১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী সংঘর্ষের বৃত্তান্ত

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী সংঘর্ষের বৃত্তান্ত

জাবরিয়াস খাখা


 


আমি আদিবাসী কোবরা মিলিটারি অফ আসাম-এর চেয়ারম্যান। বর্তমানে আমরা আসাম সরকারের সঙ্গে অস্ত্র-বিরতিতে আছি। ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই আমাদের এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ মে থেকে নামনি আসামে, বিশেষ করে কোকরাঝাড়, ধুবড়ি ও বঙ্গাইগাঁও জেলায় সমস্ত আদিবাসীদের বড়ো উগ্রপন্থীরা নৃশংসভাবে মারতে শুরু করে। আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ঠিক যেভাবে মুসলমানরা দাঙ্গায় আক্রান্ত হল এখন, ওইভাবেই আমাদের ওপর আক্রমণ হয়েছিল। আমরা পুরোপুরি অজ্ঞাতে ছিলাম। সমস্ত আসামের লোকে জানে আদিবাসীরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। সবার সঙ্গে মিলেমিশে আমরা বসবাস করতাম। বড়োদের যে ইন্টারনাল পলিসি ছিল, জয়গাঁও থেকে --- এটা বোধ হয় পশ্চিমবঙ্গে --- তিনটে মেয়েকে নিয়ে এল। গোসাইগাঁও থেকে দক্ষিণে সত্যপুর ফরেস্টে তাদের মারা হল। শারীরিক শাস্তি দিয়ে ওদের জাতিগত পোশাক পরিয়ে আদিবাসী গ্রামের সামনে বড়োরা রেখে দিল। তারপর আদিবাসীদের ওরা বদনাম দিল, তিনটে বড়ো মেয়েকে আদিবাসীরা মেরেছে। ওটাই সূত্রপাত। তারপর ১৫ মে থেকে আদিবাসী খেদানো শুরু হল।

   ওদের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন যেগুলো ছিল --- বিএলটি, এনডিএফবি --- আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে থেকে ছেলেগুলোকে বেছে নিত। আমাদের গ্রাম আক্রমণ করার জন্য অন্য এলাকা থেকে ছেলেগুলোকে নিয়ে এসেছিল। আমাদের দুই লাখ লোকের ঘরবাড়ি ধনসম্পত্তি জ্বালিয়ে নষ্ট করা হল। কমপক্ষে বিশ হাজার মানুষ নিহত হল। তিনটে জেলায় বিভিন্ন শিবিরে আমরা আশ্রয় নিলাম। বারো বছর সময় লাগল আমাদের পুনর্বাসনের। ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই নিজেদের জাতটাকে প্রোটেকশন দেওয়ার জন্য আমরা আদিবাসী কোবরা সংগঠন তৈরি করলাম। তখন থেকে আমরা ২০০১ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র আন্দোলন চালালাম। এর পরে আমরা ভাবলাম, এইভাবে তো কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। আমরা একপক্ষীয় অস্ত্র-বিরতি ঘোষণা করলাম আসাম সরকারের সঙ্গে। বিশেষ করে দুটো দাবি আমরা রাখলাম। এক, তিনটে জেলার আদিবাসীদের যথাযথ নিরাপত্তা সহ পুনর্বাসন দিতে হবে; দুই, আমাদের তফশিলি জনজাতির (শিডিউল ট্রাইব বা এসটি) মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের যে পরিবারগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের জন্য খুব সামান্য ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, পরিবার পিছু মাত্র দশ হাজার টাকা। ওই টাকা পাওয়ার পরে আমরা আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে মানুষকে নিরাপত্তা দিয়ে যার যার নিজের গ্রামে পুনর্বাসন করিয়েছি। যদিও এখনও বেশ কিছু টাকা সরকার দেয়নি। এসটি-র ব্যাপারে আমরা আসাম সরকারের সঙ্গে এখনও বৈঠক করছি। সমস্ত ভারতবর্ষে আদিবাসীরা এসটি স্ট্যাটাস পেয়েছে, আসামে আমরা পাইনি। আসামে আমাদের আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতাল, ওরাঁও, মুণ্ডা, হো, ভিল, খারিয়া, শবর, পান, ভূমিজ, গোন্দ ইত্যাদি মোট ৩৬টি গোষ্ঠী আছে। 

   সরকার বলছে, আমরা এখানে অনেক সংখ্যায় আছি। তাই ওরা দুই ভাগে আমাদের ভাগ করেছে, চা জনজাতি (টি ট্রাইব) আর প্রাক্তন চা জনজাতি (এক্স টি ট্রাইব)। যারা চা বাগানে কাজ করে, ওদের চা জনজাতি বলে; আর আমরা যারা গ্রামে আছি এখন, তাদের প্রাক্তন চা জনজাতি বলে। চা বাগানে চা জনজাতি ছাড়াও অ-আদিবাসী আছে --- যেমন ঘাটোয়া, তাঁতি, কুর্মি, দাস --- এদের জনজাতিকরণ তো হবেই না। কিন্তু সমস্ত বাগান থেকে এদেরও দাবি আছে, এদেরও এসটি স্ট্যাটাস দিতে হবে। আমরা বলছি, এ ব্যাপারে আপনাদের আলাদা ডিপার্টমেন্ট আছে। আপনারা যাদের এসটি দেওয়া দরকার তাদের এসটি দিন, যাদের এসসি (শিডিউল কাস্ট বা তফশিলি জাতি) দেওয়া দরকার তাদের এসসি দিন, যাদের ওবিসি (আদার ব্যাকওয়ার্ড কাস্ট) দেওয়া দরকার তাদের ওবিসি দিন। এই ব্যাপারে আসাম সরকার ২০১১ সালে তিন সদস্যের একটা এক্সপার্ট কমিটি তৈরি করেছে। ওই কমিটিকে প্রত্যেক জাতির এথনোগ্রাফিক রিপোর্ট তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে হয়, ওটা তৈরি হয়ে গেছে এবং তা আসাম সরকারের কাছে পেশ করা হয়েছে। ভারত সরকারকেও ওই রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। গত মাসের ২০ তারিখ আমরা দিল্লিতে গিয়েছিলাম। স্বরাষ্ট্র দপ্তরে আমাদের মিটিং ছিল।

   এবছর ২৪ জানুয়ারি গুয়াহাটির সরুসজাই ইন্‌ডোর স্টেডিয়ামে পাঁচটি আদিবাসী সংগঠন --- আদিবাসী কোবরা মিলিটারি অফ আসাম, বিরসা কমান্ডো ফোর্স, আদিবাসী ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি, আদিবাসী পিপ্‌লস আর্মি এবং সাঁওতাল টাইগার ফোর্স --- আসাম এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে অস্ত্র সংবরণ করে।

   বিটিএডি-র মধ্যে চারটে জেলার মধ্যেই আদিবাসীরা আছে। বেশি সংখ্যায় আছে কোকরাঝাড়, চিরাং আর উদালগুড়িতে। আমরা আদিবাসীরা প্রায় ২০%, এছাড়া আছে কোচ, রাজবংশী, রাভা, বিহারি, বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান।

   আদতে আমার গ্রাম ছিল কচুগাঁও। ১৯৯৬ সালের ঘটনার পর আমরা এদিকে চলে এলাম। আমাদের পরিবার ওখানেই থাকে। আমরা যারা জাতিটাকে নেতৃত্ব দিচ্ছি, তাদের ওরা সবসময় টার্গেটে রাখে। আমরা শ্রীরামপুরে এসে একটু সেফসাইডে আছি। এখানে বড়োদের কোনো উৎপাত নেই।

   আমরা মুসলমানদের ওপর এখনকার হামলার তীব্র প্রতিবাদ করেছি। এরকম জিনিস যেন কখনও না হয়। আমরা বারেবারে সরকারকে বলছি, শিবিরে যে মুসলমান ভাইয়েরা আছে, সেই শরণার্থীদের রেশনপাতি সমেত সমস্ত সহায়তা যেন দেওয়া হয়। অবিলম্বে আসাম সরকার, ভারত সরকার আর বিটিসি প্রশাসন মিলে যেন এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে।

   তবে যখন বড়োরা মুসলমানদের গ্রাম আক্রমণ করল, আমরা বাধা দিতে পারিনি। কারণ ১৯৯৬ এবং ১৯৯৮ দু-বার বড়ো আর আদিবাসীদের মধ্যে দাঙ্গা হয়েছে। আমাদের কোমর ভেঙে গেছে। আমরা মুসলমানদের পক্ষ নিলে আরও ঝামেলা হত। আমরা ভুক্তভোগী, জাতিগত সংঘর্ষটা কী জিনিস, তা আমরা ভালোভাবেই বুঝি। কোনো জাতিই যাতে আক্রান্ত না হয়, আমরা এটাই কামনা করি।

অনুলিখন জিতেন নন্দী। 
Comments