আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোন পথে

 


সংগ্রামী শ্রমিক কেন্দ্র-এর পক্ষ থেকে ৮ আগস্ট একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন তাপস দাস, রহমত আলী, দিলীপ শইকিয়া, জয়ন্ত দইমারি, নিলেশ্বর সৈনারি, কামেশ্বর ব্রহ্ম, নলিন বড়ো, মোশারফ হুসেন এবং মতিয়ুর রহমান$ শিরোনামে তাঁরা লেখেন, জাতি হিসেবে নিপীড়িত বড়ো জনজাতি এবং ধর্মীয় অর্থনৈতিক দরিদ্র শোষণে নিপীড়িত মুসলমান সম্প্রদায়ের সংঘর্ষ আত্মঘাতী সংঘর্ষ ছাড়া আর কোনো কিছু বলা যায় না$ আমরা এই প্রচারপত্রের কিছু অংশ এখানে বাংলায় প্রকাশ করলাম$





বিটিএডি এলাকাতে সাময়িকভাবে শান্তি ফিরে আসবে এমন একটা আশা ছিল$ কিন্তু বারেবারে সংঘর্ষ নানা রূপ নিচ্ছে$ গত ২০ জুলাই থেকে বিটিএডি এলাকায় দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা যে দাঙ্গার আগুন, তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলো চিরাচরিতভাবে পরস্পরের প্রতি দোষারোপ করে বাহবা নিচ্ছে$ স্থায়ী সমাধানের চিন্তা বা চর্চা কেউ করেনি বলছি না$ কিন্তু নিরপেক্ষভাবে স্থায়ী সমাধানের চিন্তা-চর্চার রেওয়াজ দুর্লভ$ সম্প্রতি সংঘর্ষজর্জর অঞ্চলগুলোতে গোষ্ঠীসংঘর্ষ বা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ যা ঘটে চলেছে তা এই প্রথম নয়$ তাছাড়া জনজাতি বনাম সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে$ ২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং বড়ো লিবারেশন টাইগার বিএলটির মধ্যে সাক্ষরিত ত্রিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে গড়ে ওঠা বড়ো টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল বা বিটিসি মঙ্গলগ্রহ থেকে হঠাৎ আসেনি$ এর একটা ধারাবাহিক সংগ্রাম ও সংঘর্ষের ইতিহাস আছে$ বিটিসি গঠন হওয়ার দশ বছর আগে ১৯৯৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বড়ো নেতৃত্বের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বড়োল্যান্ড অটোনমাস কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল$ কিন্তু ওই চুক্তিতে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের উল্লেখ না থাকাতে সমস্যার সমাধানের বিপরীতে বিভিন্ন ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ জন্ম নিয়েছিল$ ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালে বড়ো জনজাতি বনাম সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও ইত্যাদি আদিবাসীদের মধ্যে ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ হয়েছিল$ দুই পক্ষের বহু লোক নিহত হয়েছিল, আহত হয়েছিল অনেকেই$ লক্ষাধিক মানুষকে আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছিল$ উল্লেখযোগ্য এই যে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত আসামে আদিবাসীরা জনজাতি হিসেবে নির্ধারিত ছিল$ কিন্তু ১৯৫০ সালে তাদের জনজাতির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হল$ যাই হোক, ভাষার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারিক সাংস্কৃতিক জীবনে মিল থাকা দুটো জনগোষ্ঠী পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্প্রীতি গড়ে তুলেছিল$ ২০০৩ সালে বিএলটি নেতৃত্বের সঙ্গে চুক্তির পরে বড়ো-সাঁওতাল যৌথ নৃত্যে ঘোষিত হয়েছিল মিলনের জয়বার্তা$ ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিটিএডি-তে শান্তি ছিল$ কিন্তু ২০০৮ সালে উদালগুড়িতে বড়ো-মুসলমান সম্প্রদায়ের সংঘর্ষ দেখে পরস্পরের মধ্যে যে বোঝাপড়া ছিল না তা বোঝা গেল$ তারপরে ২০১২ সালের জুলাই পর্যন্ত বিটিএডি এলাকায় কোনোরকমে শান্তি বজায় ছিল$ বড়োল্যান্ডের দাবিতে এবং ২০০৩ সালের চুক্তির অমীমাংসিত ৯৫টি গ্রামকে বিটিএডি-র অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে ভিতরে ভিতরে ফুঁসছিল বড়ো নেতৃত্ব$ উল্লেখযোগ্য এই যে ২০০৩ সালের চুক্তির ৩(১) দফা মর্মে বিটিসি-র ভিতরে ৩০৮২টা গ্রাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল; ৩(২) দফা মর্মে ৯৫টা গ্রাম, পঞ্চাশ শতাংশের ওপরে জনজাতির লোক থাকলে বা অন্য কোনো সমর্থনযোগ্য প্রাসঙ্গিকতা থাকলে, তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল$ ওই গ্রামগুলোর অন্তর্ভুক্তির দাবির বিপরীতে বিটিএডি এলাকাতে অ-বড়োরা বড়োদের সমান অধিকার পায়নি বলে সেসময় অভিযোগ তুলেছিল, কিন্তু তা সংঘর্ষের রূপ নেয়নি$               

          

৬ জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত

৬ জুলাই কোকরাঝাড় জেলার হাওরাগুড়ি থানার অন্তর্গত মুসলমানপাড়া গ্রামে কোনো অজ্ঞাত দুষ্কৃতীর গুলিতে নুরুল হক ও মুজিবর রহমান নামে দুই মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ নিহত হন এবং ওই সম্প্রদায়ের তিনজন আহত হন$ ওই ঘটনার প্রতিবাদে এবিএমসিইউ-র নেতৃত্বে ৭ জুলাই তারিখে কোকরাঝাড় শহরে সহস্রাধিক মানুষ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে$ ওইদিন এবিএমসিইউ-র পক্ষ থেকে চার দফা দাবি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রেরণ করে$ দাবিগুলো হল, নিহতদের পরিবার পিছু দশ লক্ষ টাকা, আহতদের পরিবার পিছু পাঁচ লক্ষ টাকা,  নিহতদের নিকটাত্মীয়কে সরকারি চাকরি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিটিএডি অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রদান$ দাবিগুলো অযৌক্তিক বলে কেউ বলতে পারবে না$  কিন্তু ওই প্রতিবাদ কেবল ওইটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না$ মোটর সাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া ইত্যাদি উগ্রতা এবং ওই জেলার এবিএমসিইউ-র প্রচার-সম্পাদক রফিকউল ইসলাম প্রয়োজনে হাতে লাঠি তুলে নেব বলে ঘোষণা করেছিলেন$ অর্থাৎ প্রতিবাদের ভাষা প্রতিশোধের ধ্বনিতে পর্যবসিত হয়েছিল$ ৬ জুলাইয়ের ঘটনায় বিটিএডি এবং অন্যান্য বড়ো সংগঠনগুলোর ভূমিকা কী ছিল? ৭ জুলাই বিএলটি দলের সভাপতি তথা বিটিএডি প্রধান হাগ্রামা মহিলারি সন্ধ্যা সাতটার সময় কোকরাঝাড়ে বিটিএডি-র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসে নিহতদের পরিবার পিছু এক লক্ষ টাকা, আহতদের পরিবার পিছু পঞ্চাশ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য, দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন$ এর সঙ্গে ৭ জুলাইয়ের প্রতিবাদকারীদের মোটর সাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া, নিরীহ ব্যক্তিদের মারধোর করা ইত্যাদি ঘটনার জন্যও দুঃখপ্রকাশ করেন$ জেলা বিটিএডি-র সাধারণ সম্পাদক রহীন্দ্র ব্রহ্ম ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আটক করে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি অক্ষুন্ন রাখার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন$ অর্থাৎ ৬ জুলাই ঘটনার সময় বিটিএডি নেতৃত্ব সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ চায়নি বলে বলা যেতে পারে$ কিন্তু ৭ জুলাই কোকরাঝাড় শহরে বিক্ষোভের কর্মসূচি এবং তার ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই এবিএমসিইউ নেতৃত্বের রাজভবন অভিযানে যে ধ্বনিগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেই ধ্বনিগুলো অপ্রাসঙ্গিক এবং যুক্তিহীন ছিল বলে আমরা বলতে বাধ্য$ কারণ বিক্ষোভ সমাবেশে ২০০৩ সালের বিটিএডি চুক্তি বাতিল করা, হাগ্রামা মহিলারিকে শাস্তি দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল$ ২০০৩ সালের চুক্তির ৪(৩) দফার (ক) ও (খ) উপধারায় এবং ৪(৮) ধারায় বিটিএডি এলাকায় অ-বড়োদের ভূমিজ সম্পত্তি সুরক্ষার কথা বলা আছে$ উক্ত চুক্তির ৪(৬) দফায় ভারতবর্ষের সংবিধানের ৬নং কার্যসূচির দশ দফা কার্যকর করা হবে না বলে বলা হয়েছে$ অর্থাৎ অ-জনজাতিদেরা টাকাপয়সার লেনদেন, ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড়োরা কোনো আইন প্রনয়ণ করতে পারবে না বলে বিটিসি-তে বলা আছে$ তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব বিটিএডি নেতৃত্বকে দেওয়া হয়নি$ ওই চুক্তির ৬ দফাতে লেখা আছে, আসাম সরকারের বিটিএডি এলাকায় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একজন আইনজীবীকে দায়িত্ব দেওয়া হবে$ কাজেই আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে আসাম সরকারের ওপরে চাপ দেওয়ার পরিবর্তে বিটিএডি বাতিল করার দাবি কতখানি যুক্তিযুক্ত তা চিন্তা করার দরকার আছে$ মোটকথা, বিটিসি গঠনের চুক্তির ভিতরে অ-বড়োদের নিরাপত্তা প্রদান করার যে শর্ত ছিল, তারা যে নিরাপত্তার দাবি করতে পারত, সেটা করাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়$ যাই হোক, ১৬ জুলাইয়ের প্রতিবাদী বিক্ষোভ প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ১৯ জুলাই তারিখে চারজন বড়ো যুবককে হত্যা করার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ প্রতিহিংসার পথে চলে গেল$ তার ফলে শুরু হল হত্যা, হিংসা, অবরোধ এবং অসহায় মানুষের বুকভরা হাহাকার$ মোট কথা, ৬ জুলাই মুসলমান মানুষের হত্যার প্রতিবাদ, প্রতিবাদের মধ্যে আটকে না থেকে প্রতিহিংসার পথে চলে গেল এবং সৃষ্টি হল আজকের দাবানল$

আসামে বাঙালি মুসলমান আগমন

বরাক উপত্যকা ছাড়া আসাম পুরোপুরি অসমীয় অধ্যুষিত ছিল। বাইরে থেকে মানুষের আসা শুরু হল ১৯১১ থেকে। ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে তৈরি হল। পূর্ববঙ্গ থেকে বাঙ্গালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান উভয়েই এসেছে। ১৯৩৯ সালে গোপীনাথ বরদলৈ-এর নেতৃত্বে আসাম কংগ্রেস একটা আওয়াজ তোলে, বাইরে থেকে মানুষের আসা বন্ধ করতে হবে। সেটা ছিল অসমীয় দৃষ্টি থেকে যে তারা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। সেই সময় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিআই) একটা প্রশ্ন তুলেছিল। অসমীয়দের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে, একটা কাট-অফ ইয়ার স্থির করা দরকার। ১৯৪০ সালে গোপীনাথ বরদলৈ সরকার থেকে পদত্যাগ করলেন। দ্বিতীয় দফায় সঈদ মহম্মদ সাদউল্লার সরকার তৈরি হল। তারা বলল, পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা পরিশ্রমী, চাষের কাজে লাগে, ওদের আসতে দাও।

    ১৯১১ থেকে যে বহিরাগতদের আগমন শুরু হয়েছিল, মাঝখানে একটা বিরতির পর আবার ১৯৭১ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত প্রচুর মানুষ এসেছে। বাংলাদেশ গঠনের পরে যে মানুষেরা এল, তাদের বড়ো অংশ বাঙালি হিন্দু। আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় মুসলমানও কিছু এসেছে।

    বিটিএডি গঠনের পরে বড়োদের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। নিজেদের কৃষিকাজ নিজেরা করার পরিবর্তে ভাড়া করা লোকের ওপর এরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মুসলমানরা এসেছে ধুবড়ির ওপারের দক্ষিণাংশের মানকার চর ইত্যাদি এলাকা থেকে। বড়োদের কাছে জমিতে হাজিরা খাটা, ঘর তৈরি করা, গরু চরানোর কাজে এরা যুক্ত হয়েছে। যারা সেনসাসের কাজে যায়, তাদের এরা বলেছে, আমাদের নাম ঢোকাবেন না, আমরা এখানে স্থায়ীভাবে থাকে না। যখন এবার দাঙ্গা হল, তখন হাজারে হাজারে মানুষ সুখচর, মানকার চর থেকে যারা এসেছিল, আবার নৌকায় করে ফিরে গেছে।

    ২০০১ সালের পর বিটিএডি এলাকায় মুসলমানদের অনুপ্রবেশ হয়নি। আসামের ব্যাপক নদীভাঙা লোক, তারা যে যেখানে পারে গেছে। জঙ্গলে গেছে, ট্রাইবাল এলাকায় গেছে। আগে বড়ো, রাভা এরা এই ব্যাপারে উদাসীন ছিল। ১৯৮৫ সালের পরে নদীভাঙা লোকজন ওখানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। হয়তো তাদের মধ্যে কিছু মানুষ ২০-৩০ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছে, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকেছে। পরে এখানে জমিজায়গা করেছে। নদীভাঙনে জমি নদীর তলায় চলে গেছে। নদীভাঙা মানুষের মধ্যে কোচ, রাজবংশীও আছে। যেমন, গোলকগঞ্জে একটা নদী বিশাল গতি পরিবর্তন করে। বহু মানুষ তার ফলে উচ্ছেদ হয়েছে।

    ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে একটা বড়ো আন্দোলন আসামে হয়েছে। তার একটা বিরাট প্রভাব পড়েছিল, বাইরে থেকে মানুষ আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখানে একটা বিশাল গণবিদ্রোহ হয়ে যায়। হাজারে হাজারে মানুষ কার্ফু ভেঙে রাস্তায় নেমেছে। যখন ১৯৮৩ সালে নির্বাচন করা হল, সেই নির্বাচন বয়কট করা হল। সেইসময় গণচিতা জ্বলেছে, একসঙ্গে ৫০-১০০টা শব দাহ করা হয়েছে। সারি সারি অসমীয় যুবকদের চিতা জ্বালানো হয়েছিল। তারপর নেলীর ঘটনা ঘটল। সারি সারি মুসলমান মানুষকে হত্যা করা হল। প্রত্যেক গণবিদ্রোহের পরে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আসে।

    বিটিএডি এলাকায় এখন বিটিসি প্রশাসন বলছে, ১৯৭১ সালের সেনসাস রিপোর্ট, ১৯৭১ সালের ভোটার লিস্টে যার নাম আছে আর মাটির রেকর্ড। ১৯৭১ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত একটা বড়ো অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এর মধ্যে ভালোসংখ্যক মুসলমানও আছে। কিন্তু তারা এসেছে ১৯৭১-এর পরে। কাজেই কাট-অফ ইয়ারে অনেকে আটকে যাবে। কিন্তু মাটির পাট্টা দাবি করে বড়োরা নিজেরাই আটকে যাবে। ওদের নিজেদেরই ফরেস্ট ল্যান্ডে কোনো পাট্টা নেই।

তাপস দাস, সংগ্রামী শ্রমিক কেন্দ্র, আসাম


 

বিজেপির ভূমিকা এবং অন্যান্য কিছু ভুল বোঝা সম্পর্কে

গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয়ের পরে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হিন্দুত্বের ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করে বাজিমাত করতে চেয়েছিল$ দুর্নীতি এবং অন্যান্য বিষয়ে তাদের সংগঠনের মধ্যে যে আভ্যন্তরীণ ভাঙন, তাতে সংগঠন দিন-কে-দিন দুর্বল হচ্ছিল$ তাই বিটিএডি এলাকায় সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে তারা দেশি-বিদেশি আখ্যা দিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ সৃষ্টি করতে চাইছে$ বিদেশি বলতে যারা বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমান, তাদের বিদেশি আখ্যা দিতে চাইছে$ গোষ্ঠী সংঘর্ষের একটা পর্যায়ে হাগ্রামা মহিলারি বাংলাদেশ থেকে দলে দলে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ এসে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেছেন$ আসলে সংঘর্ষের একটা পর্যায়ে বিটিএডি সীমান্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে বিলাসীপাড়ার আশেপাশে হাজার হাজার মুসলমান মানুষ লাঠি-বল্লম-দা হাতে নিয়ে বড়ো গ্রাম আক্রমণ করেছিল$ কিন্তু এরা সব পুরোনো মানুষ, কেউ বাংলাদেশ থেকে আসেনি$ বিটিএডি এলাকায় ব্যাপকভাবে মুসলমান মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে একটা প্রচার আছে$ বেশি তথ্যে না গিয়ে কোকরাঝাড় জেলার জনসংখ্যার একটা পরিসংখ্যান আমি পেশ করছি$ ১৯৯১ সালে অহম জনসংখ্যা ৮,০০,৬৪৯; হিন্দু ৫,৩১,৪৭৮; মুসলমান ১,৫৪,৮০১ $ ২০০১ সালে অহম জনসংখ্যা ৯,০৫,৭২৮; হিন্দু ৫,৯৮,১৬৮; মুসলমান ১,৮৪,৪৪০$ এই পরিসংখ্যান থেকে বলা যায়, কোকরাঝাড় জেলায় মুসলমান মানুষের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি হয়নি$ ২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত জনসংখ্যার ধর্মীয় বিভাজন পাওয়া যায়নি$ কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটা হার পাওয়া যায়$ অর্থাৎ একমাত্র ধুবড়ি ছাড়া এই চারটি জেলায় জনসংখ্যার শতকরা পরিসংখ্যান বাড়েনি$ বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানী বিকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে উস্কানি দেওয়া, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা করছেন$ এর ফলে বিজেপি দলের ভোটের রাজনীতিতে কিছু লাভ থাকতে পারে$ কিন্তু জনজাতিদের কোনো স্বার্থরক্ষা হবে কি? উল্টোদিকে মুসলমান সম্প্রদায় বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু নেতৃত্ব না-বুঝে উস্কানিমূলক কর্মসূচি নিচ্ছে$ এতে কি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের স্বার্থরক্ষা হবে? আসলে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাতিসত্তার সংগ্রামকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে ধ্বংস করার একটা ধারাবাহিক চক্রান্ত চলছে$ উদাহরণ হিসেবে পাঞ্জাবিদের জাতীয় সংগ্রামে শিখ এবং হিন্দু বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল; বাঙালি জাতির সংগ্রামে হিন্দু ও মুসলমান হিসেবে ভাগ করা হয়েছিল$ বাঙালি হিন্দুরা ভাবে যে তারাই একমাত্র বাঙালি জাতির প্রতিনিধি$ অথচ বাংলাভাষার জন্য বাঙালি হিন্দুরা এক ফোঁটাও রক্ত দেয়নি$ কিন্তু পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) হাজার হাজার মানুষ বাংলাভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শহিদ হয়েছিল$ ধর্মীয় বন্ধন তথা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করেছিল$ আসামেও অসমিয় জাতির মধ্যে হিন্দু আর মুসলমান বিভাজনের চক্রান্ত বারবার দেখা গেছে$ কিন্তু এই চক্রান্ত আজকে আবার ব্যাপ্তি লাভ করেছে$ 

 

কে কার বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা সংঘর্ষ করছে

একদিকে বড়ো, রাভা ইত্যাদি জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের ভাষার অধিকার থেকে বঞ্চিত$ ১৯৬২-৬৩ সালে বড়ো ভাষার অধিকারের দাবিতে সংগ্রাম, তৎকালীন সরকার যুবক-যুবতীদের গুলি করে হত্যা করে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল$ সাময়িকভাবে তা স্তব্ধ হয়েছিল$ সেই সময় ধুবড়ি শহরের পোস্টমর্টেম রুমে পড়ে থাকা জনজাতি যুবকদের শবদেহ পচে তার দুর্গন্ধে ধুবড়ি শহরের মানুষ ভীষণ অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল$ ধীরে ধীরে বড়ো নেতৃত্বের বহু পরিবর্তন হয়েছে$ প্লেন ট্রাইবাল কাউন্সিল কংগ্রেস দলের সঙ্গে মিশে যায়$ পরবর্তীকালে এই দাবিগুলো কেবল ভাষার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিস্তার লাভ করে এবং ১৯৮৭ সালে পৃথক বড়ো রাজ্যের দাবিতে ডিভাইড আসাম ফিফটি ফিফটি শ্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে বড়োরা$ সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তখন রক্তাক্ত হয়েছিল এই জনজাতি$ তার ধারাবাহিকতায় বহু উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে, কখনো বা সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত, কখনো বা ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে গঠিত হয়েছে বিটিএডি$ অন্যদিকে আছে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ$ এই হতদরিদ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয়, এই দ্বৈত শোষণে জর্জরিত$ একটা কথা স্পষ্ট, আইন অনুযায়ী ভারতবর্ষের মুসলমানদের সম অধিকার দেওয়া হয়েছে$ কিন্তু প্রকৃত অর্থে সম অধিকার দেওয়া হয়নি$ ভারতবর্ষের কোনো জায়গায় বোমা বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটলে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ তা করেছে বলে ধরে নিয়ে অত্যাচার করা হয়$ জার্মানির ইহুদি হত্যার মতো গুজরাতে মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে$ কাজেই বর্তমান সংঘর্ষের একদিকে আছে ঐতিহাসিকভাবে নিপীড়িত জনজাতি এবং অন্যদিকে আছে নিপীড়িত ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা$ অর্থাৎ গোটা নিপীড়িত জনগোষ্ঠী আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে রক্তাক্ত হচ্ছে$

 

দুটো প্রশ্ন, একটা উত্তর

অনেকেই বলেন, বিটিএডি এলাকায় বড়োরা সংখ্যালঘু$ কাজেই বড়ো সংখ্যালঘু মানুষে সংখ্যাগুরু মানুষের ওপর কেন শাসন চালাবে? এ প্রশ্ন  উঠবে$ অন্যদিকে অনেকেই বলেন, ১৮৮৬ সালের জমি আইন অনুযায়ী ট্রাইবাল ল্যান্ড গঠন করা উচিত এবং ভূমিপুত্রদের জন্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে$ তাছাড়া ১৯৪৭ সালে লোকনাথ বর্ধনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জনজাতিদের অধিকার রক্ষা করতে হবে$ পরস্পরবিরোধী দুটো প্রশ্নের একটাই উত্তর$ সেটা হল দুটো মুখ একই কথা বলছে$ অর্থনৈতিক রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে নিজের মাটিতে অর্থাৎ ট্রাইবাল বেল্টে সংখ্যালঘু হয়ে পড়া জনজাতিদের জাতীয় অস্তিত্ব কোনোভাবেই লুপ্ত করা উচিত নয়$ একই অধিকার রক্ষার স্বার্থে জনজাতিদের বিশেষ অধিকার দিতে হবে$ অন্যদিকে বলতে হবে, ঘড়ির কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে যেমন বয়স কমানো সম্ভব নয়, ঠিক তেমনই ইতিহাসের চাকা পিছনদিকে ঘুরিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না$ আজ থেকে এক-দেড়শো বছর আগে পিছিয়ে গিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়$ বর্তমান অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে$

   একটা সাবধানবাণী, আয়ার্ল্যান্ডের জনগণ বছরের একটা দিন ঠোঁটের রঙ সবুজ করে$ কারণ হল, প্রোটেস্টান্ট ক্যাথলিক সংঘর্ষের ফলে আয়ার্ল্যান্ডে এমন দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যে গাছের পাতা খেয়ে তাদের জিভ সবুজ হয়ে গিয়েছিল$ এই ভয়ঙ্কর ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার কথা মনে করার জন্যই বছরের একটা দিন প্রত্যেক মানুষ তাদের ঠোঁটের রঙ সবুজ করে নেয়$ আলোচনাপন্থী এনডিএফবি (প্রো) সচিব সম্পাদক গোবিন্দ বসুমাতারি বলেছেন,  বর্তমান সংঘর্ষে তারা নেই$ কিন্তু এই সংঘর্ষে তাদের বিজয় হয়েছে$ ভবিষ্যৎ-সংঘর্ষ তারাই সৃষ্টি করবে$ এছাড়া, নাগরিকপঞ্জি না হওয়া পর্যন্ত বিটিএডি এলাকাতে উচ্ছেদ হওয়া মানুষকে কোনো পুনর্বাসন দেওয়া হবে না$ এইরকম একটা বক্তব্য শান্তি গড়ে তোলার পক্ষে সহায়ক নয় বলেই বলতে হবে$ কাজেই এখন তাৎক্ষণিকভাবে নাগরিকপঞ্জি গঠন করা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে$ নাগরিক পঞ্জি করতে হবে না, এমন কথা নয়$ কিন্তু এটা পূর্বশর্ত হিসেবে ঘোষণা করা আসলে ঘরছাড়াদের পুনর্বাসন না দেওয়ারই একটা কৌশল$ এরই ধারাবাহিকতায় যেন ৫ আগস্ট চিরাং জেলায় এবং ৬ আগস্ট কোকরাঝাড় জেলায় সংগটিত হত্যাকাণ্ড$ এই দুইদিনের ঘটনার উদ্দেশ্য যেন মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা বলেই মনে হচ্ছে$ একটা কথা স্পষ্টভাবে যা বোঝা প্রয়োজন সেটা হল, কোনো জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম অন্য কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের ধ্বংসের বিনিময়ে হতে পারে না$ কোনো জাতি বা সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে নিজের জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার কার্যসূচি আসলে নিজের জাতিকে ধ্বংস করার দিকে পৌঁছায়$

 

২০০৩ সালে বিটিসি গঠন হওয়ার পরে বিটিএডি এলাকাতে বসবাস করা জনজাতি ও অ-জনজাতিদের কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক বিকাশ হয়েছিল কি?

বিটিএডি এলাকা গঠন হওয়ার পরে কোকরাঝাড়ে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকাল কলেজ, সেন্ট্রাল ইন্সটিট্যুট অব টেকনোলজি ইত্যাদি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল$ ওই অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা ওই আধুনিক শিক্ষার সুযোগ নিতে পেরেছে$ চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক বছরে একশো কোটি টাকা সাহায্য দেওয়া হয়েছে, তাছাড়া রাস্তাঘাট তৈরি ইত্যাদি সামাজিক কাজে অনেক টাকা দেওয়া হয়েছে$ এই টাকা ব্যবহার করায় এবং অন্য কামকাজে জনজাতিরা অগ্রাধিকার পেয়েছে$ কিন্তু অ-জনজাতি, নন-ট্রাইব বা মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ কোনো সুযোগসুবিধা পায়নি বলে বলতে পারি না$ বিভিন্ন ঠিকা কামকাজে বড়ো যুবকদের সঙ্গে মুসলমান যুবকরা যৌথভাবে কাজ করছে$ আসলে প্রতিটি জাতির জাতীয় আন্দোলন ওই জাতির জাতীয় বুর্জোয়াদের দ্বারা পরিচালিত হয়$ কাজেই জাতীয় বিকাশের একটা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জাতির আগ বাড়িয়ে থাকা মানুষ সুযোগসুবিধা গ্রহণ করতে পারে$ বিটিএডির ক্ষেত্রে উদীয়মান বড়ো যুবকেরা অনেক বেশি সুবিধা লাভ করেছে$ অনেকেই শিল্পোদ্যোগ গড়ে তুলেছে; দু-চারজন বনাঞ্চলে জমি লিজ নিয়ে রাবার বাগিচা, চা বাগিচা গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছে$ রাবার বাগিচা, চা বাগিচা স্থাপনের জন্য জমির প্রয়োজন এবং সেই প্রয়োজন মেটাতে বর্তমান উচ্ছেদ অভিযান চলছে বলে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছে$ সত্যি কী আশ্চর্য কথা! উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড ইত্যাদি জায়গায় দেশি-বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিরা ওই অঞ্চলের খনিজ দ্রব্য আহরণ করছে এবং স্থানীয় আদিবাসী ও জনজাতিদের সরকারি আইন ভেঙে উৎখাত করছে$ আসামে একটা নিপীড়িত জাতিসত্তার একটি ক্ষুদ্র স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অন্য একটি নিপীড়িত সম্প্রদায়ের মানুষকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছে$ বর্তমান সংঘর্ষের ক্ষেত্রে এটা প্রধান কোনো বিষয় নয়, কাজেই এ নিয়ে বেশি আলোচনা করতে চাইছি না$

 

সমাধানের সন্ধানে

যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা নিশ্চয় জানেন, কার্বি আলং, উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা, ডিমাহারগাঁও ইত্যাদি জায়গায় কোথাও বা পৃথক রাজ্য, কোথাও বা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি উঠেছে$ কোচ-রাজবংশীরা কামতাপুর রাজ্যের দাবি তুলেছে$ অপহরণ ও হত্যা প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে$ নাগাল্যান্ড, মণিপুরে চল্লিশের দশক থেকে স্থানীয়রা সরকারি বাহিনীর সঙ্গে ধারাবাহিক সংঘর্ষে রক্তাক্ত হচ্ছে$ শাসকদলগুলো কখনো কুকি-নাগা, কখনো মণিপুরি-নাগা, কখনো মণিপুরি-বিষ্ণুপ্রিয়া ইত্যাদিদের মধ্যে সংঘর্ষ লাগানোর চেষ্টা করেছে$ কিন্তু জাতীয় সংগ্রামগুলো ধ্বংস করতে পারেনি$ মেঘালয়ের গারো পাহাড় এবং খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড় নানা কারণে উত্তাল হয়েছে$ চল্লিশের দশক থেকে কাশ্মীরি জাতি ভারত এবং পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে$ অহম তথা ভারতীয় শাসকেরা কোথাও অটোনমাস কাউন্সিল, কোথাও আলাদা রাজ্য গঠন করে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করছে, স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি$ তাহলে স্থায়ী সমাধানের উপায় কোথায়?

     সকল জাতির সমান অধিকারের ভিত্তিতে শান্তি-প্রতিষ্ঠার বিষয়টাকে চিন্তা-চর্চার মধ্যে নিয়ে আসা খুবই জরুরি।
Comments