মন্থন সাময়িকী



জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি ২০০৯

এক ফোঁটা চোখের জলের ভিতর থেকে ফুটে উঠল একটা ফুল

কী ঘটেছিল গ্রীসে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে                

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের দখলে                

সংকটে বিশ্বায়ন                                    

ছোটো নজরে বিশ্বমন্দা                             

নতুন নেপাল এবং বৃহত্তর প্রেক্ষিতের প্রসঙ্গ          

স্টিফেন মাইকসেলের সঙ্গে সংলাপ                            

নৈহাটির গৌরিপুর জুট মিল

বঞ্চনা ও ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনী                    

ধার করে ঘি খাওয়া অর্থনীতির ডুবে যাওয়ার দৃষ্টান্ত

আইসল্যান্ড                                                  

চিঠিপত্র

বিষয় : সম্পাদকীয়/ আমার জ্বলেনি আলো

 

 

 

সম্পাদকীয়  

কর্পোরেট রাজনীতি এবং ভোটের রাজনীতি

 

লাল ফিতের ফাঁসে খতম হল ১,৬৪,০০০ চাকরি

[Red tape strangles 1,64,000 jobs – The Statesman, 3 March 2009]

         

৩ মার্চ ২০০৯ স্টেটস্‌ম্যান পত্রিকার খবরটা ছিল এইরকম : ২,৪৪,৮১৫.৫ কোটি টাকা মূল্যের ১৮টি প্রকল্পে, চুক্তি হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও গত তিন-চার বছর ধরে সরকারি ঢিলেমির জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারেনি। এগুলোতে সরাসরি ১,৬৪,০০০ মানুষ এবং পরোক্ষভাবে আরও ২,৭০,০০০ মানুষ কাজ পেত। অ্যাসোচাম ইকো পাল্‌স সমীক্ষায় এটা জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইস্পাত ব্যবসা পস্কো-র উড়িষ্যার প্রকল্প; ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও ছত্তিশগড়ে টাটার তিনটি প্রকল্প এবং উড়িষ্যা ও ঝাড়খণ্ডে আর্সেলর-মিত্তালের দুটি প্রকল্প।

          এই খবর একটা জলজ্যান্ত মিথ্যে কথা। পস্কো, আর্সেলর-মিত্তাল বা টাটারা জমি পায়নি কেন? কারণ সেই জমি --- বসতি, জঙ্গল বা চাষের জমি --- যারা এতদিন ব্যবহার করে এসেছে, সেই স্থানীয় জনসমাজ দিতে চায়নি। সরকার তাদের বুঝিয়েছে, জমির মালিকদের টাকার লোভ দেখিয়েছে, অবশেষে সন্ত্রাস চালিয়ে হত্যা পর্যন্ত করেছে, কিন্তু জনপ্রতিরোধকে চূর্ণ করতে পারেনি। এটা হল প্রথম সত্য।

          দ্বিতীয় সত্য হল, যে ইস্পাত, মোটরগাড়ি-নির্মাণ, তথ্য-প্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেট ইত্যাদি শিল্পের জন্য জমি নিতে চাইছিল কর্পোরেট-সংস্থাগুলো, এখন সেইসব শিল্পে চলছে মন্দা। সেইসব ক্ষেত্রের চালু কারখানাগুলোতেই উৎপাদনে দম নেই, বাজার খারাপ, কর্মী ছাঁটাই চলছে নানানভাবে। নতুন শিল্প করার তাড়াহুড়ো সেখানে নেই।

          তৃতীয় সত্য হল, চাকরির গল্পটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হচ্ছে। যুবসমাজকে লোভ দেখিয়ে নিরস্ত করে জমিটা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

          কিন্তু কেন এই মিথ্যে খবরটাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে বড়ো মিডিয়া? লাল ফিতের ফাঁস মানে হল সরকারের অপদার্থতা। সরকারের অপদার্থতা মানে সরকারি ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর অপদার্থতা। ভোটের রাজনীতিতে এক দল অপর দলকে অপদার্থ প্রমাণ করে নিজে ক্ষমতা দখল করতে চায়। দিল্লির ভোট এসে গেছে। কর্পোরেট কর্তারা জানে, এই খবরটা পাতে পড়লেই তা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে ভোটের রাজনীতি।

          ১৮টি প্রকল্প জনপ্রতিরোধে আটকে গেছে, এই খবর প্রকাশ করার সৎসাহস নেই পস্কো, আর্সেলর-মিত্তাল বা টাটাদের। চাষাভুষো, আদিবাসী, গরিব মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতার স্বীকৃতি দেওয়ার হিম্মত ওদের নেই। দলগুলোকে ওরা মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রাখতে চায়, পুষতে চায়, আবার দরকার মতো দুটো থাপ্পড়ও মারতে চায়। সেটাই ওদের পক্ষে সুবিধাজনক। ওদের প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যবসাজগতের দুর্নীতিগ্রস্ত জোড়াতালি দেওয়া চেহারাটাকে ওরা বিশ্বমন্দা শব্দটার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চায়।

 

          আমরা বিশ্বমন্দার বড়োসড়ো চেহারা আর তার প্রভাবকে ভেঙে ভেঙে বিশ্লিষ্ট করে দেখতে চাই। এবারের সংখ্যায় তার কিছুটা চেষ্টা করা হল। আমরা দেখতে পাচ্ছি : বিশেষ বিশেষ শিল্পে ব্যাপক শ্রমিক-ছাঁটাই; রোজকার মামুলি জিনিসপত্রের আগুন দাম; অর্থনীতির বেহাল অবস্থাতেও যুদ্ধের সাজগোজে খরচ বাড়ানো; জনমত গঠনে মিডিয়ার অসামান্য কার্যকলাপ; প্যালেস্তাইন-ইরাক-আফগানিস্তানে নির্লজ্জভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভারতে একটা অস্থির পরিস্থিতি তৈরির জন্য আমেরিকার মরীয়া চেষ্টা এবং এসবের বিপরীত মেরুতে জনতার এক জীবন্ত প্রতিরোধ --- কখনও আমাদের নন্দীগ্রামে, কখনও দেশের বাইরে গ্রীসে বা নিউ ইয়র্কে। এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে বিশ্বমন্দার যোগ কোথায়? 

 

পত্রিকার জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সংখ্যা প্রকাশে দেরি হওয়ার জন্য

 পত্রিকার পক্ষ থেকে আমরা দুঃখপ্রকাশ করছি।