মন্থন সাময়িকী  

সেপ্টেম্বর অক্টোবর ২০০৭ 

 

হোম পেজ 

ইমাম সাহেবের মাস-মাইনে                

বিকল্প নিয়ে কথাবার্তা                     
 

চাষের বিকল্প নীতির সন্ধানেজাতীয় কৃষি কমিশনের প্রধান এম.এস.স্বামীনাথনের কাছে ভাস্কর সাভের চিঠি                         

গ্রাম-সমীক্ষা : রেশনে দুর্নীতি ও বিক্ষোভ   
 

রেশন ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি                
 

দক্ষিণ ২৪ পরগণার কাঙ্গনবেড়িয়া গ্রামের রেশন-চিত্র
 

আমার জানাবোঝায় রেশন ব্যবস্থা          

মেঠো কবির প্রার্থনা                  
 

 

 

সম্পাদকীয় 

নন্দীগ্রাম : বিদ্রোহ , বিকল্প এবং ব্যবস্থাভুক্তির  বিপদ

 

দৈনন্দিনের রুটিনবাঁধা জীবন বা ভাবনায় যখন আমরা হঠাৎ করে আটকে যাই, সামনে যাকে সেই ঘটনার আয়োজকের ভূমিকায় দেখতে পাই, আমরা তার ওপর বিরক্ত হই, পারলে কিংবা বেশি বিরক্ত হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি।
আজ নন্দীগ্রামের ঘটনায় অনেকের চোখে পড়েছে, এই আয়োজকের ভূমিকায় রয়েছে দল [সিপিএম] ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এক যৌথ ক্ষমতা। কেউ তা দেখে বিরক্ত হয়েছে, কেউ প্রতিবাদও করছে। আবার আবেদন-নিবেদন-তোয়াজও যে কেউ করছে না তা নয়। তবে সকলেই কমবেশি ভয় পেয়েছে। ৬-৭ তারিখ যখন সাতেঙ্গাবাড়ি থেকে সিপিএমের মিছিল শুরু হল, বহু গ্রামবাসী তাতে যোগ দিয়েছে।
একজন বুদ্ধিজীবী যখন তার ভাবনায় মননে যুক্তি-বিবেকবোধে আটকে যায়, একটা অস্বস্তি হয় তার। মুক্তি পেতে সে প্রতিবাদের রাস্তা নেয়, একান্ত ব্যক্তিগত স্তরে হয়ত একটা বিদ্রোহ কখনও করে।
একজন সাধারণ মানুষ --- শ্রমজীবী বা দিন-আনি-দিন-খাই মানুষ  --- যখন তার রুটি-রুজি বা জীবনযাপনে হঠাৎ আটকে যায়, সে কখনও কখনও প্রতিবাদ করে, তার মন হয়ে ওঠে বিদ্রোহী, স্ব-উদ্যোগে একটা জনবিদ্রোহ জেগে ওঠে সমাজে। এমনটাই ঘটেছিল নন্দীগ্রামে। কিন্তু সেই জনউদ্যোগ প্রায়শই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যখন সেই বিদ্রোহ বা তার ফলকে ধরে রাখার জন্য সংগঠনের প্রশ্ন ওঠে, তখন বিদ্রোহের প্রকৃত রূপকারেরা একটু পাশে সরে যায়, সামনে চলে আসে মুখপাত্র হওয়ার যোগ্য বলে পরিচিত আর একদল মানুষ। নন্দীগ্রামেও যখন ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’ তৈরি হল, তখন তার প্রতিনিধিত্ব হল দল/গোষ্ঠী হিসেবে। এমনকী SEZ-এর জন্য স্থির হওয়া এলাকার বাইরে থেকেও প্রতিনিধি মনোনীত হয়েছিল। তারপর আসে দলের স্বার্থ ও দলীয় পতাকা। নন্দীগ্রামের ওই এলাকায় ৫ জানুয়ারির পর দেখা গিয়েছিল কালো পতাকা। ১৪ মার্চ এসেছিল লাল পতাকা। ১৬ মার্চ এল ঘাস-ফুল আঁকা তেরঙা পতাকা আর ৭ থেকে ১২ নভেম্বর আবার ফিরে এল লাল পতাকা। এটাও কি একটা দলতন্ত্রের আবর্তে আটকে যাওয়াই নয়?
বুদ্ধিজীবীর ব্যক্তিগত স্তরেই হোক বা সমাজের সমষ্টিগত স্তরেই হোক, এরকম নানান আটকে যাওয়ার মুহূর্তগুলিতে একটা শব্দ আজকাল আমরা উচ্চারণ করে থাকি : বিকল্প। এই চক্করে আটকে যাওয়াই যখন আমাদের নিয়তি, তাহলে বিকল্পটা কী?
এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ খোঁজে সিপিএমের বিকল্প, কেউ খোঁজে দলতন্ত্রের বিকল্প, কেউ খোঁজে রাজনীতির বিকল্প, কেউ পুঁজি বা ক্ষমতা-তন্ত্রের বা আরও বৃহত্তর কোন পরিধিতে মাথা ঘামায়।
মজার কথা, যে বলে ‘শিল্পই ভবিষ্যত’ বা ‘উন্নয়ন আটকে গেলে চলবে না’, সে যেমন বিকল্প-সন্ধানী; আবার ‘গ্রাম স্বরাজ’ বা ‘শিল্প-উত্তর সমাজ’-এর স্বপ্ন যে দেখে, বিকল্প তারও অ্যাজেন্ডা।
আরও মজার কথা, এই প্রতিবাদ-বিদ্রোহ-বিকল্প সন্ধানের সবচেয়ে বড়ো প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে কর্পোরেট বড়ো মিডিয়া, একভাবে সেই এখন সবচেয়ে বড়ো সংযোগকারী।
নিজেদের দিকে তাকাই। আমাদের লিট্ল ম্যাগাজিন আন্দোলনে আমরা বেশ কিছুকাল ধরে কী দেখছি? আমরা খুদে-সম্পাদকেরা অর্থাভাবে, পত্রিকা বিতরণ/বিক্রির অসুবিধায় পড়ে, কীভাবে বিজ্ঞাপনের জন্য, আকর্ষণীয় মলাটের জন্য, নামী লেখক-কবি-প্রাবন্ধিকের জন্য, সরকারি পুরস্কার/স্বীকৃতির জন্য, বাজারে ভালো খায় এমন বিষয়/ইস্যুর জন্য বড়ো বাজারি পত্রিকা ও মিডিয়ার ছকটাতে বারবার ঢুকে পড়েছি। তা কখনও এতটাই যে, বেমালুম ভুলে গেছি, ঠিক কোথা থেকে আর কেনইবা আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম।
এ যেন সেই শিব্রামের ‘গোলদীঘির ভারী গোল’! গোলদীঘি থেকে বেরিয়ে দিনের শেষে গোলদীঘিতেই ফিরে আসা। যে ব্যবস্থা-বূহ্যে আটকে না থাকতে চেয়ে প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, বিকল্পের খোঁজ, বেরিয়ে পড়া --- দিনের শেষে তারই অন্তর্ভুক্ত হওয়া --- আর তা এত দ্রুত ঘটছে যে শিহরিত হতে হয়।