মন্থন সাময়িকী


জুলাই-অগস্ট ২০০৮

হোম পেজ 

আলো জ্বালানোর আষাঢ়ে গল্প 

ভারত আমেরিকার বদলে ইরানকে বেছে নিক! 

পরমাণু পুনরুজ্জীবন এবং একগুচ্ছ পরমাণু চুক্তি 

 পুস্তক পরিচিতি : শ্রাদ্ধের প্রয়োজন আছে কি? 

পূর্ব মেদিনীপুরে অসময়ে এতবড় বন্যার কারণ কী? 

বানভাসি পটাশপুরে 

বেসরকারি খপ্পরে সরকারি সাগর দত্ত হাসপাতাল 

ভেনেজুয়েলা নিয়ে সংলাপ

'শিল্পায়ন' হটাও পৃথিবী বাঁচাও 

চিঠিপত্র: চিন্তার স্বচ্ছতা অর্জন




 

সম্পাদকীয়

আমার  জ্বলেনি  আলো !

সারা পৃথিবীতে যে ১২০ কোটি মানুষ শৌচাগারের অভাবে খোলা মাঠেঘাটে মলত্যাগ করতে বাধ্য হয়, তার মধ্যে ৬৬ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ এদেশের। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা, নিকাশী ও পানীয় জলের ব্যবস্থা না থাকায় ফি বছর শুধু পেটের অসুখে এদেশের লক্ষ লক্ষ শিশু মায়ের কোল খালি করে চলে যায়।


তবু আমরা স্বাধীন! কেবল স্বাধীনই নয়, আমরা এখন নাকি গ্লোবাল ইকোনমিক জায়েন্ট আর সুপার পাওয়ার হওয়ার পথে! আমরা বিশ্বদানব, মহাক্ষমতা হতে চলেছি। আর কে না জানে, সেটাই তো আমাদের অগ্রাধিকার, আমাদের টার্গেট! শুধু তাই নয়, আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স, উত্তর কোরিয়া, ইজরায়েল, চীনের জাতে উঠে আমরা দুটি ভাই --- ভারত ও পাকিস্তান --- নিউক্লিয়ার ক্লাব-এর সদস্য হতে চলেছি। আসুন, আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বকে সেলিব্রেট করি।

    আমাদের বাপ-ঠাকুর্দার আমলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় একটা কথা ভাবনা-চিন্তার মধ্যে ছিল, দেশের স্বক্ষমতা অর্জন করা। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হল। তার পরেও একটা কথা উঠত : শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেই চলবে না, অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও অর্জন করতে হবে। ওই স্বক্ষমতা অর্জনের প্রসঙ্গটাও তখন একেবারে মুছে যায়নি। ১৯৭০-এ যখন পরমাণু অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তি NPT এল, ভারতের রাষ্ট্রনায়কেরা বললেন, আমরা সই করব না। কেউ বোমা বানাবে আর কেউ আঙুল চুষবে, এই পরমাণু-বৈষম্য মানছি না। তারপর ভারতও ১৯৭৪-এ পরমাণু বোমা ফাটালো। দেশের স্বক্ষমতা অর্জনের কথাটা খোলাখুলি ক্ষমতা অর্জনের ঘোষণায় চাপা পড়ে গেল। ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয় পরমাণু বোমা ফাটিয়ে আমরা মহাক্ষমতা অর্থাৎ সুপার পাওয়ার হওয়ার দৌড়ে নেমে পড়লাম।

    গৃহস্থ ঘরের পুরুষ এরকম ক্ষমতার নেশায় উন্মাদ হয়ে গেলে পড়শিরা বলে শয়তানে পেয়েছেকিন্তু আদতে সে তো মানুষই --- কারও বাপ, কারও ছেলে, কারও প্রেমিক, কারও বা বন্ধু। নিজের অস্তিত্বের জন্য, নিজেদের পরিবার, পাড়া, জাত, কৌম বা দেশের অস্তিত্বের জন্য তার মধ্যে জেগে ওঠে অপরকে --- অপর পরিবার, পাড়া, জাত, কৌম বা দেশকে --- ধ্বংস করার প্রবৃত্তি, ক্ষমতা ব্যবহারের ইচ্ছে। একটা পরিবার, সমাজ বা জনগোষ্ঠীও বেঁচে থাকার যুক্তিতে সেই ক্ষমতা বা পাওয়ারকে অনুমোদন দেয়। সেই ক্ষমতা তো শ্রেণী-নির্বিশেষে পরিবার, সমাজ বা জনগোষ্ঠীর ওপরও প্রতিষ্ঠা পায়, আধিপত্য করে এবং শেষত গড়ে তোলে সাম্রাজ্য। এই ক্ষমতারই তো সর্বোত্তম (বা জঘন্যতম) প্রকাশ পরমাণু-ক্ষমতা।

কেবল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাই নয়, সোভিয়েত এবং চীনও যুক্তি দিয়েছে নিউক্লিয়ার ডেটারেন্স বা পরমাণু প্রতিষেধকতার। অর্থাৎ আমার হেফাজতে পরমাণু বোমা থাকলে অপর আর আমাকে পরমাণু বোমা মারতে পারবে না। কারণ, আমিও পাল্টা তাকে মারতে পারি, সে জানে। শুধু রাষ্ট্র নয়, ওদেশের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে জানাজানি হলে এদেশের মানুষ, মিডিয়া আমাদের পরমাণু অস্ত্রের জন্য পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে। হাতের কাছে উদাহরণ পাকিস্তান। আর পরমাণু প্রতিষেধকতার একটা হিসেব নেওয়া যাক। আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে রেডি করে রাখা পরমাণু অস্ত্র ছোঁড়া থেকে পৌঁছানোর সময়কাল আধঘন্টা। ১৫ মিনিট সময় থাকে তাকে নিষ্ক্রিয় করার পরমাণু অস্ত্র ধেয়ে আসছে কিনা রাডারে তা ধরা পড়ে, তাও ওই প্রথম ১৫ মিনিটের অনেকটা কাটিয়ে। সব মিলিয়ে মিনিট তিনেকের মতো থাকে পরমাণু অস্ত্র ছোঁড়ার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য। পরমাণু প্রতিষেধকতা বাস্তবত ওই একচুলের ওপর দাঁড়িয়ে।


এভাবেই শক্তিশালী হয়ে চলে বিভিন্ন আয়তনের গণ-বিধ্বংসী ক্ষমতার খোঁজ। পরমাণু অস্ত্র আর তার ব্যবহারের এই গণ-প্রয়োজনীয়তা আজও হয়ত রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের মধ্যে দিয়ে ফুটে বেরোচ্ছে, কিন্তু কাল তা আরও ছোটো ছোটো পরিসরে ফুটে বেরোতেই পারে। অস্ত্র-প্রযুক্তি তথা উৎপাদনের গতিও সেদিকে লক্ষ্য রেখেই। সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্র তার নিজের পরমাণু অস্ত্রের সমৃদ্ধ ভাঁড়ার আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এবার আর শুধু বড়ো বড়ো অস্ত্র নয়, ছোটো ছোটো অস্ত্রও।

    কেবল একটিমাত্র দেশ নিজের সরকার বদলের মাধ্যমে ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছিল যুদ্ধের প্রথম কয়েকটি বছরে। তার নাম স্পেন। সাধারণ নির্বাচনের দিন দুয়েক আগে রাজধানী মাদ্রিদে টিউব রেলে বিস্ফোরণে কয়েক শত মানুষের মৃত্যুর বিনিময়ে যুদ্ধবিরোধী জাপাতেরোর দিকে জনসমর্থন ঘুরে গিয়েছিল রাতারাতিক্ষমতার মদমত্ত সেই গৃহস্থ ঘরের ছেলেটারও তো দুটো ভাতের খিদে পায়; তার বৌ হয়ত বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে জান দেয়; কিংবা বাচ্চাটা মামুলি পেটের অসুখে ভুগে নেতিয়ে পড়ে। ব্যক্তির জীবনে যেমন, সমষ্টির জীবনেও স্ব-ক্ষমতা অর্জনের প্রসঙ্গটা ফিরে ফিরে আসে। আর রাষ্ট্র-জীবনেও তা ছায়া ফেলে। সেখানে তখন শুরু হয় আর একটা গল্প।

    এই গল্পটা নিজের নিজের ঢঙে শোনায় রাহুল গান্ধী বা মহম্মদ সেলিম। গল্পটা এরকম : পরমাণু ক্ষমতায় ভর করে আমরা পাব বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আমরা পাব শিল্পায়নশিল্পায়ন হল উন্নয়নের চাবিকাঠি। উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা পাব অর্থনৈতিক বিকাশ। অর্থনৈতিক বিকাশের পথে আমাদের বড়োলোকরা আরও বড়ো হবে। মধ্যবিত্তরা হবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত। আর তাদের শরীরের চর্বি-গলা তেল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পৌঁছাবে সেই নিচের তলায়, যেখানে এখনও বাজার থেকে কেনা ইলেকট্রিকের বাতি জ্বলেনি। পরমাণু-ক্ষমতা তাকে দেবে সেই আলো। তার সঙ্গে দেবে পরমাণু বোমা। একটা কিনলে একটা ফ্রি!

    পরমাণু-ক্ষমতা কেবল অতিমানবিকই নয়। অতিপ্রাকৃতিক যে ক্ষমতার বলে আমরা আজ আলোকিত হতে চাইছি, তার দিকে কেবল চোখ কচলে তাকালেই দেখা যায়, এ আসলে সামগ্রিক ধ্বংসের বার্তাবহ।