মন্থন সাময়িকী : জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি ২০১৩

হোম পেজ

সম্পাদকীয়


বাংলাদেশের জনসমাজে

শাহবাগের প্রভাব


ফাঁসি ফাঁসির দাবি


তিহার জেলে

আফজল গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার



মৃত্যুদণ্ড :

বাতিলযোগ্য একটি দণ্ড


পাকিস্তানে

হাজারা শিয়া গণহত্যা চলছে


সাম্প্রতিক

শাহবাগ আন্দোলনের দিনপঞ্জি


সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর



তারুণ্যের আহ্বান



শাপ-মুক্তি ঘটুক বাংলাদেশের



শাহবাগ নিয়ে

মেটিয়াব্রুজ-মহেশতলায় আলাপ








 

তিহার জেলে আফজল গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার


সংসদ ভবন আক্রমণের ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত দিল্লির তিহার জেলে বন্দি মুহাম্মদ আফজল গুরুর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন দিল্লির সাংবাদিক বিনোদ কে জোশ ২০০৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। ইংরেজি থেকে বাংলায় তরজমা করেছেন অমিতাভ সেন।


একটা রঙচটা টেবিল$ টেবিলের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে উর্দি পরা জাঁদরেল চেহারার একটি লোক$ তার হাতে একটা চামচ$ বন্দিদের সঙ্গে যারা দেখা করতে এসেছে তাদের দেখলে বোঝা যায় সবাই এই ব্যাপারটায় অভ্যস্ত --- লাইন দিয়ে দাঁড়ানো, প্লাস্টিকের ব্যাগ খুলে কী খাবার এনেছে দেখানো, গন্ধ শুঁকতে দেওয়া এবং প্রয়োজনে খাবার চাখতে দেওয়া$ সিকিউরিটির লোকটার চামচ সমানে চলতে থাকে ঘন তরকারির ঝোল ভেদ করে --- কারও আনা মালাই কোফতা, কারও শাহি পনির, আলু-বেগুন বা পাঁচ তরকারির ভিতরে$ সাক্ষাৎপ্রার্থীরা তাদের ছোটো ছোটো থলি খুলে তরকারির পাত্র উন্মুক্ত করলে প্রত্যেকটা তরকারির টুকরোকে চামচেটা যান্ত্রিকভাবে আলাদা করতে থাকে$ একজন মাঝবয়সি মহিলার আনা খাবার ঘাঁটাঘাঁটি করে চামচেটা পাশের টেবিলে রাখা একটা জলভরা স্টিলের বাটিতে ডুব দেয়$ তারপর চলে যায় লাইনে দাঁড়ানো পরবর্তী এক কিশোরের প্লাস্টিকের ব্যাগের মধ্যে$ এতক্ষণে স্টিলের বাটিতে রাখা জলটা বহুবর্ণে রঙিন হয়ে উঠেছে$ শীতের বিকেলের এক টুকরো আলো এসে বাটির জলে ভাসা তেলের ওপর পড়ে রামধনুর সাত রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে$

আমার পালা এল সাড়ে চারটে নাগাদ$ লোকটা চামচ নামিয়ে রেখে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত সারা শরীর হাতড়ে দেখল পরপর তিনবার$ তারপর যখন মেটাল ডিটেক্টরটা কঁক কঁক করে আওয়াজ করে উঠল, তখন আমার কোমরের বেল্ট, হাতঘড়ি আর চাবির গোছা জমা দিতে হল$ তামিলনাড়ুর স্পেশাল পুলিশের ব্যাজ পরা কর্তব্যরত লোকটাকে তখন বেশ তৃপ্ত দেখালো$ এবার আমাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হল$ তিহার কেন্দ্রীয় কারাগারের ৩নং কয়েদখানার অতি বিপজ্জনক ওয়ার্ডে ঢোকার আগে এই নিয়ে চতুর্থবার আমাকে নিরাপত্তা রক্ষীরা সার্চ করল$ আমি যাচ্ছি এই সময়ের বহু আলোচিত এক মানুষ মহম্মদ আফজলের সঙ্গে দেখা করতে$

একটা ঘর অনেকগুলো ছোটো ছোটো খুপরিতে ভাগ করা আছে$ সাক্ষাৎকারী ও খুপরিবাসীর মাঝখানে একটা লোহার গরাদ, মোটা কাঁচের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা$ দেওয়ালের গায়ে একটা মাইক আর একটা স্পিকার ফিট করা আছে দু-পক্ষের কথাবার্তা চালানোর জন্য$ যন্ত্রগুলো ভালো নয়, কথা প্রায় শোনাই যায় না$ কাঁচের দেওয়ালের দুই পারে কান খাড়া করে দেওয়ালে ঠেকিয়ে দু-পাশের লোক পরস্পরের কথা শোনার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যায়$ খুপরির মধ্যে দেওয়ালের ওপাশে মহম্মদ আফজল আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য এসে দাঁড়িয়েছেন$ তাঁর প্রশান্ত মুখে গভীর আত্মমর্যাদার ছাপ$ মধ্য তিরিশের একটু খাটো চেহারার এই মানুষটার পরনে সাদা পাজামা সাদা কুর্তা, পকেট থেকে রেনল্ডসের একখানা পেন উঁকি মারছে$ খুব পরিষ্কার গলায় অত্যন্ত বিনীত আদবকায়দায় তিনি আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন$

জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছেন আপনি?

আমি বললাম, ভালো$ কিন্তু আমিও কি একই প্রশ্ন করব? মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে কি এই প্রশ্নটা করা যায়? এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে প্রশ্নটা করেই ফেললাম$ খুব ভালো, ধন্যবাদ আপনাকে --- উষ্ণ কণ্ঠে তিনি উত্তর দিলেন$ প্রায় এক ঘণ্টা কথাবার্তা হল$ তারপর দু-সপ্তাহ বাদে আরেক দফা দ্বিতীয় সাক্ষাৎকার$ প্রতিবারই আমরা দুজন যতটা পারা যায় দ্রুত কথা চালাচালি করছিলাম, সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই যতটা করে নেওয়া যায়$ আমি তাঁর কথাগুলো আমার ছোট্ট পকেট নোটবুকে টুকে নিয়েছিলাম$ তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি এমন এক ব্যক্তি যিনি দুনিয়াকে অনেক কিছু বলতে চান$ তাঁর যাবজ্জীবন দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অবস্থান থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর অসহায় অপারগতার কথা বার বার বলছিলেন$ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ এবার বলছি$

--- আফজলের এত রকমের পরস্পর বিরোধী ছবি রয়েছে, কোন আফজলের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হচ্ছে?

--- সত্যি তাই? কিন্তু আমার যতদূর জানা আছে, সে তো একজনই আফজল$ আমিই সে$

--- কে সেই আফজল?

এক মুহূর্তের নীরবতা$ আফজল এক যুবক --- টগবগে, বুদ্ধিমান, আদর্শবাদী একজন যুবক$ আফজল এক কাশ্মীরি$ ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে কাশ্মীর উপত্যকার রাজনৈতিক আবহাওয়া যে হাজার হাজার কাশ্মীরিকে প্রভাবিত করেছিল তাদের মধ্যে একজন$ একজন, যে জেকেএলএফ-এর (জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট) সদস্য হিসেবে কাশ্মীর সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে চলে গিয়েছিল$ কিন্তু কয়েক সপ্তাহ না যেতেই স্বপ্নভঙ্গ হওয়ায় এপারে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করেছিল$ কিন্তু নিরাপত্তারক্ষীরা কখনো আমাকে স্বাভাবিক থাকতে দেয়নি$ ওরা আমাকে অসংখ্যবার তুলে নিয়ে গেছে, অত্যাচার করে আমার শরীরের মাংস খুবলে নিয়েছে, ইলেকট্রিক শক দিয়েছে, বরফগলা জলে চুবিয়েছে, পেট্রলে দেহ ভিজিয়েছে, নাকে শুকনো লংকা পোড়া ঢুকিয়ে বলেছে, এইসব কথা স্বীকার করতেই হবে আর মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করেছে$ ওরা আমাকে কোনো উকিল দেয়নি, আমার ন্যায্য বিচার করেনি আর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে$ পুলিশ যেসব মিথ্যা কথা বলেছে, সেগুলোই আপনাদের মিডিয়া ছড়িয়ে দিয়েছে$ হয়তো তার ফলেই এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে যে সুপ্রিম কোর্ট জাতির সমষ্টিগত বিবেক-এর প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছে$ আমি সেই মহম্মদ আফজল, যার সঙ্গে আপনি কথা বলছেন$

এক মুহূর্তের নীরবতার পর তিনি আবার বলতে শুরু করেন$

কিন্তু আমার ভাবতে খুব আশ্চর্য লাগে, বাইরের দুনিয়া এই আফজল সম্পর্কে আদৌ কিছু জানে কিনা$ আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করি, আমি কি আমার কাহিনী বলার একটাও সুযোগ পেয়েছি? আপনার কি মনে হয় আমার সঙ্গে ন্যায়বিচার করা হয়েছে? আপনি কি একজন মানুষকে কোনো উকিল না দিয়েই ফাঁসিতে ঝোলাতে চাইবেন? সে সারাটা জীবন কীসের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে এসেছে তা না শুনেই আপনি কি চাইবেন তাকে ফাঁসিতে লটকাতে? গণতন্ত্র মানে তো এসব নয়, তাই নয়?

--- আমরা কি আপনার জীবনের শুরুর দিকটা জানতে পারি? এই মামলাটা শুরু হওয়ার আগে আপনার যে জীবন ...

--- আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম, তখন কাশ্মীরে টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি$ মকবুল ভাটকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে$ কাশ্মীরের মানুষ ফের একবার ভোটে লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য$ মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট তৈরি করা হয়েছে অন্তিম সমাধানের সময় কাশ্মীরের মুসলিমদের আশা-আকাঙ্খার প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়ে$ নয়াদিল্লির প্রশাসন এই মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্টের প্রতি জনসমর্থন দেখে আতঙ্কিত হল$ তার ফল, ভোটে আমরা দেখলাম ব্যাপক রিগিং$ বিপুল ভোটে জয়ী নেতাদের গ্রেপ্তার করে, অত্যাচার করে জেলে পুরে দেওয়া হল$ তারপরই এই নেতারা সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয়$ এর প্রত্যুত্তরে হাজার হাজার যুবক অস্ত্র হাতে তুলে নেয়$ আমি শ্রীনগরের ঝিলম ভ্যালি মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস পড়া ছেড়ে দিলাম$ অনেকের মতো আমিও একজন জেকেএলএফ সদস্য হিসেবে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের দিকের কাশ্মীরে চলে গেছিলাম$ কিন্তু দ্রুতই আমার স্বপ্নভঙ্গ হল, যখন দেখলাম ভারতের রাজনীতিকরা কাশ্মীরিদের নিয়ে যা করে, পাকিস্তানি রাজনীতিকরাও তাই করছে$ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আমি ফিরে এলাম এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলাম$ বিএসএফ আমাকে একটা আত্মসমর্পনকারী জঙ্গির শংসাপত্র দিল$ আমি আবার নতুন করে জীবন শুরু করলাম$ ডাক্তার হতে পারলাম না বটে, কিন্তু কমিশন নিয়ে ওষুধ ও শল্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতি বিক্রির ব্যবসা শুরু করে দিলাম$ (আফজল হাসলেন)

ওই সামান্য রোজগার, কিন্তু তার জোরেই আমি একটা স্কুটার কিনলাম ও বিয়েও করে ফেললাম$ কিন্তু এমন একদিনও কাটত না, যে দিন আমাকে রাষ্ট্রীয় রাইফেল আর স্পেশাল টাস্ক ফোর্স জ্বালায়নি$ কাশ্মীরের কোথাও যদি কোনো জঙ্গি হামলা হত, তাহলেই সাধারণ কাশ্মীরিদের বেঁধে মেরে চামড়া তুলে দিত ওরা$ আর আত্মসমর্পনকারী জঙ্গি হলে তো কথাই নেই$ সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে ওরা আমাদের আটকে রাখত, ভয় দেখাত মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেবে বলে, আর মুক্তির বিনিময়ে প্রচুর ঘুষ চাইত$ আমাকে অনেকবার এই অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে$ ২২ রাষ্ট্রীয় রাইফেলের মেজর রাম মোহন রায় আমার যৌনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দিয়েছে$ আমাকে অনেকবার ওদের পেচ্ছাপ পায়খানা পরিষ্কার করতে হয়েছে এবং ওদের ক্যাম্প ঝাঁট দিতে হয়েছে$ একবার হুমহামা অত্যাচার ক্যাম্প থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য আমার সর্বস্ব দিতে হয়েছিল$ ডিএসপি বিনয় গুপ্তা আর ডিএসপি দেবীন্দর সিং এই অত্যাচার পর্ব দেখভাল করত$ ওদের একজন অত্যাচার বিশেষজ্ঞ ইনসপেক্টর শান্তি সিং আমাকে তিনঘন্টা ধরে ইলেকট্রিক শক দিয়েছিল যতক্ষণ না আমি ওদের এক লাখ টাকা ঘুষ দিতে সম্মত হই$ আমার বউ তার গয়না বিক্রি করে দিয়েছিল, আর ওরা আমার স্কুটারটা বিক্রি করে দিয়েছিল$ জেল থেকে আমি বেরিয়েছিলাম অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে$ ছয় মাস ধরে আমি ঘরের বাইরে বেরোতে পারিনি, শরীরে কোনো শক্তি ছিল না$ আমি এমনকী আমার বউয়ের সঙ্গে শুতে পর্যন্ত পারতাম না, কারণ আমার যৌনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়েছিল$ চিকিৎসা করিয়ে আমার যৌন ক্ষমতা ফেরাতে হয়েছিল ...$

নিজের ওপর শারীরিক অত্যাচারের বিবরণ দিতে দিতে আফজলের মুখের শান্ত ভাবটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল$ মনে হচ্ছিল, তাঁর ওপর অত্যাচারের আরও খুঁটিনাটি তিনি আমাকে বলতে চাইছিলেন$ কিন্তু আমারই দেওয়া করের টাকায় পোষা এইসব নিরাপত্তারক্ষীদের অত্যাচার চালানোর ভয়াল কাহিনী আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না$ আমি তাঁর কথার মাঝখানে ঢুকে অন্য প্রশ্নে চলে গেলাম$

--- আপনি যদি আপনার মামলাটা সম্পর্কে একটু বলেন ... ঠিক কী কী ঘটনা এই সংসদ আক্রমণের মামলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল?

--- এসটিএফ ক্যাম্প থেকে আমি শিক্ষা পেয়েছিলাম, হয় এসটিএফ-এর সাথে অন্ধভাবে সহযোগিতা কর, আর যদি প্রতিরোধ করো তাহলে তোমার তোমার পরিবারের লোকেদের জন্য রোজ বরাদ্দ থাকবে লাঞ্ছনা$ ফলে ডিএসপি দেবীন্দর সিং যখন আমাকে তার খাতিরে একটা ছোটো কাজ করতে বলল, আমি না করতে পারিনি$ সে ঠিক এই কথাটাই আমাকে বলেছিল, ণ্ণএকটা ছোটো কাজ$ সে আমাকে বলল, একটা লোককে দিল্লি নিয়ে যেতে হবে$ দিল্লিতে তাকে একটা ভাড়াবাড়ি খুঁজে দিতে হবে$ আমি তাকে সেই প্রথমবারের জন্য দেখেছিলাম, সে কাশ্মীরিতে কথা বলছিল না, তাই আমি ভেবেছিলাম, সে বহিরাগত$ তার নাম বলেছিল মোহাম্মদ (পুলিশ পরে বলেছিল, মোহাম্মদই সেই লোক, যে সংসদ আক্রমণ করা পাঁচজনের দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিল$ তারা সবাই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা যায়)$

যখন আমরা দিল্লিতে ছিলাম, দেবীন্দর সিং আমাকে আর মোহাম্মদকে ফোন করত$ আমি আরও লক্ষ্য করেছিলাম, মোহাম্মদ দিল্লিতে অনেক লোকের সঙ্গে দেখা করছে$ সে একটা গাড়ি কেনার পর আমাকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে বলেছিল এটা উপহার, এবার আমি ফিরে যেতে পারি$ এবং আমি কাশ্মীর ফিরলাম ঈদ উপলক্ষে$

আমি যখন সোপোরে ফেরার পথে শ্রীনগর বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছি, আমাকে গ্রেফতার করে পারিমপোরা থানায় নিয়ে যাওয়া হল$ ওরা আমাকে অত্যাচার করল, তারপর এসটিএফ-এর সদর দফতর হয়ে দিল্লি নিয়ে গেল$ দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল-এর অত্যাচার কক্ষে আমি তাদেরকে মোহাম্মদ সম্পর্কে যা জানতাম বলে দিলাম$ কিন্তু ওরা আমাকে জোর করল, আমি যেন বলি আমার তুতো ভাই শওকত, তার বউ নভজোত, এসএআর গিলানি এবং আমি মিলে সংসদ হামলার পরিকল্পনা করেছি$ ওরা আমাকে বলেছিল এই কথাগুলি আমি যেন মিডিয়ার সামনে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলি$ আমি প্রতিবাদ করলাম$ কিন্তু ওরা আমাকে বলল, আমার পরিবার ওদের হেফাজতে আছে এবং আমি না মানলে ওরা তাদের মেরে ফেলবে, ফলে ওদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করা ছাড়া আমার উপায় ছিল না$ আমাকে দিয়ে অনেক কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হল, আমাকে মিডিয়ার সামনে ওদের শেখানো কথা বলতে বাধ্য করা হল$ যখন একজন সাংবাদিক আমাকে এসএআর গিলানির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করলেন, আমি বললাম, এসএআর গিলানি নির্দোষ$ এসিপি রাজবীর সিং আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল ঘরভর্তি মিডিয়ার সামনে, আমি যা শেখানো হয়েছিল তার বাইরে বলে ফেলেছিলাম$ ওরা বেশ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল আমি গল্পের বাইরে চলে যাওয়ায়$ রাজবীর সিং সাংবাদিকদের অনুরোধ করল, আমি গিলানি নির্দোষ বলে যেখানে বলেছি, সেই অংশটা সম্প্রচার না করতে$

রাজবীর সিং পরদিন আমাকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে দিয়েছিল$ ফোনে কথা বলা শেষ হয়ে যাবার পর রাজবীর আমায় বলেছিল, আমি যদি তাদের সঙ্গে সহযোগিতা না করি, তাহলে ওদের শেষ করে দেওয়া হবে$ আমার অভিযোগ মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না এবং স্পেশাল সেল-এর অফিসাররা আশ্বাস দিয়েছিল, আমার কেসটা যথাসম্ভব হালকা করে দেওয়া হবে, যাতে আমি কিছুদিন পর ছাড়া পেয়ে যাই$ তারপর ওরা আমাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকল, মোহাম্মদ যে বাজার থেকে কেনাকাটা করত, সেখানেও নিয়ে গেল$ এভাবেই তারা প্রমাণ জোগাড় করল$

পুলিশ আমাকে বলির পাঁঠা করল, সংসদ হামলার চক্রীদের হদিশ পেতে তাদের ব্যর্থতা চাপা দেওয়ার জন্য$ ওরা লোককে বোকা বানিয়েছে$ এখনও লোকে জানে না, সংসদ হামলা কার মস্তিষ্কপ্রসূত$ আমাকে এই মামলার ফাঁদে ফেলে দিয়েছিল কাশ্মীরের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স, আর ফাঁসিয়ে দিল দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল$ মিডিয়া নিরন্তর আমার টেপ বাজিয়ে গেল$ পুলিশ অফিসাররা পুরস্কার পেল$ আমার মৃত্যুদণ্ড হল$

--- আপনি আইনের আশ্রয় নিলেন না কেন?

--- আমি কার কাছে যাব? আমার কেউ নেই$ বিচার চলার প্রথম ছ-মাস আমি এমনকী আমার পরিবারের কারোরই সঙ্গে দেখা করতে পারিনি$ তারপর তাদের সঙ্গে যখন পাতিয়ালা হাউস কোর্টে দেখা হল, সেও খুব সামান্য সময়ের জন্য চোখের দেখা$ আমার জন্য একজন উকিল ঠিক করে দেওয়ার কোনো লোক ছিল না$ যেহেতু আইনি সহায়তা পাওয়া এই দেশের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে পড়ে, তাই আমি আমার পছন্দ মতো চারজন আইনজীবীর নাম করেছিলাম আমার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য$ কিন্তু বিচারপতি এস এন ধিংরা জানালেন, ওই চারজনই আমার পক্ষ নিয়ে মামলা লড়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন$ আদালত আমার পক্ষে যে আইনজীবীকে দাঁড় করিয়েছিল, তিনি শুরুই করলেন আমার বিরুদ্ধে যায় এমন কতকগুলো প্রমাণপত্রকে সত্য ধরে নিয়ে$ অথচ সত্যিটা যে কী, সে সম্পর্কে একবারও আমাকে কোনো কথা জিজ্ঞেসও করলেন না$ ওই মহিলা আইনজীবী ঠিক মতো কাজ করছিলেন না এবং শেষে তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমার সঙ্গে অভিযুক্ত আরেকজনের পক্ষ নিয়ে সওয়াল করতে শুরু করলেন$ তারপর আদালত আমার জন্য এক বিচারবান্ধব নিযুক্ত করল, যার কাজ হল আমার পক্ষে না দাঁড়িয়ে আদালতের কাজকর্মে সহায়তা করা$ এই লোকটা কোনোদিন আমার সঙ্গে দেখাও করেনি$ তাছাড়া লোকটা ছিল খুবই সাম্প্রদায়িক এবং বিরূপ মনোভাবাপন্ন$ এই হচ্ছে আমার ঘটনা, আমার বিচারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার পক্ষে একজনও দাঁড়িয়ে সওয়াল করেনি$ ঘটনার সত্যতা হল এটাই যে এই ধরনের মামলায় আমার কোনো প্রতিনিধি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকলে বিচারে কী হতে পারে তা সকলেই বুঝতে পারবে$ যদি আপনারা আমাকে মেরে ফেলতেই চান, তাহলে এতদিন ধরে এরকম একটা দীর্ঘ বিচার চালানোর প্রয়োজনটা কী? আমার কাছে এর কোনো মানেই হয় না$

--- আপনি কি বিশ্বের কাছে কোনো আবেদন করতে চান?

--- তেমন বিশেষ কোনো আবেদন আমার নেই$ ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে আমার আবেদনপত্রে যা বলার তা আমি বলেছি$ আমি বলেছি, অন্ধ জাতীয়তাবাদ এবং ভ্রান্ত ধারণাগুলো যেন আপনাকে এমন বিপথগামী না করে যাতে আপনার সহনাগরিকদের একান্ত মৌলিক অধিকারগুলোকে পর্যন্ত আপনাকে অস্বীকার করতে হয়$ ট্রায়াল কোর্টের বিচারে প্রাণদণ্ড পাওয়ার পরে এস এ আর গিলানি কী বলেছিলেন সে কথা আমি আবার বলতে চাই, শান্তি আসে ন্যায়ের সঙ্গ ধরে$ যদি ন্যায়বিচার না থাকে, শান্তিও থাকতে পারে না$ আমার মনে হয় এই কথাটা আমি এখন সবাইকে বলতে চাই$ আপনারা যদি আমায় ফাঁসিতে ঝোলাতে চান তাহলে সেই পথে এগিয়ে যান$ কিন্তু মনে রাখবেন, এই ঘটনা ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গায়ে এক কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দিয়ে যাবে$

--- জেলের ভিতর অবস্থাটা কেমন?

--- আমাকে রাখা হয়েছে একটা খুপরিতে একা, যেখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক আসামীদের খুব সতর্ক পাহারায় রাখা হয়$ দুপুরবেলায় একবার আমায় অল্প সময়ের জন্য বাইরে বেরোতে দেওয়া হয়$ কোনো রেডিও বা টেলিভিশন নেই$ এমনকী যে খবরের কাগজটা আমি নিজের খরচে আনাই সেটাও ছেঁড়াখোঁড়া অবস্থায় আমার কাছে পৌঁছায়$ আমার সম্পর্কে কোনো খবর থাকলে ওরা সেই অংশটা কেটে বাকি কাগজটা আমাকে পাঠায়$

--- আপনার অনিশ্চিত ভবিষ্যত ছাড়া আর কোন বিষয়টা আপনাকে ভাবায়?

--- হ্যাঁ, আরও অনেক কথা আমার মনে হয়$ শত শত কাশ্মীরি বিভিন্ন জেলে নানারকম কষ্টের মধ্যে রয়েছে$ তাদের উকিল নেই, বিচার নেই, কোনো অধিকার নেই$ কাশ্মীরের রাস্তায় যেসব কাশ্মীরি নাগরিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের অবস্থাও তথৈবচ$ গোটা উপত্যকা যেন এক মুক্ত জেলখানা$ আজকাল ভুয়ো সংঘর্ষের খবর কিছু বেরোচ্ছে$ কিন্তু তা ভাসমান বরফখণ্ডের সামান্য চূড়াটুকু মাত্র$ একটা সভ্য রাষ্ট্রে আপনি যা যা দেখতে চান না তার সবকিছুই কাশ্মীরে আছে$ কাশ্মীরের নিঃশ্বাসে অত্যাচার, প্রশ্বাসে অবিচার$

তিনি এক মুহূর্তের জন্য থামেন$

--- আরও অনেক কথা আমার মনে আসে; যেসব চাষিরা জমি থেকে উৎখাত হয়ে গেছে, যেসব ব্যবসায়ীদের দোকান দিল্লিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এমন আরও কত মানুষের কথা$ অবিচারের কত মুখ আপনি দেখবেন, চিনতে পারবেন, পারবেন না? আপনি কখনো ভেবেছেন, কত হাজার হাজার মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে, কতজনের জীবিকা, কতজনের পরিবার ...? এইসব জিনিসও আমাকে খুব উদ্বিগ্ন করে$

আর একবার অনেকক্ষণ আফজল থেমে থাকেন$

--- দুনিয়ার নানারকম ঘটনা নিয়েও ভাবি$ সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করার ঘটনাও আমাকে খুব দুঃখ দিয়েছিল$ অন্যায় কত খোলাখুলি ও নির্লজ্জভাবে করা যায়! ইরাক, যে দেশে মেসোপটেমিয়ার মতো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা ছিল, যে সভ্যতা আমাদের গণিত শিখিয়েছিল, শিখিয়েছিল ৬০ মিনিটে ঘণ্টার ঘড়ির ব্যবহার, ২৪ ঘণ্টায় দিনের হিসেব আর ৩৬০ ডিগ্রির বৃত্ত, সেই সভ্যতাকে আমেরিকা ভেঙে ধূলিস্যাৎ করে দিল$ আমেরিকানরা অন্য সমস্ত সভ্যতা আর মূল্যবোধকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে$ এখন তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হল ঘৃণা ছড়ানো ও ধ্বংসসাধন করার সবচেয়ে ভালো উপায়$ এরকম বহু কিছু সম্পর্কে আমি বলে যেতে পারি যা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে$

--- আপনি এখন কী কী বই পড়ছেন?

--- আমি অরুন্ধতী রায় শেষ করেছি$ এখন এক্সিসটেন্সিয়ালিজম্‌ নিয়ে সার্ত্রের লেখা পড়ছি$ জানেন, জেলের লাইব্রেরিতে বই খুব কম$ এসপিডিপিআর (সোসাইটি ফর দি প্রোটেকশন অফ ডিটেনিজ অ্যান্ড প্রিজনার্স রাইট্‌স) সদস্যরা জেল পরিদর্শনে এলে তাদের বইয়ের সমস্যার কথা বলতে হবে$

--- আপনার পক্ষে একটা প্রচার আন্দোলন চলছে ...

--- যে হাজার হাজার মানুষ এগিয়ে এসে বলেছে আমার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে, তাদের সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ$ ছাত্র, আইনজীবী, লেখক, বুদ্ধিজীবী সমস্ত মানুষ, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে, তারা সত্যি একটা বড়ো কাজ করছে$

২০০১ সালের গোড়ার দিকে যখন মামলাটা সবে শুরু হয়, তখন অবস্থাটা এমন যে ন্যায়বিচারের পক্ষের লোকেদের এগিয়ে আসাটা রোখা মুশকিল ছিল$ যখন এস এ আর গিলানিকে হাইকোর্ট বেকসুর খালাস করে দিল, তখন সাধারণ মানুষ পুলিশকেই সন্দেহ করতে শুরু করল$ তারপর যখন আরও অনেক মানুষ এই মামলার খুঁটিনাটি জানতে পারল এবং মিথ্যে ছাপিয়ে সত্যিটা জানতে পারল, তখন তারা অনেক প্রশ্ন করতে লাগল$ এটা খুব স্বাভাবিক যে ন্যায়বিচারপ্রেমী মানুষ সোচ্চারে বলবে আফজলের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে$ কারণ সেটাই সত্য$

--- আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনার ব্যাপারে পরস্পর বিরোধী মন্তব্য করেছে কি?

--- আমার স্ত্রী বরাবর বলে এসেছেন আমাকে ফাঁসানো হয়েছে$ তিনি দেখেছেন আমার ওপর এসটিএফ-রা কীরকমভাবে অত্যাচার চালিয়েছে আর আমাকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দেয়নি$ আমার স্ত্রী জানেন, আমাকে কেমন করে এই মামলাটায় জড়ানো হয়েছে$ তিনি আমাকে দেখাতে চান, আমাদের ছেলে গালিব কেমন বড়ো হয়ে উঠেছে$ আমার এক বড়ো ভাই আছে, তিনি আপাতভাবে আমার বিরুদ্ধে বলেছেন, কারণ তিনি এসটিএফ-দের জুলুমের চাপের মধ্যে আছেন$ তিনি যা করছেন, সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক, এটুকুই আমি বলতে পারি$

দেখুন, এটাই এখন কাশ্মীরের বাস্তবতা, যাকে আপনারা কাউন্টার ইনসার্জেন্সি অপারেশন বলেন$ সেটা যে কোনো নোংরা চেহারা গ্রহণ করতে পারে --- ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে, প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিবেশীকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে$ আপনারা আপনাদের নোংরা কৌশল দিয়ে একটা সমাজকে ভেঙে ফেলছেন$

প্রচার আন্দোলন সম্বন্ধে যেটুকু বলা যায়, আমি গিলানি এবং অন্য সমাজকর্মীদের পরিচালিত এসপিডিপিআর-কে অনুরোধ করেছি এবং দায়িত্ব দিয়েছি প্রচারের দিকটা দেখার জন্য$

--- আপনার স্ত্রী তাবাসুম ও ছেলে গালিবের কথা ভাবলে আপনার কী মনে হয়?

--- এবছর আমাদের বিয়ের দশমবার্ষিকী$ এর মধ্যে অর্ধেক সময়ই আমি জেলে কাটালাম$ এর আগেও আমি বহুবার কাশ্মীরে নিয়োজিত ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও নির্যাতিত হয়েছি$ আমার শারীরিক ও মানসিক ক্ষতগুলো তাবাসুম দেখেছেন$ অনেকবার আমি অত্যাচার-শিবির থেকে এমন অবস্থায় ফিরেছি যে দাঁড়াতে পারছিলাম না$ পুরুষাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া সমেত সবরকমের অত্যাচার আমার ওপর চালানো হয়েছে$ আমার স্ত্রী সবসময় আমার বাঁচার আশা জোগাতেন$ আমরা একটা দিনও শান্তিতে কাটাতে পারিনি$ বহু কাশ্মীরি দম্পতির জীবনে এরকম একই ঘটনা ঘটেছে$ সমস্ত কাশ্মীরি পরিবারে ধারাবাহিক আতঙ্কের অনুভূতি চেপে বসেছে$

আমাদের যখন একটা বাচ্চা হল, কী খুশিই যে আমরা হয়েছিলাম$ প্রবাদপ্রতিম কবি মির্জা গালিবের নামে আমাদের ছেলের নাম রাখলাম গালিব$ আমাদের স্বপ্ন ছিল যে আমরা আমাদের ছেলে গালিবকে বড়ো হয়ে উঠতে দেখব$ আমি ছেলের সঙ্গে সামান্য সময়ও কাটাতে পারলাম না$ ছেলেটার দ্বিতীয় জন্মদিনের পরপর আমাকে এই মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হল$

--- ছেলে কেমনভাবে বড়ো হয়ে উঠুক আপনি চান?

--- যদি পেশাগতভাবে বলেন, তাহলে আমি চাই ও চিকিৎসক হোক$ কারণ ওটা আমার অপূর্ণ স্বপ্ন$ কিন্তু তার চেয়েও বেশি করে আমি চাই, আমার ছেলে যেন নির্ভীক হয়$ যেন সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে$ আমি নিশ্চিতভাবে জানি, আমার ছেলে তা পারবে$ আমার বউ আর ছেলের চেয়ে অন্যায়-অবিচারের কাহিনী আর কে বেশি জানে?

[আফজল যখন তাঁর বউ আর ছেলের কথা অবিরাম বলে যাচ্ছিলেন, তখন আমার বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল তাবাসুমের কথা --- ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে যখন এই মামলার আবেদন পেশ করা হচ্ছিল, সেই সময়ে আদালতের বাইরে আমি তাবাসুমের সঙ্গে দেখা করেছিলাম$ আফজলের পরিবারের অন্য লোকেরা যখন কাশ্মীর থেকে আসতে ভয় পেয়েছিল, তখন আফজলকে বাঁচাতে তাবাসুম একা ছেলে গালিবকে কোলে নিয়ে দিল্লিতে এসে হাজির হয়েছিলেন$ সুপ্রিম কোর্টের উকিলদের নতুন চেম্বারের বাইরে রাস্তার ধারের ছোট্ট চায়ের দোকানে তিনি অনর্গল আফজলের কথা বলে চলেছিলেন$ চায়ে চুমুক দিয়ে তাতে বেশি চিনি দেওয়ার জন্য দোকানিকে অনুযোগ করার ফাঁকে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন আফজল রান্না করতে কেমন ভালোবাসেন$ তাবাসুমের বর্ণনায় আঁকা একটা ছবি আমার মনের গভীরে থেকে গেছে --- ওদের জীবনের খুব ব্যক্তিগত মুহূর্তের দু-একটা পোঁচ --- আফজল কিছুতেই তাবাসুমকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেবেন না, রান্নার জায়গার পাশে একটা চেয়ারে তাবাসুমকে বসিয়ে রেখে একহাতে একটা বই ধরে আরেক হাতে আফজল হাতা নাড়ছেন আর রান্না করতে করতে বই থেকে গল্প পড়ে শোনাচ্ছেন তাবাসুমকে$]

--- আমি যদি আপনাকে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করি ... কীভাবে এর সমাধান হবে বলে আপনি মনে করেন?

--- প্রথমে সরকারকে কাশ্মীরের জনগণ সম্পর্কে আন্তরিক হতে হবে$ তারপরে কাশ্মীরের প্রকৃত প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করতে হবে$ আমাকে বিশ্বাস করুন, কাশ্মীরের প্রকৃত প্রতিনিধিরা সমস্যা সমাধান করতে পারবে$ কিন্তু সরকার যদি মনে করে শান্তিপ্রক্রিয়া কাউন্টার ইনসার্জেন্সির একটা কৌশল, তাহলে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না$ এখনই সেই সময় যখন কিছু আন্তরিকতা দেখাতে হবে$

--- কারা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি?

--- কাশ্মীরি জনসাধারণের অনুভবের মধ্য থেকে খুঁজে নিতে হবে$ আমি ক, , গ কারও নাম করব না$ আমি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে আবেদন করব : প্রচারের যন্ত্র হিসেবে কাজ করা বন্ধ করুন$ সত্যি যা, সেটাই সংবাদমাধ্যম রিপোর্ট করুক$ ওরা ঝকঝকে শব্দ দিয়ে রাজনৈতিক অভিপ্রায়ে ভরপুর এমন সব খবর তৈরি করে যা বাস্তবকে বিকৃত করে, অসম্পূর্ণ রিপোর্ট দেয়, উগ্রপন্থী তৈরি করে, সন্ত্রাসবাদী বানায়, ইত্যাদি ইত্যাদি$ রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বিভাগের খেলায় ওরা সহজেই নিজেদের জড়িয়ে ফেলে$ এইভাবে অসৎ সাংবাদিকতার মাধ্যমে ওরা সমস্যাটাকে বাড়িয়ে তোলে$ প্রথমেই কাশ্মীর সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বন্ধ করতে হবে$ এই যে বিরোধ-সংঘাত চলছে তার বাস্তবভিত্তি এবং সম্পূর্ণ ইতিহাসটা ভারতবাসীদের সবাইকে জানতে দিতে হবে$ সত্যিকারের গণতন্ত্রীরা সত্যটাকে উল্টে দেয় না$ যদি ভারত সরকার কাশ্মীরিদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে হিসেবের মধ্যে আনতে না চায়, তাহলে তারা কোনোদিন সমস্যার সমাধান করতে পারবে না$ কাশ্মীর একটা সংঘর্ষ-এলাকা হিসেবেই থেকে যাবে$

আপনি আমাকে এটাও বলুন, কাশ্মীরিদের মধ্যে প্রকৃত বিশ্বস্ততা আপনি কী করে গড়ে তুলবেন, যখন আপনি এই বার্তা পাঠাচ্ছেন যে ভারতের একটা ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে যেখানে একজন মানুষকে তার পক্ষে লড়ার জন্য উকিল না দিয়ে, সঠিক বিচারের মধ্যে না গিয়ে ফাঁসিতে লটকে দেওয়া হয়?

আমাকে বলুন, যখন শত শত কাশ্মীরিকে জেলে পুরে রাখা হয়েছে, তাদের অধিকাংশকে কোনো আইনি সহায়তা না দিয়ে, কোনো ন্যায়বিচারের আশা না দিয়ে আপনারা কি কাশ্মীরিদের মধ্যে ভারত সরকারের প্রতি অনাস্থা বাড়িয়ে তুলছেন না? আপনি কি মনে করেন যে কেন্দ্রীয় সমস্যাটা এড়িয়ে গিয়ে ওপর ওপর কিছু করে কাশ্মীর-বিরোধের মীমাংসা করতে পারবেন? না, আপনারা পারবেন না$ ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা আন্তরিকতা দেখাতে শুরু করুক, তাদের রাজনীতিবিদ, সংসদ, বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম, বুদ্ধিজীবীরা ...

--- সংসদ আক্রমণের ঘটনায় ৯ জন নিরাপত্তারক্ষী মারা গেছে$ তাদের আত্মীয়স্বজনকে আপনি কী বলতে চান?

--- প্রকৃতপক্ষে ওই আক্রমণের ঘটনায় যেসব পরিবার তাঁদের পরিজনদের হারিয়েছেন, তাঁদের সকলের আমি সমব্যথী$ কিন্তু আমার দুঃখ লাগে যখন দেখি ওই পরিবারের লোকজনকে এমন এক ভ্রান্ত বিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে যাতে তারা মনে করে আমার মতো একজন নিরীহ মানুষকে ফাঁসিতে ঝোলালেই তাঁরা শান্তি ফিরে পাবেন$ এক সম্পূর্ণ বিপথগামী জাতীয়তাবাদের খেলায় ওঁদের বোড়ে হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে$ আমি ওঁদের কাছে আবেদন করি, ওঁরা এর থেকে বেরিয়ে এসে দেখুন সত্যিটা কী$

--- আপনার চোখে আপনার জীবনের সাফল্য কী?

--- আমার সবচেয়ে বড়ো সাফল্য সম্ভবত এটাই যে আমার এই মামলা এবং একে ঘিরে আমার প্রতি অবিচারের যে আলোচনা উঠে এসেছে তাতে এসটিএফের ভয়ঙ্করতা প্রকাশ্যে আসতে পেরেছে$ আমি খুশি যে এখন নাগরিকদের ওপর নিরাপত্তারক্ষীদের নিগ্রহ, সংঘর্ষে মৃত্যু, মানুষকে লোপাট করে দেওয়া, অত্যাচার-শিবির ইত্যাদি নিয়ে জনসাধারণ আলোচনা করছে$ কাশ্মীরিদের জীবনে এগুলোই বাস্তব সত্য$ কাশ্মীরের বাইরের লোক ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে না ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনী কাশ্মীরে কী করছে$

যদি কোনো অপরাধ না করা সত্ত্বেও ওরা আমাকে হত্যা করে, তাহলে তার একমাত্র কারণ হল ওরা সত্যকে সহ্য করতে পারে না$ একজন কাশ্মীরিকে কোনো আইনি সহায়তা না দিয়ে ফাঁসিতে লটকালে যেসব প্রশ্ন উঠে আসে, ওরা তার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে না$

এইসময় কান ফাটিয়ে ইলেকট্রিক ঘণ্টা বেজে উঠল$ পাশের খুপরিগুলো থেকে দ্রুত কথাবার্তা শেষ করার আওয়াজ পাওয়া গেল$ আফজলকে আমি শেষ প্রশ্ন করলাম, আপনি কোন পরিচয়ে বেঁচে থাকতে চান?

তিনি এক মিনিট ভেবে নিয়ে উত্তর দিলেন :

আফজল হিসেবে, মহম্মদ আফজল হিসেবে$ কাশ্মীরিদের কাছে আমি আফজল, ভারতীয়দের কাছেও আফজল$ কিন্তু এই দুই অংশের জনগোষ্ঠীর কাছে আমার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিরোধী দুটো ধারণা রয়েছে$ স্বভাবতই আমি কাশ্মীরি জনগণের বিচারের ওপরেই ভরসা রাখব$ আর সেটা শুধু এই কারণে নয় যে আমিও একজন কাশ্মীরি$ সেটা এই কারণেও যে তারা আমার বাস্তব অবস্থাটা জানে, তারা জানে কীসের মধ্যে দিয়ে কীভাবে আমি এখানে এসে পৌঁছেছি$ কোনো ইতিহাস বা ঘটনার বিকৃত বয়ান দিয়ে তাদের বিভ্রান্ত করা যাবে না$

মহম্মদ আফজলের শেষ কথাটায় আমি একটু বিভ্রান্ত হয়েছিলাম$ পরে খানিক চিন্তা করে আমি বুঝতে পারলাম তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন$ কাশ্মীরের ইতিহাস এবং কাশ্মীরের কোনো ঘটনা যদি কোনো কাশ্মীরি বর্ণনা করে, তাহলে তা একজন ভারতীয়ের পক্ষে বড়ো ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়$ কারণ কাশ্মীর সম্পর্কে ভারতীয়দের জ্ঞান পাঠ্যপুস্তক ও সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ$ আফজল আমাকে সেই ধাক্কাটাই দিলেন$ আরও দুবার ঘণ্টা বেজে উঠল$ সাক্ষাৎকারের সময় শেষ$ কিন্তু লোকেরা কথা চালিয়েই যাচ্ছে$ মাইক বন্ধ করে দেওয়া হল$ স্পিকার বন্ধ করা হল$ কিন্তু আপনি যদি কানটা খাঁড়া রাখেন এবং ঠোঁট নাড়ানোর দিকে লক্ষ্য রাখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন বক্তা কী বলতে চাইছে$ রক্ষীরা এসে কড়া নির্দেশ দিল, কথা বন্ধ করে স্থানত্যাগ করো$ কিন্তু সাক্ষাৎকারীরা কেউ যেতে চাইছে না$ আলো নিভিয়ে দেওয়া হল$ সাক্ষাৎকারের কক্ষ অন্ধকার$

তিহার জেলের তিন নম্বর কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে কারাগার প্রাঙ্গণ থেকে বড়ো রাস্তায় যেতে বেশ অনেকটা হাঁটতে হয়$ আমি দেখলাম আমার সঙ্গে যারা চলেছে, তারা সব দুজন বা তিনজন দলবেঁধে একসঙ্গে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে --- হয়তো একটা জোটে মা, বউ আর মেয়ে; ভাই, বোন আর বউ; কোনোটায় বা বন্ধু আর ভাই অথবা অন্য কেউ$ প্রতিটা দঙ্গলের দুটো সাধারণ বৈশিষ্ট্য$ সকলেরই হাতে একটা শূন্য কাপড়ের থলে ঝুলছে$ টিএসপি- চামচের ঘাঁটাঘাঁটিতে বাটির ঝোল উপচে মালাই কোপ্তা, শাহি পনীর আর পাঁচ তরকারির দাগ লেগে রয়েছে কাপড়ের থলেগুলোতে$ দ্বিতীয়ত যেটা আমি লক্ষ্য করলাম, এরা সকলেই সস্তার শীত-পোশাক আর ছেঁড়া জুতো পরে আছে$ গেটের বাইরে অপেক্ষমান ৫৮৮ নম্বর তিলকনগর-জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের বাস এদের সম্ভবত ধাউলাকুয়ান মেন জংশনে নামিয়ে দেবে$ এরা আমাদের দেশের গরিব নাগরিক$ মনে পড়ে গেল রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালাম বলেছিলেন, যাদের প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় তারা দেশের গরিব মানুষ$ আমি যাঁর সাক্ষাৎকার নিলাম তিনিও তাই$ আমি যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার কাছে কত টোকেন আছে? (জেলের মধ্যে যে ধরনের টাকার অনুমোদন আছে তাকে টোকেন বলে) তিনি বলেছিলেন, বাঁচার জন্য যথেষ্ট$

Comments