মন্থন সাময়িকী


সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০০৮ 

হোম পেজ

দুনিয়াজোড়া মন্দা : কিছু কথাবার্তা   

আমেরিকার গৃহঋণের সঙ্গে 

যুক্ত কিছু শব্দের অর্থ

বাতিল বস্তি : মুম্বাইয়ের ধারাভি  

বাতিল শ্রমিক 

নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়ে কিছু কথা 

ফলতার SEZ শ্রমিকের টুকরো কথা 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা-গদ্য, 

 বাস্তবেরভিতর-পাঠ  

কিউবাঃ অন্য বিপ্লব  

চিঠিপত্র:  

সম্পাদকীয়/ আমার জ্বলেনি আলো 

বিষয় : চিন্তার স্বচ্ছতা  অর্জন                 

প্রসঙ্গ উন্নয়ন

চিঠিতে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে সমর 

বাগচীর সংলাপের প্রয়াস  

আর্থিক সংকট : ভণ্ডামির ফল?

পৃথিবী এক বড়োসড়ো বিশ্বায়িত মন্দায় ডুবছে। সম্ভবত তা গত পঁচিশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ, হয়ত বা মহামন্দার পর থেকে নিকৃষ্টতম। একাধিক অর্থে এই সংকট ছিল আমেরিকার উৎপাদন, মেড ইন আমেরিকা। আমেরিকা তার বিষাক্ত মর্টগেজগুলি অ্যাসেটব্যাক্‌ড সিকিউরিটির আকারে পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিয়েছে। আমেরিকা তার নিয়ন্ত্রণহীন মুক্ত বাজারের দর্শনকে দেশে দেশে রপ্তানি করেছে। এখন এর প্রধান পুরোহিত, অ্যালান গ্রিনসপ্যানও, স্বীকার করছেন, ভুল হয়েছিল। আমেরিকা তার কর্পোরেট দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সংস্কৃতিকে দেশে দেশে চালান করে দিয়েছে --- অস্বচ্ছ স্টক অপশন, যা খারাপ হিসেবনিকেশ রাখাকে উৎসাহিত করে ---  যেমন তা কয়েক বছর আগে এনরন ও ওয়ার্ল্ডকম কেলেংকারিতে করেছিল --- এই বিপর্যয়ে ভূমিকা পালন করেছে। আর শেষ পর্যন্ত আমেরিকা তার অর্থনীতির পতনকে রপ্তানি করছে। ...

            ৬ নভেম্বর গার্ডিয়ান পত্রিকার পাতায় জোসেফ স্টিগলিজ এই কথাগুলো লিখেছেন। ওই পত্রিকাতেই ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁর লেখার শিরোনাম ছিল : The fruit of hypocrisy, ভণ্ডামির ফল। আজকের সংকট সম্পর্কে লিখতে গিয়ে সেখানে তিনি বলছেন, আমরা ভণ্ডামিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

          কারা আমরা? আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে বাম নেতা গলার শির ফুলিয়ে বক্তৃতা দেন, তিনি বোধহয় নিজেকে ভণ্ডামিতে অভ্যস্ত মনে করেন না। কিন্তু আমি বা আমার পরিবারের সদস্যরা? খুঁজে দেখার সময় বয়ে যাচ্ছে। যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, খুঁজে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে, এই ভণ্ড ব্যবস্থা আমাকে কতখানি গ্রাস করেছে। আইএমএফ-বিশ্বব্যাঙ্কের চত্বরে ঘোরাফেরা করেন জোসেফ স্টিগলিজরা, ওঁরা একভাবে বুঝছেন। আমরাও কি প্রতিদিনের জীবনে তা টের পাই না?

 


১২ নভেম্বর গার্ডিয়ান পত্রিকার পাতায় সাইমন জেনকিন্সের লেখায় আমরা পাচ্ছি লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস-এ এক সভার বিবরণ। সেখানে অর্থনীতির পণ্ডিতদের মাঝে প্রথাবহির্ভুতভাবে উপস্থিত হয়েছেন ইংল্যান্ডের রাণী। তিনি বর্তমান সংকটকে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করে এক ঝকমকে অর্থনীতিবিদকে জিজ্ঞেস করলেন, কেউ ব্যাপারটা লক্ষ্য করেননি কেন? উত্তর দিতে গিয়ে আমতা আমতা করে ডাইরেক্টর অফ রিসার্চ প্রফেসর লুইস গ্যারিকানো বললেন, একজন অন্য আর একজনের ওপর ভরসা করেছিল ... আর প্রত্যেকেই ভেবেছিল তারা সঠিক কাজই করছে। যখন গোটা দেশ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আর্তনাদ করছে, সেই সময় এ নিয়ে প্রশ্ন করা মোটেই বিলেতের রাজকীয় আদবকায়দায় শোভনীয় নয়। রাণী তো হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন। কিন্তু কে এই বিশ্বায়িত ভণ্ডামির দায় ঘাড় পেতে নেবে? কোন সে পণ্ডিত? কোন পলিসিমেকার? কোন রাজনৈতিক নেতা?

          স্টিগলিজ বলছেন, আস্থার এক বিপর্যয়মূলক আচমকা পতন থেকে এই আর্থিক সংকট উদ্ভূত হয়েছে। অমর্ত্য সেনও বলেছেন, লোকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বাজারের প্রতি, কেনাবেচার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনলেই কি ভণ্ডামির অবসান হবে? তাতেই কি সমাজে বিষাক্ত মর্টগেজ ছড়িয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলোর সমাপ্তি ঘটবে? দুনিয়া জুড়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই আর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পুরনো টোটকার বাইরে আমরা কি অন্য কিছু ভাবতে পারছি?