বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত

তরেন বড়ো


 


মুসলমান ও বড়োরা অনেক অনেক বছর ধরে এখানে আছে। আসামে স্বাধীনতার পর খিলঞ্জিয়া (আদি বাসিন্দা) মুসলিমরা এখানে আসে। আমার বাড়ি চিরাংয়ে, অবিভক্ত কোকরাঝাড় জেলায়। আগে ছিল অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলা, তারপর হল অবিভক্ত কোকরাঝাড় জেলা, এখন চিরাং। বিটিসি (বড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল) চুক্তি হল ২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। বিএলটি (বড়ো লিবারেশন টাইগার), ভারত সরকার এবং আসাম সরকারের মধ্যে এই চুক্তি হল। বিএলটি ছিল উগ্রপন্থী সংগঠন। তার আগে ১৯৮৭ সাল থেকে উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মের নেতৃত্বে নিখিল বড়ো ছাত্র সংগঠন (অল বড়ো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা আবসু) গঠন করে দারুণ একটা গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালের ২৭ মার্চ এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তখন ছিল প্রফুল্ল কুমার মহান্তের নেতৃত্বে অসম গণ পরিষদ অগপ সরকার। সেই আঞ্চলিক দলের সরকার একটা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রশমিত করার জন্য ১৯৮৮ সালে সেনাবাহিনী বিশেষ সুরক্ষা আইন (আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট) লাগু করে দিল। ১৯৮৯ সালে আসামের শাসক চক্র এবং অসমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি পুলিশ বাহিনীর সহায়তায় দরং, লখিমপুর ইত্যাদি দুই-তিনটে জেলায় গোষ্ঠীগত সংঘর্ষ লাগিয়ে দিল। অসমীয়রা হাজার হাজার বড়োদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিল। যতদূর মনে আছে, স্বাধীনতা দিবসের পর ২৩-২৪ আগস্ট থেকে এই কাণ্ড শুরু হয়েছিল। ১৯৮৮-৮৯ পর্যায় জুড়ে অসমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি এবং বড়োদের মধ্যে এই জাতিগত হাঙ্গামা চলল।

   সেই হাঙ্গামা শান্ত হওয়ার পরে যখন ঘরছাড়া মানুষের পুনর্বাসন হল, ১৯৯১ সালে আবার আন্দোলন শুরু হল। এবার বড়োদের মধ্যে বিভাজন দেখা দিল। তাদের নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ শুরু হল। হয়তো অসমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি বা শাসক চক্রের চক্রান্তও ছিল। এতদিন ছিল একটা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন। ১৯৯৬ সালের ১৮ জুন বিএলটি-র জন্ম হল। তারা হাতিয়ার সঙ্গে নিয়ে সমান্তরাল সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করল সেনাবাহিনীর দমনের বিরুদ্ধে। সরকারের দমনপীড়ন শুরু হল। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত এই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় বহু নিরপরাধ বড়ো সাধারণ মানুষ মরল। কেউ বুঝতে পারল না, কেন এমন ঘটল। কোনো চক্রান্তের ফলে না কী কারণে কেউ আন্দাজ করতে পারল না। একদিকে রঞ্জন দইমারির সশস্ত্র গোষ্ঠী ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অফ বড়োল্যান্ড[1], অন্যদিকে হাগ্রামা মহিলারির বিএলটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। কার্গিল যুদ্ধের সময় এক মাস যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছিল হাগ্রামা মহিলারি। তখন দিল্লিতে এনডিএ জোটের সরকার ছিল, তারা এদের ডেকে বলল, এখন তোমরা সশস্ত্র বিপ্লব বন্ধ করো। কার্গিল যুদ্ধকে মর্যাদা দিয়ে বিএলটি অস্ত্র সংবরণ করল।

   এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এল কে আদবানির উদ্যোগে ১৮-১৯টা বৈঠক হল বিএলটির সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে বড়ো চুক্তি সম্পন্ন হল। প্রকৃতপক্ষে, আন্দোলন করেছিল আবসু। কিন্তু চুক্তি হল সশস্ত্র গোষ্ঠী বিএলটির সঙ্গে। সেইসময় অবশ্য আবসু, বিএলটি বা বড়োদের ১২টা সংগঠনের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা গেল না। সেইসময় অসমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে সকলেই এক ছিল। কারণ ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্লেন ট্রাইবাল্‌স কাউন্সিল-এর স্বতন্ত্র উদয়াচল রাজ্যের দাবির আন্দোলনে বহু শহিদ হয়েছিল; ১৯৭৪-৭৫ সালের আন্দোলনে ১৮ জন শহিদ হয়েছিল; পরে উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মের নেতৃত্বে ডিভাইড আসাম ফিফটি-ফিফটি আন্দোলনেও শহিদ হয়েছিল বড়োরা। এইসবের একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা বড়ো জনগোষ্ঠীর ছিল।

   চুক্তির পর একটা দাবি উত্থাপিত হল। যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন না হয়, তাহলে তো আসাম সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকার প্যাকেজ দেবে না। টানা পাঁচ বছরের জন্য বছরে পাঁচশো কোটি টাকার প্যাকেজ ছিল। পরে অবশ্য তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এই প্যাকেজ নিয়ে হাগ্রামা মহিলারির নেতৃত্বে বড়োল্যান্ড স্বশাসিত পরিষদ চলল। বড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অটোনমাস ডিস্ট্রিক্টস বিটিএডি-র মধ্যে নতুন চারটি জেলা হল : কোকরাঝাড়, বঙ্গাইগাঁও ও পুরোনো কোকরাঝাড়ের অংশ নিয়ে চিরাং, পুরোনো দরং জেলাকে ভেঙে উদালগুড়ি, বরপেটা জেলাকে ভেঙে বাকসা। চিরাং হল আসামের ক্ষুদ্রতম জেলা। তামাম উন্নয়নের কাজ শুরু হল। বড়োল্যান্ডে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, টেকনিকাল এডুকেশনের প্রতিষ্ঠান সব তৈরি হল। কোকরাঝাড়ে সরকারি কলেজ হল। গ্রামে উন্নয়ন বলতে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি তৈরি হল।

   হাগ্রামা মহিলারির নেতৃত্বে বড়োল্যান্ড পিপল্‌স ফ্রন্ট বিপিএফ নামক রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করা হল। ২০০৫ সালের নির্বাচনে হাগ্রামা মহিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর রঘুরাম মার্জারি। দুটো রাজনৈতিক দল হয়ে যাওয়ার ফলে আবার ভ্রাতৃঘাতী নিধন শুরু হল ২০০৫-০৬ সাল থেকে। ২০০৬ সালের সংসদ নির্বাচনে বিপিএফ কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গঠন করে তিনজন মন্ত্রী আর একজন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারির পদ পেল। ২০১০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ৭৮টি আসন পেল, বিপিএফ পেল ১১টি আসন। পরে বোধ হয় ১৩ জন হয়েছে। হাগ্রামা মহিলারি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট সরকারে অংশ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে টাকাপয়সা ফান্ডিং ইত্যাদি পেয়ে কিছু বিকাশ হয়নি বলা যায় না। কিন্তু দুই গোষ্ঠীর মধ্যে আভ্যন্তরীণ কলহ আরও বেড়েছে।

   এরপর আবসু আলাদা রাজ্যের দাবিতে স্মারকলিপি পেশ করল। তারা বলল, বিটিসি চুক্তিতে যে ধারাগুলি আছে, তাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা নেই, কোকরাঝাড়ে আসাম সরকারের স্পেশাল একজন ডিআইজি-র অধীনে চারটে জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়। সীমানা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে কিছু করার ক্ষমতা বিটিসির নেই। বড়োদের আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের সুযোগ নিয়ে তৈরি হল অনাবড়ো সুরক্ষা সমিতি। এটার নেতৃত্বে রয়েছে কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা। হরেশ্বর বর্মণ, ব্রজেন মহান্ত প্রভৃতি পুরোনো বামপন্থী লোক, যারা কোথাও জায়গা পায়নি, আর কোথায় যাবে! এইসব বামপন্থীদের একটাও এমএলএ নেই। নিজেদের ভুলের জন্যই ওদের এই অবস্থা! প্রফুল্ল মহান্তের আঞ্চলিকতাবাদী সরকারকে সমর্থন দিয়ে সিপিআইয়ের প্রমোদ গগৈ মন্ত্রী হলেন। যে রঙ্গিয়া ঘাঁটি ছিল সিপিএমের, সেখানে কী করে কংগ্রেস এসে গেল? এটা ভাববার বিষয়। আসামে গণতান্ত্রিক শক্তি দুর্বল হয়েছে।

   বিটিসির মধ্যে রয়েছে মোট ৩০৮২টা গ্রাম। এরা বলল, যেসব গ্রামে ৫০ শতাংশের কম বড়ো মানুষ রয়েছে, সেই গ্রাম বিটিসির মধ্যে থাকবে না। ২০০৮ সালে অল বড়ো মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবিএমসিইউ তৈরি হয়েছে। আগে ছিল অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন আমসু। আমার মনে হয় বিটিসি প্রশাসনই এই এবিএমসিইউ-কে সৃষ্টি করেছে। এই এবিএমসিইউ শেষে অনাবড়ো সুরক্ষা সমিতি-র সঙ্গে মিলে বিটিসি বাতিল করো দাবি তুলল, হাগ্রামা মুর্দাবাদ ধ্বনি দিল। ২০০৮ সালেই উদালগুড়ি জেলায় নতুন করে মুসলমান ও বড়োদের মধ্যে সংঘর্ষ হল। ২০০৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত এই ধরনের কোনো সংঘর্ষ ছিল না। বিপিএফ এবং হাগ্রামা মহিলারির সঙ্গে মুসলমান নেতা আছে, যেমন খলিলুর রহমান, মোক্তার আহমেদ, জাহানারা বেগম প্রভৃতি। এরা এক সঙ্গে কাজ করেছে। কোকরাঝার, চিরাং জেলায় ভিলেজ ডেভলপমেন্ট কাউন্সিলে (ভিসিডিসি) অনেক মুসলমান নেতা রয়েছে। তাহলে সংঘর্ষ কেন হল?

   ২০০৮ সালে ঈদের সময় উদালগুড়ি জেলায় সংঘর্ষে বহু মুসলমান ভাই এবং বড়োদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তখন যারা গৃহহীন হয়েছিল তাদের পুনর্বাসন হয়নি। যে কেউ আই নদীর পারে গিয়ে শিবির দেখে আসতে পারে। চিরাং এবং উদালগুড়ি জেলায় এখনও বেশ কয়েকটা শিবির রয়েছে। এটা কম দুঃখজনক ব্যাপার নয়। সেই ঘটনার ক্ষত মুছতে না মুছতে আবার হল এই ২০১২-তে!

   এটা কি তবে অসমিয় জাতীয়তাবাদী শিবিরের কোনো প্ররোচনা? নাগরিকপঞ্জি (ন্যাশনাল রেজিস্টার্ড সিটিজেন) নবীকরণের ব্যাপারটা দেখা যাক। আইএমডিটি আইন (Illegal Migrants (Determination by Tribunals) Act) বাতিল হল। আসু (অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) বলেছিল, আইএমডিটি আইনের জন্য আমরা বিদেশিদের বিতাড়ন করতে পারিনি। ওরা বলেছিল, এটা একটা ভুতুড়ে আইন। এই আইন বাতিল করার পরে আসাম সরকারের কী দায়িত্ব ছিল? বেআইনি অনুপ্রবেশকারী মানে তো কেবল মুসলমান নয়। মেঘালয়, ত্রিপুরায় গেলে দেখা যাবে, কেবল মুসলমানরাই বাংলাদেশ থেকে আসে না। নেপালি, হাজং, হিন্দু বাঙালিরাও বাইরে থেকে আসে। হাগ্রামা মহিলারি সমস্ত জাতিকে নিয়ে একটা মডেল বিটিসি গঠন করতে চেয়েছিলেন। এটা কারা সহ্য করতে পারেনি? আমি সিআইএ বা আমেরিকা ইত্যাদির চক্রান্তের কথা বলি না। শুধু মৌলবাদী বদনাম দেওয়ার জন্য কিছু কায়েমি স্বার্থ এই ষড়যন্ত্র করেছে।

   ২০১২-র ঘটনা কীভাবে শুরু হল? জুন মাসে এবিএমসিইউ অনাবড়ো সুরক্ষা সমিতি-র সাহায্য নিয়ে গুয়াহাটিতে বিশাল জনসমাবেশ করল। হাগ্রামা মহিলারি, বিটিসি ও বড়োল্যান্ড বিরোধী ছিল এই সমাবেশ। এরপর ঘটল ৬ জুলাইয়ের ঘটনা। এবিআমসুর দুইজন কর্মীকে গুলি করা হল। কোনোরকম তদন্ত না করে কীভাবে ধরে নেওয়া হল যে বড়োরা ওদের মেরেছে? আসাম সরকারের পুলিশও একটা উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাবের বাহিনী। ৭ তারিখ হাগ্রামা মহিলারি ওই দুই কর্মীর পরিবারকে এক লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিলেন। ৮ তারিখ শান্তি সভা হল। ফের এবিএমসিইউ ১২ তারিখে কোকরাঝাড় জেলায় বন্‌ধ ডাকল। ১৬ তারিখে মাগুরমারিতে এবিএমসিইউ দুজন আহত হলেন। তার জের ধরে ঘটল ১৯ তারিখের ঘটনা। পুলিশ প্রশাসন ঠিক থাকলে ঘটনা এভাবে এগোত না। ১৯ তারিখ ৪ জন বড়ো যুবককে পুলিশের সামনেই মারা হল। এটাই ছিল মূল প্রতিক্রিয়ার উৎস।

   ২০ জুলাই কোকরাঝাড়ে মৃতদেহ নিয়ে শোভাযাত্রা বেরোল। প্রশাসন একে নিয়ন্ত্রণ করল না। ২১ তারিখে জয়পুর থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ শুরু হল। ২২ তারিখ দুপুর সাড়ে তিনটে পর্যন্ত ঘটনা কোকরাঝাড় জেলায় সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর তা চিরাংয়ে ছড়িয়ে পড়ল। কেন পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে জেলা কমিশনার, এমনকী মুখ্যমন্ত্রী কেউই একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না? কোথায় গেল প্যারা মিলিটারি? এটাই আমার প্রশ্ন।

   একটা আতঙ্ক। মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালাতে লাগল। তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হল। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়নি। হিংসা, তারপর প্রতিহিংসা। এখানে আসামের যাবতীয় সংবাদপত্র, বিশেষত ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভূমিকাটা কী? এ ডাকছে এবিএমসিইউর নেতাকে, এ ডাকছে বদরুদ্দিন আজমলকে, এ ডাকছে বড়ো সংগঠনের লোককে, এ ডাকছে অসমিয় বুদ্ধিজীবীকে, আর এক চ্যানেল ডাকছে বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে, কেউ ডাকছে বড়ো বুদ্ধিজীবীকে। সবটাই সংঘর্ষ! এরা বড়োকে দশ দিলে, ওরা দশ দেয় মুসলিমকে! যদি শান্তি প্রতিষ্ঠার চিন্তা থাকে, তাহলে মিডিয়ার ভূমিকা কী হওয়া উচিত ছিল? কোথায় গেল মানবতা? কোথায় গেল সিভিল সোসাইটি? প্রত্যেকে পরস্পরকে দোষারোপ করছে। দোষারোপ করে সমাধান হয় না।

   এর মধ্যে আবার চলে এল বজরং দল। আসামে কেউ বজরং দলের অস্তিত্বের কথা শুনেছে? বজরং দলের ডাকা বন্‌ধকে সকলে স্বতস্ফূর্তভাবে সমর্থন করেছে। কেন এবিএমসিইউ পিছিয়ে থাকবে? যেই বজরং দল বন্‌ধ ডাকল, পরদিন পাল্টা বন্‌ধ ডাকল এবিএমসিইউ। বজরং দলের বন্‌ধে সমস্ত দোকানপাট বন্ধ। বন্‌ধের বিষয়টা কী? বদরুদ্দিন আজমলকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এবিএমসিইউ-কে তাহলে বদরুদ্দিনকে রক্ষা করতে হয়! আর অমুক অমুককে গ্রেপ্তার করতে হবে! কিন্তু এরই মধ্যে এবিএমসিইউ একটা ভুল করে ফেলল। তারা হাঙ্গামা চালাল এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া সেটা সকলকে দেখিয়ে দিল। 

   আমি মনে করি, আসামের সব জেলায় বাংলাদেশি মুসলমান নেই। নামনি আসামে ধুবড়ি বা কোকরাঝাড় জেলায় বাংলাদেশি মুসলমান থাকতে পারে। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ যুদ্ধ হল, তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে এদেশে এসেছে। বহু হিন্দুও এসেছে। হাজং, গারো বা রাভা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তো বাংলাদেশি আছে। বাঘমারা, দালু, মহেন্দ্রগঞ্জ, ইসলামপুর, কালাইচর, নগরপাড়া, ফুলবাড়ি, ভেদবাড়ি, মানকাচরে যারা আছে, তাদেরও তো বাংলাদেশি বলা যেতে পারত। কিন্তু বিশেষ বিশেষ জায়গায় মুসলমানদের কেন টার্গেট করা হল?

   আজকের খবরের কাগজে দেখলাম, মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, মুসলমানদের সন্তানের সংখ্যা বেশি। রাজ্যের প্রধান হিসেবে তাঁর এটা বলা উচিত নয়। মুসলমানদের আট-দশটা ছেলে-বাচ্চা? আমি তো বড়ো, আমার মা-বাবারও তো আটজন ছেলেমেয়ে। এই সংকট-মুহূর্তে তাঁর এটা বলা সমীচিন নয়। আসলে সরকার নিজের অপদার্থতার কথাটা বলতে পারছে না।

   আমি সিভিল সোসাইটির একজন সদস্য, মানবিকতায় বিশ্বাসী। পনেরো বছর আমি বামপন্থী রাজনীতি করেছি, এসএফআই-তে ছিলাম। তারপর আমি বাধ্য হয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে আসি। আবসু করেছি। আবসু সামান্য হলেও সংকীর্ণতাবাদী, তবে তাদের অনেক ন্যায্য ইস্যু রয়েছে। এখন এসেছে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ। পুনর্বাসনের প্রশ্নে পক্ষপাতদুষ্ট হলে চলবে না। বলা হচ্ছে, শরণার্থীদের অনেকের মাটির পাট্টা নেই, তারা খাস জমিতে রয়েছে। বড়োদের কেউ কি খাস জমিতে নেই? কত জনজাতির, কত লক্ষ মানুষ খাস জমিতে রয়েছে। তাদেরও তো মেয়াদি (স্থায়ী) পাট্টা নেই। আমি বলব, যাদের ১৯৫২ সালের ভোটার লিস্টে নাম আছে; ১৯৭১ সালকে নাগরিকপঞ্জির জন্য ভিত্তিবর্ষ করা হয়েছে, এর মধ্যে যারা পড়ছে সকলেই নাগরিক। ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির ১০নং ধারায় ছিল --- কিন্তু তা কার্যকর হয়নি --- কেবল সংরক্ষিত শ্রেণীর (প্রোটেক্টেড ক্লাস) ভূমির অধিকার থাকবে। সংরক্ষিত শ্রেণী মানে হল যারা ভূমিপুত্র (ইনডিজেনাস), আমরা বলি খিলঞ্জিয়া। এর মধ্যে অসমিয় মানুষ আছে, বড়োরাও আছে। আসামের ভূমিনীতি পশ্চিমবঙ্গের মতো নয়। তার মধ্যে অনেক ফাঁকফোকর আছে। আসামে ৩২টি ট্রাইবাল বেল্ট অ্যান্ড ব্লক ছিল, সংরক্ষিত এলাকা। এর মধ্যে ইনার লাইন পারমিট[2] নেই। সেই পারমিট থাকলে অন্য কথা। আমরা মুসলমানকে বাংলাদেশি বলছি, কিন্তু যে রাজস্থান বা অন্য জায়গা থেকে আসছে, তারা তো সংরক্ষিত শ্রেণী নয়। ব্যবসায়ী সমাজ তো সংরক্ষিত শ্রেণী নয়। সরকার এদিকে নজর দেয় না। সরকারের দৃষ্টি কেবল তাদের দিকে, যারা শুধু পেটের জন্য চিন্তা করে, জমিতে হাল দেয়, কোদাল ধরে। তারা এখন ভুগবে। যাদের দু-তিন বিঘা জমি ছিল, সেই পরিবারের যদি পুনর্বাসন না হয়, তাদের কী হবে? তাই এটা নিছক বড়ো-মুসলমান সংঘর্ষ নয়, এটা একটা অন্য ষড়যন্ত্র। এর মধ্যে সামান্য হলেও নির্বাচনের ফ্যাক্টর রয়েছে। ২০১৪ সালে আসামে নির্বাচন। জমি দখল করে নেওয়ার একটা মতলবও আছে।

   স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কীভাবে ফিরে আসবে? শান্তি কীভাবে আসবে? উভয় গোষ্ঠীর মধ্যেই সহিষ্ণুতা থাকতে হবে। যদি হাজার হাজার শরণার্থী নিজেদের ঘরে না ফিরতে পারে, আবার গণ্ডগোল বাধবে। মানুষের মনের ক্ষয় ঘটবে। চিরাং জেলায় আমার গ্রামের বাড়ি। সেখানে প্রথমে ১৬টা ঘর ছিল, এখন ৬০ ঘর হয়েছে। বরপেটা থেকে আমাদের আত্মীয়-বন্ধু ওখানে গেছে। এটা হতেই পারে। এদের যদি বাংলাদেশি বলা হয়, সেটা কেমন? এরা ভূমিপুত্র হতে পারে। জমি নেই, একই পরিবারের এক ভাই নিজের গ্রাম ছেড়ে ওই গ্রামে গেছে, এটাও হতে পারে। চিরাং জেলায় নোয়াপাড়া, নদিয়াপাড়া, হাসলবাড়ি, গরুইমারি, মঙ্গোলিয়ান শিবিরে আমি গিয়েছিলাম। মঙ্গোলিয়ান শিবিরের লোকেরা আমায় বলেছে, আমরা বড়ো আর মুসলমানরা এত বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করি, একসঙ্গে জমিতে যাই, কীভাবে এই গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বটা হল? যখন বাইরে থেকে হামলা করতে এসেছে, স্থানীয় মুসলমানরা বাধা দিয়েছে। সেই স্থানীয় মুসলমানরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমরা মুসলমান হয়ে কেন বাধা দিচ্ছ? তোমার ঘরও জ্বালাব। এটা আমি মঙ্গোলিয়ানের শিবিরে পেয়েছি। কোকরাঝাড় ও ধুবড়ি জেলার গোটা সীমানা অঞ্চলে --- গোসাইগাঁওয়ে --- অচেনা লোক এসে হামলা চালিয়েছে। তারা কোথা থেকে এল? হাগ্রামা মহিলারি বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে মৌলবাদী সংগঠনের লোক এসে হামলা করেছে। এরা কারা? কোন দলের লোক? আমি বলব না যে কোনো মৌলবাদী সংগঠন নেই। আবার এটাও বলব না যে বড়ো উগ্রপন্থী নেই। হাতিয়ারধারী লোক আছে। তারা থাকলে সমাজে শান্তি থাকবে না। বেআইনি অস্ত্রধারী মুসলিমও হতে পারে, কেএলও হতে পারে, বাঙালি লিবারেশন ফোর্স হতে পারে, কোবরা হতে পারে। যদি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় একজন বাঙালিকে কেউ মারে, পাশে রাজবংশী আর বড়োরা বাস করে, তাদের ঘরে লাশটা রাখা হল। পুলিশ কাকে ধরবে? একটা রাইটিং প্যাড ছাপিয়ে নেওয়া তো কোনো ব্যাপার নয়। তাতে লিখে পাঠিয়ে দেওয়া হল, অমুক তারিখের মধ্যে পাঁচ লক্ষ টাকা পাঠাও, নাহলে তোমার জীবন বিপন্ন। এই জিনিসটা এখন বিটিএডি এলাকায় ঢুকে পড়েছে।

   বড়োরা বিটিসি পেয়েছে বটে, কিন্তু গোড়া থেকেই আসামে তাদের প্রতি একটা অবহেলার দৃষ্টি রয়েছে। আমার মতে, সামগ্রিক পরিস্থিতিটা খারাপ।

     বাকসা জেলায় কিছু জায়গায় বড়ো মেজরিটি নেই, তারা ৩৫%-এর নিচে। এরকম ৯৫টা গ্রাম বিটিসির ভিতর থাকতে চাইছে না। বিটিসি চুক্তির ৪.৬ ধারায় লেখা আছে, বিটিএডি এলাকায় জমি ও সম্পত্তিতে সকলের সমান অধিকার। বেল্ট অ্যান্ড ব্লক কাজ করবে না। অ-বড়োরাও জমি নিতে পারে। সরকারি চাকরিতে যে কেউ যেতে পারে। শরণার্থীদের মধ্যে শুধু মুসলমান আর বড়ো নয়, কোচ, রাজবংশী, রাভা, নেপালিও আছে। খুব সামান্য বাঙালিও আছে।

অনুলিখন জিতেন নন্দী। 



[1] ১৯৮৬ সালের ৩ অক্টোবর উদালগুড়ির ওদলা খাসিবাড়ি গ্রামে রঞ্জন দইমারির নেতৃত্বে বড়ো সিকিউরিটি ফোর্স গড়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালে নামবদল করে হয় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অফ বড়োল্যান্ড এনডিএফবি। এদের অধিকাংশই ক্রিশ্চান। ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্তরে এরা সার্বভৌম বড়োল্যান্ড রাজ্যের দাবি করেছে। এরা দেবনাগরির পরিবর্তে লাতিন অক্ষরে লেখে। সূত্র : উইকিপিডিয়া।     

[2] ইনার লাইন পারমিট হল ভারত সরকারের ইস্যু করা ভ্রমণের এক ছাড়পত্র। চারটি সংরক্ষিত রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বসবাসের জন্য ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক এই পারমিট। আসামে এই পারমিটের ব্যবস্থা নেই।  সূত্র : উইকিপিডিয়া।

Comments