মন্থন সাময়িকী : মে জুন ২০১২

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

এক বিকৃতশক্তিনীতি ও পরমাণু বিদ্যুৎ


রমার খোরোচাষ


বাজারের পাকেচক্রে চাষিসমাজ


চাষিরকাছে বোরো ধান চাষ কতটা উপযোগী


চাষিরঅন্য চিন্তাভাবনা


কৃষির পটপরিবর্তন


চিঠিপত্র

    









 

সম্পাদকীয়

সারের অসারত্ব  


ক্ষুব্ধ চাষিরা বলছে, সারের দাম হুহু করে বাড়ছে, সারে খুব ভেজাল দেওয়া হচ্ছে, ইত্যাদি। সার মানে হল এমন এক পদার্থ যা জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। অভিধানেও এমনই লেখা আছে। অভিধানে এই কথার আরও কিছু অর্থ পাওয়া যায়। যেমন, শ্রেষ্ঠ, তেজ, বীর্য, মর্মার্থ (আমরা বলি সারকথা, সারাংশ)। অন্যদিকে মার্কিন নৃতাত্ত্বিক স্টিফেন মাইকসেল এই সংখ্যায় তাঁর লেখায় ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, সার মাটির উর্বরতাকে ধ্বংস করে আর সেজন্যই একে সার বলা যায় না। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, এটা ঠিক যে সার গাছের বৃদ্ধি ঘটায়, কিন্তু কীসের বিনিময়ে? তাঁর যুক্তিকে যদি মেনে নিই, তাহলে বলতে হয়, যে জিনিসটা আদতে ভেজাল, তাকে আর আলাদা করে ভেজাল বলে গাল দিই কীভাবে?

          বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা চাষি পরিবারের এক যুবক আমাকে ১০:২৬:২৬ সারের কথা বুঝিয়ে বলছিলেন। এটা তিনটি রাসায়নিক পদার্থের এক আনুপাতিক মিশ্রণ। এর গুণ বোঝাতে তিনি আমাকে বললেন, এটা হল ধানগাছের রক্ত। এরকম অনেক সারকথা আমাদের রোজ টিভিতে পাখিপড়া করে বোঝানো হয়। বাচ্চাদের সঠিক বৃদ্ধির জন্য, মেধার জন্য, এনার্জির জন্য কী কী খাওয়ানো দরকার। হরলিক্‌স, কমপ্ল্যান, গ্লুকন-ডি, আরও কত কী! চাষিদের সার দেওয়া ডাল-ভাত-সবজিতে তেজ, বীর্য কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। কোম্পানির বোতলবন্দি সার কিনে বাচ্চাকে খাওয়ানো দরকার। নাহলে সে ফেল!

          আসলে চাষি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ভুল বলছে না। আশু ফলকে তারা দেখেছে। ১৯৮০-৯০ পর্যায়ে চাষে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, ভিটামিন এবং অধিক ফলনশীল বীজের ভেলকি তারা দেখেছে। সার গাছের বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। কিন্তু কীসের বিনিময়ে? আজ বর্ধমানের চাষি টের পাচ্ছে মাটি সহ পরিবেশের কী দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এই আধুনিক চাষের মাধ্যমে হয়েছে। বহু চাষি চাষ থেকে সরে যেতে চাইছে। মোটা টাকায় চাষের জমি বাস্তু এবং অন্য কাজে হাতবদল হয়ে যাচ্ছে। চাষি পালাতে চাইছে!

          একই প্রক্রিয়ার বশবর্তী হয়েছে আমাদের মধ্যবিত্ত মন। আমি শুধু শহুরে মধ্যবিত্তদের কথাই বলছি না। বলছি মধ্যবিত্ত মনের কথা। বিত্ত ছাড়াও টিভি এবং আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই মনকে গড়ে তোলা হয়েছে। যে মন চাষিকে ছোটো বলে মনে করে, চাষকেও। উন্নয়ন-এর দৌলতে চাষিও এই মধ্যবিত্ত মন পেয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে ওঠা তার আদি মনের সঙ্গে এই আধুনিক মনের সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে।

      এই সংকট-মুহূর্তে খোলামেলা কথা বলা দরকার, চাষিদের নিজেদের অভিজ্ঞতার পর্যালোচনা দরকার। শহরে আমরা যারা চাষির ফলন কিনে খাই, তার গুণমান-দরদাম-জোগানের ভুক্তভোগী, তাদেরও গ্রামের দিকে চোখ ফেরাতে হবে। শহুরে উন্নাসিকতায় বুঁদ হয়ে থাকা আর চলে না। শহর আর গ্রামের মধ্যে আজ সরাসরি খোলামেলা কথাবার্তা দরকার।
Comments