দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে

জিতেন নন্দী



গুয়াহাটি থেকে আমাদের সফর শুরু হয়েছিল ৮ আগস্ট। কলকাতা থেকে গিয়েছিলাম আমি, মুহাম্মাদ হেলালউদ্দিন, আর কামরুজ্জামান খান। নারায়ণ নন্দী চলে এলেন ডিমাপুর থেকে। কোচবিহার থেকে পরদিন সকালে এলেন রামজীবন ভৌমিক। এই নিয়ে তৈরি হল আসামের হালফিল জাতিদাঙ্গার স্বরূপ অনুসন্ধানকারী আমাদের দল। সরাসরি দাঙ্গা বা সংঘর্ষ অনেকটা প্রশমিত হলেও তার জের ভালোমাত্রায় রয়ে গেছে আসাম জুড়ে। আমরা তা টের পেলাম সরাইঘাট এক্সপ্রেসে হাওড়া থেকে যাওয়ার পথেই।

 

আপনি কি বাংলাদেশি?

ট্রেনের কামরায় আমাদের বসার জায়গায় সামনাসামনি দুটো আসনে জানলার ধারে ছিলেন দুজন মাঝ বয়সের মহিলা। একজন ওড়িয়া, তিনি আসছিলেন উড়িষ্যার বালেশ্বর থেকে, যাবেন গুয়াহাটি ছাড়িয়ে তেজপুর। ওখানে ওঁর স্বামী এয়ারফোর্সে কাজ করেন। আর একজন অসমিয়া, পেশায় উকিল। তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন তাঁর মক্কেলের কাজে। চলার পথে আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে আলাপ জমে উঠল। নিজেদের মধ্যে গল্পের ফাঁকে ঝালমুড়ি, ডালমুট দেওয়া-নেওয়াও চলল। বালেশ্বরের মহিলা যখন হেলালউদ্দিনের নাম জানলেন, তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি বাংলাদেশি? হেলালউদ্দিন বললেন, আমি আজন্ম মুর্শিদাবাদের মানুষ, কোনোদিন বাংলাদেশে যাওয়াও হয়নি। কথায় কথায় মহিলা বললেন, দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে বাংলাদেশি আছে। হেলালউদ্দিন উত্তর দিলেন, না, একজনও নেই। মুহূর্তে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপের সুরটা যেন কেমন একটু কেটে গেল। তখন ট্রেন কামাখ্যা ছেড়ে গুয়াহাটি স্টেশনের দিকে এগোচ্ছে। রেললাইনের দুপাশে টানা ঝুপড়ি-বস্তি। সেইদিকে তাকিয়ে আগের কথার জের ধরেই অসমিয়া মহিলা বললেন, গুয়াহাটিতে লেবার বা রিকশা টানার কাজে আগে বিহারিরা আসত। ইদানীং তাদের তেমন আসতে দেখা যাচ্ছে না। বরং দেখা যাচ্ছে গরিব বাঙালি মুসলমানরা এসে সেইসব কাজ করছে। অসমিয়াদের মধ্যেও গরিব নেই তা নয়, তবে তাদের এইসব কাজে তেমন পাওয়া যায় না। আমি বুঝতে পারলাম, ইঙ্গিতটা বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানদের দিকেই।

 

শুরুতেই গুয়াহাটির বিস্ফোরণ

গুয়াহাটিতে আমাদের প্রথম সন্ধ্যায় পল্টনবাজারে ঘটল গ্রেনেড বিস্ফোরণ। বিকেলে আমরা গিয়েছিলাম সংগ্রামী শ্রমিক কেন্দ্রর নেতা তাপস দাসের বাড়িতে। সেখানে কথাবার্তা সেরে গেস্ট হাউসে ফেরার পরই তিনি ফোন করলেন। জানতে পারলাম বিস্ফোরণের সংবাদ। গুয়াহাটি স্টেশনের লাগোয়া পল্টনবাজার এলাকা। সকালেই ট্রেন থেকে নেমে আমরা ওখান দিয়ে এসেছি। সুরক্ষা বাহিনীর একজন জওয়ান প্রাণ হারালেন, আহত হলেন অনেকে। সেদিন ছিল প্রয়াত সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকার জন্মদিন। পরদিন সংবাদপত্রে শিরোনাম হল, সুধাকণ্ঠের জন্মদিনে রক্তস্নাত গুয়াহাটি। পরে এটাও জানা গেল, বিস্ফোরণ ঘটানোর দায় স্বীকার করে নিয়েছে আলফা।

   এই হল আসামের প্রাত্যহিক জীবনের ছবি। শুধু আসাম নয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের প্রাত্যহিকতা কমবেশি এরকমই। এর মধ্যেই শুরু হল আমাদের বড়ো স্বশাসিত অঞ্চলের সফর।

   একই সময়ে গুয়াহাটিতে বশিষ্ঠ মন্দিরের কাছে শান্তি সাধনা আশ্রম-এ সর্ব সেবা সংঘ-এর উদ্যোগে শান্তিযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, গুজরাত, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও আসাম থেকে আসা প্রায় চল্লিশ জন কর্মী। প্রথমে আমাদের পরিকল্পনা ছিল ওঁদের সঙ্গে কোকরাঝাড়ে যাব। সেই মতো আমরা ১০ তারিখ ওই আশ্রমে গেলাম। ১০-১১ দু-দিন ওখানে আসামের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক ও সমাজকর্মীরা এসে সাম্প্রতিক দাঙ্গা প্রসঙ্গে আগত কর্মীদের ওয়াকিবহাল করছিলেন। আমরা সেই আলোচনায় কিছুটা অংশ নিই। পুরোটা থাকতে পারিনি, কারণ আমরাও নিজেদের উদ্যোগে কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনা করি।

   এদিন কে বি রোডে বই কিনতে গিয়ে দোকানদার এক মহিলার সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি কথায় কথায় আমাদের আসামের কল্যাণ আশ্রম সম্বন্ধে অবহিত করেন। তিনি বর্ণনা করেন, কীভাবে জঙ্গল ও ট্রাইবাল বেল্টে তারা আদিবাসী ও জনজাতির মধ্যে সমাজসেবার কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর দেওয়া পুস্তিকা থেকে আমরা জানতে পারি, অখিল ভারতীয় বনবাসী কল্যাণ আশ্রম-এর সঙ্গে এরা যুক্ত। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এখানে সক্রিয়।    

   ১১ তারিখ রাতে সর্ব সেবা সংঘ-এর চন্দন পাল জানালেন, ওঁদের কোকরাঝাড় যাত্রা শুরু হবে ১৩ তারিখ। ওঁরা ২০ তারিখ পর্যন্ত বড়োভূমিতে থাকবেন। আমাদের মেয়াদ ১৬ তারিখ পর্যন্ত। তাই আমরা আর অপেক্ষা না করে পরদিন সকালেই কোকরাঝাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

 

কোকরাঝাড়ে প্রথমদিন

কোকরাঝাড় স্টেশনে নামলাম আমরা চারজন। গতকাল নারায়ণ নন্দী ডিমাপুরে কাজে ফিরে গেছেন। প্ল্যাটফর্মে নেমেই চোখে পড়ল একটা পোস্টার। ওতে ইংরেজি, হিন্দি আর অসমিয়তে  যা লেখা আছে, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়, বাংলাদেশিদের কাছ থেকে কোনো জিনিস কিনবেন না। বাংলাদেশিদের কোনো ধরনের কাজ দেবেন না। নাহলে ১০,০০০ টাকা জরিমানা করা হবে। কোনো প্রেসলাইন নেই, শুধু লেখা আছে বি ট্রু ইন্ডিয়ান এবং জয় হিন্দবেআইনি বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে বেআইনি ছাপা পোস্টারে হুমকি! কারণ ট্রু ইন্ডিয়ানদের ওসব আইন-টাইনের দরকার হয় না। প্ল্যাটফর্ম থেকে বাইরে এসেও দেখলাম ওই একই পোস্টার সর্বত্র। বুঝলাম, এখানে আমাদেরও প্রকৃত ভারতীয়ত্বের পরীক্ষা (নাকি অগ্নিপরীক্ষা!) দিতে হতে পারে।

   আমার এবং হেলালউদ্দিনের মুখে দাড়ি রয়েছে। চারপাশে একজনও দাড়িওয়ালা লোক চোখে পড়ল না। কোকরাঝাড় শহর হল বড়োভূমির সদর। কোথায় থাকব? হেলালউদ্দিনের মোবাইলে এক বন্ধু পরামর্শ দিলেন, তোমরা সার্কিট হাউসে চলে যাও। আমরা একটা ছোটো গাড়ি ভাড়া করে সোজা চলে গেলাম সার্কিট হাউসে। সেখানে প্রচুর জায়গা। কিন্তু ডিসি অফিস থেকে অনুমতি নিতে হবে। আমরা গেলাম ডিসি অফিসে। সেখানে এডিসি-র কাছে দরখাস্ত করতে বলা হল। আমি একটা দরখাস্ত লিখে তাঁকে দিলাম। তিনি বললেন, আপনারা থাকতে পারতেন, কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি যে কোনো সময় মন্ত্রীরা এসে পড়তে পারে। তখন খালি করে দিতে হবে। আমি নাছোড়বান্দা। ওঁকে বললাম, যাই হোক, আপনাকে একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তিনি ওঁর একজন অফিসার ত্রিদিব চক্রবর্তীকে ডেকে বললেন, আপনার বাংলার লোক এসেছেন। এঁদের একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিন। ত্রিদিববাবু আমাদের তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন। সামান্য আলাপ-পরিচয় হল। ফোন করে বাবুলাল দাস নামে একজনের ওপর দায়িত্ব দিলেন হোটেল বুক করার। বাবুলাল দাস শরণার্থী শিবিরের রিলিফ মেটিরিয়াল সাপ্লায়ারের কাজ করছেন। তবে আমাদের দুজনের দাড়ি দেখে ত্রিদিববাবু একটু শংকিত হলেন। বললেন, আমারও দাড়ি ছিল। গণ্ডগোলের পর রোজ শেভ করছি। যাই হোক, বাবুলাল রুইসুমোই হোটেলে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আপনারা চলে যান।

   আমরা হোটেলে গেলাম বটে। কিন্তু ইতিমধ্যেই চারদিকের থমথমে পরিস্থিতি দেখে সকলেই --- বিশেষত আমাদের দুই মুসলমান সফরসঙ্গী --- একটু ঘাবড়ে গেলেন। আমাদের চিন্তা হল, কীভাবে আমরা বড়োভূমিতে কাজ শুরু করব?                   

   দুপুরে আমি এবং রামজীবন ভৌমিক গেলাম বড়সা সংবাদপত্রের দপ্তরে। এই কাগজের সম্পাদক চিনো বসুমাতারির একটা যোগাযোগ গুয়াহাটি থেকে পেয়েছিলাম। প্রসঙ্গত, আমরা বাংলায় লিখছি বড়ো, বড়োভূমি ইত্যাদি। বড়োভূমিতে দেবনাগরি অক্ষরে লেখা হয় বড়ল্যান্ড, ইংরেজিতে Bodoland

   ছোট্ট  বড়সা প্রেস। চিনো বসুমাতারি তখন পরদিনের কাগজ ছাপার কাজে খুব ব্যস্ত। ব্যস্ততার মাঝেই আমরা আলাদা করে ওঁর সঙ্গে মিনিট পনেরো কথা বললাম। দুটো কথা বুঝলাম। প্রথম কথা, প্রত্যেক বাঙালি মুসলমানকেই এখন বড়োভূমিতে প্রমাণ দিতে হবে যে সে বাংলাদেশি নয়। দ্বিতীয়, বড়োভূমি মূলত ট্রাইবাল বেল্ট অ্যান্ড ব্লকের অন্তর্গত। ট্রাইবাল বেল্ট্‌স অ্যান্ড ব্লক্‌স-এ নন-ট্রাইবালের জমিজায়গার অধিকার নেই। সাম্প্রতিক দাঙ্গার পর এই কথাগুলো সমস্ত বড়ো মানুষের মুখে খইয়ের মতো ফুটছে![1]

   চিনো বসুমাতারির কাছ থেকে পথনির্দেশ নিয়ে আমরা দুজন গেলাম তিতাগুড়িতে। শুনলাম, ওখানে বড়ো শরণার্থীদের শিবির রয়েছে। অটোরিকশা থেকে তিতাগুড়িতে নেমে দেখি দুদিকে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। কিন্তু শিবির নেই। কয়েকদিন আগে নাকি শিবির উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গোরাং নদীর কাছে অন্য কোথাও। বাইকে চেপে আসছিলেন একজন। ওঁকে আমরা দাঁড় করালাম। পরিচয় হল। বিজয় কুমার ব্রহ্ম, কোকরাঝাড়ে বড়ো পিপ্‌লস ফ্রন্টের ইউথ উইংসের চেয়ারম্যান। আমাদের তিনি ওই গ্রামের ভিসিডিসি-র (ভিলেজ কাউন্সিল ডেভলপমেন্ট কমিটি) পাকা দালানে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়ালেন। রাস্তার ধারেই রয়েছে বড়োদের ধর্মস্থান বাথৌ এবং আবসু-র (অল বড়ো স্টুডেন্ট্‌স ইউনিয়ন) দপ্তর।

   পরে জানতে পেরেছি, বড়োভূমির সমস্ত গ্রামেই ভিসিডিসি রয়েছে। এখানে পঞ্চায়েত নেই। ভিসিডিসি-র প্রধানকে বলা হয় চেয়ারম্যান। এছাড়া রয়েছে গ্রামের গাঁওবুড়া, গ্রামের মধ্যে সর্বসম্মত প্রবীণ ব্যক্তি, যাকে সকলেই মেনে চলে।

   সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে শুনলাম, আবদুল আজিজুল নামে এক যুবককে পাওয়া গেছে, তিনি আগামীকাল আমাদের গোসাইগাঁওয়ের শরণার্থী শিবিরগুলিতে নিয়ে যাবেন।

 

গোসাইগাঁও থেকে ধুবড়ি : শিবির পরিদর্শন

১৩ সেপ্টেম্বর কোকরাঝাড় থেকে শ্রীরামপুর স্টেশনে নেমে গাড়িতে চেপে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আজিজুল স্থানীয় যুবক এবং কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউ-এর (ন্যাশনাল স্টুডেন্ট্‌স ইউনিয়ন) সক্রিয় কর্মী। ওঁর কাছ থেকে আমরা কোকরাঝাড় জেলার গোসাইগাঁও সাব-ডিভিশনের ৩৫টা শিবিরের তালিকা পেলাম। এগুলো মূলত বাঙালি মুসলমান শরণার্থীদের শিবির। তালিকায় সত্তর থেকে আশি হাজার শরণার্থীর উল্লেখ রয়েছে। সকাল সাড়ে ন-টায় আমরা গ্রাহামপুর উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিবিরে পৌঁছালাম। এটা আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম। আমাদের যাত্রাপথের সমস্ত শিবিরই স্থাপন করা হয়েছে অ-বড়ো গ্রামে। বেশিরভাগই মুসলমান গ্রাম। কিছু কোচ, রাজবংশী বা আদিবাসী গ্রামও আশ্রয় দিয়েছে। গোসাইগাঁও হয়ে ধুবড়ির শিবিরে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় দুপুর বারোটা বেজে গেল। বেশিরভাগ মানুষই এসেছে ২৪ জুলাই নাগাদ। আবালবৃদ্ধবণিতা পায়ে হেঁটে, নদী সাঁতরে, দৌড়ে এসেছে; যারা নৌকা বা গাড়ি পেয়েছে তারা ভাগ্যবান। মাঝে দিনেরবেলায় লোকে জঙ্গলে লুকিয়ে থেকেছে। শরণার্থীদের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, দাঙ্গাকারীরা সাধারণত প্রাণে মারতে চায়নি, খেদিয়ে দিতে চেয়েছে। অনেক জায়গায় গ্রামবাসীরা পালিয়ে যাওয়ার পরে ঘরে ঘরে আগুন লাগানো হয়েছে। খেতের ফসলও অনেক জায়গায় নষ্ট করা হয়নি। তবে ঘরের যাবতীয় জিনিস লুঠপাট করা হয়েছে।

বিকেল নাগাদ শ্রীরামপুর রেলস্টেশনের কাছে পৌঁছে আমরা আদিবাসী কোবরা মিলিটারি অফ আসাম-এর চেয়ারম্যান জাবরিয়াস খাখা-র সঙ্গে দেখা করি। খাখা একজন বিনয়ী যুবক। কথা বললে বোঝা যায়, নেহাত আক্রমণের মুখে পড়েই এই যুবকেরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। ১৯৯৬ এবং ১৯৯৮ দুবার আদিবাসীদের নৃশংসভাবে খেদানো হয়েছে। তবে পুনর্বাসনের পর ওরা সরকারের কাছে অস্ত্র সমর্পন করেছে।

   সেদিন রাতে আমরা অবশ্য নিরাপদ একটা আশ্রয় পাই। আসাম কৃষি বিদ্যালয়ের কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের অতিথিশালায় আমাদের থাকবার বন্দোবস্ত হয়।

 

বাংলাদেশি গো ব্যাক

১৪ সেপ্টেম্বর আমি এবং রামজীবন ফের কোকরাঝাড় শহরে আসি। সকাল নটা-দশটা নাগাদ আমরা রুইসুমোই হোটেলে বসে আছি, কাজ শুরু করব ভাবছি। রাস্তায় দেখি সার সার গাড়ি বোঝাই যুবকেরা বাংলাদেশি গো ব্যাক শ্লোগান দিতে দিতে শহরে ঢুকছে। গাড়ির মাথায় হলুদ পতাকা, মাঝে ঢাল-তরোয়াল ক্রস করে আঁকা। অনেকটা গোর্খাল্যান্ড কায়দার ঝান্ডা। রামজীবনের মোবাইল ফোনে বিজয়কুমার ব্রহ্ম পরামর্শ দিলেন, আপনারা আবসুর জনসভায় চলে যান। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবছি, কী করা যায়। গাড়ির স্রোত চলেছে। এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। গাড়ির স্রোত শেষ হওয়ার আগেই বিপরীত দিক থেকে মিছিল আসতে শুরু করল। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ইউনিফর্ম পরেই এসেছে মিছিলে, যুবক-যুবতীরাও রয়েছে। বৃষ্টি জোর হল, তার মধ্যেই উদ্দীপ্ত শ্লোগান দিতে দিতে ডিসি অফিসের দিকে চলেছে হাজার হাজার মানুষ। সমস্ত শহরকে স্তব্ধ করে দিয়ে পাক্কা এক ঘণ্টা মিছিল চলল।

        আমরা গেলাম বড়ো সাহিত্য সভার কার্যালয়ে। সেখানে তেমন কাউকে পাওয়া গেল না। গেলাম শাসকদল বড়োল্যান্ড পিপ্‌লস ফ্রন্ট-এর কার্যালয়ে। সেখানে কোকরাঝাড়ের মহিলা-বিধায়ক প্রমীলা রাণী ব্রহ্মের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। এছাড়া বড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল বিটিসি-র একজন কর্মকর্তা রিও রেওয়া নার্জিহারি-র সঙ্গে কথা বলে ওদের মনের কথা আরও কিছুটা বোঝা গেল :

৩৮৯৫টা গ্রাম আছে বিটিসির মধ্যে। তার মধ্যে ট্রাইবাল বেল্ট্‌স অ্যান্ড ব্লক্‌সের মধ্যে আছে ২৭৫০টা আর তার বাইরে আছে মাত্র ৬০০টা গ্রাম। ফরেস্টে আছে ৫৫৪টা গ্রাম। ট্রাইবাল বেল্ট্‌স অ্যান্ড ব্লক্‌স ১৯৪৭ সালে ঘোষণা করা হয়েছে। তার মধ্যে ট্রাইবাল বাদে কয়েকটা প্রোটেক্টেড ক্লাস অফ পিপ্‌ল আছে। যেমন, রাজবংশী-নেপালি-আদিবাসী-বড়ো-গারো-রাভা এখানে থাকতে পারে। প্রোটেক্টেড ক্লাসের বাইরে এখানে কোনো নন-ট্রাইবাল থাকতে পারে না। অবশ্য বাঙালি, মাড়োয়ারি, বিহারিরা বিজনেস ক্লাসের মানুষ স্থানীয়, তখন থেকেই এদের আমরা রেখেছি। এদের থাকার মধ্যে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বাইরের থেকে যারা এসেছে, তাদের এখানে কোনো থাকার অধিকার নেই। ২০০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুক্তির আগে থেকে যারা এখানে ট্রাইবাল বেল্ট অ্যান্ড ব্লকের বাইরের গ্রামগুলোতে আছে, তারা তো আসাম সরকারের সময় থেকেই আছে। ২০০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির পরে যারা এসেছে, তাদের আমরা থাকতে দেব না। মুসলমানরা বেশিরভাগ ওই ৬০০ গ্রামে আছে। গোসাইগাঁওতে আছে, কোকরাঝাড়েও আছে। তখন তো আমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ছিল না। আসাম সরকার ম্যানিপুলেট করে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাইবাল বেল্ট অ্যান্ড ব্লকের মধ্যেও মুসলিম আছে।

আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, আদিবাসীরা প্রোটেক্টেড ক্লাস। ওদের থাকার কোনো আপত্তি নেই তো?

--- না।

--- ওরা শিডিউল ট্রাইবের (এসটি) ডিমান্ড করেছে। আপনারা কি তা সমর্থন করেন?

--- আমাদের তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু রিজার্ভেশন কোটা, ১৬টা ট্রাইবাল গ্রুপের জন্য মাত্র ১০%, সেন্ট্রালে ৭%। রাজবংশী, আদিবাসী এসটি ডিমান্ড করেছে। ওরা এসে গেলে, আমাদের কোটা আরও কমে যাবে। তাই আমরা বলছি, ওদের জন্য একস্ট্রা রিজার্ভেশন করে ওদের এসটি-তে ঢুকিয়ে দাও। ওদেরও সুবিধা হবে, আমাদেরও সুবিধা হবে। কম-সে-কম ৫% বাড়ানো দরকার। বড়ো ছাড়া রাভা, গারো, হাজং, সনওয়াল কাছারি এরকম আরও কিছু এসটি-র মধ্যে আছে।

 

বঙ্গাইগাঁও থেকে চিরাং : শিবির পরিদর্শন

১৪ সেপ্টেম্বর রাতেই আমরা বঙ্গাইগাঁওতে চলে গেলাম। পরদিন প্রথমে আমরা গেলাম হাপাসরা গ্রামে। এখানেও আমরা সঙ্গে কয়েকজন মুসলমান কর্মীকে পেলাম। বঙ্গাইগাঁওতে ১৫ আর চিরাংয়ে ১৭টা শিবির রয়েছে। বড়োভূমি থেকে যারা পালিয়ে ধুবড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, সেখানে রয়েছে ৯৩টা শিবির। এখানে রিহাব ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন নামে একটা সংগঠন ত্রাণের কাজ করছে। ৫ আগস্ট প্রকাশিত এদের সমীক্ষা অনুযায়ী, চিরাং-চাপর-বিলাসিপাড়া-বঙ্গাইগাঁও-কোকরাঝাড় (গোসাইগাঁও)-ধুবড়ি মিলিয়ে মোট আশ্রিত পরিবার ছিল ৬২,৪৩৬ এবং জনসংখ্যা ৩,২০,৭৬০। এদের হিসেবে ২০ জুলাই থেকে দাঙ্গায় আহতদের সংখ্যা ৬১৭ এবং মৃতের সংখ্যা ৬৩। এদের কাজে যথেষ্ট নিষ্ঠা রয়েছে। তবে এদের সমীক্ষা আংশিক। কারণ বড়ো বা অন্য জাতির ক্ষয়ক্ষতির কোনো হিসেব এর মধ্যে নেই। এটা ঠিক যে অ-মুসলমান এলাকায় এদের কাজ করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতির মানুষকে নিয়ে সমীক্ষাদল গঠন করা দরকার।

        গতকাল থেকেই বৃষ্টি চলছে। প্রায় দু-মাস হতে চলল শরণার্থী শিবিরগুলো রয়েছে। মূলত স্কুলবাড়িতেই শিবির তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কতদিন স্কুল বন্ধ থাকতে পারে? তাই স্কুল ছেড়ে দিয়ে বহু জায়গায় প্লাস্টিকের শিট দিয়ে ছোটো ছোটো তাঁবু বানিয়ে শরণার্থীরা বাস করছে। বৃষ্টি হলেই জল ঢুকছে সেই তাঁবুতে।

        দুপুর দুটো নাগাদ আমরা পৌঁছালাম চিরাং জেলার লক্ষ্মীপুর নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয় সংলগ্ন শিবিরে। চিরাংয়ের ফরেস্টের লাগোয়া আটটা গ্রামের লোক এখানে আশ্রয় নিয়েছে। সার সার তাঁবু নামতে নামতে আই নদীর পার পর্যন্ত চলে গেছে। দুর্গতির শেষ নেই। একদিকে আকাশের জল, অন্যদিকে নদীর কূলছাপা জল --- কে বাঁচাবে এদের?     

        এদিকে সরকার চাল, ডাল, সর্ষের তেলের ব্যবস্থা করেছে বটে, কিন্তু মেয়াদি পাট্টা (জমির পাট্টার পাকা কাগজ) না থাকলে এখনই পুনর্বাসন দেবে না। আরও শোনা যাচ্ছে, লোককে বাছাই করে তিন দফায় পুনর্বাসন দেওয়া হবে। তার অর্থ হল, কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাংলাদেশি ছেঁকে বার করে নেওয়া হবে! কোনো শিবিরের লোকই ভাগে ভাগে নিজের গ্রামে ফিরতে চায় না।

   তিনটের সময় আমরা গেলাম চিরাংয়েরই কাউয়াটিকা শিবিরে। সেখানে দাঙ্গায় সন্তানহারা এক পিতার সঙ্গে দেখা হল। তাঁর মুখোমুখি বসে কথা বলতেই খারাপ লাগে। মহঃ বসের আলি নামে একজন এসে বললেন, চলুন আপনাদের একটা পোড়া গ্রাম দেখিয়ে আনি। মাজরাবাড়ি গ্রামে সার সার পোড়া তছনছ হয়ে যাওয়া ঘরগুলো দেখলাম। মাঠের ফসল কিন্তু নষ্ট হয়নি। দিনেরবেলায় ফসলের তদারকি করে মুসলমান শরণার্থীরা শিবিরে ফিরে আসে। বসের আলি নিজের গাছ থেকে এক মুঠো লেবু (কাগজি ধরনের) এনে আমাদের হাতে তুলে দেন। বড়োরা হামলা চালানোর পর নিজেরাও পাল্টা হামলার ভয়ে এই গ্রাম ছেড়ে দূরে সরে গেছে।

 

সামান্য উপলব্ধি : কিছু প্রশ্ন

বড়ো আর বাঙালি মুসলমান, সকলের মধ্যে একটা মিল খুঁজে পাই। উভয়েরই বুকে আক্রান্তবোধ আর ভয়। বড়োদের নিজভূমে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার ভয়। মুসলমানদের পিঠে বাংলাদেশি ছাপ পড়ার ভয়। কেবল মুসলমানদেরই বা কেন? যেভাবে গুয়াহাটি হয়ে সমস্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশি খেদানোর আওয়াজ উঠেছে, যে কোনো     বাংলা ভাষাভাষী মানুষ কি সেখানে শান্তিতে থাকতে পারছে?

        শোনা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্তর তীরবর্তী অঞ্চলের আদিম অধিবাসী ছিল বড়োরা। ওরা বলে, খিলঞ্জিয়া, ভূমিপুত্র। ভারতীয় সমাজের কৃষিজীবী মূলস্রোতে তারা মিশে যেতে পারেনি। ব্রহ্মপুত্র নদী উপত্যকার সেচ-সমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে উৎখাত হয়ে তারা ক্রমশ জঙ্গল এলাকায় সরে যেতে থাকে। তাদের মধ্যে পুরোনো ধরনের ঝুম-চাষ বহাল থাকে। পরে ব্রিটিশ শাসকেরা খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পূর্ববঙ্গের মুসলমান চাষিদের এখানে বসবাসে উৎসাহী করে তোলে। অন্যদিকে ব্রিটিশ চা-বাগিচা মালিকেরা বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং বাংলা থেকে আদিবাসীদের এখানে নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় বড়োরা ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ট্রাইবাল লিগ ট্রাইবাল ল্যান্ডের প্রোটেকশন দাবি করে। ব্রিটিশ সরকার লাইন সিস্টেম চালু করে। একটা কাল্পনিক লাইন টেনে কিছু কিছু জেলায় অভিবাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা সফল হয়নি। স্বাধীনতার পর ট্রাইবাল বেল্ট্‌স অ্যান্ড ব্লক্‌স-এর দাবি তোলা হয়। সেই মর্মে আইনও সংশোধন হয়। কিন্তু কখনোই বাইরের অভিবাসন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক হতেই পারে। কিন্তু আমাদের সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশি খেদাও আওয়াজের গভীরে বড়োভূমিতে ভূমির অধিকার নিয়ে একটা তীব্র টানাপোড়েন আমরা অনুভব করেছি। আজকের দাঙ্গা কি তারই নির্মম পরিণতি নয়?


[1] ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে ১৮৮৬ সালের আসাম ল্যান্ড অ্যান্ড রেভিনিউ রেগুলেশন-এর একটা সংশোধনী মারফত নতুন দশম অধ্যায় যোগ করে ট্রাইবাল বেল্ট অ্যান্ড ব্লক গঠন করা হয়। এই অধ্যায়ের শিরোনাম হল, প্রোটেকশন অফ ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস। সংশোধিত আইনের ১৬৪(২)(বি) ধারায় রয়েছে, বেল্ট অ্যান্ড ব্লকে (ট্রাইবাল শব্দটা নেই) কোনো জমির মালিক সেই বেল্ট অ্যান্ড ব্লকের এমন কোনো লোকের কাছে তার জমি হস্তান্তর করতে পারবে না, যে ওই বেল্ট অ্যান্ড ব্লকের স্থায়ী বাসিন্দা, যে ১৬০ ধারায় বর্ণিত শ্রেণীর মানুষ নয়, আগে ডেপুটি কমিশনারের অনুমোদন পেলে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। ১৭১(২) ধারায় প্রোটেক্টেড ক্লাসেস বা সংরক্ষিত শ্রেণী বলতে নিম্নলিখিত শ্রেণীর চাষি, যেমন সমতলের জনজাতি, পাহাড়ি জনজাতি, চা বাগানের শ্রমিক, সাঁওতাল, নেপালি চাষি-গোচর এবং তফশিলি জাতির উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব সমতলের জনজাতি বলতে বড়োর পাশাপাশি অন্যদেরও বেল্ট্‌স অ্যান্ড ব্লকসে জমির সংরক্ষিত অধিকার দেওয়া হয়েছে।       

Comments