মন্থন সাময়িকী


মে-জুন ২০০৮
 

home page 

 

সপ্তম রাষ্ট্রীয় আহ্লাদ

 

মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্যসঙ্কট

 

সাক্ষাৎকার : 

 গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোটে অন্য নন্দীগ্রাম

 

রক্তাক্ত ভোট পরব মুর্শিদাবাদে

 

গ্রাম পঞ্চায়েতে উমা

 

পঞ্চায়েত ভোট : যা দেখেছি

 


 

সর্ষে চাষ নিয়ে ক্ষেত্রসমীক্ষা

 

নন্দীগ্রাম ২০০৭ :  

মৃত্যুর খতিয়ান

 

কয়লাখনি অঞ্চলে আগুন কেন?

 


আসানসোলে কয়লাখনি 

ঠিকাশ্রমিকদের গণশুনানি

 

মন্থন সাময়িকী : ২০০৭ সালের

আয় ব্যয়ের হিসেব

 

সম্পাদকীয়

 এ কার কন্ঠস্বর !

শিল্পায়ন প্রক্রিয়া থমকাবে কি, বড় প্রশ্ন সেটাই 

এ প্রশ্ন কার? পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বড়ো গলায় এই বড়ো প্রশ্ন কে তুলল? খবরের কাগজের শিরোনামে, টিভির পর্দায় প্রশ্নকর্তা ছিলেন আমাদের সকলের চেনা মিডিয়া-কর্মীরা। উত্তরও যেন জানাই ছিল। সিপিএম, তৃণমূল ইত্যাদি দলের নেতা-নেত্রীরা একবাক্যে বললেন, শিল্পায়ন চলবে। শিল্পমহলের প্রতিনিধিরাও বললেন, শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা নেই। আনন্দবাজারের জনমত সমীক্ষায় ৬২% মত দিল, ‘সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের এই ফল রাজ্যের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেবে না’। এতেও আশ্বস্ত না হয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ২৩ মে ২০০৮ লেখা হল, “পঞ্চায়েত-পীড়িত শাসকরাও হয়তো অতঃপর ভোট হারাইবার ভয়ে শিল্পায়নের প্রশ্নে ‘সংযত হইবেন, যাহার অর্থ উন্নয়নের গতিভঙ্গ। সে ক্ষেত্রে এই নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গে স্থিতাবস্থার শাসন ফিরাইয়া আনিবে। যদি তাহা হয়, তবে বুঝিতে হইবে সপ্তম পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামফ্রন্ট পরাজিত হয় নাই, বিরোধীরাও পরাজিত হন নাই, পরাজিত হইয়াছে পশ্চিমবঙ্গ, পরাজিত হইয়াছে বাঙালির ভবিষ্যৎ।”

      এবার বোঝা গেল শিল্পায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বড়ো প্রশ্ন কর্পোরেট বড়ো মিডিয়ার। পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যেও তারা এই শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার সমালোচনার ইঙ্গিত পাচ্ছে। নেতা-নেত্রী আর শিল্পপতিদের আশ্বাসবাণীতেও তাদের শঙ্কা কাটছে না।

      কেন এই শিল্পায়ন প্রক্রিয়া আজ জনসমাজে সমালোচিত? প্রথমত, এই প্রক্রিয়ার কিছুটা জায়গা জুড়ে রয়েছে বি-শিল্পায়ন বা ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন আর কিছুটা বিকৃত-শিল্পায়ন, যার মডেল হল SEZSEZ-এর জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং গোয়াতে যে জনরোষের সম্মুখীন হয়েছে সেইসব রাজ্যের সরকার, নন্দীগ্রামে তা-ই ঘটেছে। অন্ধ্রপ্রদেশের মেহবুবনগর জেলায় পোলেপাল্লি ফার্মা SEZএ জমিহারা পরিবারের পুরুষ ও মহিলা নিয়ে ১৩ জন বিধানসভার উপনির্বাচনে জাদচেরলা আসনে সমস্ত দলের পাশাপাশি নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে ৮০০০-এর বেশি ভোট টেনে নেন।

  সিঙ্গুরেও জনমতকে তোয়াক্কা করা হয়নি। আজ টাটার ১ লাখ টাকার মোটরগাড়ি তৈরি নিয়ে আদিখ্যেতা করা হচ্ছে; রতন টাটাকে ভারত রত্ন-এর মুকুট পরানো হচ্ছে। কিন্তু কোথায় গেল গত পঞ্চাশ বছর ধরে সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত হিন্দমোটর?

      ষোল-সতেরো হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র ছিল উত্তরপাড়ার হিন্দমোটর। একটা গাড়ি কারখানা এবং একটা ক্রেন ও মাটি কাটার যন্ত্র তৈরির কারখানার মধ্যে ২টি ফাউন্ড্রি, ১টা ফোর্জ প্ল্যান্ট, ৩টি মেশিন শপ, ২টি প্রেস শপ, ২টি ডাই শপ, ১টি পেইন্ট শপ, ১টি বডি শপ, ১টি বডি অ্যাসেম্বলি শপ, ১টি কার অ্যসেম্বলি শপ, ১টি ইলেক্ট্রোপ্লেটিং শপ। এর কোনটার ব্যবসা ফুরিয়েছে? গাড়ি, লোহা, ফোর্জ-ফাউন্ড্রি সবেরই তো দারুণ বাজার! তাহলে কেন পঙ্গু করে ফেলা হচ্ছে এই চালু ব্যবস্থাটাকে? কেন সরকারের কাছ থেকে শিল্পায়ন-এর জন্য নেওয়া হিন্দমোটরের জমিতে আজ রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা চনমনিয়ে উঠছে? হিন্দমোটরের ৩১৪ একর জমিতে এখন বেঙ্গল শ্রীরাম হাইটেক সিটি লিমিটেড এবং দুটি আমেরিকান ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, ওয়ালটন স্ট্রীট ও স্টারউড, ৫৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। সামান্য অংশে আইটি পার্কও একটা হবে। হিন্দমোটরের বি-শিল্পায়ন আর হাইটেক সিটির বিকৃত-শিল্পায়নের ককটেল পার্টি জমে উঠতে চলেছে সেখানে। হিন্দমোটরের অবশিষ্ট ৫০০০ কর্মীর মধ্যে ২০০০ জনকে দূর-দূরান্তে বদলি করে, নানারকম হেনস্থা করে তাড়ানোর নকশা তৈরি করে ফেলেছে বিড়লারা। আজ যে দক্ষ শ্রমিকরা চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদায় (স্বেচ্ছা অবসর !) নিচ্ছেন, হয়ত আগামী কোনদিন তাঁদেরই ছেলেরা পার্টির ঝাণ্ডা কাঁধে নিয়ে হাইটেক সিটির দারোয়ানি করার জন্য জান লড়িয়ে দেবে। এই শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার জন্যই তো কর্পোরেট বড়ো মিডিয়া এত উদ্বিগ্ন!

      গ্লোবাল কর্পোরেট বসেরা এখন বাঙালির ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত। মানে সেই শরপে লাল রুশি টোপি, ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি! যেখান যে ঢঙে আঞ্চলিকতার সুড়সুড়ি দিলে কাজ হয়, সেখানে সেই ঢঙে বাজিমাত করো। অর্থাৎ এই শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার পক্ষে জনমত গঠন করো। এই জনমত গঠন মিডিয়া-শিল্পের সবচেয়ে বড়ো স্কিল! এদিকে, এত মৌ সই করছেন রাজ্যে রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীরা, এত বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ ঘোষিত হচ্ছে। অথচ এদেশে শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির হার কমছে। সবচেয়ে চাঙা নির্মাণ শিল্প ও রাস্তাঘাট-হাইওয়ে-পরিকাঠামো ক্ষেত্র বাদ দিলে শিল্পে উৎপাদনের অগ্রগতি হতাশজনক। তবু চোখের ওপর জলজ্যান্ত বি-শিল্পায়নকে শিল্পায়ন বলতে হবে। হয় তা বলুন, নয় আপনি শিল্পায়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। আপনাকে হ্যাঁ কিংবা না বলতে হবে। কর্পোরেট বড়ো মিডিয়া আপনার সামনে মাইক্রোফোন উঁচিয়ে প্রশ্ন করবে, আপনি কি শিল্পায়নের পক্ষে?, আপনি কি বন্ধের পক্ষে?, আপনি কি মাওবাদী?... বেশি কথার জায়গা নেই। কারণ খেলাটা চলছে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের স্রোতের মাঝের এক চিলতে পরিসরে। ওই দামি ব্র্যান্ডগুলো দয়া করছে বলেই তো টিকে রয়েছে আমাদের মহান গণতন্ত্র, আমাদের কথা বলার অধিকার!

      রোমে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে কিউবা চেয়েছিল, খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হোক। তা হয়নি। অর্ধ-শতাব্দী ধরে কিউবার ওপর বা ১৯৯০-এর দশকে ইরাকের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের দিক থেকে এর একটা গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব কিন্তু আলাদা। আমাদের চাষিরা ইদানীংকালে রেকর্ড ২২৭০ লক্ষ টন খাদ্য উৎপাদন করেছে। বাজারে থরে থরে খাবার সাজানো আছে। তবু কেন এত চড়া দাম? কেন আমরা প্রয়োজন মতো কিনতে পারি না? সারা পৃথিবীতে ২০০৭ সালে চাষিরা রেকর্ড ২৩০০ কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করেছে, তবু আজ বিশ্বে খাদ্য সঙ্কট! আমাদের তেল-নুন, দুধ, ফলমূলের কারবারটাও যদি কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলো দখল করে নেয়, তাহলে কীসের পঞ্চায়েতী রাজ? কীসের বা গ্রামস্বরাজ?

      জনসমাজের বাইরে থেকে আসা একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলাম। অন্য কিছু প্রশ্নে এসে শেষ করছি এই সংলাপ। প্রশ্নগুলো অন্যের কাছে নয়, নিজের কাছে, নিজেদের বিচার-বিবেচনার কাছে।