হোম পেজ

এই সংখ্যার হোম পেজ

ভয় পাই শান্তিও যদি সিংহের মতো গর্জায়
হিংসা-অহিংসা নিয়ে কিছু কথাবার্তা   

শিকার  

হিংসা বিষয়ে ঘিনুয়া-সাঁওতাল উপস্থাপনা 

হিংসা প্রসঙ্গে এক অহিংসাপন্থীর ভাবনা

জিনগত মারণযজ্ঞ পারমাণবিক মারণযজ্ঞের চেয়েও ধ্বংসাত্মক 

এক মালয়ালি মুম্বইবাসীর বঙ্গদর্শন 

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে চলেছে 

  চিঠিপত্র : ১. বিষয় : সমস্যা সমাধানে মন্থন

 

সম্পাদকীয়

হিংসা-অহিংসার তর্ক

 

হিংসা-অহিংসার প্রসঙ্গ নিছক একটা তর্কই নয়, প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে, তার অস্তিত্বের মধ্যে নিহিত রয়েছে একই সঙ্গে হিংসা এবং অহিংসা। যে ব্যক্তি জীব-জন্তু ভালোবাসে, প্রকৃতি বা অরণ্য প্রেমিক, সে-ই হয়তো জীবনের অন্য ক্ষেত্রে কিছুটা হিংস্র। আমরা নিজের বাইরে অন্য ব্যক্তির মধ্যে, সমাজের মধ্যে, সংগঠন-দল-প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হিংসা খুঁজি, দেখতে পাই, আক্রান্ত হই, দুঃখ পাই। তাই বলে আলাদা করে এ নিয়ে ভাবতেও অভ্যস্ত নই। কিন্তু আজ এ নিয়ে আলাদা করে কিছুটা ভাবার প্রয়োজন এসেছে। কেন? কারণ আমরা বেশ টের পাই নানান দিক থেকে আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহ বিপন্ন। এই বিপন্নতার মধ্যেই রয়েছে হিংসার বাড়াবাড়ি। প্রত্যেকের কাছেই এর ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। এই বাড়াবাড়ি যদি আমাদের অপছন্দ হয়, তাহলে এসে পড়ে সচেতনভাবে কিছু করার প্রসঙ্গ। কী করব? কীভাবে চলব? এসব ঠিক করার জন্য কিছুটা কথাবার্তাও দরকার অন্যদের সঙ্গে। এদিক থেকেই এবার আমরা এই সংখ্যার পরিকল্পনা করেছি। এবারের মন্থন হয়ে উঠুক হিংসা-অহিংসা নিয়ে সমাজ জোড়া মন্থনের অঙ্গ। অবশ্যই এই মন্থনের অঙ্গ হিসেবে সমাজ জুড়ে ইতিমধ্যেই উপস্থিত আজকের নানান আন্দোলন, তার নতুন বিষয়বস্তু এবং নতুন নতুন আঙ্গিক বা রূপ। আসুন আমরা প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে এই মন্থনে অংশ নিই।    




------------------------------------------------------------------

-------------------------------------------------------------

অমলেন্দু চক্রবর্তী

(৩১ ডিসেম্বর ১৯৩৪ -- ১৫ জুন ২০০৯)

 

১৫ জুন দুপুর তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ টেলিফোন এল অমলেন্দু নেই। ওপাশে অমিয়র গলা, আমাদের বন্ধু অমিয় দেব। মুখ দিয়ে কথাটা অজান্তেই বেরিয়ে এল, মানে? অমলেন্দু এই কিছুক্ষণ আগে মারা গেল। মৃত্যুর খবর এমনও হয়। এমন নয় যে দীর্ঘদিন ভুগছিলেন তিনি। আমাদের মতো বয়সে সবারই যেমন হয়, এটা সেটা সমস্যা কিছু কিছু ছিল, তা জানতামও আমরা। কিন্তু চলে যাবার মতো তেমন কিছু জানা ছিল না। কিন্তু তবুও অমলেন্দু চক্রবর্তী মারা গেলেন এই ১৫ জুন দুপুরবেলায়, নিজের বাগুইআটির বাড়িতেই। সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল তখনও সেই বিছানাতেই শোওয়া। ঠিক যেন ঘুমন্ত। শুধু গায়ের ওপর কিছু ফুলের মালা চাপানো।

দু-একজন বললেন বটে যে, কাল পরশুও গল্প করে আড্ডা দিয়ে গেছেন যাঁরা তাঁরা শুধু একটু খেয়াল করেছিলেন, শরীরটা কেমন লাগছে যেন ওঁর। তার বেশি কিছু না। উনি নিজেও তা নিয়ে বলেননি কিছু। বলবেন না এটা স্বাভাবিক। যাক, এসব নিয়ে এখন আক্ষেপ করা বৃথা। সবই মেনে নিতে হয়।

আমাদের জন্য রয়ে গেল ওঁর রচনাবলী আর একটা বেশ একটু আলাদা রকমের জীবনযাপন। সবাই জানেন অমলেন্দু চক্রবর্তী লিখতেন গল্প আর উপন্যাস। আমাদের সময়ের অধিকাংশ গল্প-উপন্যাস লেখকের সঙ্গে অমলেন্দুবাবুর (হ্যাঁ, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে আমাদের ডাকাডাকি ওই রকমই) একটা বড়ো তফাত লক্ষ করা দরকার। ওঁর গল্প উপন্যাসের সংখ্যা এখনকার অনেকের তুলনায় একটু উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সে কথাটা খেয়ালও করা হয়েছে। আমাদের একজন প্রধান সমালোচক এই সেদিনও ওঁর স্মরণসভায় বললেন, অমলেন্দু তাঁর সমসাময়িক অনেক লেখকের থেকেই লিখেছেন কম। তবে এই সঙ্গে তিনি একথাও জানাতে ভোলেন না যে ণ্ণরাধিকাসুন্দরী বাংলা উপন্যাসের একটা ধারার সম্ভবত শেষ গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন যে ওই উপন্যাস রচনা করার সময় কতটা সময় তিনি নিজেকে অনন্যমনা রাখার চেষ্টা করেছিলেন। ণ্ণগোষ্ঠবিহারীর জীবনযাপন, ণ্ণযাবজ্জীবন ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে তিনি বোধহয় নিজেকে ণ্ণরাধিকাসুন্দরীর জন্য প্রস্তুত করেও নিচ্ছিলেন।

অমলেন্দু চক্রবর্তীর প্রস্তুতি জীবনযাপনের স্তরেও লক্ষণীয় ছিল। তিনি নিজেকে বেশ যত্নে চারপাশের জীবনধারার সঙ্গে জড়িয়েছিলেন। দোকান বাজার পথঘাট, এ সবই ছিল তাঁর নিজস্ব চলাফেরার জগৎ। এক সময়ে গুড়াপের স্কুলে পড়িয়েছিলেন। সেটা তাঁর শুধু জীবিকা ছিল না। গুড়াপ তাঁর অস্তিত্বে কীভাবে জায়গা করে নিয়েছিল সে তাঁর সঙ্গে একটু মেলামেশা করলেই টের পাওয়া যেত। সেই গুড়াপ থেকে খিদিরপুর আর হাতিবাগান সবই তিনি একটানে ধরতে জানতেন। শেষের কয়েক বছর বাগুইআটির বসবাসও তাঁর জীবনে বৃথা যায়নি। তিনি সেখানেও দিব্বি শেকড়বাকড় ছড়িয়েছিলেন। একটু বয়স হয়ে গেলেই অনেকের পক্ষে সেটা আর সম্ভব হয় না। সম্ভবত অল্প বয়সের রাজনীতি দীক্ষা থেকে এটাই তাঁর স্থায়ী প্রাপ্তি। কত রকমের কাজের সঙ্গে তিনি নিজেকে শামিল করতে পারতেন। এসব ব্যাপারে বয়সের দূরত্ব বা অন্য কোনও দূরত্ব তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাঁড়াত না। ছোটোখাটো পত্রপত্রিকার জগতে তিনি মিশে যেতে পারতেন সহজে। তাদের নানা ধরনের কাজকর্মেও আগ্রহে তিনি শরিক হয়ে যেতে পারতেন। কোনও কোনও পত্রিকাকে তিনি নিজের কাজ হিসেবেই সাহায্য করতেন। মন্থন সাময়িকীর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। অমলেন্দু চক্রবর্তীর আকস্মিক প্রয়াণে আমরা শোক জ্ঞাপন করছি। পত্রিকার তরফে তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা রইল।