কাবা শরীফের দিকে মুখ করে অজু করা ২/ পানির পাত্র বাম পাশ্বে রেখে উযূু করা ৩/ উযূ আরমভ করার পূর্বে নিয়্যাত করা ও দোয়া পড়া ৪/ হাত ধোয়ার সময় ডান হাত এবং পা ধোয়ার সময় ডান পা আগে ধোয়া ৫/ বাম হতের বৃদ্ধা ও কনিষ্ঠা আংগুল দ্বারা নাক পরিস্কার করা ৬/ উযূুর প্রতিটি অংগ ধোয়ার সময় বিসমিল্লাহ সহ দোয়া পড়া ৭/ উভয় হাতের পিঠ দ্বারা ঘাড় মাসেহ করা৷ ৮/ প্রত্যেক অংগ ঘসে ঘসে ধোয়া ৯/ উভয় পা অবশ্যই বাম হাত দ্বারা ঘসে ধোয়া৷ ১০/কারো সাহায্য না নিয়ে উযূু করা৷ ( মাজুর না হলে) ১১/ উযূুর সময় কথা বার্তা না বলা ৷ ১২/ অজুর পাত্রে যদি উযূ শেষে পানি অবশিষ্ট থাকে তবে তা দ্বাড়িয়ে পান করা৷১৩/ উযূুকরা শেষ হলে দোআ করা৷ ১৪/ এমনভাবে উযূু করা যাতে ব্যবহৃত পানির ছিটা অন্য কারো গায়ে না যায়৷
চতুর্থত অধ্যায় :
ফেরেস্তা ও শয়তান ৷ শয়তান কে প্রতিরোধ৷ নফস এবং নফসের সংশোধন :
হুজুর (স:) বলেন যখন কোন আদম সন্তান ভুমিষ্ট হয়,আল্লাহ পাক তখন এজন ফিরিশতা কে তার সংগীরুপে নিযুক্ত করে দেন৷ তদ্রুপ শয়তানও অন্য এক শয়তানকে তার সংগী করে দেয়৷তখন শযতানটি শিশুর বাম দিকে অবস্থান করে আর ফিরিশতা টি তার ডান দিকে অবস্থান করতে ধাকে৷ অত:পর উভয়েই নিজ নিজ কর্তব্যে রত হয়ে যায়৷ তিনি আরো বলেছেন, মানুষের প্রতি যেমন একটি শয়তানের প্রভাব পতিত হয়,তদ্রুপ এক জন ফিরিশতার প্রভাবও তার উপর রয়েছে৷ অথ্যাত্‍ মানুষের অন্তর সর্বদা শয়তান ও ফিরিশতার দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকে৷
ফিরিশতা কি
ফিরিশতা শব্দটি ফাসর্ী মব্দ৷ আরবীতে ফিরিশতাকে একবচনে 'মালাক' ও বহুবচনে 'মালাইকা' বলা হয়৷ এর আভিধানিক অর্থ হলো বার্তা বাহক৷ ফিরেশতা হচেছ নুরের তৈরী আল্লাহ তা'লার এক বিশেষ অনুগত এমন এক মাখলুক যার মধ্যে নফস দেয়া হয়নি৷ নফস না থাকার কারনে ফিরিশতাদের পদ:ক্ষলন হয় না৷ ফিরিশতা আল্লাহপাকের হুকুমে দুনিয়া এবং আখেরাতে বিভিন্ন কর্মে লিপ্ত আছে ও থাকবে৷ ফিরেশতা মানুষের নেক আমল সমূহ আল্লাহ তা'লার নিকট পৌছায় এবং মানুষ কতৃক করা ভাল এবং মন্দ সমুদয় আমলই লিপিবদ্ধ করে থাকে অথ্যাত্‍ মানষের আমলনামা তৈরী করে যা কেয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে দেয়া হবে৷ ফিরিশতা সংখা কত তা এক মাত্র আল্লাহপাকই জানেন৷
মর্যাদা অনুযায়ী ফিরিশতা সাধারনত তিন শ্রেনীতে বিভক্ত৷ ১/ দুনিয়ার ফিরিশতা ২/ আকাশের ফিরিশতা ৩/ আরশ বহনকারী ফিরিশতা ৷ পৃথিবীতে এমন কোন স্থান নেই যেখানে ফিরিশতা নেই৷ প্রতিটি মানুষের সাথে ফিরিশতা রয়েছে৷
শয়তান কি
শয়তান হচেছ জীন প্রজাতি ভুক্ত আগুনের তৈরী আল্লাহতা'লার এমন এক মাখলুক যে দুনিয়া এবং আখেরাতে মানুষকে বরবাদ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ৷ শয়তানের নফস থাকার কারনে আদম (আ:) কে সেজদা না করে সে অভিশপ্ত হয়ে আদম সন্তানের প্রধান শত্রুতে পরিনত হয়েছে৷ শয়তান মানুষকে দারিদ্রের ভয় দেখায় আর যাবতীয় মন্দ কাজের প্রেরনা যোগায়৷ বান্দা যখন নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে লিপ্ত হয়, শয়তান তখন খুবই সক্রিয় হয়ে বান্দার আল্লাহমুখী ধ্যান নষ্ট করতে তত্‍পর হয় ৷ বিশেষত বান্দা যখন অন্য বান্দাগনকে আল্লাহর পথে আহবান করতে থাকে, এটা শয়তানের ইচছার একেবারে উল্টা৷ সে কোন অবস্থায় ইহা মানতে চায়না৷ শয়তান বান্দাকে দেখে কিন্তু বান্দা শয়তানকে দেখে না৷ বান্দা শয়তানকে ভূলে যায় কিন্তু শয়তান বান্দাকে কখনও ভোলে না৷ তাই এই অদৃশ্য শত্রুর শত্রুতা থেকে বাঁচার জন্য ব্যাপক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে৷ আল্লাহপাক বলেন হে আদম সন্তান ! আমি কি তোমাদেরকে সতর্ক করে দেই নি যে তোমরা শয়তানের দাসত্ব করবে না৷ যেহেতু সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু৷ সুরা ইয়াসীন আয়াত------
আল্লাহ পাক আরো বলেন " নিশ্চয় শয়তান তোমাদের প্রধান শত্রু৷ তাই তোমরাও তাকে শত্রু হিসেবে চিহৃিত কর৷" সুরা----- আয়াত-----------
আল্লাহ পাক আরো বলেন " হে মমিনগন! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর, এবং শয়তানের পদাংক অনুসরন করো না৷ নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু৷" সুরা বাকারা আয়াত ২০৮
শয়তান কিভাবে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে
আল্লাহতা'লা শয়তানকে মানুষের সাথে শত্রুতা করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন৷ শয়তান সর্বদা মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তৈরী থাকে এবং কুমতলব নিয়ে মানুষের পিছনে লেগেই আছে৷ নিম্নে বিভিন্ন হালতে শয়তান মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে ও যাবতীয় শয়তানী কার্যক্রম দ্বারা এযাবত্‍ কাল মানুষকে শুধু ধোকাই দিচেছ এবং বিপদে ফেলে আসছে :
ক) ক্রোধ ও কাম রিপু :
মানষের অন্তরে শয়তানের প্রবেশের জন্য ক্রোধ ও কাম রিপু একটি প্রশস্ত পথ৷ ক্রোধ বুদ্ধিকে ছোট করে আর শয়তান ক্রোধকারীর উপর কতৃত্ব করে৷ আর কাম রিপু হচেছ শয়তানের চলাচলের পথ৷ একমাত্র ক্ষুধা এই পথকে সংকীর্ন করতে পারে৷
খ) লোভ ও হিংসা বিদ্বেষ :
যখন কোন ব্যাক্তি কোন জিনিসের প্রতি লোভ করে, শয়তান তার অন্তরে সেই জিনিসের লালসা সৃষ্টি করে তাকে অন্দ্ধ ও বধির করে ফেলে৷ শয়তান এই সুযোগটা কাজে লাগায় এই ভাবে -লোভী ব্যাক্তির নিকট তার লোভের বিষয় গুলো সাজিয়ে নিয়ে আসে এবং তাকে তার লালসায় পূর্ণরুপে নিমর্জিত করে, যদিও তা অত্যন্ত অশ্লীল ও নিন্দনীয় হয়৷ অনুরুপ কারো প্রতি হিংসা বিদ্বেষ সৃস্টি হলে শয়তান একই পদ্বতিতে অগ্রসর হয়ে থাকে৷
গ) তৃপ্তি সহকারে আহায্য ভক্ষন :
হালাল খাবারও যদি পেটপূর্ণ করে খাওয়া হয়,তবে তা কামরিপুকে শক্তিশালী করে৷ এবাদতে প্রবল আলস্য, শরীর ভারী হয়ে যায়৷ মন থেকে আল্লাহর ভয়, মানুষের উপর রহম বিদুরিত হয়ে যায়৷ এজন্য শয়তান বান্দাকে অত্যাধিক খাবার খেতে প্রবলভাবে প্ররোচিত করে৷ হযরত আয়শা (রা:) বলেন হুজুর (স:) এর ইন্তেকালের পর সর্বপ্রথম যে বেদআত বা নব প্রচলন শুরু হয়েছিল, তা' হলো পরিতৃপ্ত আহার৷
ঘ) বিলাসিতা ও মনোরম সাজের আসবাব পত্র:
অনাবশ্যক বিলাসিতা তথা অতিরিক্ত দামী পোষাক, অত্যন্ত যাকজমক পূর্ন পরিবেশ, বিলাসবহুল গাড়ী এবং বাসস্থানের বিশালতা এবং তাতে সুন্দর ও দামী আসবাব দিয়ে সজ্জিত করা ৷ সব কিছুর মডেলের পরিবর্তন করার এক প্রতিযোগিতায় মানুষকে লিপ্ত করে দেয় শয়তান, এবং মৃত্তুর পূর্ব পর্যন্ত এই এক নেশায় তাকে ডুবিয়ে রেখে ধোকা দেয়৷
ঙ) মানুষের নিকট প্রত্যাশা ও দুনিয়াবী আশায় মত্ত হওয়া:
মানুষের নিকট প্রত্যাশা করা এবং বড় বড় দুনিয়াবী আশায় নিজের জীবন যৌবন লাগিয়ে দেবার নেশায় মত্ত হওয়ার কাজে শয়তান মানুষকে নিয়োজিত রেখে ধোকা দেয়৷
চ) তাড়াহুড়ো এবং অস্থিরমতি হওয়া :
শয়তানের একটি ধোকা হল, যে কোন কাজে তারাহুড়ো করা এবং কাজে কর্মে দৃঢ়তা না থাকা ও অস্থিরতা প্রকাশ পাওয়া৷ হুজুর (স:) এরশাদ করেছেন " সত্বরতা শয়তান থেকে এবং বিলম্বতা বা ধীর-স্থিরতা আল্লাহ থেকে আসে৷"
ছ) প্রয়োজনাতিরিক্ত ধন-সম্পদ থাকা :
প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশী ধন সম্পদ থাকলে শয়তানের জন্য তা একটি বিস্রাম স্থল সরুপ হয়ে উঠে৷ হুজুর (স:) এর নবুয়ত লাভের পর ইবলীস সাহাবীদের নিকট শয়তান পাঠাতে শুরু করে৷ কিন্তু শয়তানগন বিফল হয়ে ইবলীসকে রিপোর্ট দেয় যে -সাহাবীরা এমন যে তাদের কোন ব্যাপারে কু-প্ররোচনা দিলে তারা নামাজে দ্বাড়িয়ে যায়৷ তখন ইবলীস বলল, এদেরকে একটু সময় দাও৷ হয়তো আল্লাহ এক সময় এদেরকে পার্থিব সম্পদরাজী দান করবেন৷ তখন এদের মধ্যে সফল ভাবে কাজ চালাতে পারবে৷
জ) কৃপনতা ও দারিদ্রতার ভয় দেখানো :
বান্দাকে দ্রুত কাবু করতে দারিদ্রভীতি ও কৃপনতা হচেছ শয়তানের অমোগ অস্ত্র৷ দারিদ্র ভীতির কারনে মানুষ কৃপনতা অবলম্বন করে কিংবা অবৈধ ভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার চেষ্টা করে ৷ জাকাত দেয়ায় কার্পন্য করতে শুরু করে৷ দান খয়রাত বন্ধ হয়ে যায়৷ প্রতারনা, অপরের সম্পদ আত্নসাত করা, হকদারের হক না দেয়া প্রভৃতি হচেছ শয়তানের ধোকার ফসল৷
ঝ) মুসলমানের প্রতি কুধারনা পোষন করা :
যে ব্যাক্তি অন্য মূসলমানের উপর কুধারনা রাখে, শয়তান তার রসনাকে পরনিন্দা চর্চার জন্য উত্‍সাহ দেয়৷ যদি সে তা গ্রহন করে তবে তাতেই সে ধংস হয়৷ পরনিন্দা শ্রবন করে আশ্চর্যান্বিত হওয়া আরেক প্রকার পরনিন্দা ৷ এতে গীবতকারী উত্‍সাহিত হয়৷ হুজুর (স:) বলেছেন "পরনিন্দা শ্রবন করে নিন্দুকের সমর্থন করাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত৷" অতএব দ্বীনের দ্বায়ীর জন্য গীবত বলা দুরের কথা গীবত শোনা থেকে নিজের কান কে হেফাযত করা খুবই জরুরী৷ কেউ গীবত বলতে শুরু করলেই, সেখান থেকে সরে আসা কিংবা তাকে ধামিয়ে দেয়া উচিত্‍ ৷
ঞ) হাট বাজারে অবস্থান করা :
হাট বাজার বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হচেছ শয়তানের বসবাসের স্থান এবং এজন্যই বাজার হচেছ দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান৷ নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে হাট বাজারে প্রবেশ করা এবং প্রয়োজন সেরে দ্রুত চলে যাওয়া হচেছ মুমিনের সেফাত৷ কারন বাজারেই শয়তান মানুষকে প্রতারনা, মাপে কম দেয়া, ভেজাল দেয়া, কালোবাজারী, মজুদদারী, মুনাফাখুরী প্রভৃতি খারাপ অভ্যাস গুলোকে জাগিয়ে দিয়ে তাকে ধোকা দেয়৷ হযরত সালমান ফারসী (রা:) এর রেওয়াতে হুজুর (স:) বলেন " তুমি তাদের মধ্য থেকে হয়ো না, যারা সবার আগে বাজারে প্রবেশ করে অথবা সবার শেষে বাজার থেকে বের হয়৷ কেননা বাজার এমন জায়গা, যেখানে শয়তান ডিম-বাচ্চা প্রসব করে রেখেছে৷"
চ) দুনিয়ার মোহাব্বত :
দুনিয়ার কাজ কারবার,স্ত্রী পুত্র কণ্যা, বন্ধু-বান্ধব, ধন সম্পদ, জমিজমা, মিল কারখানা, ঘর বাড়ী ইত্যাদি যে কোন বস্তুর সাথে মানুষের অন্তরাত্নাকে আবদ্ধ করার নামই হচ্ছে দুনিয়ার মোহাব্বত৷ পৃথিবীর সব মানুষই বিশ্বাস করে যে দুনিয়া ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে, তার পরও মানুষ দুনিয়াকে ভালবাসে৷ সবাই জানে দুনিয়ার সফলতা স্থায়ী নয়৷ বস্তুত দুনিয়া হচ্ছে আখিরাতের সম্বল সংগ্রহ করার স্থান৷ রসুলুল্লাহ (স:) বলেন " ইমান এবং দুনিয়ার লোভ একত্রে অন্তরে থাকতে পারে না" এর কারন অত্যন্ত স্পষ্ট৷ কেননা ইমানের পরিনাম হচ্ছে ধৈয্য,তাওয়াক্কুল এবং অল্পে তুষ্ট থাকা ৷ অপরদিকে দুনিয়ার মোহাব্বতের পরিনাম হচ্ছে অশান্তি , ধৈয্যহীনতা এবং অস্বস্তিবোধ৷ তিনি আরো বলেন " মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হয় কিন্তু দুটি জিনিস তার মধ্যে যৌবণ প্রাপ্ত হতে থাকে - দুনিয়ার মোহাব্বত আর অধিক আকাক্সক্ষা ৷ আল্লাহতা'লা বলেন " পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়৷" সুরা : হাদীদ আয়াত ৫৭, আল্লাহতা'লা আরো বলেন - এবং আখিরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন,যদি তারা জানত৷" সুরা আনকাবুত আয়াত ৬৪
কোন মন্দ কাজে/কোন এবাদতে কোন শয়তান সুনির্দিষ্ট ভাবে কাজ করে তার তালিকা:

বিশেজ্ঞ শয়তানের নাম যে সব মন্দ কাজ বা এবাদতে বিগ্ন সৃষ্টি করে
ড: শয়তান খানজাব নামাজের মধ্যে এসে নানান প্রক্রিয়ায় নামাজের ক্ষতি সাধন করে, ফলে নামাজী ব্যাক্তি নামাজের পূর্ণ নেকী পায় না৷
শয়তান ওয়ালহান অজুর সময় নানান রকম বিগ্ন সৃষ্টি করে থাকে
ড: শয়তান মাবছুত মিধ্যা কথা বলায় ও যাবতীয় মিধ্যা আচরণ করতে সাহায্য করে
শয়তান আওয়ার ব্যভিচারের আদেশ দেয় এবং তা মানুষের মনে আনন্দদায়ক করে৷
ড: শয়তান দাসেম মানুষকে দিয়ে যাবতীয় গীবত,অপবাদ এবং দুনর্াম রটানোর কাজে বিশেষ পারদশর্ী
শয়তান ছবর মানুষকে বীভত্‍স অন্যায় অত্যাচার করার প্রেরনা যোগায়
শয়তান জলন্ধর বাজারে অবস্থানকারী এই শয়তান মানুষকে দিয়ে যাবতীয় প্রতারনামুলক কাজ, মাপে কম দেয়া, ভেজাল ইত্যাদি করায়৷
শয়তান খাবায়েস অসময়ে এবং হটাত্‍ টয়লেটে যাবার হাজত সৃস্টি করে জামাতের নামাজে শরিক হতে অনাকাখিঙত বিলম্ভ ঘটিয়ে দেয়৷

শয়তানের চক্র ান্ত প্রতিরোধের উপায় :
শয়তানের চক্রান্ত প্রতিরোধের উপায় হচেছ আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহর জিকির ৷ এছাড়া উপরে উল্লেখিত নিন্দনীয় বিষয় গুলি থেকে পবিত্র হয়ে অন্তরে শয়তানের প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেয়া যায়৷ মানুষের অন্তরে দুিট দরজা থাকে, একটি অদৃশ্য জগতের দিকে যা দিয়ে এলহাম বা অহী প্রবেশ করতে পারে৷ আর অন্যটি জড় জগতের দিকে,যা দিয়ে দুনিয়াবী যাবতীয় বিষয়সহ উল্লেখিত নিন্দনীয় বিষয় গুলির মাধ্যমে শয়তান অন্তরে প্রবেশ করে৷ এখন অন্তর এবং শরীর থেকে উল্লেখিত সমুদয় দোষ ঝেড়ে ফেলে দেয়া হলে শয়তান সেখানে ঘাটি গেড়ে থাকতে পারে না৷
কিন্তু শয়তান হচেছ ক্ষুধার্ত কুকুরের মত, শত বার তাড়ালেও সে ফিরে আসবে৷ তাই শয়তানের কুপ্রভাব থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করা উচিত্‍ এবং তা করার জন্য আল্লাহতা'লাই হুকুম দিয়েছেন৷ আল্লাহতা'লাই শয়তানকে পূর্ণরুপে পরাজিত করতে সক্ষম৷ এ বিষয়ে তিনিই যথেষ্ট৷ তার পরও যদি দেখা যায়, যে শয়তান মানুষের উপর জয়ী হয়ে যাচেছ, তবে ইহা মানুষের জন্য পরীক্ষা সরুপ৷ এর দ্বারা আল্লাহতা'লা মানুষের সাধনা, ইমানের মজবুতী এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকার প্রমান দেখতে চান৷ শয়তানকে আল্লাহতা'লা মানুষের দেহে রক্তের ন্যায় চলাচলের ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন৷ রোজা রেখে বা স্বল্প আহার করে শয়তানের চলাচলের এই পথকে সংকীর্ণ করে দেয়া যায়৷ হুজুর (স:) বলেছেন "ওমর (রা:) যে পথে গমন করে শয়তান সে পথে না গিয়ে অন্য পথ দিয়ে যাতায়াত করে৷ তার কারন ওমরের (রা:) হৃদয় শয়তান প্রদত্ত লালসা থেকে পবিত্র ছিল৷" আজ অবদি কেহ যদি হযরত ওমর (রা:) এর নাম ঘুমানোর পূর্বে শরীরের যে কোন স্থানে হাতের শাহাদাত আংগুল দ্বারা আরবীতে লেখে তাহলে সারা রাত শয়তান কাছে আসে না৷
শয়তান কখনো কখনো সত্‍কাজের প্রতি আহবান জানায় কিন্তু তার পরিনাম মন্দই থাকে৷ এমন হয়ে থাকে যে শয়তান ক্ষুদ্র কোন সত্‍কাজে আহবান করে শেষ পর্যন্ত তাকে দিয়ে বৃহত্‍ কোন অসত্‍ কাজ করায় অথবা বৃহত্‍ কোন সত্‍কাজ থেকে দুরে সরিয়ে রাখতে ক্ষুদ্র সত্‍কাজের প্রতি প্রেরনা যোগায়৷ এজন্য মাসওয়ারার সাথে চললে শয়তানের এধরনের ধোকা থেকে নিরাপদ থাকা যায়৷
দ্বীনের দ্বায়ী হবার প্রত্যাশী ব্যাক্তি কিভাবে শয়তানের আক্রমন মোকাবেলা করবে ?
একজন নবীন যুবক প্রথম বারের মত আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছেন৷ আসলে সে শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছে৷ কিন্তু নবীন যুবকটি তা জানে না৷ যতদিন সে আল্লাহর রাস্তায় ছিল সে আল্লাহর রহমতের ছায়ায় ছিল৷ শয়তান তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি৷ চিল্লা শেষ করে সে যখন বাড়ী ফিরলো, শয়তান তার উপর আক্রমন শুরূ করে দিল৷ এখানে সবচেয়ে নাযুক বিষয়টি হলো এই " শয়তান তাকে দেখে কিন্তু সে শয়তানকে দেখে না" শয়তানের কাছে যুদ্ধাস্র আছে আর যুবক টি খালি হাতে৷ এভাবে পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজার মানুষ যারা চিল্লা কিংবা তিন চিল্লা দিয়েছেন এমন সাথীদেরকে শয়তান কবজা করে নিয়েছে৷ শয়তানের আক্রমনে তারা আজ পথহারা এবং দিশেহারা৷ আসলে সেই সব যুবকদের উচিত্‍ ছিল আল্লাহর রাস্তায় থাকাকালীণ সময়ে এমন হাতিয়ার সগ্রহ করা যাতে বাড়ী ফিরে শয়তানের আক্রমন প্রতিহত করতে পারে এবং আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার কাজটি নিয়মিত করতে পারে এবং এর মাধ্যমে দ্বীনের দ্বায়ী হবার প্রত্যাশী ব্যাক্তি হিসেবে আল্লাহর নিকট পরিগনিত হতে পারে৷ পূর্বেই বলা হয়েছে শয়তানের চক্রান্ত প্রতিরোধের উপায় হচেছ আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহর জিকির ৷ আল্লাহর রাস্তায় সময় লাগানোর মাধ্যমে আল্লাহর ভয় কিছুটা হলেও অর্জিত হয়েছে৷ এখন দেখতে হবে আল্লাহর জিকির এবং পাঁচ কাজ তার দ্বীল কতটা আয়ত্ব করতে পেরেছে!
প্রথমত : তিন তজবী দিনে দু বার৷ সকালে বাদ এসরাক,কোরআন তেলাওয়াতের পূর্বে এবং রাতে বাদ এশা, কিংবা যখন সুবিধা হয়৷ এখানে তিন তজবীর আমলেও শয়তান বাধা দেবে৷ আল্লাহমুখী ধ্যান বার বার ভেংগে দিতে চেষ্টা করবে৷ কিছুদিন কষ্ট করে আমল করলে শয়তান আর কাছে আসতে পারবে না৷ অনুরুপ কোরআন তেলরাওয়াতে ও নামাজে শয়তান আল্লাহমুখী ধ্যান নষ্ট করার প্রবল চেষ্টা করে থাকে৷
দ্বিতীয়ত : মসনুন দোয়ার আমল করতে হবে সর্বক্ষেত্রে, যে রকম তাকে আল্লাহর রাস্তায় শেখানো হয়েছে৷ মসনুন দোয়ার আমল করলে শয়তান খুবই নাস্তানাবুধ হয়ে থাকে৷ ফলে আমলকারীর কাছে আসতে ভয় পায়৷
তৃতীয়ত : মসজিদ ওয়ারী পাঁচ কাজের সাথে জুড়ে থাকতে হবে সারা বত্‍সর ৷ যাতে দ্বীনের মেহনতের সংগে আহাছানিয়াতের সাথে লেগে থাকা যায়৷

পাঁচ কাজ কি ?
পাঁচ কাজ হচেছ এমন একটি আমল যা এক জন মোবাল্লেগকে দ্বীনের মেহনতকে নিয়ে আগে বাড়ার সুযোগ করে দেয়৷ পাঁচ কাজের সাথে নিজেকে জড়িত না রাখলে দাওয়াতে তাবলীগের মেহনত থেকে দুরে সরে যাবার সম্ভবনা দেখা দেয়৷ পাঁচ কাজ হচেছ দ্বীনের সমগ্র মেহনতকে একটি পেয়ালার মধ্যে নিয়ে আসা অথ্যাত্‍ যে মহল্লায় পাঁচ কাজ সঠিক ভাবে চলে, সেই মহল্লায় দ্বীনের মেহনত আগে বাড়তে থাকে৷
১/ দৈনিক ৩ কাজ : ক) মহল্লার মসজিদে ও বাসায় তালিম
খ) মহল্লার মসজিদে ও বাসায় মাসওয়ারা
গ) আড়াই ঘন্টার মেহনত
২/ সপ্তাহে এক কাজ :ক) নিজ মহল্লার মসজিদে এক গাস্ত এবং অপর মহল্লায় এক গাস্ত

৩/ মাসে এক কাজ : প্রতি মাসে ৩ দিন এবং প্রতি ৩ মাসে এক বার ৩ দিনের জন্য মাস্তুরাত
সাথে নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া৷
পাঁচ কাজের উদ্দেশ্য :
আমাদের মসজিদ গুলিতে হুজুর (সঃ) এর জমানার মসজিদের আমল গুলি জিন্দা হয়ে যায় এবং আমাদের বাড়ীতে ছাহাবাদের বাড়ীর আমল গুলি চালু হয়ে যায়
মহল্লার মসজিদে মাসওয়ারার বিষয় বসতু :
১/ মহল্লার মধ্যে দ্বীনি তাকাজা
২/ আগের দিনের মেহনতের কারগুজারী ৩/ আড়াই ঘন্টার মেহনত
আড়াই ঘন্টার মেহনতের বিষয় বসতু :
১/ দাওয়াত ২/ তালিম ৩/ এস্তেকবাল ( যদি ৮ জন বা তার বেশী সাথী থাকে)
এছাড়া অন্য জামাতের নসরতে যাওয়া, রুগী দেখতে যাওয়া/ জানাযায় শরিক হওয়া
বাসায় মাসওয়ারার বিষয় বসতু : [ সবসময় পুরুষ ফয়সাল থা্কবে ]
১/ কিতাবী তালিম ও ৬ নম্বরের মোজাক্কারা
২/ সংসারের জরুরতের বিষয়
মুসলমান বান্দার প্রতি শয়তানের চক্রান্ত ও তার প্রতিকার :
শয়তান কতৃক বান্দাকে প্রথম প্রকারের ধোকা :
শয়তান বান্দাকে সরাসরি আল্লাহর এবাদত করতে বাধা প্রদান করে বান্দাকে উপাসনা থেকে বিরত রাখে৷ যদি আল্লাহ তা'লা বান্দার সাহায্যকারী হন তবে বান্দার মনে এই ভাবনার উদয় হয় যেহেতু এই নশ্বর দুনিয়া থেকে আমাকে বিদায় নিতেই হবে, তাই আখেরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই৷ তাই আল্লাহর এবাদত আমার জন্য অত্যন্ত জরুরী৷
শয়তান কতৃক বান্দাকে দ্বিতীয় প্রকারের ধোকা :
প্রথম প্রকারের ধোকায় অসমর্থ হয়ে, শয়তান বান্দাকে এবাদত শুরু করতে বিলম্ব বা আলস্য করতে প্ররোচিত করতে থাকে৷ যদি আল্লাহ তা'লা বান্দার সাহায্যকারী হন তবে বান্দার মনে এই ভাবনার উদয় হয় যে আমার জিন্দেগী আমার হাতে নয়৷ সুতরাং অদ্যকার আমল আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখার কোন যুক্তিই নেই৷ কেননা প্রত্যেক দিনের জন্য আলাদা আমল রয়েছে৷
শয়তান কতৃক বান্দাকে তৃতীয় প্রকারের ধোকা :
দ্বিতীয় প্রকারের ধোকায় সফল হতে অসমর্থ হয়ে,শয়তান বান্দাকে এবাদতে তাড়াহুড়ো করতে প্ররোচনা দেয়৷ শয়তান এই বলে ধোকা দেয় - তোমাকে অমুক কাজটি করতে হবে, তাই তাড়াতাড়ি এবাদত শেষ করো প্রভৃতি৷ যদি আল্লাহ তা'লা বান্দার সাহায্যকারী হন তবে বান্দার মনে এই ভাবনার উদয় হয় যে সঠিক ভাবে অল্প আমল করা- বেঠিকভাবে বেশী আমল করা থেকে অনেক উত্তম৷
শয়তান কতৃক বান্দাকে ৪র্থ প্রকারের ধোকা :
তৃতীয় প্রকারের ধোকায় সফল হতে অসমর্থ হয়ে, শয়তান বান্দাকে বুঝায় যে এবাদত বা সত্‍ কর্ম মানুষকে দেখিয়ে করা উচিত্‍, তাতে তোমার প্রতি মানুষের ভক্তি শ্রদ্ধা বেড়ে যাবে৷ যদি আল্লাহ তা'লা বান্দার সাহায্যকারী হন তবে বান্দার মনে এই ভাবনার উদয় হয় যে আমার এবাদত শুধূমাত্র আল্লাহর জন্য- মানুষকে দেখানোর জন্য করলে তা রিয়ায় পরিনত হবে৷ আমি রিয়াকারী নই৷
শয়তান কতৃক বান্দাকে দেয়া ৫ম প্রকারের ধোকা :
এপর্যায়ে শয়তান বান্দার অন্তরে আত্নভিমান ও অহংকার পয়দা করে দেয়৷ শয়তান বলে কত বড় পূর্ণের কাজ করে ফেললে, কত উত্তম করেই না তুমি করলে- তোমার মত নেককার বান্দা কেহ আছে নাকি ? আল্লাহ তা'লা যদি বান্দার সাহায্যকারী হন তবে বান্দার মনে এই ভাবনার উদয় হয় যে - আমি যা করেছি তা আল্লাহর মেহেরবানীতেই করতে পেরেছি৷ এতে আমার নিজের কোন কৃতিত্ব নেই৷
শয়তান কতৃক বান্দাকে দেয়া ৬ষ্ঠ প্রকারের ধোকা :
এপর্যায়ে শয়তান অত্যন্ত শুক্ষ চাল দেয় যা কঠোর ধ্বংসাত্বক৷ শয়তান বান্দাকে বোঝাতে থাকে তুমিতো গোপনভাবে আল্লাহর এবাদত করছো৷ অথচ আল্লাহতা'লা সবকিছু জাহের করে দিচেছন৷ আল্লাহতা'লা সকল আমলকারীর আমলকে তার পোষাক বানিয়ে দিবেন৷ অতএব আল্লাহতা'লা নিজে যা প্রকাশ করা পছন্দ করেন, তুমি লুকিয়ে আমল করে কি সাফল্য পেলে ? যদি আল্লাহতা'লা বান্দার সাহায্যকারী হন তবে বান্দার মনে এই ভাবনার উদয় হয় যে - আমি আল্লাহর বান্দা এবং তিনি আমার মাবুদ ! তিনি যদি কোন কিছু জাহের করার ইচেছ করেন তা করতে পারেন৷ আর যদি গোপন করতে ইচেছ করেন তবে তাতে আমার আপত্তি করার কিছুই নেই৷ এসকল ব্যাপার আল্লাহতা'লার ইচছার উপর নির্ভরশীল৷ সে জন্য আমার চিন্তা করার কিছু নেই৷
শয়তান কতৃক বান্দাকে দেয়া ৭ম প্রকারের ধোকা :
অত:পর নিরুপায় হয়ে শয়তান বান্দাকে বলতে থাকে এসব এবাদত করে তোমার লাভ কি? তোমার অবস্থা কি হবে সেটা আল্লাহতা'লা আগেই নিধ্যারিত করেই রেখে দিয়েছেন৷ অতএব নেক বান্দা ও জান্নাতী হওয়াই যদি তোমার কিসমতে থেকে থাকে তবে এবাদত না করলেও চলবে৷ আর যদি তোমার কিসমতে গুনাহগার ও দোযখী হওয়াই ধাকে, তবে হাজারো নেক কাজ করলেও কোন লাভ হবে না৷
যদি আল্লাহতা'লা বান্দার সাহায্যকারী হন তবে বান্দার মনে এই ভাবনার উদয় হয় যে আমি আল্লাহতা'লার একজন বান্দা৷ আর বান্দার কাজ হচেছ প্রভুর উপাসনা করা ও তার আদেশ নিষেধ মান্য করে চলা৷ মহান আল্লাহতা'লা তার প্রভুত্যের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে সজাগ রয়েছেন৷ আর উহা সুনিশ্চিত যে, এখলাসওয়ালা নেক কাজ কখনো মূল্যহীন হয় না৷ যদি নেককার বান্দাই হয়ে থাকি তবে আল্লাহতা'লার দরবারে বেশী বেশী সৌভাগ্যের জন্যে আরজ পেশ করতে পারবো৷
আর যদি তিনি আমার গুনাহগার হওয়াই লিখে রেখে থাকেন, তবুও নেক কাজ আমার প্রয়োজন আছে৷ কেননা যদি আমাকে দোযখে প্রবেশ করানো হয়, সেই অবস্থায় আমার অন্তরে এই
সান্তনা থাকবে যে আল্লাহর নাফরমানী করে গুনাহগার সাব্যস্ত হয়ে দোযখে নিক্ষিপ্ত হইনি৷ এছাড়া আল্লাহতা'লা নিজে যে অংগীকার করেছেন তা জাজল্যমান সত্য ও সঠিক৷ তিনি নেক কাজের জন্য পুরুস্কার প্রদানের অংগীকার প্রদান করেছেন৷ অতএব যে ব্যাক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে নেক কার্যাদি করবে সে অবশ্যই আল্লাহতা'লার সাথে সাক্ষাত্‍ করবে৷ সে ব্যাক্তি কখনো জাহান্নামে প্রবিষ্ট হবে না, বরং জান্নাতেই প্রবেশ করবে৷ আর সে নিজের নেক কাজের জন্য জান্নাতে যাবে না; বরঞ্চ আল্লাহপাকের প্রতিশ্রুতি এবং অংগীকারের কারনেই জান্নাতে প্রবেশ করবে ৷
পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট আদম (আ:)এবং ইবলীশ শয়তানের দোয়া - জবাব
আদম (আ:) পৃথিবীতে হক অথ্যাত্‍ দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন আর শয়তান নিয়ে এসেছে বাতেল
আদম ( আ:) এর দোয়া ইবলীশ শয়তানের দোয়া

হে প্রভু ! তুমি শয়তানের সাথে আমার শত্রুতা সৃষ্টি করেছো৷যদি আমায় সাহায্য না করো তবে তার বিরুদ্ধে আমার সংগ্রাম করার শক্তি থাকবে না৷ তখন আল্লাহ পাক বললেন, তোমার এমন কোন সন্তান জন্ম গ্রহন করবে না, যার সাথে অন্তত: একজন ফিরিশতা থাকবে না! আদম (আ:) বললেন হে মাবুদ ! আমাকে আরো কিছু আশার কথা শ্রবন করাও৷ আল্লাহ পাক বললেন, তোমার এবং তোমার সন্তানদের একটি পাপের জন্য একটি গূনাহ দেব কিন্তু একটি পূণ্যের বদলে
দশটি বা আমার ইচ্ছানুসারে ততোধিক নেকী দান করবো৷ আদম (আ:) বললেন হে মাবুদ ! আমাকে আরো আশ্বস্ত করো৷ আল্লাহ পাক বললেন, তোমার এবং তোমার সন্তানদেও দেহে যে পর্যন্ত প্রান থাকবে সে পর্যন্ত তাওবার দরজা উন্মুক্ত রাখা হবে৷ হে প্রভু! তুমি তোমার এই বান্দাকে সন্মানিত করেছো৷ যদি আমাকে তার বিরুদ্ধে সাহায্য না করো তবে আমার সংগ্রাম করার শক্তি থাকবে না৷ তখন আল্লাহ পাক বললেন, হে ইবলীস! জেনে রাখ, তার একটি সন্তান হবার সাথে সাথে তোমারও একটি সন্তান হবে৷ইবলীস বলল, হে প্রভু ! আমার জন্য আরো বেশী শক্তি ও সামর্থের ব্যাবস্থা করো৷ আল্লাহ পাক বললেন, তুমি আদম সন্তানের দেহের মধ্যে রক্তের ন্যায় চলাচল করতে পারবে৷ ইবলীস বলল, প্রভু ! আমাকে আরো ক্ষমতা দাও৷ আল্লাহ পাক বললেন, তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হবে এবং ধন-সম্পদে এবং সন্তান-সন্ততিতে তাদেও সাথে শরিক হবে আর তাদেরকে ওয়াদা দিবে কিন্তু তোমার সে ওয়াদা প্রতারনা ছাড়া কিছুই নয়৷


শেষ পর্যন্ত শয়তান যে সব মানুষকে ধোকা দিয়ে জাহান্নামের উপযুক্ত করে ছাড়বে, কিয়ামতের দিন বিচার পর্ব শেষ হবার পর তারা একত্রিত হয়ে আল্লাহর কাছে ইনসাফের জন্য ফরিয়াদ করবে ৷ আল্লাহপাক ইবলীস শয়তানকে হাজির করলে শয়তান জবাব দিবে৷ " যখন সব কাজের ফয়সালা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবে: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কে সত্য ওয়াদা করেছিলেন এবং আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছি অতপর ভংগ করেছি৷ তোমাদের উপর তো আমার কোন ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এতটুকু যে, আমি তোমাদের ডেকেছি, অত:পর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছ৷ এতএব তোমরা আমাকে ভত্‍সনা করো না এবং নিজেদেরকেই ভত্‍সনা করো৷ আমি তোমাদের উদ্ধারে সাহায্যকারী নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারে সাহায্যকারী নও৷ ইতিপূর্বে তোমরা আমাকে যে আল্লাহর সাথে শরিক করেছিলে, আমি তা অস্বীকার করি৷ নিশ্চয়ই যারা জালেম তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি৷" সুরা ইব্রাহীম আয়াত ২৩
নফস কি
নফস হচেছ মানুষের অন্তরে বসবাসকারী এবং একই সাথে আহবানকারী উপাদান যা মানুষের যাবতীয় আমল নিয়ন্ত্রন করে বা নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করে৷ মানুষের মধ্যে ভাল গুন এবং মন্দ গুন দুটোই পাশাপাশি থাকে, কারন ভাল নফস এবং মন্দ নফস একই সাথে অন্তরে বিরাজ মান৷ ইমাম গাজ্জালী (র:) তিন ধরনের নফসের বর্ননা দিয়েছেন৷ তিনি খারাপ ধরনের রিপুকে নফসে আম্মারা বলেছেন৷ আরো বলেছেন এটা হচেছ অত্যাধিক শক্তিশালী এক জানোয়ার বিশেষ, শয়তান যার একান্ত সহযোগী এবং যাবতীয় পাপকাজ হচেছ এর খাবার ৷ বান্দা যদি এই নফসের উপর আল্লাহর এবাদতের বোঝা চাপায় কিংবা রোজা রাখে, তখন সে দুর্বল হয়ে পড়ে৷ অপরদিকে ভাল নফস বা নফসে মুতমায়িন্না হচেছ মানুষের বিবেক, ফেরেস্তা হচেছ যার সহযোগী, যাবতীয় এবাদত তাকে শক্তিশালী করে এবং পাপকাজ সমূহ তাকে দুর্বল করে৷ মানুষ যখন কোন অন্যায় কাজ করে , তখন এই নফস নির্ভয়ে বলে দেয়, তুমি এটা অন্যায় করেছ৷ এছাড়া মানুষের অন্তরে তৃতীয় আর একটি আহবানকারী উপাদান রয়েছে যাকে নফসে লাউওয়ামা বলা হয়৷ মোনাফেক ধরনের এই নফস অধিকাংশ সময় নিস্ক্রীয় থাকে বা অপর দুটি নফসের যে কোন একটির সাথে যোগ দেয়৷
মানুষের অন্তরে নফস এর উপস্তিতির কারণ :
আল্লাহ পাকের প্রতিটি কাজের মধ্যে হেকমত ও মানুষের জন্য কল্যাণ রয়েছে৷ নফস সংযুক্ত করার মাধ্যমে আল্লাহতা'লা মানুষ এবং ফেরেস্তার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন৷ তিনি নফসের খায়েসাত পুরনে ধাবিত হলে জাহান্নামের ভয় দেখিয়েছেন৷ অপর দিকে জান্নাতে নফসের খায়েসাত পুরনের অংগিকার করে দুনিয়াতে নফসে আম্মারার মুখে লাগাম দিয়ে মোজাহেদা করতে বলেছেন৷ আল্লাহ বলেন " এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা জাহান্নাম - পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালন কর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়াল খুশী থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে - তার ঠিকানা হবে জান্নাত৷" সুরা-আন-নযিআত আয়াত ৩৮-৪১
দুনিয়া এত ছোট যে নফসের খায়েসাত পুরনে একেবারেই অক্ষম৷ নফসের খায়েসাত এত বেশী যে কোন মানুষ যদি একটি স্বর্ণের পাহাড়ের মালিক বনে যায়, তবে সে আরেক টি স্বর্ণের পাহাড়ের সন্ধান করতে থাকে৷ নফস থাকার কারনে মানুষ এতটা কর্মঠ হয়েছে কারন নফস মানুষের মধ্যে লোভ-লালসা সৃষ্টি করে তাকে এক যায়গায় স্থির থাকতে দেয় না৷ নফসের তাড়নার কারনে মানুষের মধ্যে প্রবল কামনা বাসনা সৃষ্টি হয়৷ আর এই কামনা বাসনা পুরনে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় প্রবল কর্মস্পৃহা,যা পৃথিবীকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে৷ আখেরাতে জান্নতের প্রশস্ততা, এক মতির বালাখানা, হুরদের সোন্দর্য ও প্রাচুর্যতা, বেহেস্তের বাগান ও খানা খাজানা, শরাবের নদী, অভূতপূর্ব সুরের গান বাজনা ইত্যাদির আকর্ষন উপেক্ষা করে নফস নশ্বর দুনিয়াতেই এগুলো পেতে চায় এবং এজন্য মানুষকে উতলা বানিয়ে তাকে নফসের গোলামে পরিণত করতে চায়৷ অধিক থেকে অধিকতর সম্পদ অর্জন এবং ভোগ বিলাসের জন্য দুনিয়াতে মানুষকে প্রবল কর্ম উদ্দিপনায় আক্রান্ত করে নফস৷ বিশাল সম্পদের মালিক বনে যায় কিন্তু সামান্যই খেতে পারে কারন খুব ছোট একটি দেহের সংগে এই নফসকে জুড়ে দেয়া হয়েছে৷ অপর দিকে আখেরাতে নফস এমন এক বিশাল দেহ পাবে যে, এক লক্ষ ষাট হাজার প্লেট খানা একবারে খেতে পারবে৷ তাই নফসের এসলাহ সাধন করতে পারলে মানুষ, ফেরেস্তার চেয়ে অধিক মর্যদার অধিকারী হয়ে যায়৷ আবার নফসে আম্মারার গোলাম হয়ে যাবার কারনেই মানুষ পশুর চেয়ে অধমে পরিনত হয়৷ এ সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন " আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন , যে তার খেয়াল খুশীকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে" সুরা জাসিয়া আয়াত ২৩
নফস এর এসলাহ করার পদ্ধতি :
সাধারন ভাবে নফস বলতে নফসে আম্মারাকেই বুঝায়৷ ওলামায়ে একরামগন বলেছেন তিন উপায়ে এই নফসে আম্মারাকে দুর্বল এবং আস্তে আস্তে এর এসলাহ সাধন করা সম্ভব ৷ দ্বীনের দ্বায়ীর জন্য নফসের এসলাহ বা সংশোধন অত্যন্ত জরুরী৷ এসলাহকৃত নফস নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় বের হলে মানুষকে দ্বীনের দিকে সহজে আকৃস্ট করা যায় এবং দাওয়াত বা বয়ানে যে সব কথা বলা হয় তাতে নুর থাকে বিধায় শ্রোতাদের হৃদয়ে তার কথা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে৷ আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার উদ্দেশ্য হচেছ অন্য মুলমানকে আল্লাহর রাস্তায় বের করা ,তাই এসলাহকৃত নফস এই কাজে খুবই সফল হয়ে থাকে৷ কারন আল্লাহর রাস্তায় ভাল নফস বা নফসে মোতমাইন্না কাজ করার সুযোগ পায়৷ কিন্তু কি ভাবে আপনি আপনার নফসের এসলাহ করবেন ? এটি অতিশয় কঠিন একটি কাজ, তবে দ্বীনের দ্বায়ী বা আল্লাহর পথের প্রকৃত অভিযাত্রীদের জন্য অসম্ভব নয়৷
নফস এর এসলাহে প্রথম করনীয় কাজ :
সর্বাগ্রে নফসের এসলাহ করার নিয়্যাত করতে হবে এরপর আল্লাহতা'লার সাহায্য চাইতে হবে যেন এই কাজে তিনি সাহায্য করেন৷ কারন নফস আল্লাহ সৃষ্ট একটি উপাদান, যা তিনি সব মানুষের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছেন এবং নফসের কার্যকালাপ সম্পর্কে সতর্কও করে দিয়েছেন৷ আল্লাহপাক বলেন " আপনি কি তাকে দেখেন না , যে তার প্রবৃত্তিকে ( নফসে আম্মারা) খোদা রুপে গ্রহন করে ?" সুরা ফোরকান আয়াত ৪৩
নফস এর এসলাহে দ্বিতীয় করনীয় কাজ :
স্বীয় ইচছা ও আবেগের মুখে লাগাম দিতে হবে৷ অথ্যাত্‍ যায়েজ নয় এমন কামনা বাসনার কাছে পরাজিত হওয়া চলবে না৷ শক্তিমান উচছৃক্ষল জানোয়ারকে কম খাবার দেয়া হলে যেমন দুর্বল ও অনুগত হয়ে পরে, আমাদের নফস ঠিক সেই রকম একটি জানোয়ার৷ এর এসলাহ সাধন করার জন্য প্রথমে একে দুর্বল করে ফেলতে হবে নিম্ন উপায়ে :
সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেচেঁ থাকতে হবে এবং হারাম দেখা, হারাম খাওয়া, হারাম বলা এবং হারাম শুনা থেকে বিরত থাকতে হবে ৷
হারাম দেখা থেকে বাচাঁর উপায় :
ক) যদি আচানক নজর পড়ে যায়,তবে অতি দু্রত নজরকে ফেরানো৷ দ্বিতীয়বার না তাকানো৷
খ) প্রতি দিন বের হলে এই নিয়্যাত করা যে একটিও বদ নজরী করবো না৷
গ) পথে বের হলে নজর মাটির দিকে রাখতে হবে৷ আল্লাহতা'লা বলেছেন " মুমিনগনকে বলে দিন, চক্ষু যেন তারা নীচু করে রাখে" সুরা--------- আল্লাহতা'লা আরো বলেছেন " তিনি চক্ষুর লুকোচুরির ব্যাপার এবং অন্তরে যা কিছু গুপ্ত বিষয় সর্বকিছু অবগত" সুরা.........
হুজুর (স:) বলেছেন : স্ত্রীলোকের সোন্দর্য গোপন রাখার বস্তু , সোন্দর্য বলতে স্ত্রীলোকের সমগ্র শরীরকে বোঝায়৷ যে বেগানা স্ত্রী কিংবা পুরুষ একে অন্যের প্রতি ইচ্ছাপূর্বক কু-দৃষ্টি করে তার চোখে গলিত সীসা ঢেলে দেয়া হবে৷ দাইয়ুস কে ৫০০ বত্‍সরের দুরত্ব থেকে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে৷ তার জন্য জান্নাত হারাম৷ (দাইয়ুস : যে ব্যাক্তি নিজ স্ত্রী,মেয়ে, বোন ও মাকে পর্দায় রাখতে সচেষ্ট না থাকে )
হারাম খাওয়া থেকে বাচাঁর উপায় :
ক) কোন প্রকার লোভের বশবতর্ী না হওয়া, চলার পথে যদি স্বর্ণের ইট ও দেখা যায়৷ অন্যের সম্পদের দিকে না তাকানো, সম্পদের লালচ অন্তরে স্থান না দেয়া৷
খ) খানা তাহকিক করে খাওয়া
হারাম বলা থেকে বাচাঁর উপায় :
ক) প্রথমে চিন্তা করা, কথার ওজন করা, তার পর বলা৷
হারাম শোনা থেকে বাচাঁর উপায় :
ক) শ্রোতা, বক্তার সাথে জড়িয়ে যায়, তাই অশালীন কথা, গান-বাজনা, গানের সুর, রেডিও টেলিভিষন থেকে দুরে থাকতে হবে৷ কারন হারাম শব্দাবলী কানের মধ্যদিয়েই অন্তরে পৌছে এবং প্রথমেই অন্তরের পরহেজগারী বিনষ্ট করে , তারপর অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি করা শুরু করে৷
নফস এর এসলাহে তৃতীয় করনীয় কাজ :
মানুষের নফস, শয়তানের চেয়ে ৭০ গুন বেশী দুস্কৃতিশীল এবং মানুষকে বিপদে ফেলতে তার জুরি নেই৷ তাই নফসকে বলা হয় মানুষের প্রিয় দুষমন৷ আমার বুকের ভেতরে বাস করে আমারই মহা এক দুশমন ৷ আল্লাহতা'লার এবাদত ও আনুগত্যের বোঝা তার উপর এমন ভাবে চাপিয়ে দিতে হবে যাতে সে দুর্বল হতে থাকে৷ প্রতি দিনের কাজ কর্মের সাথে ব্যাক্তিগত আমল সমূহ এমন ভাবে সেট করে নেয়া উচিত্‍ যার মাধ্যমে নফসকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে ফেলা যায় ৷ তার পর একসময় উহার এসলাহ ( সাইজ) হয়ে যায়৷
নফসের উপর এবাদতের বোঝা কিভাবে চাপাবেন :
নফল নামাজ, নফল রোজা, কোরআন তেলাওয়াত , দান খয়রাত, খেদমত, জিকির এবং দাওয়াত্‍ অথ্যাত্‍ গাস্ত করার মাধ্যমে এটা করা যায়৷ দুনিয়াবী কাজের ব্যস্ততা রয়েছে, আবার নফসের এসলাহ করার কাজও চালিয়ে যেতে হবে, এমন ব্যাক্তি বর্গের জন্য নিম্নে , ভারী - মাঝারী হালকা এবং হালকা এই তিন ধরনের আমলের চার্ট দেয়া হলো যার মাধ্যমে নফসের উপর এবাদতের বোঝা চাপানো যাবে৷ এই আমলগুলি করতে হবে এস্তেকামাত বা দৃঢ়তার সাথে৷

ক) ভারী আমল
১/ এশার আগে সুরা ওয়াকেয়া, এশার বাদ সুরা মুলক ২/ শেষ রাতে তাহাজ্জতের নামাজ ১০ রাকাত ও জিকির ৩/ এশরাকের নামাজ এবং পাঁচ সুরার তেলাওয়াত - সুরা ইয়াসীন, সুরা আর-রহমান, সুরা ওয়াকেয়া, সুরা মুলক, সুরা মোজাম্মেল ৪/ সারা দিনে কমপক্ষে ১০ জনকে গাস্ত করা ৫/ তিন তজবী সকালে ও বিকেলে ৬/ আউয়াবীন নামাজ এবং ছালাতুত তজবী নামাজ প্রতি দিন বাদ মাগরীব ৭/ নফল রোজা রাখা অথবা ১০ জনকে খানা খাওয়ানো বা তার মূল্য দান করা৷
খ) মাঝারী হালকা আমল
১/ এশার আগে সুরা ওয়াকেয়া ২/ শেষ রাতে তাহাজ্জতের নামাজ ৬ রাকাত ও জিকির ৩/ এশরাকের নামাজ এবং তিন সুরার তেলাওয়াত - সুরা ইয়াসীন, সুরা আর-রহমান, সুরা মূলক ৪/ সারা দিনে কমপক্ষে ৫ জনকে গাস্ত করা ৫/ তিন তজবী সকালে ও বিকেলে ৬/ আউয়াবীন নামাজ এবং ছালাতুত তজবী নামাজ এক দিন বাদে এক দিন বাদ মাগরীব
৭/ নফল রোজা রাখা অথবা ৪ জনকে খানা খাওয়ানো বা তার মূল্য দান করা৷
গ) হালকা আমল
১/ এশার বাদ সুরা মুলক ২/ শেষ রাতে তাহাজ্জতের নামাজ ৪ রাকাত ও জিকির ৩/ এশরাকের নামাজ এবং - সুরা ইয়াসীন আদায় ৪/ সারা দিনে কমপক্ষে ২ জনকে গাস্ত করা ৫/ তিন তজবী সকালে ও বিকেলে ৬/ আউয়াবীন নামাজ এবং ছালাতুত তজবী নামাজ সপ্তাহে যে কোন একদিন বাদ মাগরীব ৭/ নফল রোজা রাখা অথবা ২ জনকে খানা খাওয়ানো বা তার মূল্য দান করা৷
নফস এর বিদ্রহ এবং তা দমনের উপায়
নফসকে এত শক্তিশালী করে আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন, তাই উহার এসলাহ বা সংশোধন সহজ কাজ নয়৷ বিশেষত নফসকে তার পাখা মেলার অবারিত সুঝোগ দিয়ে হটাত্‍ তা গুটানো ঠিক নয়৷ কাজটি করতে হবে আস্তে আস্তে ৷ আর তা করতে চাইলে নফস চুপচাপ থাকবে এবং মেনে নেবে এমনটি ভাবাও ঠিক নয়৷ নফস বিদ্রহ করে বসবে৷ নফস বিদ্রহ করলে কি কি অসুবিধা হয় ?
প্রথমত কোন কিছু ভাল লাগে না৷ দ্বিতীয়ত অন্তরে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়৷ দ্বীল বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়৷ বিনা কারনেই অধিনস্ত কাউকে বকা ঝকা করতে ইচেছ করে৷ মেজাজ কড়া হয়ে যায়৷ কারো গীবত করতে খুবই ভাল লাগে৷ অন্য মানুষের দোষ ত্রুটি দেখতে চোখ আগ্রহী হয়ে উঠে৷ তৃতীয়ত আল্লাহর এবাদত বন্দেগী করতে ভাল লাগে না৷ আল্লাহর রাস্তায় বের হতে দ্বীল একে বারে নারাজ হয়ে যায়৷ পুরো আচরনই অস্বাভাবিক হয়ে উঠে৷ এ সবই হচেছ নফসের বিদ্রহের আলামত !
এ অবস্থায় দোয়া ইউনুস, আসতাগফের এবং দোয়ায় মাছুরা বেশী করে পড়া উচিত্‍৷ আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারলে কিংবা রোজা রাখতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়৷ মন অথ্যাত্‍ নফস যা চায় তার উল্টা চলতে না পারলেও মনের চাহিদা পুরা না করা৷ এসময় চুপ চাপ থাকা এবং কম কথা বলা ৷ কিছুদিন এভাবে চলার পর সব কিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে৷ কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে কখন নফস আবার বিদ্রহ করে বসে৷ এজন্য খারাপ পরিবেশে না যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত্‍ করতে হবে৷
নফসে আম্মারা হচেছ রাত্রির অন্ধকার, রাত শেষ হলে দিন আপনা আপনিই আসে৷ ঠিক তেমনি নফসে আম্মারার এসলাহ সাধন করা সম্ভব হলে নফসে মোতমাইন্না আপনা আপনিই শক্তিশালী হয়ে যায়৷ ফলে বিবেক নামক আল্লাহ পাকের বিশাল আরেক নেয়ামত জাগ্রত হয়ে তা পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হতে থাকে৷
বিবেক ও বিবেকের স্বরুপ এবং প্রকার ভেদ :
মানুষের বিবেক হচেছ তার জ্ঞানের মূল উত্‍স৷ বিবেক এমন একটি গুন যা দ্বারা মানুষ পশু থেকে সতন্ত্র হয়েছে৷ বিবেক এমন একটি শত্তি যার দ্বারা মানুষ চিন্তাগত শাস্ত্র উপলব্দি করে অথ্যাত্‍ মানুষের মধ্যে চিন্তাগত জ্ঞান-বিজ্ঞন গ্রহন, গোপন কারিগরি বিষয় সম্পর্কে চিন্তা করার যোগ্যতা অর্জিত হয়৷ বিবেকের পূর্ণতা বা অপূর্ণতা রয়েছে৷ চেস্টা সাধনা এবং আল্লাহর সাহায্য কামনার মাধ্যমে বিবেকের পূর্ণতা আনায়ন করা যায়৷
হুজুর (স:) বলেন : সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'লা বিবেক সৃস্টি করেছেন, তারপর তাকে বলেছেন সামনে এস৷ সে সামনে এলে বললেন পুষ্ঠপ্রদর্শন কর৷ সে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে আল্লাহপাক বললেন : আমার ইয্যত ও মাহাত্নের কসম, আমি তোমার চেয়ে অধিক সন্মানিত কোন কিছু সৃষ্টি করিনি৷ আমি তোমার মাধ্যমেই সন্মান ছিনিয়ে নেব, তোমার মাধ্যমেই সন্মান দেব, তোমার কারনেই সোওয়াব দেব এবং তোমার কারনেই শাস্তি দেব৷ হুজুর (স:) আরো বলেন: মানুষের উপার্জনের মধ্যে বিবেক বুদ্ধির সমান কোন কিছু নেই৷ বিবেকহীন ব্যাক্তি মূর্খতার কারনে পাপাচারীর চেয়ে বেশী পাপ করে ফেলে৷ বিবেক বুদ্ধি মানুষকে হেদায়েতের দিকে পথ প্রদর্শন করে এবং ধ্বংসের কবল থেকে বাঁচিয়ে রাখে৷ মানুষের বিবেক পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার ইমান পূর্ণ হয় না এবং দ্বীন সঠিক হয় না৷ হজরত আবু সায়ীদ খুদরী (রা:) রেওয়াতে হুজুর (স:) বলেন প্রত্যেক বস্তুর একটি ভরসা আছে৷ ইমানদারের ভরসা হলো বিবেক৷ অতএব তার এবাদত তার বিবেক অনুযায়ীই হবে৷ হজরত আবু হোরায়রা (রা:) বর্ননা করেন অহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে হুজুর (স:) সাহাবীদের বলাবলী করতে শুনলেন অমুকের চেয়ে অমুক বেশী বীর প্রমানিত হয়েছে ইত্যাদি৷ রাসুলুল্লাহ (স:) বললেন - তারা ততটুকু যুদ্ধ করেছে যতটুকু আল্লাহ তা'লা তাদের বিবেক দান করেছেন৷ তাদের জয় পরাজয়ও তাদের বিবেক অনুসারে হয়েছে৷ তাদের মধ্যে যারা শহীদ হয়েছে তাদের স্তর বিভিন্ন রুপ হয়েছে৷ কেয়ামতের দিন তারা তাদের বিবেক ও নিয়্যাত অনুসারে মর্যাদা লাভ করবে৷
হজরত আয়শা (রা) বলেন আমি রাসুলুল্লাহ (স:) এর কাছে আরজ করলাম- দুনিয়াতে মানুষের শ্রেষ্টত্ব কোন বিষয়ের দ্বারা? তিনি বললেন: বিবেকের দ্বারা৷ আমি আরজ করলাম আখেরাতে কোন বিষয়ের দ্বারা? তিনি বললেন: বিবেকের দ্বারা৷ আমি আরজ করলাম -তাদের কর্মের বিনিময়ে প্রতিদান হবে না? তিনি বললেন : আয়শা, তারা কর্ম ততটুকু করবে যতটুকু আল্লাহ তাদের বিবেক দিয়ে থাকবেন৷
কিভাবে আপনি আপনার বিবেকের পূর্ণতা আনায়ন করবেন ?
বিবেক হচেছ মানুষের কতক জাজ্বল্যমান জ্ঞান৷ যখন কোন ব্যাক্তি স্বভাবগত ভাবে যে কোন তাত্‍ক্ষনিক অনৈতিক আনন্দ লাভের প্রবৃত্তিকে দমন বা নিয়ন্ত্রন করার শক্তি রাখেন, তখন তাকে বিবেকবান বলা যেতে পারে৷ রাসুলুল্লাহ (স:) হজরত আবু দরদা (রা:) কে বলেন -তুমি অধিক বিবেকবান হও , যাতে আল্লাহ তা'লার অধিক নিকটবতর্ী হতে পার৷ আবু দরদা (রা:) আরজ করলেন: আমার পিতামাতা আপনার প্রতি উত্‍সর্গ হোন আমার জন্য এটা কিভাবে সম্ভবপর হবে? রাসুলুল্লাহ (স:) বললেন আল্লাহ তা'লার হারাম বিষয় সমূহ থেকে বেচেঁ থাক, তার ফরজ কর্ম সম্পাদন কর এবং সত্‍কর্ম অবলম্বন কর৷ এতে দুনিয়াতে তোমার মাহত্ন্য বাড়বে এবং আল্লাহ তা'লার কাছে তোমার নৈকট্য অর্জিত হবে৷হজরত সায়ীদ ইবনে মুসায়ীব (র:) বর্ননা করেন : হজরত ওমর (রা), হজরত উবাই ইবনে কাব (রা) এবং হজরত আবু হোরায়রা (রা) রাসুলুল্লাহ (স:) এর খেদমতে আরজ করলেন : ইয়া রাসুলাল্লাহ সর্বাধিক আলেম কে ? তিনি বললেন বিবেকবান৷ আবার প্রশ্ন হল সর্বাধিক এবাদতকারী কে ? তিনি বললেন বিবেকবান৷ তারা আবার আরজ করলেন : যে ব্যাক্তি পূর্ণ মনুষত্ব্যের অধিকারী, বহ্যত : শুদ্ধভাষী, দানশীল ও উচ্চ মর্যাদাশীল, সে-ই কি বিবেকবান নয়? তিনি বললেন : এগুলো তো পার্থিব জীবনের বিষয়৷ আল্লাহর কাছে মুত্তাকীদের জন্য আখেরাত ভাল৷ অতএব সে-ই বিবেকবান, যে মুত্তাকী অথ্যাত্‍ খোদাভীরু৷ অতএব এক জন দ্বীনের দ্বায়ী হবার প্রত্যাশী ব্যাক্তি তার নিজের মধ্যে মুত্তাকীর গুন সমূহ আনায়ন করার চেস্টা করবে৷ তাহলে তার মধ্যে বিবেকের পূর্ণতা আসতে থাকবে৷
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা:) এর রেওয়ায়েত, রাসুলুল্লাহ (স:) বলেন " ফেরেস্তারা আল্লাহ তা'লার কাছে আরজ করলো, ইলাহী, আপনি আরশের চেয়েও বড় কোন কিছু সৃষ্টি করেছেন কি? এরশাদ হলো : হাঁ, বিবেক আরশের চেয়েও বড়৷ প্রশ্ন হলো, এর পরিমান কতটুকু ? আল্লাহ বলেন : তোমরা এটা পুরোপুরি জানতে পারবে না৷ তোমরা বালুকার সংখ্যা জান কি ? উত্তর হলো, না ৷ আল্লাহ বলেন : আমি বিবেককেও বালুকার সংখ্যানুযায়ী বিভিন্ন রুপে সৃষ্টি করেছি৷ কেউ পেয়েছে এক রত্তি, কেউ পেয়েছে দুই রত্তি, কেউ পেয়েছে তিন রত্তি, কেউ পেয়েছে চার রত্তি৷ আবার কেউ পেয়েছে আট সেরের কাছাকাছি এবং কেউ এক উটের বোঝাই পরিমানে প্রাপ্ত হয়েছে" আল্লাহ তা'লা আরো বলেন জাহান্নামে গিয়ে কাফেরা বলবে - " যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক খাটাতাম, তবে জাহান্নামীদের অন্তভর্ুক্ত হতাম না৷" সুরা-------- আয়াত----- হজরত আবু সাইদ খুদরী (রা:) এর রেওয়ায়েতে রাসুলুল্লাহ (স:) বলেন " প্রত্যেক বস্তুর একটি ভরসা আছে৷ ইমানদারের ভরসা হলো বিবেক৷ অতএব তার এবাদত তার বিবেক অনুযায়ীই হবে৷ রাসুলুল্লাহ (স:) বলেন হে লোক সকল ! আল্লাহকে চেন এবং পরস্পর একে অপরকে বিবেকের উপদেশ দাও৷ এতে সিদ্ধ ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ জানতে পারবে৷ জেনে রাখ,বিবেক তোমাদেরকে তোমাদের পরওয়ারদেগারের কাছে মাহাত্ন দান করবে৷ জেনে রাখ, সে-ই বিবেকবান যে আল্লাহর আনুগত্য করে, যদিও সে দেখতে কুশ্রী, মান্যতায় নিকৃষ্ট এবং মর্যাদায় কম হয়৷ আর জাহেল সে-ই ব্যাক্তি, যে আল্লাহ তা'লার নাফরমানী করে৷ তার তুলনায় শুকর ও বানর অধিক বিবেকবান৷
বিশেষ দ্রষ্টব্য :
যে সব মোবাল্লেগ গন ছোট বেলা থেকে নিয়ন্ত্রিত দ্বীনি পরিবেশে বড় হয়েছেন৷ অথ্যাত্‍ তাদের নিজেদের নফস ও শয়তান তাদের ইচেছমত পাখা মেলার সুযোগ পায় নি, ফলে তাদের নফস এসলাকৃত এবং শয়তান দমিত হয়ে আছে৷ ফলে উপরে উল্লেখিত অনেক বিষয় তাদের কাছে অবাস্তব মনে হতে পারে৷
৫ম অধ্যায় : নিজ শরীর এবং স্বাস্থ্যের বিষয়ে যত্নবান হওয়া
মানব দেহ আল্লাহতা'লা নিজ কুদরতী হাত দ্বারা বানিয়েছেন৷ মানব দেহ তৈরীর উপকরন হচেছ আগুন পানি মাটি এবং বাতাস ৷ এই উপকরন গুলি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ ভুমিকা পালন করে থাকে৷ দ্বীনের দ্বায়ী হবার প্রত্যাশী ব্যাক্তিকে নিজের শরীর এবং স্বাস্থ্যের সুরক্ষার বিষয়ে এমন ভাবে চলতে হবে যেন জীবনের অন্তিম মুহুত্ত পর্যন্ত সক্ষম থাকতে পারেন৷ যে নিজেকে সাহায্য করে আল্লাহ তা'লা তাকে সাহায্য করেন৷ কিন্তু শর্ত হচেছ আল্লাহর রাস্তায় বের হবার আগে বা পরে তাকে নুনতম স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে এবং একই সাথে সুস্থ্যতার জন্য আল্লাহ তা'লার সাহায্য চাইতে হবে৷ সুস্থ্যতা জন্য আল্লাহ তা'লার শুকরিয়া আদায় করতে হবে৷ কারণ সুস্থ্যতার আল্লাহ তা'লার একটি নেয়ামত৷ বস্তুত নুনতম স্বাস্থ্য বিধি না মেনে চলার কারনেই নানান শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হতে থাকে৷
নুনতম স্বাস্থ্য বিধি কি ?
নুনতম স্বাস্থ্য বিধি হচেছ স্বাস্থ্য রক্ষায় এমন নিয়ম কানুন যা মেনে চললে বহুবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে বেঁচে থাকা যায়৷ যেমন :
ক) পেটে কিছু ক্ষুধা অবশিষ্ট থাকতেই খানার প্লেট থেকে হাত উঠিয়ে নেয়া
চর্চা করার মাধ্যমে এধরনের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়৷ যে কোন বয়সে এটা করা হলে স্বাস্থ্য হানির পরিবর্তে স্বাস্থ্য গড়ে উঠতে থাকবে৷ কারন এর ফলে পাকস্থলীতে খানার হজম প্রক্রিয়া সুসম হয় এবং খানার সারাংশ শরীরে সহজে গৃহীত হয়ে থাকে৷ খানার ব্যাপারে হুজুর (স:) এর সুন্নত তরিকার মূল বিষয় হচ্ছে " ক্ষুধা লাগলে খানা খেতে মাটিতে বিছানো দস্তরখানে বসে যাও এবং ক্ষুধা বাকী থাকতেই খানা খাওয়া বন্ধ করো৷" এজন্যই খানা সুস্বাদু হলেও হুজুর (স:) কখনো খানার প্রশংসা করতেন না, কারন তাতে খানার প্রতি লালসা বৃদ্ধি পেতে পারে৷ আবার খানা নিন্ম মানের বা বিস্বাদ হলেও তিনি খানার নিন্দা করতেন না৷ একে বারে অপছন্দ হলে হাত উঠিয়ে নিতেন৷
হুজুর (স:) পেটকে তিন ভাগ করে এক ভাগ খানা, এক ভাগ পানি এবং এক ভাগ খালি রাখতে বলেছেন৷ আধুনিক পরিপাক বিজ্ঞান বলছে মানুষের লিভার থেকে যে পরিমান পাচক রস নির্গত হয় তা পাকস্থলীর মোট ধারন ক্ষমতার তিন ভাগের এক ভাগ পরিমান খাবার পরিপাকের জন্যই উপযোগী৷ একই ভাবে আহারের বিষয়ে হুজুর (স:) এর সবগুলি আচরনই স্বাস্থ্য সম্মত৷
খ) সঠিক সময়ে সঠিক পরিমান পানি পান করা
বিশুদ্ধ পানি আল্লাহতা'লার এক বিশেষ নেয়ামত৷ দৈনিক কত বাটি বা গ্লাস পানি পান করা হবে তা নিজ ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে ঠিক করা৷ পানি পানের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধ্যারন করে নেয়া উচিত্‍৷ যেমন বাদ ফজর ২ থেকে ৪ গ্লাস, এই পানি পানের ১ ঘন্টার মধ্যে নাস্তা না খাওয়া৷ দুপুরের খাবারের দুই ঘন্টা আগে এবং দুই ঘন্টা পরে ২ থেকে ৪ গ্লাস এবং রাতের আহারের আগে পরে মিলিয়ে অবারও পানি পান করা যেতে পারে৷ দৈনিক কমপক্ষে ৮ গ্লাস, উধের্্ব ১৬ গ্লাস পানি পান করা উচিত্‍৷ হুজুর (স:) আহারের পর পরই পানি পান করতেন না৷ তিনি আহারের পর পরই শুয়ে ঘুমিয়ে পরতে নিষেধ করেছেন৷ রাতের আহারের পর কোরআন তেলাওয়াত এবং তিন তজবীর আমল করা যেতে পারে৷
গ) সঠিক সময়ে এবং সঠিক পরিমানে আহার করা প্রসংগে
প্রতি দিন একই সময়ে আহার জীবনকে একটি শৃঙখলায় চলতে সাহায্য করে৷ অনিয়মিত সময়ে আহার নানা প্রকার শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করে৷ এছাড়া মানুষের জিহবা হচ্ছে লালসা উদ্রেককারী অংগ৷ খাবার মুখরোচক হলে বেশী খেতে চাওয়াই স্বাভাবিক৷ যে ব্যাক্তি সংযম করতে পারবে সেই অধিক ভোজন কারীর বিপদ থেকে তাকওয়া অবলম্বনকারী৷ অত্যাধিক ভোজন নীতি ও নৈতিকতা বিরোধী একটি কাজ৷
অধিক খাবার গ্রহনে ১০ টি বিপদ
১/ অধিক খাবার গ্রহনের কারনে অন্তর কঠিন হয়ে যায় এবং অন্তকরনের জ্যোতি নিভে যায়৷
২/ অধিক খাবার গ্রহন শরীরকে বাজে এবং অনিষ্টকর কাজে ব্যস্ত রাখে
৩/ অধিক খাবার গ্রহন করলে বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়
৪/ অধিক খাবার গ্রহন শরীরে অবসাদ নিয়ে আসে ফলে এবাদত কমে যায়
৫/ অধিক খাবার গ্রহনে এবাদতের আনন্দ বিলোপ হয়ে যায়
৬/ অধিক খাবার গ্রহন বান্দাকে সন্দেহজনক বসু্ত খেতে উস্কানি দেয়
৭/ অধিক খাবার গ্রহনের অর্থ যোগারে বান্দাকে সর্বদা ব্যতি ব্যাস্ত থাকতে হয়৷
৮/ অধিক খাবার গ্রহনের পরিনতি হচেছ আখেরাতে আজাব /হয়রানি হওয়া
৯/ অধিক খাবার গ্রহনের কারনে আখেরাতে নেকী কমে যাবে
১০/ অধিক খাবার গ্রহন অভিশাপ / বিপদ ডেকে আনে৷
একদা হুজুর (স:) এর দরবারে হজরত আবু হোযায়ফা (রা:) ঢেকুর দিলে তিনি বলেন ঢেকুর কম উঠাও, দুনিয়াতে যে ব্যাক্তি তৃপ্তি সহকারে ভোজন করবে, সে রোজ কেয়ামতে ক্ষুধা-পিপাসায় ভীষন কষ্ট পাবে৷ অপর দিকে পরিমিত আহার রোগ প্রতিরোধ করে৷ কিছু সময়ধরে ক্ষধার্ত থাকতে পারলে বহুবিধ উপকার সাধিত হয়ে থাকে৷
ক্ষুধার্ত থাকার ১০ টি উপকার :
১/ ক্ষুধা আত্নাকে নির্মল ও পরিস্কার করে, স্বভাবকে সতেজ করে এবং দৃষ্টিকে সূক্ষ্ন করে৷
২/ ক্ষুধা দ্বারা হৃদয় কোমল ও নির্মল হয় ফলে জিকির ও মোনাজাতের মিষ্টতা অনুভব করা যায়
৩/ ক্ষুধা প্রবৃত্তিকে বশীভূত করে
৪/ ক্ষুধার্ত থাকলে ক্ষধিতজনের কষ্ট ক্লেশের স্বরুপ কেমন তা উপলব্দি করা যায়৷
৫/ক্ষুধা পাপের লালসাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে
৬/ ক্ষুধা ঘুমের প্রকোপ কমায়
৭/ ক্ষুধা এবাদতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে৷
৮/ ক্ষুধা স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ ব্যাধির বিলুপ্তি ঘটায়
৯/ ক্ষুধা জীবন যাপনে স্বল্প ব্যয় নিশ্চিত্‍ করে
১০/ ক্ষুধা আত্ন্ম্ভরিতা ত্যাগে সহায়তা করে৷
হজরত আয়শা (রা:) বলেন " হুজুর (স:) কখনো তৃপ্তি সহকারে খানা খান নি৷ কখনও কখনও তার ক্ষুধার কষ্ট দেখে তার প্রতি স্বহৃদয়তায় আমি ক্রন্দন করতাম৷ তার পেটের উপর হাত বুলিয়ে দিতাম৷" একাধারে তিন দিন না খেতে পারার ঘটনা হুজুর (স:) এর জীবনে অনেকবারই ঘটেছে৷ হজরত আনাস (রা:) বর্ননা করেন - একদা হযরত ফাতেমা (রা:) এক খন্ড রুটিসহ হুজুর (স:) এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেন, কি এনেছ মা ? হযরত ফাতেমা (রা:) বললেন, আমি আটা দিয়ে রুটি তৈরী করেছি আব্বাজান! কিন্তু আপনাকে এর অংশ না দিলে আমি এ রুটি খেতে পারবো না৷ তখন হুজুর (স:) বললেন তিন দিন অনাহারের পর তোমার তৈরী এ খাদ্যই তোমার পিতার পেটে প্রথম যাবে৷ ঘ) মাটির সাথে সংস্পর্শ রাখা এবং সঠিক মাত্রায় হাটা অথবা শরীর চর্চা
পৃৃথিবীর জমিন থেকে নেয়া কর্দমাক্ত খনখনে মাটির দ্বাারা তৈরী হয়েছে মানুষের দেহ৷ ফলে মাটির সাথে মানব দেহের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে , তাই মাটির সংস্পর্শ মানব দেহের জন্য উপকারী৷ মানব দেহে যে বিদ্যুত্‍ তৈরী হয় মাটির সংস্পর্শে এলেই তা জমিনে চলে যায়৷ এজন্য সম্ভব হলে ঘাসের উপর কিছু সময় খালি পায়ে হাটা উচিত্‍৷ এজন্যই গ্রামের কৃষকগনের মধ্যে যারা সরাসরি জমিতে কাজ করেন তারা অনেক রোগ ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকেন৷ সকালে খালি পেটে হাটা বা শরীর চর্চা সব ধরনের সব বয়েসী মানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী বিশেষত যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত৷ আল্লাহর রাস্তার মেহমান যারা এই বিশেষ রোগে আক্রান্ত তাদের কল্যানে কিছু দরকারী আলোচনা :
১/ প্রথমত নিজ ডাক্তারের যাবতীয় নির্দেশনা একশত ভাগ মেনে চলার চেষ্টা করা৷ এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ইনসুলিন (যদি আদিষ্ট থাকে) এবং মেডিসিন গ্রহন উল্লেখযোগ্য৷ সপ্তাহে অন্তত একদিন গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তের সুগার এর মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত্‍৷
২/ আল্লাহর রাস্তায় চলা অবস্থায় খানা খেতে বিলম্ভ হবার সম্ভবনা হলে নিজ ব্যাগে রক্ষিত বিকল্প খাবার যেমন: সঠিক মানের বিস্কুট, কলা,হরলিকস লাইট কিংবা আপেল ইত্যাদি খেয়ে নিতে হবে যাতে হাইপোগ্লাইসেনিয়া দেখা দিতে না পারে৷
৩/ খানা খেতে বসলে নিজের জন্য নির্দিষ্ট পরিমান এবং নির্দিষ্ট কিলো ক্যালরির খানা খাওয়া হয়েছে মনে হলেই সাথীদেরকে বলতে হবে, যে আমার খাওয়া আপাতত: শেষ হয়েছে ! সাথীদের খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে বসে থাকা কিংবা অনুমতি নিয়ে উঠে পড়তে হবে৷ এরপর দাঁত খিলাল করে মেসওয়াক করে ফেলতে দেরী করা যাবে না৷
৪/ ডায়বেটিক রোগ কোন রোগই নয় যদি এটাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখা যায়৷ এখানে মূল বিষয় হচ্ছে " খেতে বসলে পরিমানে কম খাওয়া , প্রয়োজনে তিন বারের পরিবর্তে পাঁচ বার খাওয়া- যাতে শরীরের মধ্যে প্রবাহিত রক্তে গ্লুকোজের পরিমান বাড়তে না পারে৷"
৫/ সকালের বয়ানের পর সবাই যখন আরাম করে, তখনই খালি পেটে ৪০ মিনিট থেকে এক ঘন্টা হাটতে হবে কেডস মুজা পায়ে দিয়ে৷ হাটার ধরন হচ্ছে লম্বা করে পা ফেলে আর্মি স্টাইলে যতটা সম্ভব দ্রুত৷ এই হাটা হাটি শরীরে ঘাম সৃষ্টি করলে ভাল হয়৷ সমস্যা হচ্ছে যদি মসজিদের বাহিরে বৃষ্টি কিংবা তুষারপাত হতে থাকে! এ অবস্থায় মসজিদের বারান্দায় মোটা কাপড় বিছিয়ে যোগ ব্যায়ামের নির্দিস্ট কয়েকটি আসন করে ফেলা যেতে পারে যে গুলি ডায়বেটিক রোগ প্রতিরোধী৷ অথবা বিদ্যুত্‍ চালিত ভাইব্রেটিং মেশিনের সাহায্যে হাটার বিকল্প কর্ম সম্পাদন করে নেয়া যায়৷
৬/ ডায়েবেটিক বেশী মাত্রায় আছে এমন মোবাল্লেগদের প্রস্রাব জনিত সমস্যা তাদের বিব্রত করতে পারে৷ বিশেষত বাথরুম দেখা মাত্র প্রসাবের বেগ বৃদ্ধি পাওয়া একটি রোগ, যার চিকিত্‍সা রয়েছে৷ পানি পানের সময়ের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এর তীব্রতা অনেকাংশে হৃাস করে ফেলা যায়৷ সকালে হাটার পর কচি ডাবের পানি খেতে পারলে উপকার পাওয়া যায়৷ মোট কথা সতর্কতা , চেষ্টা , আগ্রহ এবং আল্লাহর নিকট সাহয্য কামনার মাধ্যমে যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় চলতে পারেন৷ আল্লাহ আমাদের সকলকে মৃত্যুর পূর্ব মুহুত্ত পর্যন্ত সক্ষম থেকে আল্লাহর রাস্তায় চলান তৌফিক দান করুন৷
৬ষ্ঠ অধ্যায় : দ্বীনের দ্বায়ীর সেফত্‍ বা গুণসমুহ নিজের মধ্যে আনায়ন
যে ব্যাক্তি দাওয়াতের মেহনতকে অথ্যাত্‍ মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করাকে নিজের জীবনের প্রধান কাজ হিসেবে বাছাই করে নিয়েছে এবং এজন্য এখলাসের সাথে নিজের জান-মাল এবং সময়কে দ্বীনের তাকাযা অনুসারে ব্যয় করে, সামগ্রিকভাবে তার এই আচরনকে দ্বীনের দ্বায়ী হবার একটি মেহনত বলা যেতে পারে৷ তবে দ্বীনের দ্বায়ী হবার বিষয়টি একটি অত্যন্ত নাযুক বা গোপনীয় একটি বিষয়৷ দুনিয়াতে মুসলমান বান্দা শুধু মাত্র একজন দ্বায়ীর গুন সমূহ কি কি তা জানতে এবং এসব গুন হাসিল করার জন্য একনিষ্ঠভাবে প্রচেষ্টা চালাতে পারেন৷ তিনি আসলেই দ্বীনের দ্বায়ী হতে পারলেন কিনা তা বুঝা যাবে মৃত্যুর পর৷ হুজুর (স:) ছিলেন সর্ব কালের সেরা দ্বায়ী ৷ তিনি সরাসরি সাহাবীদেরকে দাওয়াতের মেহনত শিক্ষা দিয়েছিলেন৷ এই মেহনত করতে গিয়ে সাহাবীরা জান ও মালের যে কোরবানী দিয়েছিলেন তা তাদেরকে দ্বায়ীর উচ্চ মর্যাদায় পৌছে দিয়েছিল৷ এজন্য হুজুর (স:) এর অনুসরণই হচ্ছে দ্বীনের দ্বায়ী হবার সবচেয়ে বড় প্রেরণা৷ তিনি তার জীবনের শেষ দিকে সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলতেন " আমার আর তোমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই৷ শুধূ পার্থক্য এত টুকু যে আমার কাছে অহী আসে তোমাদের কাছে অহী আসে না৷" আসলে এই অবস্থা হচ্ছে মানব জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন৷ সাহাবীরা যে মেহনতের মাধ্যমে এরুপ মর্যাদা পেয়েছিলেন, সেই মেহনত এখন আমাদের সামনে রয়েছে৷ এখন যদি আমরা এই মেহনত কে কোরবানী এবং এখলাসের সাথে করি তবে আল্লাহপাক সুনিশ্চত্‍ভাবে আমাদেরকেও একই মর্যদা দান করবেন৷ হযরত মাওলানা ইলিয়াস (র:) বলতেন আমি বজুর্গ নই, কিন্তু দাওয়াতের এই মেহনত বুজুর্গওয়ালা মেহনত৷ যে ব্যাক্তি এই মেহনতকে আপন করে নেবে সে বুজুর্গ বনে যাবে৷
দ্বীনের দায়ীকে যে সব সিফাত বা গুন অর্জন করতে হয় :
সিফতে হেকমত/বাসিরাত :
এটা হচ্ছে প্রঙা বা কৌশল অবলম্বন করে দৃঢ় একিনের সাথে মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়ার পদ্ধতি৷ দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে হেকমত শিখতে হয়৷ প্রকৃত হেকমত আল্লাহতা'লার দান৷ আল্লাহ বলেন " যাকে হেকমত দান করা হয়েছে তাকে উত্তম বস্তুই দান করা হয়েছে৷" সুরা--------- আয়াত------------অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন " কিতাব ও হেকমত শিক্ষ গ্রহন করা উচিত্‍" সুরা ---------- আয়াত--------অতএব যে ভাবে কিতাব শিখতে হয় অনুরুপ হেকমতও শিখতে হয়৷ কিন্তু এই হেকমত তার কাছেই আসে যার মধ্যে আল্লাহর ভয়, পরহেজগারী রয়েছে এবং যার নফস এর এসলাহ সাধিত হয়েছে৷ আল্লাহতা'লা বলেন " অথ্যাত্‍ তিনি যাকে ইচ্ছা হেকমত প্রদান করেন৷" সুরা----- আয়াত----- এজন্য হেকমতের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে দ্বীনের জন্য উন্মোচন করতে আল্লাহতা'লার নিকট সাহায্য কামনা করা প্রয়োজন৷ উদহারন সরুপ পরিচিত প্রতিবেশী কে দাওয়াত দেয়ার একটি সাধারন হেকমত নিন্মে উল্লেখ করা হলো :
ক) প্রথমে আপ্যায়ন করা
খ) ধমর্ীয় অনুভুতি সৃষ্টির জন্য চেষ্টা করা
গ) দ্বীনের দাওয়াত দেয়া
ঘ) আল্ল্লাহর রাস্তায় বের করা বা করার চেষ্টা করা৷
কিন্তু দাওয়াত দেয়ার সময় জরুরী হচ্ছে : ১/ সময় বুঝা ২/ মেজাজ বুঝা ৩/ লোককে চেনা ও তার কথা শুনা
দাওয়াতে তাবলীগে গাশতের আদব ও গুরুত্ব :
গাশত হচ্ছে দাওয়াতের মেহনতের মেরুদন্ড৷ সকল নবী রাসুলগনের মধ্যে ছিল এই বুনিয়াদী কাজের প্রথা বা ছিলছিলা৷ তারা নবুয়ত প্রাপ্তির পর যে কাজ করার মাধ্যমে নিজেদের মানুষের সামনে প্রকাশ করতেন তা হচ্ছে গাশত৷ রাসুলুল্লাহ (স:) মক্কায়,তায়েফে, হজ্জের মৌসুমে মিনায়, আরাফায় এবং হিযরত করার পর মদিনায় ও তার আশেপাশে গাশত করেছেন লাগাতর ভাবে ৷ এসব গাশতে কখনো তিনি একা কিংবা রাহবার / সাথী হিসেবে যাদের নিয়েছিলেন তারা হচ্ছেন হযরত আবু বকর (রা:) হযরত যায়েদ বিন সাবেত (রা:) হযরত আব্বাস (রা:) প্রমূখ৷ গাশতের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেবার দেয়ার মশক রয়েছে৷ গাশতের মধ্যে এখলাসের মশক রয়েছে৷ গাশতের মধ্যে অন্তদৃষ্টি অর্জন করার মশক রয়েছে৷ অন্তরে উম্মতের জন্য দরদ ও ফিকির অর্জন করতে গাশতের কোন বিকল্প নেই৷ যে পরিমান কষ্ট গাশতের আমলে করতে হয়, তা অন্য আমলে মধ্যে করতে হয় না৷ তাই গাশত জিন্দা হলে দ্বীন জিন্দা হয়ে যাবে৷ উদহারন হিসেবে উমমী গাশতে দাওয়াত দেবার একটি আহাম পদ্ধতির উল্লেখ করা যেতে পারে :
প্রথমে তৌহিদের দাওয়াত : যেমন : আল্লাহতা'লা খালেক - আল্লাহতা'লা মালেক - আল্লাহতা'লা রাজ্জাক - আল্লাহতা'লা রব ৷
রেসালাতের দাওয়াত :
হুজুর (স:) এর সুন্নতের মধ্যেই হেদায়েত ৷ হুজুর (স:) এর সুন্নতের মধ্যে শান্তি রহমত বরকত৷ হুজুর (স:) এর সুন্নতের দাম সাত আসমান জমিনের চেয়ে বেশী৷ যে ব্যক্তি হুজুর (স:) এর একটি সুন্নত জিন্দা করবে সে এক শত শহীদের নেকী পাবে৷
আখেরাতের দাওয়াত :
যে ব্যক্তি হুজুর (স:) এর সুন্নতের উপর জীবন যাপন করবে, তার ইমানী মৃতু্য নসীব হবে৷ হুজুর (স:) এর সুন্নতের উপর আমলকারীর জন্য আল্লাহপাক কবরে শান্তি ও আরামের ব্যাবস্থা করবেন৷ হাসরের ময়দানে সে আল্লাহপাকের মেহমান হিসেবে খাড়া হবে৷ আর মেহমানের মেহমানদারীর খাতিরে আল্লাহ তা'লা তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন৷
সিফতে ইহসান :
ইহসান আরবী শব্দ৷ এর আভিধানিক অর্থ সুন্দর ব্যবহার৷ ইসলামের পরিভাষায় ইহসান হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য উত্তমরুপে ইবাদত করা এবং তার সৃষ্টির প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা৷ অথ্যাত্‍ আল্লাহ ও তার মাখলুকের প্রতি যাবতীয় কর্তব্য
সুন্দর ও উত্তমরুপে সম্পাদন করার নামই ইহসান৷ আল্লাহতা'লা বলেন " যে ব্যাক্তি ইহসানকারীরুপে আল্লাহর নিকট একান্তভাবে আত্নসমর্পন করে , সে তো মজবুত হাতল ধারন করে ,আর সমস্ত কাজের ফলাফল তো আল্লাহরই ইখতিয়ারে৷" সুরা:লোকমমান আয়াত : ৩১ তিনি আরো বলেন " নিশ্চয়ই আল্লাহ ইহসানকারীদের সাথে আছেন৷" সুরা আনকাবুত আয়াত ২৯ :৬৯ ইহসানের ন্যায় মহত্‍ গুন ব্যতিত প্রকৃত মুমিন হওয়া যায় না৷ কারন ইমানের বিভিন্ন আহকাম ও আমল সুন্দররুপে সম্পন্ন করার জন্য ইহসান অপরিহায্য৷ এবাদতকারী ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহরই এবাদত করবে৷ এপ্রসংগে হুজুর (স:) বলেন " তুমি এমনভাবে আল্লাহর এবাদত করবে ,যেন তুমি তাকে দেখছো, তুমি আল্লাহকে দেখতে না পেলেও তিনি তোমাকে দেখতেছেন৷"
পিতা মাতা,আত্নীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, অতিথি, দুস্থ, ইয়াতীমের প্রতি ইহসান তথা সদাচরন করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷ এরশাদ হয়েছে " এবং পিতা মাতা ,
আত্নীয়-স্বজন ,ইয়াতীম , অভাবগ্রস্থ ,নিকট প্রতিবেশী ,দুর প্রতিবেশী, সংগী-সাথী , মুসাফেরদের প্রতি সদ্বব্যবহার করবে৷ সুরা নেসা আয়াত ৪:৩৬ মানুষ ছাড়াও উদ্ভিদ , প্রানী,জীব-জন্তু এবং কীট-পতংগের প্রতিও ইহসান করতে হবে৷ হুজুর (স:) বলেন " তোমরা যমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবে , তাহলে আসমানের অধিপতি আল্লাহও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন৷ ( তিরমিজী )
ইহসান মানব চরিত্রে একটি অত্যন্ত মহত্‍ গুন৷ সবচেয়ে বড় ইহসান হচ্ছে মানুষকে জাহন্নামের আগুন থেকে বাচিঁয়ে তাকে জান্নাতের উপযুগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করা অথ্যাত্‍ আল্লাহর রাস্তায় বের করা৷ কিন্তু দুনিয়ার কাজ কর্ম , নফস এবং শয়তানের কারসাজীর কারনে মানুষ সহজে আল্লাহর রাস্তায় বের হতে চায় না৷ এজন্য ইহসান হচ্ছে মানুষকে আল্লাহর রাস্তায় বের করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার৷ আল্লাহতা'লা বলেন " তোমরা ইহসান করো৷ কেননা আল্লাহ ইহসানকারীদের ভালবাসেন৷" সুরা বাকারা আয়াত ২:১৯৫ ইহসানের মাধ্যমে দাওয়াতের মেহনত মানুষের সামনে পেশ করা হলে তা মানষ সহজে গ্রহন করে৷ তাছাড়া দাওয়াতের মেহনত করার জন্যই আল্লাহপাক হুজুর (স:) এর উম্মতকে বাছাই করেছেন৷ আল্লাহতা'লা বলেন " আপনি বলে দিন এইটাই আল্লাহর রাস্তা৷ আমি (মানুষকে) আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই- আমি এবং আমার অনুসারীরা৷" সুরা ইউসুফ আয়াত :১০৮ বস্তুত দাওয়াতের মেহনতের জীম্মাদারী এড়িয়ে চলার কোন উপায় নেই৷ বরং এই জীম্মাদারী কত টুকু আদায় করা হয়েছে সে বিষয়ে আখিরাতে জিজ্ঞাসা করা হবে৷
হজরত আবু হোরায়রা (রা:) বলেন রসুলুল্ল্াহ (স:) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি জেহাদের কোন চিহৃ ব্যতীত (কিয়ামতের দিন) আল্লাহতা'লার নিকট হাজির হইবে, সে আল্লাহতা'লার সহিত এমন অবস্থায় সাক্ষাত্‍ করিবে যে তাহার দ্বীন ত্রুটিযুক্ত হইবে ৷ ( তিরমিজী) ফায়দা : জেহাদের চিহৃ এই যে, যেমন তাহার শরীরে কোন যখম অথবা আল্লাহর রাস্তায় ধুলাবালি অথবা থেদমত ইত্যাদির দরুন তাহার শরীরে কোন দাগ পরিয়াছে৷ ( শররে তীবী) হুজুর (স:) হযরত আলী (রা:) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন " তোমার দাওয়াতে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হেদায়েত দান করেন তবে তা তোমার নাজাতের জন্য যথেষ্ট ৷ "
সিফতে তাকওয়া : আল্লা্লহর ভয়
তাকওয়া আরবী শব্দ৷ এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা , পরহেজ করা ইত্যাদি৷
শরী'আতের পরিভাষায় তাকওয়া হলো , একমাত্র আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা৷ যে ব্যক্তির মধ্যে তাকওয়া থাকে তাকে মুত্তাকী বলা হয়৷ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে ব্যক্তি শেরক, কবীরা গুনাহ ও অশ্লীল কাজ কর্ম এবং কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে তাকে মুত্তাকী বলা যায়৷ মুত্তাকীদের পরিচয় দিয়ে আল্লাহ বলেন " যারা গায়েবের প্রতি ইমান রাখে, নামাজ আদায় করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে৷ আর আপনার উপর যা নাজিল করা হয়েছে এবং আপনার আগে যা নাজিল করা হয়েছে তার প্রতি ইমান রাখে, আর তারা আখেরাতের প্রতি ইয়াকীন রাখে৷" সুরা বাকারা, ২: ৩-৪

তাকওয়া মানব চরিত্রের অন্যতম সম্পদ৷ পবিত্র কোরআনে তাকওয়া সম্পর্কে অনেক আয়াত নাজিল হয়েছে৷ তাই ইহলৌকিক ও পরলৌকিক জীবনের মুল ভিত্তি হচ্ছে তাওয়া৷ তাকওয়া অবলম্বন জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়৷ রাসুলুল্লাহ (স:) বলেন " দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবেনা৷ একটি চোখ যা আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে , আর অপর চোখ আল্লাহর রাস্তায় পাহারা রত অবস্থায় রাত্রি যাপন করে৷" হযরত আয়শা (রা:) বলেন, পৃথিবীর মাঝে পরহেজগারী ব্যতিত কোন কাজ এবং পরহেজগার ব্যতিত কোন লোককে রাসুলুল্লাহ (স:) পছন্দ করেন না৷
আপনি কিভাবে তাকওয়া হাসিল করবেন ?
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করার জন্য আল্লাহপাকের সাহায্য চাইতে হবে এবং তাকওয়া ধরে রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে পথ চলতে হবে৷ মানুষকে ক্ষমা করা এবং যে কোন ব্যাপারে সুবিচার করা তাকওয়ার নিকটবতর্ী একটি কাজ৷
এভাবে চলতে থাকলে এবং অনুশীলন করতে থাকলে আপনার তাকওয়া হাসিল হয়ে যেতে পারে ৷ যেমন
১/ শিরক থেকে তাকওয়া
২/ বিদআত থেকে তাকওয়া
৩/ ছোট ছোট গুনাহ থেকে তাকওয়া
৪/ নফস বা প্রবৃত্তি থেকে তাকওয়া
৫/ চক্ষুর তাকওয়া
৬/ কর্ণের তাকওয়া
৭/ জিহবার তাকওয়া
৮/ অন্তকরনের তাকওয়া
বিনয় ও সরলতা :
ইসলামে বিনয় ও সরলতা অবলম্বন হচ্ছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ বিনয়ের অর্থ হলো, আল্লাহর অন্য বান্দাদের তুলনায় নিজেকে ছোট মনে করা এবং অন্যদের বড় মনে করা৷ বিনয় আল্লাহ তা'লার নিকট খুবই পছন্দনীয় একটি গুন৷ বিনয় মর্যাদা লাভের সোপান৷ বস্তুত আল্লাহর খাঁটি বান্দা হতে হলে বিনয়ী হওয়া আবশ্যক৷ আল্লাহতা'লা বলেন" রহমানের ( আল্লাহর) বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সাথে চলাফেরা করে৷" সুরা ফোরকান ২৫:৬৩ হুজুর (স:) এরশাদ করেন " যদি কেউ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিনয় অবলম্বন করে তবে আল্লাহতা'লা তার মর্যদাকে বাড়িয়ে দেন৷" তিনি আরো বলেন " আল্লাহতা'লা নিজে বিনয় অবলম্বনকারী, তিনি বিনয়কে পছন্দ করেন এবং তিনি নম্রতা অবলম্বনকারীকে এত বেশী দান করেন যা কঠোর চিত্ত ব্যাক্তিকে করেন না৷" সরলতা হচ্ছে মুমিনের জীন্দেগীর ভূষণ আর কুটিলতা হচ্ছে পাপীষ্ঠ হওয়ার নিদর্শন৷ রাসুলুল্লাহ (স:) এরশাদ করেন" প্রকৃত ইমানদার ব্যাক্তি সরল ও ভদ্র হয়ে থাকে৷ আর পাপী ব্যাক্তি প্রতারক ও নীচু ধরনের হয়ে থাকে৷ অতএব বিনয়ী স্বভাব নিজের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু করা যেতে পারে৷ যে কোন পরিস্থিতিতে ক্রোধ সংবরন করতে পারলেই বিনয় অবলম্বন করা যায়৷ দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে যে পরিমান বিনয় বৃদ্ধি পাবে সে পরিমান অজ্ঞতা দুরীভূত হবে৷ আর অজ্ঞতার পর ই'লমের দরজা উন্মোচিত হতে থাকবে৷ কেননা, এর দ্বারা প্রকৃত তলব সৃষ্টি হবে৷ আর তলব প্রতিটি বস্তুর দ্বার খুলে দেয়৷
সেফতে আখলাক :
আখলাক আরবী শব্দ৷ এর আভিধানিক অর্থ চরিত্র ,স্বভাব ,সদাচার ,সৌজন্যমূলক আচরন ইত্যাদি৷ মানুষের দৈনিক কাজকর্মের মাধ্যমে যে সব আচার ব্যবহার চাল-চলন এবং স্বভাবের প্রকাশ পায় ,সে সবের সমষ্টি হলো আখলাক৷ শরী'আতের পরিভাষায় আখলাক হলো, মানুষের সাথে পারস্পরিক সুসম্পর্ক, সৌহাদ্য ও সৌভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে সদাচার ও সৌজন্যমূলক ব্যবহার করা৷

ইসলামে মানব চরিত্রের যে সকল মহত্‍ গুনাবলীর কথা উল্লেখ রয়েছে তাকে আখলাকে হাসানা বা উত্তম চরিত্র বলা হয়৷ রাসুলুল্লাহ (স:) এর জীবনাদর্শই হলো আখলাকে হাসানার উজ্জলতম দৃষ্টান্ত৷ আখলাক শব্দের অর্থ ব্যাপক৷ সামাজিক জীব হিসেবে মানব চরিত্রের প্রতিটি দিকই আখলাকের অন্তর্ভুক্ত৷ ব্যাক্তিগত জীবন থেকে আন্তর্জতিক জীবন পর্যন্ত আখলাকের ক্ষেত্র বিস্তৃত৷ আল্লাহর সৃষ্ট জীবজন্তুর সাথে আচার আচরন ও আখলাকের আওতাভূক্ত৷ মানব চরিত্রের সত্‍ এবং অসত্‍ গুনাবলীর প্রেক্ষাপটে আখলাক দুই প্রকার : আখলাকে হাসানা এবং আখলাকে সায়্যিআ৷
আখলাকে হাসানা হলো , ইসলামে যে সব মহত্‍ গুনাবলীর কথা উল্লেখ আছে সে গুলি মানব চরিত্রে বিদ্যমান থাকলে তাকে আখলাকে হাসানা বা উত্তম চরিত্র বলা হয়৷ যেমন- তাকওয়া, সিদব ,জিকির,সবর, শোকর, আদল, আফউ,খিদমতে খালক ইত্যাদি গুনাবলী আখলাকে হাসানার অন্তর্ভুক্ত৷

অন্য দিকে আখলাকে সায়্যিআ হলো যে সব অসত্‍ গুন মানুষকে হীন, নীচ, ইতর শ্রেনীভুক্ত এবং নিন্দনীয় করে৷ ফিসক,খিযানত,গীবত,নিফাক,কিযব ইত্যাদি মন্দ স্বভাবগুলো আখলাকে সায়্যিআর অন্তর্ভুক্ত৷

মানব জীবনে আখলাকে হাসানার গুরুত্ব অপরিসীম৷ মানুষের পার্থিব ও পরলৌকিক জীবনের যাবতীয় সুখ শান্তি ,ইজ্জত ও নিরাপত্তা আখলাকে হাসানার উপর নির্ভরশীল৷ তাই আল্লাহর নিকট দোয়া এবং চেষ্টার মাধ্যমে আখলাকে হাসানার গুনগুলি নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসা যায়৷ যেমনটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন সাহাবা একরাম (রা:)৷
দ্বীনের দ্বায়ীর ৮ টি সেফত বা গুণ :
১/ দ্বায়ী সর্বদা উম্মতের সাথে মোহাব্বত রেখে চলে
২/ জান-মাল উত্‍সর্গ করার সময় দ্বায়ী কোরবাণীর জজবা পয়দা করে
৩/ দ্বায়ী নিজের সংশোধনের নিয়্যাতে অন্যকে দাওয়াত দিয়ে থাকে
৪/ দ্বায়ী সর্বদা অহংকারের পরিবর্তে অত্যন্ত বিনয়ী আচরন করে চলে
৫/ কামিয়াবী বা সফলতা এলে দ্বায়ী এটাকে আল্লাহর সাহায্য মনে করে
৬/ মানষ না আসলে কিংবা আল্লাহর রাস্তায় বের হতে না চাইলে দ্বায়ী নিরাশ হয় না
৭/ মানুষ কষ্ট দিলে বা কটু কথা বললে দ্বায়ী ধৈয্য ধারন করে
৮/ প্রত্যেক নেক আমলের পর দ্বায়ী নিজ থেকে এস্তেগফার করতে থাকে


আল-হা'মদুলিল্লাহ ৷

তাবলীগের মেহনত ও আলিমের সোহবত

posted Nov 28, 2011, 11:06 AM by Abul Hiqmah

ইসহাক ওবায়দী

কয়েক বছর আগে আমাদের সেনবাগ থানায় নোয়াখালি জেলার একটি তাবলীগী ইজতিমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাবলীগের ইজতিমা যেখানেই হোক, বিশ্ব ইজতিমার মতো তিন দিনের কর্মসূচি প্রায় একই ধরনের হয়ে থাকে। ইজতিমার আগের কয়েকটি মাশোয়ারায় আশপাশের মাদরাসাগুলোকেও দাওয়াত করা হয়েছিল। সেই সূত্রে ঐ মাশোয়ারাগুলিতে আমিও হাজির ছিলাম। ফেনী জেলা তাবলীগ জামাতের অন্যতম মুরববী, বুযুর্গ আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা হানীফ সাহেবকে কাকরাইল থেকে রামগড় ও সেনবাগের ইজতিমাকে কামিয়াব করার জন্য যাবতীয় মেহনতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। বিশ্ব ইজতিমায় যেমন বিভিন্ন তবকার মধ্যে বয়ান ও মেহনত হয়ে থাকে এই ইজতিমাতেও সেরকম মেহনত হয়। ‘কদীম’ দের মাঝে বয়ানের বিষয়ে মাশোয়ারা হচ্ছিল। একপর্যায়ে মাওলানা হানীফ সাহেব হুজুর সবাইকে প্রশ্ন বরলেন-‘কদীম’ বা পুরাতন কে? আমরা সবাই চুপ করে রইলাম। তখন তিনি নিজেই বললেন, যদি তিন চিল্লা ওয়ালাকে কদীম বলা হয় তাহলে আমিও কদীমের মধ্যে পড়ি না। কারণ আমার এক সাথে তিন চিল্লা হয়নি। তিনি আরো বললেন, হযরতজী মাওলানা এনামুল হাসান সাহেবের   ইন্তেকালের পর থেকে বিশ্ব ইজতিমার আগে হযরত মাওলানা ইলিয়াস সাহেব রাহ.-এর একজন সাথী মিয়াজী মেহরাব সাহেব প্রায় এক মাস আগেই ঢাকায় আগমন করতেন এবং হযরতজীর অনুপস্থিতিতে মোনাজাতও তিনিই করতেন। বিশ্ব ইজতিমার আগের সব কটি মাশওয়ারায় তিনি আমীরে ফয়সাল থাকতেন। মাশওয়ারায় কদীমদের মাঝে বয়ানের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। মিয়াজী মেহরাব সাহেব তখন আহলে শুরার কাছে প্রশ্ন রাখলেন, ভাই! কদীম কৌন হ্যায়? অর্থাৎ তাবলীগে কদীম বা পুরাতন কে? আহলে শুরাকে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকতে দেখে তিনি নিজেই উত্তর দিলেন, ভাই! ইহাঁ কদীম তো ওহ  হ্যায়, জিসকো পুরা দ্বীন কা সমঝ আ-গায়া হো, চাহে উসকা এ-ক চিল্লা ভী না হো। অর্থাৎ তাবলীগে কদীম বা পুরাতন ঐ ব্যক্তিকে বলা হবে, যার মধ্যে পুরা দ্বীনের সমঝ-বুঝ এসে গেছে। চাই তার এক চিল্লাও না থাক।

আমি মাওলানা হানীফ সাহেবের মুখ থেকে মিয়াজী মেহরাব সাহেবের মুখে ‘কদীম’ সম্পর্কিত এই ব্যাখ্যা শোনার পর খুব চমৎকৃত হয়েছিলাম। নিযামুদ্দীনের হযরত মাওলানা ইবরাহীম ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম একবার ‘খুরুজ’ শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন-

  এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়াই খুরুজ নয়। এটা তো জাহেরী খুরুজ। হাকীকী বা প্রকৃত খুরুজ হল শাহওয়াতের গোলামী থেকে বের হয়ে হেদায়েতের দিকে আসা। আর একথা তো বলাবাহুল্য যে, হেদায়েতের দিকে বের হওয়া তখনই হতে পারে যদি হেদায়েতওয়ালা যারা তাদের নিকটে যাওয়া এবং তাদের সোহবত-সান্নিধ্যের দ্বারা হেদায়েতের আলো গ্রহণ করা হয়।

হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর নির্দেশনা ছিল, হক্কানী আলেমদের কাছে গিয়ে দুআ চাওয়া ও কাজের কারগুযারী শোনানো। এতে হক্কানী আলেমদের সাথে তাআল্লুক হবে এবং কাজে বরকত হবে ইনশাআল্লাহ।

হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.-এর যমানায় হক্কানী আলেমদের বিনা চিল্লায়ও মিম্বরে বয়ানের দরখাস্ত করা হত।

১৯৩৩ ঈসায়ীতে কনকনে শীতের মাঝে হযরত মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ. কে দিল্লী জামে মসজিদে নিয়ে আসেন হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহ.। হযরত মাদানী রাহ. হেদায়েত দান করতে গিয়ে আবেগের সাথে বললেন, আপনারা যে কাজের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তার ফলে বাতেল খতম হয়ে যাবে। ভারতবর্ষ থেকে বৃটিশের শাসন-শোষণের অবসান হবে। লালকেল্লার ওপর যে ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা উড়ছে তা ভূপাতিত হবে। সেদিন হযরত মাদানীর একথা বলার সাথে সাথে আকস্মিকভাবে লাল কেল্লার পতাকাটি নিচে পড়ে যায়। দিল্লী জামে মসজিদ লোকে লোকারণ্য ছিল। এই অস্বাভাবিক কেরামতি কান্ড দেখে তারা সকলে জোরে না’রায়ে তাকবীর-আল্লাহু-আকবার ধ্বনি দিয়ে ওঠে। বৃটিশ রাজ পতাকা পড়ে যাওয়ার বিষয়টি তো আর হযরত মাদানী দেখেননি এবং বলতেও পারবেন না হয়তো। তাই তিনি জোরের সাথে ভৎর্সনা করে বললেন, আজকাল লোকেরা জোশ-জযবা সব না’রা লাগানোর মধ্যেই শেষ করে দেয়। একটি দ্বীনী আমলের কথা বলছি, তা মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন। (বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর, পৃ. ৫৭৮; তাবলীগি তাহরীকের সূচনা ও মূলনীতি পৃ. ২৬, ২৭; সীরাতে শাইখুল ইসলাম মাওলানা নাজমুদ্দীন এসলাহীকৃত ২/৪০৭-৪০৮)

তাবলীগী ভাইদের উচিত হবে হক্কানী আলেমদের সাথে সম্পর্ক করা ও তাঁদের কাছে বেশি বেশি যাওয়া এবং তাদের হেদায়েত মোতাবেক দ্বীনের মেহনত করা।

মাওলানা হানীফ সাহেব হুজুর তিন চিল্লা ওয়ালা কদীম না হওয়া সত্ত্বেও কাকরাইল থেকে তাঁকে দুটি ইজতিমার মেহনতের দায়িত্ব দেওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, পুরা দ্বীনের সমঝ-বুঝের সাথে সাথে তাবলীগের সাথে পুরো মোনাসাবাত রাখেন এমন হক্কানী আলেমকে কাকরাইলের মুরববীরাও কদীমই মনে করেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সমঝ-বুঝ নসীব করুন। আমীন।

1-10 of 13