বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি

 


গুয়াহাটি, শিলচর ও ডিব্রুগড় থেকে বাংলায় প্রকাশিত দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকা থেকে নেওয়া সংবাদের ভিত্তিতে এই দিনলিপি প্রস্তুত করা হয়েছে। সাধারণত যে কোনো দাঙ্গার মোটাদাগের খবর থেকে নানারকম ভুল ও একপেশে ধারণার সৃষ্টি হয়। সেই ধারণাগুলিকে অনেকসময় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারও করা হয়। যেহেতু আমাদের দেশের রাজনীতির জাতীয়, আঞ্চলিক, ভাষা ও কৌমগত ভিন্ন ভিন্ন তল রয়েছে, ভ্রান্তি থেকে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা থেকেই যায়। বড়োভূমির সাম্প্রতিক ঘটনাবলীও এরকম বিভ্রান্তির উৎস হয়ে উঠতেই পারে। সর্বোপরি, আসাম তথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক হয়নি। তাই আমরা এই দিনলিপি প্রকাশ করছি।


     


৬ জুলাই কোকরাঝাড় জেলার আন্ঠিহারা মুসলমানপাড়া গ্রামে ঠিক সন্ধ্যা সাতটার সময় কিছু মুসলমান মানুষ দোকানের সামনে বসে আড্ডা মারছিল। মোটরসাইকেলে এসে একে-৪৭ দিয়ে গুলি করে চলে গেল। একজন ওখানেই মারা গেল, তিনজন গুরুতরভাবে আহত হল, একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেল। আহতদের বয়ান অনুযায়ী, যারা মেরেছে ওরা বড়ো জাতির লোক ছিল। এটা নিয়ে উত্তেজনার সূত্রপাত। নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। আসাম পুলিশের তদন্তও চলছিল। তদন্তকারী অফিসারদের কথার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের একটা তফাত চলে এসেছিল। তদন্তকারী অফিসাররা বলে, এটা কেএলও-র কাজ। আহত ব্যক্তিরা এই তথ্য মেনে নিতে পারেনি।

স্বপন আইচ, সাংবাদিক, শ্রীরামপুর, গোসাইগাঁও


১৯ জুলাই   অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা মাত্র কয়েকদিন আগে গোঁসাইগাঁওয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের দুজনকে গুলি করে হত্যা করেছিল$ এই ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল বড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিস্ট্রিক্টস (বিটিএডি) এলাকায়$ অসম তফশিলি জাতি পরিষদ-এর ডাকা ২৪ ঘন্টা বন্‌ধ চলাকালীন আজ বৃহস্পতিবার রাত আটটা নাগাদ কোকরাঝাড় সদরে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা সমবেত মুসলমান জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়$ এতে অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আমসু)-র নেতা মহিবুল ইসলাম ও সিদ্দিক আলি গুরুতরভাবে আহত হন$ ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকে কোকরাঝাড়ের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে কাতারে কাতারে লোক রাজপথে বেরিয়ে আসে$ আহত দুজনকে কোকরাঝাড় রূপনাথ ব্রহ্ম অসামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল$ সেখানে এসে জড়ো হয় সহস্রাধিক মানুষ$

           কোকরাঝাড় জেলার কাজিগাঁও থানার ধুবড়ি-কোকরাঝাড় সীমানা সংলগ্ন মঙ্গলাঝোড়ার গভীর জঙ্গলে এদিন দুপুরে সেনা ও পুলিশ যৌথ তল্লাশি চালায়$ সন্ধ্যা সাড়ে ছ-টা নাগাদ ধরা পড়ে রাভা ভাইপার আর্মি (আরভিএ)-র রুদ্র আভা (৩০)$ পুলিশি সূত্রে জানা যায়, তিনি একবার বড়ো লিবারেশন টাইগার (বিএলটি) জঙ্গি হিসেবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন$ তারপর ফের তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অফ বড়োল্যান্ড (এনডিএফডি)-তে যোগ দিয়ে তিন মাসের জঙ্গি প্রশিক্ষণ নেন ভুটান থেকে$ এখন তিনি আরভিএ-র হয়ে কাজ করছেন$

২০ জুলাই   আজ শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ কোকরাঝাড় শহর থেকে তিন কিমি দূরে নাড়াবাড়ির জয়পুরে মোটরবাইক আরোহী চার প্রাক্তন বিএলটি সদস্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে স্থানীয় গ্রামবাসীরা$ তারা বাইক জ্বালিয়ে দেয়$ বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে এলে আক্রান্ত হয়$ এদিন আমসু এবং এবিএমসু (অল বড়োল্যান্ড মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) ঘোষণা করে, তারা বিটিএডি এলাকা ও ধুবড়িতে ২৩ জুলাই সকাল পাঁচটা থেকে ১২ ঘণ্টা বন্‌ধ পালন করবে$

২১ জুলাই   আজ শনিবার ভোররাতে তিনটে নাগাদ কোকরাঝাড় থানা থেকে আট কিমি দূরে চিম্বরগাঁওয়ের হালিথবাড়িতে অপরিচিত আততায়ীর গুলিতে একজন কৃষক নিহত হন, আহত হন তাঁর স্ত্রী সহ পাঁচজন$ জেলার ফকিরাগ্রাম, গোঁসাইগাঁওয়ে এবং চিরাং, বাকসা ও ওদালগুড়িতে বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটে$ পাঁচ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং ১৪৪ ধারা জারি হয়$ বিটিএডি প্রধান হাগ্রামা মহিলারি বলেন, অশান্তি দুষ্টচক্রের ষড়যন্ত্র$

           এদিন শালকোচা থেকে কোকরাঝাড় হয়ে একটি ইটভর্তি ট্রাক যখন শালাকাটি যাচ্ছিল, আচমকা দুর্ঘটনা ঘটে$ এই সুযোগে সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ দুষ্কৃতীরা আক্রমণ চালায় চালক ও মালবাহী শ্রমিক জাকিরের ওপর$ চালক পালিয়ে গেলেও জাকির মারা যান$

           দুপুর বারোটা নাগাদ গোসাইগাঁও মহকুমার মাকটাই গ্রামে উন্মত্ত যুবকেরা গুলি চালায়$ একজন মহিলা ও দুইজন পুরুষ আহত হয়$

২২ জুলাই   গতকাল রাতে কোকরাঝাড় শহরের প্রাণকেন্দ্রে গঙ্গা টকিজ সিনেমাহলের পাশে ভাড়াবাড়িতে থাকা এক পরিবারের ওপর নৃশংস হামলা হয়$ পরিবারের গৃহকর্তা, স্ত্রী ও নিকটাত্মীয় মারা যায়$ পার্শ্ববর্তী গোরাং নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া হয়$ ভোররাতে গোরাং নদীতে মাছ ধরতে আসা একদল জেলে দশ বছরের এক গুলিবিদ্ধ শিশুকে উদ্ধার করে$ আখতার নামের এই শিশুকে কোকরাঝাড় আরএনডি সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়$ সে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে$ শ্মশানঘাটের পাশে দুপুরে দুটি মৃতদেহ পাওয়া যায় এবং তাদের শনাক্ত করা হয় বসিরন খাতুন (১৫) ও রুকসানা খাতুন (৫ মাস)$ গতরাতে মোটর পার্টস দোকানের কর্মচারী মনোয়ার হুসেনের (৪০) ভাড়াঘরে হামলা হয়$ বালাজান তিনআলিতে অরুণ দাসের স্ত্রী পূর্ণিমা দাসকে মুসলমান মনে করে আক্রমণ করা হয়$

           চিরাং জেলার বিজনি অঞ্চলের মঙ্গোলিয়ান বাজারে অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতীর গুলিতে হাসের আলি ও নূর হুসেন নামে দুজন মারা যান$

           গতকাল শনিবারের কার্ফু কোকরাঝাড়ে রবিবারও চলতে থাকে, সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত$ কোকরাঝাড় মহকুমায় ৭টি এবং গোসাইগাঁওয়ে ৬টি আশ্রয়শিবির তৈরি হয়, আশ্রয় নেয় মোট চোদ্দো হাজার মানুষ$

           আজ রবিবার রাত সাড়ে আটটা নাগাদ সেরফাংগুড়ির আঠিয়াবাড়িতে ৪ জন হিন্দিভাষী পরিবারের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়$

           গোসাইগাঁও মহকুমার কচুগাঁওয়ে মসজিদ ভাঙচুর হয়$

           ফকিরাগ্রাম থানার কোদালদোয়াতে এক অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে পাঁচ হাজার বড়ো মানুষ আশ্রয় নেয়$ ভাওতাগুড়ি ফাঁড়ির অন্তর্গত মান্দারপাড়াতে শিবিরে আশ্রয় নেয় প্রায় দু-হাজার মুসলমান মানুষ$ শাপকাটা ফাঁড়ির ভোমরাবিলের মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে কাশিয়াবাড়ি সহ কয়েকটি গ্রামের মুসলমান মানুষেরা আশ্রয় নেয়$

           কোকরাঝাড় থেকে ধুবড়ি যাওয়ার পথে পুলিশের কনভয়ে হামলা চলে, জনতা পাথর ছোঁড়ে$

           এদিনের সরকারি হিসেবে ১৭ জন মৃত, আহত ২০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন$ 

২৩ জুলাই   কোকরাঝাড় জেলার গ্রামগুলি ছেড়ে পালাচ্ছে ভীত শিশু-বৃদ্ধ-মহিলা$ ঘরবাড়ি জ্বলছে$ দেখামাত্র গুলির নির্দেশ এবং নতুন করে কার্ফু জারি হয় বিটিএডি এলাকার বাইরে ধুবড়ি, গৌরীপুর ও সাপটাগ্রামে এবং চিরাং জেলাতে$ লাঠি বল্লম দা কুড়ুল নিয়ে বেরিয়ে আসে জনতা$

           গোরাং নদীতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মহিলার মৃতদেহ$ মুনসিরঘোপ এলাকায় জমিলা বেগম (৪৫) আহত, করিম মিয়া (৫৫) গুলিতে ঝাঁঝরা$ জেলার আমিনকাটা, সুবনখাতা, লক্ষ্মীগাঁও ও কচুকাটা গ্রামে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা আগুন লাগিয়েছে$

           এদিন সরকারি মতে ১৫ জন মৃত$ বেসরকারি হিসেবে ৩০ জন মৃত$ অসমর্থিত মতে চল্লিশের বেশি মৃত$ কোকরাঝাড়ে ৪২টি আশ্রয়শিবিরে সত্তর হাজারের বেশি মুসলমান মানুষ$

           আজ সকাল থেকে ধুবড়িতে বন্‌ধ ডাকে আমসু ও এবিএমসিইউ$ গৌরীপুর বাজারে অরাজক পরিস্থিতি, শাসানি দিয়ে বন্‌ধ সফল করা হয়$ বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ ধুবড়ি শহরের ১০নং ওয়ার্ডে ব্রহ্ম বোর্ডিং হস্টেলের তিনটি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়$ নিউ জলপাইগুড়ি-ধুবড়ি ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধুবড়ি অভিমুখে আসার পথে গৌরীপুর স্টেশনে দুষ্কৃতিরা কণিষ্কা রাভা (২১) এবং কামেশ্বর রাভা (২৩) নামে দুই যুবককে দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতরভাবে আহত করে$ এই জেলার ২৬টি শিবিরে ত্রিশ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নেয়$

           কোকরাঝাড় জেলার সীমান্তবর্তী চিরাং জেলার জরেগাঁও, কাউনিয়াভাষা, মিলমিলিপাড়া, খাগ্রাবাড়ি, কুর্শাকাটি, তিরিমারি প্রভৃতি মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামের মহিলাদের দেখা যায় বাড়িঘর ছেড়ে কোলের শিশু নিয়ে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে$

২৪ জুলাই   আজ কোকরাঝাড়ের কদমতলায় শাহিনুর আলম (১৯) নিহত হয়$ দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলেটি বিটিএডি এলাকার বাইরে বঙ্গাইগাঁও জেলার চাকলা গ্রাম থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য একটি নিয়োগ র‍্যালিতে অংশ নিতে কোকরাঝাড়ে এসেছিল শনিবার$ তাকে অপহরণ করা হয়েছিল$

           কোকরাঝাড় মাগুরমারির সুলেমান শেখ (২৬) নিরুদ্দেশ$ বাসুগাঁওয়ের বাসিন্দা কাঠমিস্ত্রি গোপাল দাস (৪৭) কাজ করতে এসে বিসমুতিয়ারি গ্রামের একদল উন্মত্ত যুবকের হাতে প্রাণ দেন$  

গোসাইগাঁও সংলগ্ন হামরাবাড়ি গ্রামের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী মিনা বেগম, দাদা নাসিরুদ্দিন (২৩) ও ঠাকুমা কারমান বিবি (৭৪) নিহত হন$ তার বাবা আবুল কাসেম বাড়িতে ছিলেন না$ তিনি মিস্ত্রির কাজ করেন গুয়াহাটিতে$

সোমবার শ্বশুর, শাশুড়ি ও সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে বঙ্গাইগাঁও শহরের দিকে পালিয়ে আসার পথে এক মহিলা প্রসব যন্ত্রণায় অসুস্থ হয়ে পড়েন$ বঙ্গাইগাঁও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়$ সোমবার সন্ধ্যা থেকে চিরাং জেলার উত্তরাঞ্চলের মানুষ প্রাণভয়ে কাজলগাঁও, ঢালিগাঁও, বিজনি, বঙ্গাইগাঁও ইত্যাদি সুরক্ষিত এলাকায় পালিয়ে আসে$ দুর্বৃত্তরা আজ মঙ্গলবার দুপুরে কাজলগাঁও মহকুমায় অন্থাইবাড়ি, দেউলগুড়ি, ডোমগাঁও, পাটাবাড়ি সহ বেংতলের পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়$ কাকভোরে বিজনি থনার করাইবাড়ি, গেন্দাবাজার, কুক্‌লং ইত্যাদি বড়ো অধ্যুষিত গ্রাম জ্বলতে থাকে$

বঙ্গাইগাঁও জেলার মানিকপুর থানায় বড়ো অধ্যুষিত দাখাতি, জামদোহা, ডোকারচক বাজারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়$ বাসুগাঁও থানায় খাটালপাড়া, শিলপাট ও পাখরিগুড়ি গ্রামে মুসলমানদের ৪০টি ঘর জ্বলে$ বাসুগাঁও থানা ও সালেকাটি পুলিশ ফাঁড়ির খাগ্রাবাড়ি, জরেগাঁও, টিলাপাড়া, উজানপাড়া, মাঝপাড়া, কাউনিয়াভাষা, মৌজাবাড়ি, কচুদোলা, দেউলগুড়ি, উলুবাড়ি, শিলপাট গ্রামের পাঁচ হাজারের বেশি মুসলমান ঘর ছেড়ে বাসুগাঁও উচ্চতর বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়$ তিরিমারি, টেংনামারি, ফুলগুড়ি, খাগ্রাবাড়ি, নলবাড়ি, থুরিবাড়ি, শরাইখসরা, তিলকগাঁও, বরসরা গ্রামের তিন হাজারের বেশি বড়ো ও রাজবংশী মানুষ বাসুগাঁও কলেজে আশ্রয় নেয়$ জেলায় কার্ফু চলছে$

গুয়াহাটি অভিমুখে আসা ৪০টি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে পড়ে$ ট্রেনের কামরায় খাদ্য, পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়;  বিদ্যুৎ পরিষেবা, এসি ইত্যাদি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে$ গোসাইগাঁওয়ে রাজধানী এক্সপ্রেসে হামলায় এক যাত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়$

বিটিএডি প্রধান হাগ্রামা মহিলারি বলেন, বাংলাদেশ থেকে আসছে দুর্বৃত্ত$ সরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা ২৬$

২৫ জুলাই   কোকরাঝাড়ের ডিমলগাঁওয়ের মাছুয়াঘাটে বুধবার সন্ধ্যায় তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়$ এদিন সকালে নিরাপত্তা বাহিনী দুটি ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করে$ এর মধ্যে বড়োবস্তির দণ্ডি বসুমাতারিকে (৬৫) শনাক্ত করা হয়$ কোকরাঝাড়ের আলুভূঞা গ্রামের মুসলমান বাসিন্দা ভাসা দেওয়ান বড়ো পড়শি রাজেন্দ্র ও আরতি বসুমাতারিকে আশ্রয় দিলেন উন্মত্ত হামলার সময়$

        আজ ভোরে চিরাং জেলায় বাসুগাঁও থানার অন্তর্গত বাসুগাঁও-কাকারাগাঁও সড়কের কানিভুর সেতুর নিচে আতাউর রহমান নামে এক যুবকের মৃতদেহ পাওয়া যায়$ মৌজাপাড়া গ্রামে জয়তুন নেছার (৫০) মৃতদেহ উদ্ধার হয়$

        ধুবড়ি জেলায় নতুন নতুন এলাকায় দাঙ্গা লাগে$ ফের অনির্দিষ্টকালীন কার্ফু জারি হয়$

সরকারি মতে মৃত বেড়ে ৪৩; কোকরাঝাড়ে ২৫, চিরাংয়ে ১৫$ ১২১টি শরণার্থী শিবিরে এক লক্ষ সত্তর হাজার মানুষ$ ২৯ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন হয় ধুবড়ি, বঙ্গাইগাঁও ও বিটিএডি এলাকায়$ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের প্রশ্নে বাংলাদেশের বিদেশ সচিব মিজারুল কায়েস বলেন, অনুপ্রবেশ নিয়ে আলোচনায় রাজি ঢাকা$

২৬ জুলাই   বাকসা জেলায় হিংসা ছড়িয়ে পড়ে$ কোকরাঝাড়ে পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়$ এই জেলায় মৃত ৩৩, চিরাংয়ে ১৭$ সরকারি মতে মোট নিহত ৪২, আহত ৪৫, নিখোঁজ ১০, গ্রেপ্তার দেড় শতাধিক$ তিন জেলায় আড়াইশোটির বেশি শিবির, তিন লক্ষাধিক আশ্রিত$ ধুবড়ি জেলার তামাহাট, বিলাসীপাড়া, গৌরীপুর এবং ধুবড়িতে এক লক্ষ কুড়ি হাজার শরণার্থী$

        ধুবড়ি সার্কিট হাউসে এআইইউডিএফ (অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) সুপ্রিমো তথা ধুবড়ির সাংসদ বদরুদ্দিন আজমল বলেন, বড়োভূমিতে পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে$ তিনি বলেন, বিটিসি এলাকায় বসবাসকারী ৭০ শতাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের লোককে ধ্বংস করে ২২ শতাংশ বড়ো জনগোষ্ঠীর লোকের জনসংখ্যা দিয়ে বৃহত্তর বড়োল্যান্ড গঠন করার পথ মসৃণ করার পরিকল্পনা চলছে$ [1]

        চিরাং জেলায় কুকুরমারা গ্রাম ও শুকলাইপাড়া, কামারপাড়া, ঢাকুয়ানা এলাকায় স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে রাতপাহারা দেওয়া হয়, শান্তি অব্যাহত থাকে$

২৭ জুলাই   মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেন, বড়োভূমিতে অবড়োদের অধিকার সুরক্ষিত, তাদের জমি কেড়ে নেওয়া যাবে না$    

২৮ জুলাই   বরঝাড় বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে এআইইউডিএফ স্মারকলিপি দেয় : বিটিএডি-তে ৭১% অবড়ো, ২৯ বড়ো; বিটিসি ভেঙে দাও$

           বোড়োল্যান্ডে দিনহাজিরা-শ্রমিক, কসাই, রিকশাচালক, ঠেলাচালক, গৃহপরিচারিকা অধিকাংশ মুসলমান$ এইসব শ্রমিকের অভাবে হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে$ আশ্রয়শিবিরে মোট আড়াই লক্ষ শরণার্থী$

২৯ জুলাই   গোসাইগাঁও মহকুমার হাসরাবাড়ি থেকে রাজু আলি, কোর্শামারি গ্রাম থেকে খোদা ভাষা শিকদার (৩০), ভাওলিগুড়ি থেকে রহিমা বিবির (৫০) মৃতদেহ উদ্ধার হয়$

চিরাংয়ে কার্ফু উঠল$ ঘরমুখী আক্রান্ত পলাতক মানুষ$ জেলার ৮৩টি শরণার্থী শিবিরে ১,১২,৮৫১ জন$ ৮৩টি গ্রামের ২৬,১৯০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত$ আগুনে ছাই ১১৬০টি ঘর$

১ আগস্ট    সরকারি মতে ২৭৮টি শিবিরে মোট শরণার্থী ৪.০৬ লক্ষ$

ধুবড়ি জেলার ১১৮টি শিবিরে সকলেই মুসলমান$ এই জেলার ধুবড়ি, গৌরীপুর, গোলকগঞ্জ, তামারহাট, বিলাসীপাড়া ও চাপর থানার অন্তর্গত এলাকায় রাত দশটা থেকে সকাল ছ-টা পর্যন্ত কার্ফু জারি রয়েছে$

২ আগস্ট    চিরাং জেলার চৌরাবাড়ি গ্রামের দুষ্কৃতীরা বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ ৯টি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে$ সেখানে স্থানীয়দের ঘরে ফেরার প্রস্তুতি চলছিল$

৩ আগস্ট    রাত ৮টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত কার্ফু চলাকালীন কোকরাঝাড় শহরের কলেজ রোডে ঠিকাদার জি এস খানের বাড়িতে লুটপাট হয়$ সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক এম রহমানের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দুষ্কৃতীরা$

৫ আগস্ট    চিরাং জেলার বিজনি মহকুমা থেকে উদ্ধার হয় আবদুস সালাম ও তাঁর দুই শিশুপুত্রের মৃতদেহ$ এরা তিনজন দাঙ্গার প্রথমদিকে চিরাংয়ের কাওয়াটিকা গ্রামের শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল$ চিরাং কোকরাঝাড় সীমান্ত সংলগ্ন বাড়ন্তপুর গ্রামে চম্পানদীর তীরে পুঁতে রাখা ছিল দুটি মৃতদেহ$ গতকাল অপহরণ হয়েছিলেন ইসলাম মণ্ডল ও আমির আলি নামে দুই যুবক$ আজ সকাল ৮টা নাগাদ ৩১নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করে স্থানীয় জনতা$ বড়োল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের যাত্রীবাহী বাসে উঠে মারধোর করা হয়$

           কোকরাঝাড় শহর থেকে প্রায় ৭ কিমি দূরের জালোয়াবাড়ি চাবাগানের আদিবাসী লক্ষ্মণ বেক (১৯)। অন্য যুবকদের সঙ্গে হালের বলদ জোগাড়ে বেরিয়েছিল সে$ চাবাগানে লুকিয়ে থাকা এক দুর্বৃত্ত এলোপাথাড়ি গুলি চালায়$ আহত হয় লক্ষ্মণ বেক$ এই ঘটনায় সকালে জালোয়াবাড়ি চাবাগানের ৫০০ শ্রমিক হাতে লাঠি তীর ধনুক নিয়ে পাল্টা আক্রমণে উদ্যত হয়$ এক বিবৃতি জারি করে সারা অসম আদিবাসী ছাত্র সংস্থার কোকরাঝাড় পশ্চিম আঞ্চলিক কমিটি জানায়, বিটিএডি-র বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে জড়িত করার বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক$

৬ আগস্ট    সরকারের ইঙ্গিত : জমির পাট্টা, সরকারি নথি বাধ্যতামূলক হতে পারে পুনর্বাসনে$

৭ আগস্ট    সোমবার রাতে ধুবড়ি-কোকরাঝাড় সীমান্তবর্তী রানিঘুলিতে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীর হাতে ৩ জন নিহত হয়, গুরুতর আহত হয় ২ জন$ মঙ্গলবার অগ্নিগর্ভ বিলাসীপাড়া, গৌরীপুর শহরের নিকটবর্তী সুরিয়াতলিঘাট, বটেরতল, আলমগঞ্জ এলাকা$ ৩১নং জাতীয় সড়ক অবরোধ হয় বেলতলি এলাকায়$ পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ বাধে$ অনির্দিষ্টকালীন কার্ফু জারি হয় ধুবড়ি, গৌরীপুর, গোলকগঞ্জ, তামারহাট, বিলাসীপাড়া ও চাপর থানা এলাকায়$

           পরিস্থিতি উন্নত হওয়ায় সোমবার অবধি ১.১৬ লক্ষ মানুষ শরণার্থী শিবির থেকে ফিরে গেছে$ শিবিরের সংখ্যা ৩৪০ থেকে কমে ২৪৫ হয়েছে$ মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেন, অবৈধ নাগরিকদের পুনর্বাসন সরকারও চায় না$ যেসব প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক স্থানচ্যুত হয়েছে, তারাই পুনর্বাসন পাবে$ শিবিরে থাকলেও সব লোকই যে পুনর্বাসন পাবে, তা নয়$ চিরাংয়ের শিবিরে তো বহু বাইরের লোক রয়েছে$ বাইরে থেকে অনেকেই এসে শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে$ তবে বিটিসি এলাকায় যারা স্থানচ্যুত হয়েছে, তারাই পুনর্বাসন পাবে$ জমি না থাকলে, ঘর না থাকলে কী করে পুনর্বাসন পাবে? ঘরবাড়ি থাকতে হবে, তবেই তো ক্ষতিপূরণের টাকা পাবে$ তাছাড়া ভারতীয় নাগরিক হতে হবে$

           সরকারি মতে, মৃত ৭৩, ঘর জ্বলেছে ৫৩৬৭টি, গ্রেপ্তার ১৭০ জন, নথিভুক্ত মামলা ৩০৯টি, মোট শরণার্থী শিবির ৩৪০টি, বর্তমানে ২৪৫টি$ শিবিরে ৪,৮০,৬৬৪ জন ছিল, এখন ৩,৬৪,০৮৩ জন, ছেড়ে চলে গেছে ১,১৬,৫৮১ জন, শিবির বন্ধ হয়েছে ৯৫টি, শিবিরে মৃত্যু ১৫ জনের (৭ শিশু, ৮ বৃদ্ধ)$

৮ আগস্ট    কোকরাঝাড় জেলায় ২, বাকসা জেলায় ২, মোট ৪টি মৃতদেহ উদ্ধার$ কোকরাঝাড়, চিরাং, বাকসা ও ধুবড়ি জেলায় নৈশকালীন কার্ফু$

৯ আগস্ট    বুধবার রাতে চিরাং জেলার ঢালিগাঁও থানা তথা ডাংতল সাব পুলিশ স্টেশনের নিলিবাড়ির আমসুর শাখা কার্যালয়ে আগুন লাগায় দুর্বৃত্তরা$

২৩ আগস্ট  কোকরাঝাড়ের বিধায়ক প্রদীপ ব্রহ্ম গ্রেপ্তার বুধবার মধ্যরাতে দোতমার বাড়ি থেকে$ শিবিরে আশ্রিতা এক মহিলা সোনিয়া গান্ধীকে এই তথ্য জানান$ প্রতিবাদে কার্ফু উপেখ্যা করে কোকরাঝাড়, গোসাইগাঁও, ডাংতল সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ, রেল অবরোধে আওয়াজ ওঠে 'বাংলাদেশি হটাও, ভারত বাঁচাও'$

           আগে প্রায় ৪.৯ লক্ষ শরণার্থী, বর্তমানে ২.৫৬ লক্ষ$

           আসু জানায়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে আসা পুনর্বাসন নয়$

২৪ আগস্ট   আজ বাসুগাঁও সংলগ্ন কোকরাঝাড়ের তিনটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতীরা$ কোকরাঝাড় জেলার ছালাকাটি থানার কান্দিপুকুরির মিলমিলিপাড়ায় শুক্রবার দুপুরে বাইরে থেকে এসে হানা দেয় তিনজন দুষ্কৃতী$ গ্রামে প্রবেশ করেই তারা পিস্তল থেকে গুলি ছোঁড়ে$ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গ্রাম ছেড়ে পালায় গ্রামবাসীরা, আশ্রয় নেয় পার্শ্ববর্তী জারেগাঁও-টিলারপার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়শিবিরে$ চিরাং জেলার বিজনি এলাকার বল্লমগুড়িতে সকাল দশটায় দুষ্কৃতীর প্রাণঘাতী আক্রমণে আহত হন নাসির উদ্দিন (৫৪)$ পাশের গ্রাম পুরদিয়া থেকে চারজন দুষ্কৃতী ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়$ তাঁকে বঙ্গাইগাঁও সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়$

২৫ আগস্ট  শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ চিরাং জেলার বিজনি থানার মালিপাড়ার চৌধুরিপাড়ায় আক্রমণের মুখে পড়েন মুসলমান সম্প্রদায়ের ছয়জন যুবক$ আমগুড়ি শরণার্থী শিবির থেকে মোটরগাড়িতে বিজনি অভিমুখে আসার সময় এই হামলায় নিহত হন রাজাপাড়ার নুরজামান মণ্ডল (৩০), জহিরুদ্দিন মণ্ডল (২০), আমগুড়ির মনসুফ আলি মণ্ডল (১৮), বাঁশপাড়ার সিকন্দর শেখ (২৪), রতিক শেখ (২৮) এবং সরভোগ জামাদরবাড়ির আফজল মণ্ডল (১৯)$ জেলায় রাতের কার্ফু থাকাকালীন এই ঘটনা ঘটে$ এই ঘটনায় দুজন এখনও নিখোঁজ$ জেলায় নতুন করে অনির্দিষ্টকালীন কার্ফু জারি হয়েছে$ বদরুদ্দিন আজমলের গ্রেপ্তারির দাবিতে বজরঙ দল সোমবার ১২ ঘণ্টার অসম বন্‌ধ ডেকেছে, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সমর্থন করেছে$

২৬ আগস্ট  শনিবার গভীর রাতে কোকরাঝাড় জেলার সালেকাটিতে একদল দুর্বত্তের সশস্ত্র হামলায় চারজন গুরুতরভাবে জখম হয়েছে$ তাদের মধ্যে রয়েছে ছয় বছরের শিশু সামিরুন খাতুন, ফুলবানু বেগম (৩৫), মহরুদ্দিন মণ্ডল (৩৫), মনোয়ারা বিবি (২৬)$ সালেকাটি হাইস্কুল এলাকার বাসিন্দা ওই চারজন ধুবড়ি যাওয়ার জন্য সালেকাটি রেলস্টেশনে যাওয়ার পথে স্টেশনরোডে শনিবার রাত সওয়া তিনটে নাগাদ আক্রান্ত হয়$ কুকরি দিয়ে আঘাত করে হামলাকারীরা$ পুলিশ চারটি বাইক বাজেয়াপ্ত করেছে$

           কোকরাঝাড় জেলার ১নং পর্বতঝোরা মহকুমার কাজিগাঁও পুলিশ থানার অন্তর্গত নটকোবাড়ি এলাকার শুকানঝোরা গ্রামে এক মুসলমান মানুষের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয়$ এই ঘটনায় ধুবড়ি জেলার মাক্রিঝোরা এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে$ প্রতিবাদী জনতা আজ দুপুর আড়াইটা নাগাদ মাক্রিঝোরায় ৩১নং জাতীয় সড়ক দুঘণ্টা অবরোধ করে$ জানা গেছে, মাক্রিঝোরা বানিয়ামা চতুর্থ খণ্ডের বাসিন্দা বিশু প্রাথানিক গতকাল থেকে নিখোঁজ$ শুকানঝোরা গ্রাম থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়$

           গতকাল মালিপাড়া হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কয়েক হাজার শরণার্থী এবং স্থানীয় মানুষ গড়ৈমারির কাছে ৩১নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করে$ হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে অনির্দিষ্টকালীন চিরাং বন্‌ধের ডাক দিয়েছে এবিআমসু$

আগস্ট   বিজনির মালিপাড়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টা পরেও অপরাধীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করতে না পারার প্রতিবাদে আজ সকাল পাঁচটা থেকে বিজনি রেলস্টেশনে এবিআমসুর নেতৃত্বে কয়েক শতাধিক মানুষ রেল অবরোধ করে$ এদিকে বজরঙ দলের বন্‌ধে রাজ্য স্তব্ধ হয়ে যায়$ ধুবড়ি জেলার ধুবড়ি সদর মহকুমার গোলকগঞ্জ এবং আগমনিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে ৩১নং জাতীয় সড়ক অবরোধ করার অভিযোগে পুলিশ পাঁচশোর অধিক বন্‌ধ সমর্থককে গ্রেপ্তার করে$ 

           কোকরাঝাড় জেলার ফকিরাগ্রামে রাত ন-টা নাগাদ পঞ্চাশ জনের এক সশস্ত্র দুর্বৃত্তের দল সেনা-পোশাকে মুসলমান এলাকায় ভয়ানক হামলা চালায়$ ফকিরাগ্রামের পাখরিতল এলাকায় পরিকল্পিতভাবে গ্রাম ঘেরাও করে গ্রেনেড ও মারণাস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায় দুর্বৃত্তরা$ তারা পাথরিতল গ্রামটিকে ঘিরে রেখে পঞ্চাশ-ষাটটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়$ ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছলে সেখানে হামলাবাজ দুষ্কৃতীদের সঙ্গে তাদের প্রায় দেড় ঘণ্টা গুলির লড়াই চলে$ এ নিয়ে ফকিরাগ্রাম, গোসাইগাঁও এবং কোকরাঝাড় শহরে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়$ কোকরাঝাড়ের সালেকাটির চারটি গ্রাম নলজিবাড়ি, ভুমকি, চৌটকি ১ ও ২নং খণ্ড এবং বল্লমগুড়িতে সশস্ত্র জঙ্গিরা একই কায়দায় ছয়টি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হামলা চালিয়েছে$ ভাওড়াগুলির বিল্লাখাতাতেও একই রকমের গ্রেনেড হামলা ও গুলি চালানো হয়েছে$ এই তিনটি স্থানে প্রায় একই সময়ে হামলা হয়$ 

           চিরাং জেলার বাসুগাঁও থানার বেশ কয়েকটি এলাকায় আড়াই হাজার শরণার্থী তাদের বাড়িতে ফিরে এসেছিল ২৫ আগস্ট$ কিন্তু মাত্র দু-দিন পরই তাদের ফের শরণার্থী শিবিরে চলে যেতে হয়$ বড়ো হুমকিতে পুলিশ প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নেয়$

২৮ আগস্ট  আমসুর ডাকা অসম বনধে ব্যাপক হিংসা, রক্তপাত, অস্ত্রের ঝনঝনানি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কালিমালিপ্ত হল বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিলনভূমি হিসেবে খ্যাত বরপেটা রোড$ মঙ্গলবার সকালের দিকে একাংশ বন্‌ধ সমর্থক বেলতলায় বলপূর্বক দোকানপাট বন্ধের চেষ্টা করলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের বাকযুদ্ধ শুরু হয়$ কিছুক্ষণের মধ্যে তা হাতাহাতির রূপ নেয়$ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি দুষ্টচক্র মুহূর্তেই সক্রিয় হয়ে ওঠে$ সেসময় ছয়-সাতশোজন দুষ্কৃতীর একটি দল হাতে হাতে দা, বল্লম, রড, লাঠি ইত্যাদি ধারালো অস্ত্র নিয়ে ভাষিক সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বেলতলায় হানা দিয়ে জ্ঞানেন্দ্র মণ্ডল (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে$ এলাকার ভাষিক সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হয়ে তারা পঁয়ত্রিশটিরও বেশি বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়$ এই অতর্কিত হামলায় দু-পক্ষের অন্তত পঞ্চাশের বেশি মানুষ আহত হয়$

             বন্‌ধ আহ্বানকারীদের তাণ্ডবে নগাঁও জেলার স্থানে স্থানে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়$ আমবাগান এলাকায় বন্‌ধ সমর্থক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র সংঘাতের সৃষ্টি হয়$ উত্তেজিত বন্‌ধ আহ্বানকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শূন্যে গুলি চালায়$ আমবাগান থানার ২৬টি গ্রামে অনির্দিষ্টকালীন কার্ফু জারি করে প্রশাসন$ পুব সোয়ালনি গ্রামের তিনশো হিন্দু বাঙালি পরিবার প্রাণের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে মঙ্গলবার রাতে কলিয়াবরের খামখোয়া প্রাথমিক স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে$ এর আগে ওই গ্রামের চারটি হিন্দু বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় দুষ্কৃতিরা$

             শিবসাগরে বন্‌ধ সমর্থকদের সঙ্গে সাংবাদিকও পুলিশের হাতে মার খেলেন$

২৯ আগস্ট   বড়োল্যান্ডে অবৈধ মারণাস্ত্র বাজেয়াপ্ত ও জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার$ সরকারের হাতে নির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে, আলোচনাবিরোধী এনডিএফবি জঙ্গিগোষ্ঠী এবং একাংশ প্রাক্তন জঙ্গি বড়োল্যান্ডের হিংসায় মদত জুগিয়ে যাচ্ছে$ গুলিবিদ্ধ যেসব মৃতদেহ মিলেছে, সবাই অবৈধ মারণাস্ত্রের শিকার$ গত সোমবার ফকিরাগ্রামের পাখরিতল সহ কোকরাঝাড় জেলার চারটি স্থানে দুষ্কৃতীরা নির্বিচারে গুলি ছুঁড়েছে, তাতেও ব্যবহার করা হয়েছে অবৈধ অস্ত্র$

৩০ আগস্ট   মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ আজ ঘোষণা করেছেন, আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে শুরু হচ্ছে প্রথম পর্যায়ে ৪২টি বিধানসভা কেন্দ্রে নাগরিকপঞ্জি প্রস্তুত করার কাজ$ ২০০৫ সালের ৫ মে আসু-র সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি সম্পূর্ণ করে তোলা হবে$ কিন্তু ২০১০ সালের ২১ জুলাই বরপেটায় নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী জনগণের ওপর পুলিশের গুলিতে তিনজনের মৃত্যু হয়$ তারপর থেকেই বন্ধ রয়েছে নাগরিকপঞ্জির কাজ$

             আগামী এক মাস বন‌্ধ করার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি$

             ২৮ আগস্ট আমসু-র সদস্যদের হাতে সাংবাদিক প্রহারের প্রতিবাদে গৌহাটির সাংবাদিক সমাজ বর্জন করল আমসু-কে$


[1] বিটিসি নিয়ন্ত্রিত বিটিএডি এলাকায় অবড়োদের আন্দোলনের একটি দাবি, ৫০ শতাংশের কম জনসংখ্যার বড়ো কিংবা জনজাতির গ্রামগুলিকে বিটিএডি-র বাইরে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু ২০০৩ সালের চুক্তির ৩.১ দফা অনুযায়ী তা সম্ভব নয়। সেখানে রয়েছে, একের পর এক (কন্টিনিউ) অবড়ো অধ্যুষিত যে কোনো গ্রাম ঢুকতে পারে বিটিএডি-তে।  

Comments