মন্থন সাময়িকী

নভেম্বর ডিসেম্বর ২০০৭ 

হোম পেজ

 

বালিতে মহিলাদের একটি আবেদন 

 

খেজুরির ঘরছাড়াঃ অতিকথা এবং বাস্তবতা

ভাণ্ডারদহ বিল, একটি আন্দোলনের শুরু 

তসলিমা প্রসঙ্গে একটি সংলাপ 

তসলিমা ও সেকুলারিজম 

 

চিঠিপত্র

১. বিষয় : বিকল্প নিয়ে কথাবার্তা

২. বিষয় : বিকল্প নিয়ে কথাবার্তা

৩. বিষয় : বিকল্প নিয়ে কথাবার্তা

৪. বিষয় : রেশনে দুর্নীতি ও বিক্ষোভ

৫. বিষয় : মেঠো কবির প্রার্থনা

 

শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ?

প্রতিবেদন :

লিট্ল ম্যাগাজিন সমাবেশ

 

 সম্পাদকীয়
 

কারা গ্রাম ভাঙতে চাইছে?

কারা গ্রাম ভাঙতে চাইছে? --- একটা নাটক। এই নাটক নুয়াগাঁও, গড়কুজঙ্গ ও ধিনকিয়ার গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায় অভিনয় করেছে ‘রাষ্ট্রীয় যুব সংগঠন’ এবং ‘নব নির্মাণ সমিতি’র যুবক-যুবতীরা। এ নাটক আমরা দেখিনি। কিন্তু নাটক অনেক সময় হয়ে ওঠে জীবনের আর্শি। যে জীবন আমরা প্রতিদিন যাপন করি, তাকেই অনেক সময় কোন আর্শিতে একটু নজর করে নেওয়ার দরকার হয়।
কারা গ্রাম ভাঙতে চাইছে? --- এ সময়ের এক প্রশ্ন, এক আত্মজিজ্ঞাসা, এক তর্কও বটে। এ প্রশ্ন উঠেছে জগৎসিংহপুরের তিন পঞ্চায়েত নুয়াগাঁও, গড়কুজঙ্গ ও ধিনকিয়ার গ্রামে গ্রামে; উঠেছে পাটনা, নুলিয়াশাহী ছাড়িয়ে জটাধারী মোহানা পর্যন্ত শত শত গ্রামে। কিন্তু সেখানেই জিজ্ঞাসা আর তর্ক থেমে থাকেনি। কারণ কটকের সরকারি বেতার মাধ্যমে আর এক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে আর এক বেতার-নাটকের মাধ্যমে : ‘স্বপ্ন সত্য হল’। এ স্বপ্ন হল উন্নয়নের স্বপ্ন, নগরায়ন-শিল্পায়ন-বিশ্বায়নের স্বপ্ন। নাটকে বলা হয়েছে ‘পোহাং স্টিল কোম্পানি’, সংক্ষেপে পস্কো (POSCO) সেই স্বপ্ন-পূরণের দূত, যারা তার শিল্প-সাম্রাজ্য বিস্তারে বাধা দিতে চায়, এমনকি প্রশ্ন তুলতে চায়, তারা ষড়যন্ত্রকারী, অন্য কোম্পানির দালাল, উন্নয়নের বিরোধী, নিদেনপক্ষে মাওবাদী!
গ্রামের ভাঙন না শিল্পশহরের পত্তন? সুখস্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন? জিজ্ঞাসা আর তর্ক ছড়িয়ে পড়েছে জগৎসিংহপুর থেকে কটক, ভুবনেশ্বর ছাড়িয়ে সারা উড়িষ্যায়।
সমুদ্রের নিকটবর্তী শত শত গ্রাম গড়ে উঠেছে কয়েকশ’ বছর ধরে। অবিভক্ত কটক জেলার অংশ ছিল এখনকার জগৎসিংহপুর জেলা। বর্ষায় কটক থেকে সমস্ত জল নদী-নালা-খাল বেয়ে নেমে আসে পারাদীপ বন্দরের পাশে জটাধারী মোহানায়। এই জলসিঞ্চিত জঙ্গলের জমিতে বালির মধ্যেই বছরভর চলে অতি উৎকৃষ্ট মানের পানচাষ, কাজুচাষ; মাটিতে হয় ধান আর নদী-নালা-খালে হয় মাছচাষ। এক-একটা পল্লীতে পুরুষানুক্রমিকভাবে গড়ে উঠেছে এই কর্মনির্ভর কৌমজীবন। পস্কো সেইসব গ্রামের ক্ষেত আর বসতজমিই শুধু দখল করতে চায় না, মাটির তলা থেকে আকরিক-লৌহ আর খনিজ নিষ্কাশন করে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে তছনছ করতে চায়। এমনকি, জটাধারী মোহানার দখল নিয়ে সেখানে প্রাইভেট পোর্ট বসাতে চায়। কেবল অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত তিন পঞ্চায়েতে এর পরিণাম সীমাবদ্ধ থাকবে না। আশপাশের শত শত গ্রাম হবে জলমগ্ন। ফসলের জমি, জঙ্গল আর মাটির নীচের জল হবে ধ্বংস। এককথায়, গ্রামসমাজ ভেঙে পড়বে।
স্বাভাবিকভাবেই সেই গ্রামসমাজের আপামর মানুষ সর্বনাশের ভয়ে আতঙ্কিত। তাদের ভয়ার্ত চোখের সামনে সরকার, কতিপয় সুবিধাভোগী নেতা, ধনী ব্যক্তি আর বিদেশি কোম্পানি মেলে ধরতে চাইছে সুখের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের জন্য উন্নয়ন আর এখন হাতে ক্ষতিপূরণের নামে কিছু টাকা।
২০০৫ সালের জুন মাসে সরকার পস্কোর সঙ্গে চুক্তি করেছে। গ্রামসমাজ তাতে সায় দেয়নি। দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা নিজেরাই গ্রামের দখল নিয়েছে তিন পঞ্চায়েতে। টানা তিন বছর পস্কো আর সরকারি কর্মকর্তারা অধিগ্রহণের জন্য জমি জরিপ পর্যন্ত করতে পারেনি। সরকারি দল বিজেডি, বিরোধী কংগ্রেস প্রথমে পিছু হটলেও এখন পস্কোর সঙ্গে আঁতাত করে গ্রাম ভাঙতে মরিয়া। ২৯ নভেম্বর তারা পস্কোর স্বপক্ষের সমস্ত শক্তি একত্র করে বাইরে থেকে গুণ্ডা এনে এই এলাকায় ঢোকার মুখে বালিটুথ গ্রামে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে; গ্রামবাসী, বিশেষত এই প্রতিরোধ আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা মহিলাদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং গ্রামে গ্রামে পুলিশ ছড়িয়ে দিয়েছে।
কায়েমী স্বার্থ নিজেদের স্বপ্নকে সত্য করে তোলার জন্য মরিয়া, হিংস্র হয়ে উঠেছে। গ্রাম ওদের ভাঙতেই হবে! ঢালাও মদ, মোটা টাকা আর সরকারি-বেসরকারি সন্ত্রাসের ক্ষমতায় ওরা আপন স্বপ্নকে গ্রামসমাজের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।
আপনিই বলুন, কারা গ্রাম ভাঙতে উদ্যত? কারা স্বপ্ন-নির্মাণের ছলে সমাজ-সভ্যতা-ঐতিহ্যের বনিয়াদটাকে উল্টে ফেলতে চায়? কারা নিজেদের যথেচ্ছ ভোগের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নের আতঙ্কের মতো, নিয়তির মতো গেঁথে দিতে চায় শ্রমজীবীদের মস্তিষ্কে? কারা গ্রাম-ভারতবর্ষের মাটি, জল আর আকাশটারও দখল নিতে আজ এত বেপরোয়া?