শরণার্থী শিবির থেকে বলছি

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

শরণার্থী শিবির থেকে বলছি

 


আসাম সরকার সূত্রে জানা গেছে, নামনি আসামের পাঁচটি জেলায় এখন ২০৬টি শরণার্থী শিবিরে ১,৮৭,০৫২ জন শরণার্থী রয়েছে$ এর মধ্যে ১৭৪টি শিবিরে মোট ১,৬৮,৮৭৫ জন বাঙালি মুসলমান এবং ২৯টি শিবিরে ১৭,৩৪৪ জন বড়ো এবং ৩টি শিবিরে ৮৩৩ জন অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছে$ ধুবড়িতে ১২৯টি শিবিরে রয়েছে ১,০১,৩৭৩ জন, কোকরাঝাড়ে ৪৩টি শিবিরে ৫৫,৭৬০ জন, চিরাংয়ে ২২টি শিবিরে ২৩,৬০৯ জন, বঙ্গাইগাঁওয়ে ৯টি শিবিরে ৫৫৫৪ জন এবং বরপেটায় ৩টি শিবিরে ৭৫৬ জন রয়েছে$ ১৯ জুলাই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পর সর্বোচ্চ ৩৪০টি শিবিরে মোট ৪,৮৫,৯২১ জন আশ্রয় নিয়েছিল$ সূত্র : পিটিআই, ১৬ আগস্ট।   


 



শিবির : গ্রাহামপুর উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গোসাইগাঁও

রেজিয়া বেওয়া : আমি এই শিবিরে আছি। আমার গ্রাম গোসাইগাঁও হাবরুবিল। ২৪ জুলাই আমাদের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার স্বামীকে ১৯৯৮ সালের ২৬ জানুয়ারি বড়ো উগ্রপন্থী রাজা আর মঞ্জু গুলি করে মেরেছিল। তখন আমার ২৫ দিনের একটা ছেলে আর ছয় বছরের আর একটা। সরকার আমাকে চাকরি দিয়েছে। আমি দুটো ছেলে নিয়ে হাবরুবিলে বাড়ি করে ছিলাম। কোনো অসুবিধা ছিল না। ৬ জুলাই গণ্ডগোল লাগল। কাসিয়াবাড়ি সাপকাটার ওদিকে একটা মিস্ত্রি ছেলেকে উগ্রপন্থীরা বন্দুক নিয়ে এসে গুলি করে মারে। সে ওখানে কাজ করতে গিয়েছিল। এরপর ভাদুয়াগুড়িতে একটা দোকানে লোকে বসেছিল, ওখানে বাইকে করে এসে গুলি করে। দুজন নিহত হয়, দুজন আহত হয়। এরপর কোকরাঝাড়ে দুজন আমসু নেতাকে গুলি করে মারে। একজন মহিলাকে যখন চারজন বড়ো জাতির উগ্রপন্থী আক্রমণ করছিল, তখন তাদের মুসলমানরা মেরেছে। এটা মিথ্যা কথা নয়, সত্য কথাই।

   এরপর আন্দোলন শুরু হল। আমরা টিভিতে দেখেছি। ভাবি নাই যে এরকম হবে। চারদিন আমি ঘরেই বন্ধ ছিলাম। তারপর আমার প্রতিবেশীরা বলল, এখানে গণ্ডগোল হবে। আপনারা যদি জান বাঁচাতে চান, এখান থেকে চলে যান। এরপর আমরা গেট খুলে দেখলাম, অনেক বড়ো জাতির লোক হাতে হাতে অস্ত্র নিয়ে মজুত। ওরা আমাকে বলল, আপনারা তাড়াতাড়ি যান, আপনাদের বাঁচাতে পারব না। ইতিমধ্যে দেখি, পিছন থেকে বহু গুলির আওয়াজ, হল্লাচিল্লা। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে বললাম, আমরা ঘরে ফেঁসে গেছি। আমার ছেলের প্যারালাইসিস বিমারি। আমরা যেতে পারছি না। আপনারা ব্যবস্থা করুন। সময়টা ছিল ২৪ জুলাই বিকেল পাঁচটা। দশজন পুলিশ এসে দুখানা গাড়ি পাঠিয়ে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে গেল। গোসাইগাঁও সার্কিট হাউসে চারদিন ছিলাম। পরে ফোন করে জানতে পারি বাড়ির সব ভেঙে নিয়ে গেছে, ঘরের চালটাও নেই।

   দূর থেকে ওরা এল। আমাদের কোনটা মুসলিম ঘর, কোনটা হিন্দু ঘর, কোনটা আদিবাসী ঘর ওরা জানে না। কাছের লোক সাথে থেকে ওদের দেখিয়ে দিয়েছে। এইটা এইটা মুসলিম ঘর, যাতে অন্য ঘরে আগুন না লাগায়। আমাদের বাড়ির সামনে রাজবংশী আছে দুটো ঘর, ওদের পোড়েনি। পিছনে আদিবাসী আছে, ওদের পোড়েনি। খালি আমাদের মুসলিম চারটে ঘর পুড়েছে।

   একমাস আগে মিটিং হয়েছে, বড়োল্যান্ড আসাম সরকারের আন্ডারে থাকবে না, ওরা ডাইরেক্ট সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের আন্ডারে থাকবে। চারদিন দিসপুরে মিটিং করে এটা ওরা দাবি জানিয়েছিল। অন্য অন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, আমাদের তরুণ গগৈ বলেছে, না, বিটিএডি আসাম সরকারের মধ্যে থাকতে হবে। এই নিয়ে মনে হয়, হাগ্রামা একটা গ্রুপ করেছে, আমাদের যদি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের সঙ্গে না দেয়, আমরা এখানে মুসলিমদের থাকতে দেব না। খালি মুসলিম নয়, মুসলিম খেদানোর পরে অন্য অন্য জাতিকেও খেদাব। যেমন, ১৯৯৬-এ আদবাসী মেরেছে, রাজবংশী মেরেছে, তারপর আপার আসামে মুসলিমদের মেরেছে, এবার আমাদের মারল। এভাবে মেরে মেরে সব খেদিয়ে দিয়ে ওদের বিটিএডিতে ওরাই থাকবে।

   আমরা চাই যাতে বিটিএডি বাতিল করা হয়। আমাদের জন্মভূমি, আমাদের বলছে বাংলাদেশি। একজন যদি বাংলাদেশি থাকে, তার জন্য আমরা ৯৯ জন কেন ভুক্তভোগী হব? আমার বাবার ১৯৫১ সালের এনআরসি আছে, ১৯৫০ সালের ১০০ বিঘা মাটি আছে। তখন খাস ছিল, নিজে পাট্টা করে নিয়েছিল। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নাম আছে। আমার চাকরি আছে। তাহলে আমি কী করে বাংলাদেশি হলাম? প্রমীলা রাণী বলেছে, মণিপুরে মণিপুরি আছে, চীনে চীনারা আছে, আমাদের বড়োল্যান্ডে বড়োরাই থাকবে। খেতে রুয়া গাড়তে গেলে গায়ে কাদা লাগে। আমাদের মারতে গিয়ে ওদেরও কিছু পুড়েছে। যেখানে বড়ো সংখ্যায় কম, মুসলিম বেশি, সেখানে তো মুসলিম জ্বালাবেই। ওরা যদি পঞ্চাশ গ্রামে আগুন দেয়, এরা তো দশ গ্রামে দেবেই।

   হাগ্রামা বড়োল্যান্ডের সুরক্ষার জন্য ফিক্সড পে দিয়ে বিটিএডি ব্যাটেলিয়ন বানিয়েছে। ওই ব্যাটেলিয়নকে বড়ো চ্যাংড়াদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওরা আগে আগে এসেছে, গুলি করেছে, পিছনে বড়ো জাতির লোকেরা এসে ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে লুঠপাট করেছে।

   অ-বড়োদের মাটি কেনার পারমিশন ওরা চারবছর বন্ধ করে দিয়েছে। বড়োদের অ্যাপ্লিকেশন দেখে ওরা লগে লগে ফাইল পুট-আপ করে দেয়। পঞ্চাশ বিঘা মাটি হলেও ওরা ক্যাশ টাকা দিয়ে রাখে। আর আমাদের মুসলিম বা অন্য অ-বড়ো জাতির ফাইল ওরা ফেলে রাখে। চার-পাঁচ বছর কোনো মুসলিম মাটির নামধারী বা রেজিস্ট্রেশন করতে পারছে না। তাহলে মুসলিমদের মাটির কাগজ কীভাবে থাকবে? একটা আইন করেছে, মুসলিম বড়ো জাতিকে মাটি বেচতে পারবে, বড়ো জাতি মুসলিমকে বেচতে পারবে না। তাহলে এই বিটিএডির ভূমিটা কার কাছে যাবে?

শিবির : ধুতুরামারি মধ্য ইংরাজি মাদ্রাসা, গোসাইগাঁও

সোরাব আলি : আমার বাড়ি গোসাইগাঁওয়ের আন্ঠাইবাড়ি গ্রামে। আমাদের গ্রামটা বড়ো, ৩৬০টা পরিবার। প্রথম রোজার একদিন আগে থেকে গণ্ডগোল শুরু হল। পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে সাফ করে দিয়েছে। আমি বিকলাঙ্গ মানুষ। প্রথমে আমরা আসি গৌরীপুর চৌরঙ্গী মোড় শিবিরে। ওখান থেকে এখানে এসেছি দশ-পনেরো দিন। এখন মণ্ডল এসে বলছে, যার নামধারী মাটি আছে, সে বিটিসির মধ্যে যেতে পারবে, অন্যরা যেতে পারবে না। মাটি তো আমরাও কিনেছি। দশ-পনেরো বছর আগে নামধারী বন্ধ করে দিয়েছে। আমার এক বিঘা জমি রেজিস্ট্রেশন করা আছে, বাকিটা নেই। সেই মাটি দু-তিন বছর আগে কিনেছি। উপেন্দ্র ব্রহ্ম যখন প্রথম আবসুর আন্দোলন করল, তখনই জমির কেনাবেচা বন্ধ করে দিয়েছিল। অ-বড়ো যত আছে, আমরা যদি মাটি কিনি, নামধারী হতে পারব না, রেজিস্ট্রেশন হবে না। আমাদের কাঁচা কাগজ আছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিল, সেগুলো আনতে পারিনি। জান বাঁচাব, না কাগজ নেব? টাকা পর্যন্ত নিতে পারিনি সঙ্গে। এনডিএফবি এসে গুলি শুরু করল। এমএলএ, বিধায়ক সঙ্গে এসেছে, ওরাই বলছে, দে দে গুলি কর। খাদ্যমন্ত্রী, এসপি, ডিসি এসেছিল, আমরা সবাইকে বলেছি। ওরা এসে আমাদের তিনটে শর্ত মেনেছে। সেন্ট্রাল সিকিউরিটি ফোর্স দেবে, ঘর বানিয়ে দেবে, রিলিফ দেবে। ওরা বলল, আপনারা গ্রামে যান। কিন্তু আমি যখন বললাম, বিটিসি বাতিল করতে হবে; বিএলটির  হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিতে হবে। তখন ওরা বলল, এসব লম্বা-চওড়া বাত মাত বোলো। ভোটার লিস্টে আমার নাম আছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের লিস্টে নাম চাইছে।

   ১৯৭০ থেকে আমরা ওই গ্রামে আছি। আগে ছিলাম ধুবড়ি জেলায়।

শিবির : হাতিধুবা কলেজ, গোসাইগাঁও

মহঃ জয়নাল আবেদিন শেখ, গাঁওবুড়া, অন্ঠাইবাড়ি : গ্রামে আধা মানে ১৪১ ঘর পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। আমার গ্রামে মোটামুটি ৩৫০ ঘর ছিল। বাকি সব লুঠপাট করে শেষ করে দিয়েছে। ঘরে আগুন দিয়ে দিয়েছে, কাঠখড়িগুলো খুলে খুলে নিয়ে গেছে। পৌনে তিনশ মুসলিম ঘর, আর আছে আদিবাসী কোচ রাজবংশী। বড়ো আছে ৩৩ ঘর। শীল আছে এক ঘর। যারা ঘর জ্বালিয়েছে বাইরে থেকে এসেছে, প্রতিবেশীরাও ছিল। তীর এবং বাঁটুল (গুলতি) দিয়ে মারামারি হয়েছে। ২১ জুলাই শুরু হয়েছিল। তিনদিন এরকম হওয়ার পরে আমরা থানাকে জানালাম। একজন মন্ত্রী ছিলেন, তিনিও ওদের বহুৎ বোঝালেন। ওরা সরে গেল। আমরাও সরে এলাম। পরদিন ১৪৪ ধারা দিল। আমাদের আর ঘর থেকে বেরোতে দেয়নি। বিকেলের টাইমে ওরা এগিয়ে এল। অন্ঠাইবাড়ির পুবদিকে একটা ব্রিজ আছে। ওই ব্রিজের ওদিক থেকে ওরা আসছে আমাদের গ্রামে। আমরা এসডিপিওকে ফোন করলাম, ওসি সাহেবকে ফোন করলাম। ওরা কোনো উত্তর দিল না। ফাঁকা ফায়ারিং হয়ে গেল। শুনে আমাদের মন ভেঙে গেল। এদিকে প্রশাসনও আমাদের হেল্প করে না। আমরা তখন কার সহায়তা পাব? আমাদের সঙ্গে অস্ত্রপাতি কোনো কিছুই নেই। বাধ্য হয়ে আমরা ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। বিকেল সাড়ে তিনটায় ওখান থেকে রওনা দিয়েছি। এখানে সকলে এসেছে রাত আটটায়। আমি এসে পৌঁছেছি সাড়ে দশটায়।

   বিটিসিতে ভিসিডিসি আছে। আমরা ওতে আছি বটে, কিন্তু বড়োরাই ওর হেড। আমরা নামমাত্র আছি, কর্ম যা কিছু ওরাই করে। ১৯৯২ সালে আমাকে গাঁওবুড়া সিলেকশন করা হয়েছে। আমাদের গাঁওবুড়ার সার্টিফিকেট বহু সরকারি ক্ষেত্রে চলে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, প্যান কার্ড, রেশন কার্ডে আমার সার্টিফিকেট চলে। ১৯৮৪ সালে ওরা বড়ো বেল্ট অ্যান্ড ব্লক পেল। তখন থেকে আমাদের মাটির রেজিস্ট্রেশন বন্ধ। কাঁচা পাট্টা ইস্যু হয়েছে ১৯৭৬ থেকে। নাহলে নামধারী হতে হবে। আসাম সরকার ওদের সঙ্গে পারছে না, আমরা তো একটা গ্রামের প্রতিনিধি! আমাদের কথা ওরা শুনবে কি?

মহঃ আনোয়ার আলি, গাঁওবুড়া, বাবুবিল, গোসাইগাঁও : আমি এই  শিবিরে আছি। আমাদের গ্রামের বহু ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, দোকান জ্বালিয়েছে। গ্রামে আমাদের মুসলিম ঘর ৩১০-৩১৫; আদিবাসী ২৩-২৪ ঘর; রাজবংশী ৪০-৪৫ ঘর; বড়ো ৩ ঘর। বড়োদের সঙ্গে আমাদের মেল-মহব্বত ছিল। আমাকে ওরা মেনে চলত। হঠাৎ করে ঘটনা হয়ে গিয়েছিল। ২৪ জুলাই আমরা সবাই চলে এসেছি। কিছু ঘর পোড়েনি। তবে জিনিস লুঠপাট সকলের ঘরেই হয়েছে। তিনদিন ধরে তিনবার ওরা আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল। তিনদিনই আমরা বাধা দিয়েছিলাম। তারপর কার্ফু হল। ওরা পুলিশ প্রশাসনের পোশাক পরে এসে ফাঁকা ফায়ারিং করেছিল। আমরা কীভাবে বিশ্বাস করব? পুলিশ না পাবলিক? ভয়ে আমরা চলে এলাম। মোটামুটি ৫০-৬০ ঘরের মাটির পাট্টা নেই। পনেরো বছর থেকে নামধারী করা বন্ধ আছে। রেজিস্ট্রেশন পারমিশন নিয়ে কতকগুলো করেছিল। বিটিসি অফিস থেকে অর্ডার না দিলে নামধারী ওরা দেবে না। আমরা বলছি, পাট্টা যাদের নেই, যাদের পাট্টার মাটি বেশি আছে, সেখানে গিয়ে থাকবে। আমারই ধরা যাক, দশ বিঘা মাটি আছে। সেখানে ৩০ ঘর গিয়ে থাকল।

শিবির : সোনাহাটি সিনিয়র মাদ্রাসা, ধুবড়ি

মহঃ আবারুদ্দিন শেখ : ২৪ জুলাই মঙ্গলবারের ঘটনা। আমরা কোকরাঝাড় জেলার ভদেয়াগুড়ি ১নং থেকে পালিয়ে এসেছি। বড়োরা আর্মির পোশাক পরে এসেছে। থানার লোক আমাদের রক্ষা না করে ধাওয়া দেয়। তখন আমরা যে যেভাবে পারলাম চলে এলাম। পায়ে হেঁটে, গাড়ি ধরে রাত বারোটা-একটা হয়ে গেছে আসতে। এখানে প্রথমে স্কুল কমিটি জায়গা দিতে রাজি হয়নি। গ্রামের লোক আশ্রয় দিয়েছে। মুসলিম, রাজবংশী আছে এখানে। তারপর সরকার সাহায্য দিয়েছে। এখন শুনছি যে আমাদের তিনদফায় ফেরত নেবে। আমরা যদি যেতে হয় একদফায় যাব। ঘরের কাগজপত্র কিছু পুড়ে গেছে, কিছু লুঠপাট হয়ে গেছে। যারা আগের থেকে সংগ্রহ করেছে, নিয়ে এসেছে। যে যেভাবে পারে বেরিয়ে এসেছে। যারা খাসজমিতে আছে, তাদের কী করবে এখন শোনা যাচ্ছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে, বড়োরা সংখ্যায় কম। ওরা ২৫%, অন্যরা ৭৫%। বাংলাদেশির নাম করে আমাদের খেদিয়ে দিয়ে ওরা সংখ্যাটা বাড়িয়ে নিতে চায়।

আবদুল করিম : পয়লা রোজার দিন আমরা কদমগুড়ি (গোসাইগাঁও মহকুমা) থেকে এখানে এসেছি। ওখানে আমাদের বন্দুক দিয়ে মারামারি করে খেদিয়ে দিয়েছে। হাতে বন্দুক, তীর, বাঁটুল নিয়ে এসেছে। আমরা ওদের আটকাতে পারিনি, ভেগে গেলাম একটা কোম্পানির (ফ্যাকট্রির) মধ্যে। ওখানেও বলে, ভাগো। বাধ্য হয়ে বৃষ্টির মধ্যে দুদিন তিনদিন হেঁটে এখানে এসেছি। এখানকার লোক আমাদের জায়গা দিল। আমি সেদিন দেখতে গিয়েছিলাম গ্রামে। খালি ভিটা, সব শেষ। আমাদের সবার মাটির পাট্টা আছে। কিছু আনতে পেরেছে, কিছু পারেনি। আমার মনে হয়, আমরা ফিরে গেলে আবার গণ্ডগোল হবে।

শিবির : হাপাসরা, বঙ্গাইগাঁও

নুর মহম্মদ আলি, ৩নং নাচনগুড়ির পঞ্চায়েত সদস্য, বঙ্গাইগাঁও : ৭ অক্টোবর ১৯৯৩ বড়োল্যান্ড থেকে মুসলমানদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার পর তারা হাপাসরা গ্রামে শিবির বেঁধে আছে। একবছর আগে সরকারের তরফ থেকে পুনর্বাসনের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা পেয়েছে ৫৫০ ঘর মানুষ। তারা ৩নং নাচনগুড়ির বিভিন্ন জায়গায় এক পোয়া আধাপোয়া জায়গা কিনে শিবিরের মতো করে আছে। এখনও ৬৮৩ ঘর টাকা পায়নি। পাটাবাড়ি, তুলসিঝোরা, আমডাঙা, আমাগুড়ি, ভাওরাগুড়ি ইত্যাদি গ্রাম থেকে তারা দশ বছর বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়ে থাকে। সেখানে থাকতে না দেওয়ায় বঙ্গাইগাঁও জেলায় আসে। কিছু মানুষ এখানে হাপাসারা গ্রামে আছে, কিছু জারাগুড়িতে আছে। ওই গ্রামগুলি তখন ছিল কোকরাঝাড় জেলায়। এবারে যে দাঙ্গা হল, তার পরে আমাদের বঙ্গাইগাঁও জেলায় ১২টা শিবির হয়েছে; চিরাং জেলায় ২০টার বেশি আছে; কোকরাঝাড়, বিলাসিপাড়া, শ্রীরামপুর, চাপরে আছে। বর্তমানে এরকম ২৪৪টা শিবির আছে। আমরা সার্ভে করে দেখেছি।

শিবির : দনকিনামারি, বঙ্গাইগাঁও

আসিজুল খাতুন : পলানশোগুড়িতে (চিরাং জেলা) আমাদের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, ধাওয়া দিয়েছে। পিস্তল ধরছে, তীর মারছে, বাঁটুল দিয়ে মারছে। গাঁওবুড়া, চেয়ারম্যান সঙ্গে থেকেই মেরেছে। ভয়ে আমরা এসে পড়েছি। পাঁচঘণ্টা হেঁটে আমরা এসেছি এখানে। এই শিবিরে আমরা ১৫০০ মানুষ আছি। চিরাংয়ে আমাদের মেয়াদি পাট্টা দেয়নি আগের থেকে। মাটির পাট্টা বেশিরভাগ মানুষের নেই। তাদের নেবে না সরকার। আমরা বলছি, নিলে আমাদের সবাইকে নিতে হবে।

হাওয়া বানু : আমরা চিরাংয়ের ভবানীপুর গ্রাম থেকে এসেছি। আমাদের চারিদিকে বড়োরা ছিল, গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। বড়োরা একসাইড ধরে পুবদিকে যাচ্ছে। সেই দেখে গ্রামের মেয়েছেলেদের বার করে দেওয়া হয়েছে। পুরুষরা সব গ্রামেই ছিল। তারপর পুবদিক থেকে আর্মির পোশাক পরে এসেছে। ব্রিজের মাথা থেকে ফায়ারিং চালিয়েছে। মানুষ সব সাইডে চলে গেছে। ওরা বস্তিতে ঢুকে পোড়াতে শুরু করেছে। যারা পালাতে পারেনি তারা উপুড় হয়ে লুকিয়ে ছিল। পোড়াপুড়ির পরে তারা আস্তে আস্তে বার হয়ে এসেছে। চারটে মানুষ হারিয়ে গিয়েছিল, চারদিন পরে পাওয়া গেছে, জিন্দা আছে। একটা মেয়েছেলে মানুষকে দু-টুকরো করেছে। ২৪ তারিখ গোলাগুলি চলতে মানুষ খালি হাতে পালিয়ে এসেছে। কোকরাঝাড়ে আগে হওয়ার পরে জয়পুর, বেশরগাঁও, পানিয়াবাড়ি এসব জায়গায় হওয়ার পরে আমাদের দিকে হয়েছে। ওদিকে সব মানুষ সাইড হয়ে গিয়েছিল। আমরা সাহস করে ছিলাম, সাইড হইনি। থাকার পরে একজন খবর দিল, তোমরা ফ্যামিলি অল্প পার করে দাও, বিপদ হতে পারে। ওইটা হিসেব করে আমরা নাওঘাটে এসেছি। এসে দেখছি, সত্য সত্য সব মানুষ পার হচ্ছে। আমাদের ভয় ঢুকে গেল। আমরা মেয়েছেলেদের বললাম, তোমরা পার হয়ে যাও, আমরা পুরুষ মানুষেরা থাকব। জায়গায় জায়গায় আমরা বিশজন, পাঁচজন ডিউটি করছি। তিনটে গাড়ি এল। থানার আইসি এল। কী বলল, আমরা তো বলতে পারি না। তারা চলে গেল। এরপরই আর্মি-পোশাক পরে বাইকে করে ফায়ারিং শুরু করল। তখন আমরা কাগজপত্র আনব, না কাপড়চোপড় আনব, না টাকাপয়সা আনব, না ডেকচিপত্র আনব? নিজের জানটাকে নিয়ে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছি। দৌড়ে দৌড়ে আই নদী আর নাগরভাঙা নদী পার হয়ে আমরা এলাম উদালগুড়ির গ্যাঁদাবাজার। নাওঘাটে যাওয়া সাহসে কুলায়নি, সাঁতরে নদী পার হয়ে এসেছি। সকালে আটটা নাগাদ বাচ্চা আর ফ্যামিলি নাও দিয়ে পার হয়েছে। এখানে এসে প্রথমে স্থানীয় মানুষ খাইয়েছে। তিনদিন পর সরকার ব্যবস্থা করেছে। এখন ক্যাম্পে থাকছি। থাকার চেয়ে মরাটা ভালো। ক্যাম্পের ভিতরে ছয় ইঞ্চি পানি উঠে গেছে। বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না। কালকে ঘরটা দেখতে গেছিলাম। কিচ্ছু নাই। শুধু চালটা আছে। ঘরে তালা মেরে এসেছিলাম। সব খালি, একটা সুতাও নেই। এখন যে আমরা ফিরে যাব, কী খাব? সরকার তো চাল-ডাল দেয়। খড়ি তো দেয় না। জানের ভয় নিয়ে দশ-পনেরো জন মিলে যাই, কয়েকটা খড়ি নিয়ে পালিয়ে আসি। আমাদের কারো পাট্টা আছে, কারো নাই। আমার ছোটোভাইয়ের আট-দশ বিঘার পাট্টা আছে, আমার এক বিঘারও নাই। ঘটনা হল, আগের বুড়া মানুষ পাট্টা রেখেছে, তার ঘরে পাঁচটা ছেলে হয়েছে, ওরা বিয়ে করে বাড়ি করেছে, তাদের ছেলেমেয়ে হয়েছে। সবার তো পাট্টা থাকবে না, ওই একটা নামে পাট্টা আছে। সরকার যার পাট্টা নাই, তাকে বাংলাদেশি বলছে। বাংলাদেশি যদি আমরা হই, তাহলে তাদের ভোট নিয়ে কংগ্রেস কী করে জিতল? মুসলমানের ভোট না পেলে কংগ্রেস মরে যায়! আমরা বাংলাদেশি, আমাদের নেতা বাংলাদেশি। ইন্দিরা গান্ধী মুসলমানের সঙ্গে কীসের জন্য বিয়ে করেছিল? ভারতের রাষ্ট্রপতি যে ছিল, সেও বাংলাদেশি? আমরা মুসলমান, আমরা সবাই বাংলাদেশি হলাম আজকে! মুসলমানের মরা ছাড়া গতি নাই।

আবুল কাসেম : পলানশোগুড়ি (চিরাং জেলা) থেকে এখানে এসেছি জুলাই মাসের ২৪ তারিখ, মঙ্গলবার। সোমবার দিন আমাদের বাড়ির থেকে পশ্চিমে জয়পুরে দেখলাম বেলা তিনটার সময় দুমদাম গোলাগুলি আরম্ভ করে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। পরদিন সকালে কয়েকটা গাড়ি এল। গোলাগুলি চলল। জানের ভয়ে সব এদিকে চলে এল। একজন বুড়ি মারা গেছে ওখানে গুলি লেগে, পালাতে পারেনি। ভবানীপুর থেকে আরম্ভ করেছে, ওখানে মাকরা নদী আছে। গ্রামের নাম কানা মাকরা। পুবের থেকে বাইক নিয়ে এসেছে। আমরা দক্ষিণ দিকে পায়ে হেঁটে এলাম। আই নদীর খেয়া আছে, সব মানুষ পার হয়ে এখানে এসে জমা হল। মেয়েছেলেরা দুদিনে এসে এখানে জমা হয়েছে।

মনোয়ারা বিবি : ভবানীপুর গ্রামে আগে থেকে কোনো বিবাদ আমরা বুঝলাম না। আগে বড়োদের সঙ্গে মেলামেশা ছিল। সোমবার সকালে আমরা সব মেয়েমানুষ পার হয়ে এসে পড়লাম। আমাদের পুরুষ মানুষেরা ডিউটি করার জন্য ওখানে রইল। তারপর সকাল দশটার সময় ওরা ব্রিজে এসে গোলাগুলি আরম্ভ করেছে। রাতে আমরা গ্যাঁদাবাজারে রইলাম। বেলা ওঠার আগে আমরা এখানকার পথ ধরেছি। ওই ব্রিজের ওখানে এসে বসেছিলাম। তারপর এখানকার মানুষ গিয়ে আমাদের নিয়ে এল। কিছু গেছে হাপাসরা, গরাইমারিতে, আমরা এখানে এলাম। আমরা তিনদিন না-খাওয়া ছিলাম। সরকার সবাইকে ফেরত নেবে না। যাদের মেয়াদি পাট্টা আছে, তাদের আগে নেবে। এখন তিনদিন বাদে বাদে চাল ডাল তেল মরিচ দেয়।

শিবির : গরাইমারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বঙ্গাইগাঁও

মহঃ আফজালুর রহমান : আমার গ্রাম ১নং দংশিয়াপাড়া। এটা চিরাংয়ের মধ্যে পড়েছে। আমাদের আশপাশের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। আমাদের ঘরবাড়ি সব লুঠপাট হয়ে গেছে। গ্রামের উত্তর আর পশ্চিম সাইডে পুড়িয়ে দিয়েছে। ২৩ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয়েছিল। আমরা বেরিয়ে এলাম। কেউ আগে এসেছে, আমরা পরে এসেছি, আমাদের পরেও এসেছে আরও মানুষ। যখন গুলি চালাল। তখন মানুষ তো আর থাকতে পারে না। দংশিয়াপাড়া আর দক্ষিণ মাকরা পোড়ায়নি। ওখানে খবর পেয়ে বিভিন্ন সংগঠন থেকে গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে স্থানীয় ক্লাব আর মানুষ আমাদের সংস্থাপন দিয়েছে। দুইদিন পর থেকে সরকারি দান আমরা পেয়েছি। এখানে ৭৬টা পরিবার আছে। মাদ্রাসা শিবিরে আছে ৮৯টা পরিবার। আমাদের দংশিয়াপাড়ার গাঁওবুড়াও চলে এসেছে। কোকরাঝাড়ে যখন পুড়িয়ে দেয়, আমরা বিভিন্ন সরকারি মহলে নিরাপত্তা চেয়েছিলাম। এসডিও আর ডিসি-কে আমরা ফোন করলাম। আমরা সামরিক বাহিনী চাইলাম। কিন্তু তারা কোনো সাহায্য করেনি। আমাদের গ্রামের ভিসিডিসি-র চেয়ারম্যান দারগা বসুমাতারি। তিনিও ঘর জ্বালানোর সময় ছিলেন। আগে আমাদের মেলামেশা ছিল। একসঙ্গে খেলতাম, বেড়াতাম, বাজার করতাম। উগ্রপন্থী সংগঠন বিএলটি বা এনডিএফবি-র সঙ্গে যোগাযোগ করে ওরা এটা করেছে। উগ্রপন্থীদের হাতে অবৈধ অস্ত্র আছে। সেই অস্ত্র নিয়ে ওরা হামলা করল। ঘর জ্বালানোর সময় ওরা বিপিএফ-এর পতাকা নিয়ে এসেছিল। মাটির পাট্টা কারো হারিয়ে গেছে, কারো পুড়ে গেছে, কারো নেই। সেইজন্য আমাদের ফেরার ব্যাপারে কিছু হচ্ছে না। আমরা ভারতীয় নাগরিক, আমাদের ভোটার লিস্টে নাম আছে। বড়োল্যান্ডের আইন আছে, আমাদের মেয়াদি পাট্টায় নামধারী হয় না। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে জমি করেছিল, তার পাট্টা আছে।

শিবির : লক্ষ্মীপুর নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়, বঙ্গাইগাঁও

মহঃ নাজমুল হক : আমি ১নং দংশিয়াপাড়া থেকে এসেছি। এখানে আটটার বেশি গ্রামের লোক এসেছে --- ফরমায়েসালি, দংশিয়াপাড়া, উত্তর বল্লমগুড়ি, আমগুড়ি, ভাওরাগুড়ি, মকনাগুড়ি, লাউকুরগুড়ি, মাজরাবাড়ি, আমড়াগুড়ি, ২-৩-৪নং দক্ষিণ মাকরা --- চিরাংয়ের উত্তরে ফরেস্টের লাগোয়া সব গ্রাম। হঠাৎ করে আগুন লাগিয়ে ঘর পোড়ানো আরম্ভ করল। ২৩ জুলাই সন্ধ্যা সাতটার সময় ওরা এল। আমরা দৌড়াদৌড়ি করে সব একসাইডে হয়ে গেলাম। তারপরে ফোন করে গাড়ি পাঠানো হল। পরেরদিন আমরা ক্যাম্পে এসে পড়লাম। সব চেনা লোকই পুড়িয়েছে, বন্দুক চালিয়েছে। এখন ওখানে পুলিশের ক্যাম্প আছে। এখানে ৪১৩টা পরিবার আছে, লোক আছে মোট ১৮০৯। মণ্ডল এসে র‍্যাশন দেয়। পনেরো-বিশদিন আগে এসে পানিরাম বড়ো বলল, তোমরা এখানে থাকো, আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাব। তারপর আসেও না, কিছু করেও না। আমাদের কিছু বলেনি। কিন্তু টিভিতে বড়ো মিনিস্টার বলেছে, যাদের মেয়াদি পাট্টা আছে তাদের নেবে, খাস মাটির লোককে নেবে না। বড়োরাও খাস মাটিতে আছে। ওরা যদি খাস মাটিতে থাকতে পারে, আমরা কেন থাকতে পারব না? আমাদের গ্রামে আগে পাট্টা জমি ছিল, তারপর নদী হয়ে গেল জায়গাটা। সেটা খাস হয়ে গেছে, সেখানে বসতবাড়ি আছে। কেউ ত্রিশ বছর, কেউ চল্লিশ বছর আছে। তাদের ভোট আছে। আমি চারবার বাড়ি পাল্টিয়েছি। নদী ভাঙন হয়, লোকে সরে যায়। এইবছর ভাঙে নাই। যাদের বাড়ি পোড়েনি, তাদেরও সব লুঠ হয়ে গেছে। তারা যে ফিরে যাবে, খাবে কী? সরকারকে কম-সে-কম ছ-মাস চালাতে হবে তাদের, তারপর কোনো একটা ব্যবস্থা হবে। একটা মানুষের খরচা কত আছে? আজকে দুই কেজি চাল হলে, তরকারির খরচ পঞ্চাশ-ষাট টাকা। আজ এক পোয়া মাছ কিনতে লাগে ষাট টাকা।

Text Box: যুগশঙ্খ প্রতিবেদন, ধুবড়ি (বেদলাংমারি), ২৪ আগস্ট : কোকরাঝাড়ের উপকণ্ঠে ছোট্ট জনপদ বেদলাংমারি গ্রাম$ গ্রামবাসীদের সবাই বাংলাভাষী মুসলমান$ ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর, পুকুর, মেঠোপথ, গ্রামীণ জীবনের সব উপকরণ মজুত থাকলেও গোটা গ্রাম এখন জনশূন্য$ মেঠোপথ আলপথ ধরে মাঝে মাঝে বেওয়ারিশ কুকুর, বেড়াল ছুটে বেড়ালেও গত এক মাসে বেদলাংমারিতে জন মানুষের পা পড়েনি$ গ্রামবাসীদের বর্তমান ঠিকানা অস্থায়ী আশ্রয়শিবির$ জুলাইয়ের মাঝামাঝি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার শুরুতে আট বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধ সবাই প্রাণের ভয়ে ধুবড়ির শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে$ গ্রামের বাসিন্দা কলিমুদ্দিন শেখ, খলিলুদ্দিনরা নিরাপদ আশ্রয় শিবিরেও নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারছেন না$ তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে হাগ্রামা মহিলারির ফতোয়া$ বিটিসির শাসকদের চোখে খলিলুদ্দিনদের পড়শিদের সবাই সন্দেহভাজন বাংলাদেশি$ নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রামে ফিরতে দেওয়া হবে না$ দাঙ্গায় গৃহহীনদের সিংহভাগ হাগ্রামাদের বিবেচনায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী$ কারণ বিপিএফ নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের সঙ্গে ভূমিপুত্র বড়ো সম্প্রদায়ের লড়াই চলছে$ তাই গ্রামছাড়া গৃহহীনদের নাগরিকত্ব বিপিএফ নেতৃত্বের স্ক্যানিংয়ের আওতায় চলে এসেছে$ কলিমুদ্দিন শেখ, খলিলুদ্দিনরা বুঝতে পারছেন না, তাঁদের কেন বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করছেন হাগ্রামা$ ৬২ বছরের বৃদ্ধ কলিমুদ্দিনের কাছে গ্রাম পঞ্চায়েতের দেওয়া প্রমাণপত্র রয়েছে$ গত বিধানসভা নির্বাচনেও পূর্ব বিলাসীপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন কলিমুদ্দিন শেখ$ ধুবড়ি ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের প্রমাণপত্রও তাঁর সঙ্গে রয়েছে$ ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নথিবদ্ধ রয়েছে তাঁর বাবা রমজান আলির নাম$ কলিমুদ্দিনের পড়শি মোহাম্মদ খলিলুদ্দিনের কাছেও রয়েছে নাগরিকত্বের সরকারি প্রমাণপত্র$ ৩৭ বছরের দিনমজুর খলিলুদ্দিন ঘর ছেড়ে পালানোর সময় ল্যামিনেশন করা প্রমাণপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছেন$  কলিমুদ্দিন, খলিলুদ্দিনদের আক্ষেপ -- রাজ্য সরকারের পদাধিকারীদের স্বাক্ষরিত প্রমাণপত্র থাকলেও বিটিসির শাসকরা তাদের ছাড়পত্র দিতে রাজি  নন$ মহিলারিদের ফতোয়া অগ্রাহ্য করে গ্রামে ফেরার মতো বুকের পাটা কারও নেই$ শিবিরের সিংহভাগ বাসিন্দা বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করছে     বড়ো নেতৃত্ব$ কারণ বিটিসির উপমুখ্য কার্যবাহী সদস্য খাম্পা বরগয়ারির বিশ্লেষণ হল, কোকরাঝাড়ের মোট জনসংখ্যার ২ লক্ষ ৩৬ হাজার হল মুসলিম$ এদের মাত্র ৫০ শতাংশ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে$ বিটিসির সংখ্যালঘু জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ ঘর ছাড়লে শিবিরে শিবিরে আশ্রিত মুসলমানদের সংখ্যা চার লক্ষ কেমন করে হল? বড়ো নেতৃত্ব নিশ্চিত, অনুপ্রবেশকারীরা শিবিরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে$ প্রশ্ন হল, কলিমুদ্দিন, খলিলুদ্দিনরা যদি বাংলাদেশি তবে তাদের হাতে বৈধ নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র কীভাবে এল? তাহলে এই প্রমাণপত্র কি ভুয়ো? ভুয়ো প্রমাণপত্র বাংলাদেশিরা কীভাবে সংগ্রহ করল? বিটিসি নেতৃত্বের কাছে এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই$                  জয়নাল আবেদিন : আমাদের এখানে ভবানীপুর, পশ্চিম গুমারগাঁও, চিকাপাড়া, পলানশোগুড়ি এই চারটে গ্রামের মানুষ এসেছি। ২২ তারিখ থেকে আমাদের ওখানে উত্তেজনা চলল। ২৪ তারিখে বিকেল আড়াইটার সময় আমাদের বস্তি আক্রমণ করল। ওদের দলে ছিল প্রথমে চারজন, সেনাবাহিনীর পোশাকধারী। ওদের হাতে ছিল মারণাস্ত্র একে-৪৭, তার পিছনে ছিল কমান্ডো বাহিনী ১৫-১৬ জন। তার পিছনে ছিল ওদের পাবলিক, তাদের হাতে ছিল তীর ধনুক। আমাদের হাতে তো কোনো অস্ত্র নাই। সেই কারণে আমরা বস্তি ছাড়তে বাধ্য হলাম। প্রথমে আমাদের মেয়েদের আমরা আই নদীর কিনারে রেখেছিলাম, উদালগুড়িতে। আমরা পুরুষেরা বস্তিতে ডিউটি করছিলাম। আড়াইটার সময় ওরা হামলা করল। আমাদের গরু-বাছুর বহু মারা গেছে। আমরা সাইড হয়ে গেলাম। একজন বৃদ্ধা মারা গেছে। আমাদের মানুষ বেহুঁশ হয়ে জঙ্গলে পড়েছিল। পরে ওদের উঠিয়ে নিয়েছি। এক রাত আমরা জঙ্গলে ছিলাম। এক রাত এক দিন বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে না খেয়েদেয়ে এখানে এলাম। এখানকার লোকে আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, গ্রামের থেকে চাল-ডাল সংগ্রহ করে খিচুড়ি বানিয়ে আমাদের দুদিন খাইয়েছে। তারপরে সরকারি রেশন আমরা পাচ্ছি। গণ্ডগোলের প্রথমে আমরা গাঁওবুড়া নবীন বসুমাতারি আর পানেশ্বর রাভাকে বলেছি, ভিসিডিসি-র চেয়ারম্যান পূর্ণচন্দ্র ব্রহ্মকে বলেছি। এরা বলল, আমাদের তো করার কিছু নেই, তোরা সাবধানে থাক। আমরা আইসি-র কাছে গেলাম। বললাম, একটা কোম্পানি ফৌজি আমাদের ওখানে দিন। তিনি বললেন, এসপি-কে ফোন করেছি। দুদিন চলে গেল, ফৌজি এল না। শেষ পর্যন্ত আমাদের গ্রাম পুড়িয়ে দিল। যেসময় আগুন লাগাল, তার দশ মিনিট আগে আইসি-র গাড়ি ওখানে ছিল। সেইসময় ব্রিজের পুবদিক থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স আর দুটো গাড়ি এল। ওই গাড়ি থেকেই অস্ত্রধারী মানুষ নেমেছে। আজ ১৫ তারিখ, ১২ তারিখ আমরা তিনটা শিবিরের লোক ডিসি অফিসে গেছিলাম। আমরা বললাম, স্যার আমাদের শুনলাম আই নদীর ধারে ক্যাম্প দেবেন। ওখানে না নিয়ে আমাদের গ্রামে নিয়ে চলুন। এখনও আমাদের শস্য মাঠে পড়ে আছে। গ্রামে গেলে শস্যগুলো উদ্ধার হবে, আমাদের ছেলেমেয়েগুলো ইস্কুলে যেতে পারবে। ভবানীপুরে শতকরা ৩০% মেয়াদি পাট্টাধারী আছে, ৭০% খাসল্যান্ড; আমাদের পশ্চিম গুমারগাঁওয়ে ৯৫% পাট্টাল্যান্ড, ৫% খাস; পলানশোগুড়ির একটাও খাস নেই, পুরোটাই পাট্টাধারী; চিকাপাড়া পুরোটাই পাট্টাধারী। যাদের কাগজ পুড়ে গেছে, অফিসে তো রেকর্ড আছে। ওদের ইচ্ছা, খাসমাটির লোককে ওরা পুনর্বাসন দেবে না। কিন্তু কাগজপত্র আমাদের সব আছে। আমাদের ১৯৬৫-৬৬-৭০-এর সব ভোটার আছে, কিছু নতুন ভোটার আছে। যারা খাসজমিতে বাস করে, তাদের ভোটার লিস্টে নাম আছে, রেশন কার্ড আছে, ভিসিডিসির সার্টিফিকেট আছে, বিপিএল কার্ড আছে। যে ভূমিহীন, যার মাটি নাই, সে আর কাগজ কোথা থেকে দেবে?

যুগশঙ্খ প্রতিবেদন, ধুবড়ি (বেদলাংমারি), ২৪ আগস্ট : কোকরাঝাড়ের উপকণ্ঠে ছোট্ট জনপদ বেদলাংমারি গ্রাম$ গ্রামবাসীদের সবাই বাংলাভাষী মুসলমান$ ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর, পুকুর, মেঠোপথ, গ্রামীণ জীবনের সব উপকরণ মজুত থাকলেও গোটা গ্রাম এখন জনশূন্য$ মেঠোপথ আলপথ ধরে মাঝে মাঝে বেওয়ারিশ কুকুর, বেড়াল ছুটে বেড়ালেও গত এক মাসে বেদলাংমারিতে জন মানুষের পা পড়েনি$ গ্রামবাসীদের বর্তমান ঠিকানা অস্থায়ী আশ্রয়শিবির$ জুলাইয়ের মাঝামাঝি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার শুরুতে আট বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধ সবাই প্রাণের ভয়ে ধুবড়ির শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে$ গ্রামের বাসিন্দা কলিমুদ্দিন শেখ, খলিলুদ্দিনরা নিরাপদ আশ্রয় শিবিরেও নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারছেন না$ তাঁদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে হাগ্রামা মহিলারির ফতোয়া$ বিটিসির শাসকদের চোখে খলিলুদ্দিনদের পড়শিদের সবাই সন্দেহভাজন বাংলাদেশি$ নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রামে ফিরতে দেওয়া হবে না$ দাঙ্গায় গৃহহীনদের সিংহভাগ হাগ্রামাদের বিবেচনায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী$ কারণ বিপিএফ নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের সঙ্গে ভূমিপুত্র বড়ো সম্প্রদায়ের লড়াই চলছে$ তাই গ্রামছাড়া গৃহহীনদের নাগরিকত্ব বিপিএফ নেতৃত্বের স্ক্যানিংয়ের আওতায় চলে এসেছে$ কলিমুদ্দিন শেখ, খলিলুদ্দিনরা বুঝতে পারছেন না, তাঁদের কেন বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করছেন হাগ্রামা$ ৬২ বছরের বৃদ্ধ কলিমুদ্দিনের কাছে গ্রাম পঞ্চায়েতের দেওয়া প্রমাণপত্র রয়েছে$ গত বিধানসভা নির্বাচনেও পূর্ব বিলাসীপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন কলিমুদ্দিন শেখ$ ধুবড়ি ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের প্রমাণপত্রও তাঁর সঙ্গে রয়েছে$ ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নথিবদ্ধ রয়েছে তাঁর বাবা রমজান আলির নাম$ কলিমুদ্দিনের পড়শি মোহাম্মদ খলিলুদ্দিনের কাছেও রয়েছে নাগরিকত্বের সরকারি প্রমাণপত্র$ ৩৭ বছরের দিনমজুর খলিলুদ্দিন ঘর ছেড়ে পালানোর সময় ল্যামিনেশন করা প্রমাণপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছেন$

      কলিমুদ্দিন, খলিলুদ্দিনদের আক্ষেপ -- রাজ্য সরকারের পদাধিকারীদের স্বাক্ষরিত প্রমাণপত্র থাকলেও বিটিসির শাসকরা তাদের ছাড়পত্র দিতে রাজি  নন$ মহিলারিদের ফতোয়া অগ্রাহ্য করে গ্রামে ফেরার মতো বুকের পাটা কারও নেই$ শিবিরের সিংহভাগ বাসিন্দা বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করছে     বড়ো নেতৃত্ব$ কারণ বিটিসির উপমুখ্য কার্যবাহী সদস্য খাম্পা বরগয়ারির বিশ্লেষণ হল, কোকরাঝাড়ের মোট জনসংখ্যার ২ লক্ষ ৩৬ হাজার হল মুসলিম$ এদের মাত্র ৫০ শতাংশ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে$ বিটিসির সংখ্যালঘু জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ ঘর ছাড়লে শিবিরে শিবিরে আশ্রিত মুসলমানদের সংখ্যা চার লক্ষ কেমন করে হল? বড়ো নেতৃত্ব নিশ্চিত, অনুপ্রবেশকারীরা শিবিরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে$ প্রশ্ন হল, কলিমুদ্দিন, খলিলুদ্দিনরা যদি বাংলাদেশি তবে তাদের হাতে বৈধ নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র কীভাবে এল? তাহলে এই প্রমাণপত্র কি ভুয়ো? ভুয়ো প্রমাণপত্র বাংলাদেশিরা কীভাবে সংগ্রহ করল? বিটিসি নেতৃত্বের কাছে এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই$

শিবির : কাউয়াটিকা মধ্য ইংরাজি বিদ্যালয়, চিরাং

আসগর আলি : আমি ২নং ভলাতল গ্রাম থেকে এসেছি। ২২ জুলাই আমার ছেলে ও মামাতো ভাইকে ওরা গুলি করে মারে। ছেলের নাম হাসেম আলি আর মামাতো ভাইয়ের নাম নুর হোসেন আলি। আমার ছেলেকে ৬টা গুলি করেছে আর নুর হোসেনকে ৭টা গুলি করেছে। ২৩ তারিখ বডি পোস্ট মর্টেম করে আনে সন্ধ্যা ৭টার সময়। আটটার দিকে দাফন করা হয়েছে। ওইদিন রাতে আমরা মাজরাবাড়িতে থেকেছি। মঙ্গলবার ২৪ তারিখ আমাদের ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। তখন আমরা হতবুদ্ধি হয়ে শিবিরে এসেছি। দু-ঘণ্টা পায়ে হেঁটে আসার পর এখানকার মানুষ সহায় হয়ে আমাদের আশ্রয় দিয়েছে।

   আমাদের গ্রামের পুব সাইডে বড়ো, উত্তর সাইডে বড়ো আর দক্ষিণ সাইডে আমাদের মুসলমান বস্তি। ওদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই ছিল। ২২ তারিখে মারার পর আমাদের লোক পালিয়ে এসেছে। আমাদের গাঁওবুড়া বড়ো, নিজে এসে আমাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওসি, অ্যাডিশনাল এসপি, এসডিপিও, এক্স-এমএলএ, আরও অনেকে সেইসময় ওখানে এসেছিল দেখতে। সেইসময়ই ঘটনা ঘটেছে।

   আমার ছেলে আর মামাতো ভাই মঙ্গোলিয়ান বাজারে গিয়েছিল। এমন সময় একটা চ্যাংড়া এসে খবর দিল, অমুক অমুককে মেরে ফেলেছে, আরও অনেককে মারবে। হুলুস্থুলু কান্নাকাটি লেগে গেল, আমাদের লোককে মেরে ফেলেছে। ওখানে ব্যাটেলিয়ন ছিল, বললাম, আমাদের লোককে মেরে ফেলেছে, তোমরা সহায় করো। কেউ যায়নি। ওসি সাহেবকে ফোন করায় তিনি গেছেন, তারপর তিনিই গাড়ি নিয়ে লাশগুলো নিয়ে এসেছেন। সাংবাদিক গেছে, ফটো তুলেছে।

   এখানে আসার পর আমরা বিজনি থানায় কেস করেছি। এখন সিকিউরিটির ব্যবস্থা হলে আমরা ফিরে যাব। কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

এরপর অন্যরা বলতে শুরু করে : আমাদের মেয়াদি পাট্টা আছে। খাস জমি আছে, কম। আমাদের সাব-রেজিস্ট্রার হল বিজনির, সেখানে রেজিস্ট্রি দেয় না। বড়োদের জমি অ-বড়োদের রেজিস্ট্রি হয় না। যারা না জেনে কিনেছে, তাদের নামধারী হয় না। আমাদের জমি যদি বড়োরা কেনে, তাহলে রেজিস্ট্রি হতে পারে, নামধারী হতে পারে। এটা বিটিসি হওয়ার পরে হয়েছে। বাপের জমি বেটার কাছে গেলেও নামধারী হয় না, সেটাও বন্ধ।

   আমরা পাট, ধান সবই লাগিয়েছিলাম, পেকেছিল। ওখানে যে সিকিউরিটি আছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দু-চারজনে কেটে এনেছে। সামনের দিকে যেগুলো আছে, আমরা কথা বলেছি, ১৫-২০ জন গিয়ে কেটে আনবে। সেই ফসল ওরা নষ্ট করেনি। যেগুলো ওদের নিকটবর্তী ছিল সেগুলো ছাড়া বাকি সব ঠিক আছে। আমরা গেছি মাঝে। বড়োদের সঙ্গে দেখাও হচ্ছে। ওরা কথা বলে না, আমরাও বলি না। আমাদের ভলাতল গ্রামের প্রায় মানুষই যায়। এখানে খড়ির ব্যবস্থা নেই, খড়ি আনতে যায়। সব্জি আনতেও যায়। পাঁচ-ছয়জন একসঙ্গে যাওয়া-আসা করে।

   এখানে ভলাতল গ্রামের ১৩০টা পরিবার আছে, মোট ৬৩০ জন। সরকার আমাদের চাল, ডাল, নুন, তেল দেয়, বাচ্চাদের জন্য বেবিফুড দেয়।

   আসলে আমাদের ওখানে স্কুলের যে টাকা এসেছিল, ওই টাকার দশ পার্সেন্ট ওদের পার্টির চ্যাংড়ারা নিয়ে যায়। আগে একবার কিছু দেওয়া হয়েছে। তারপর আরও একটা কিস্তি নিতে আসে দু-তিনজন। স্কুল কমিটি বলেছে, টাকা নাই। জোরজুলুম ওরা চায়। গ্রামের লোক কিছু আছে, যারা বলে, এবার টাকা আমরা দেব না। ১৯ তারিখ দুজন উগ্রপন্থী আসে, ওদের ধরে থানায় দেওয়া হয়েছে। এখান থেকেই লাগল ফ্রিক্‌শন। ওরা এনডিএফবি। আমাদের ওখান থেকে দুই-আড়াই কিলোমিটার দূরে মঙ্গোলিয়ান বাজার আছে। রবিবার ২২ তারিখ আমাদের গ্রাম থেকে কিছু লোক বাজার করতে গেছে। ভলাতল, মাজরাবাড়ি থেকে গিয়ে কেউ সব্জি কিনে আনে, কেউ শুকনো মাছ বিক্রি করতে যায়। হাসেম আলিকে ধরেছে দুটো চ্যাংড়া। হাসেম নুর হোসেনকে ডাক দিয়েছে, আমাকে মেরে ফেলে। ওরা গুলি করেছে। নুর হোসেন এগিয়ে গেছে, ওকেও মেরেছে। মারার পর হই হল্লা। বাজারে যারা ছিল, তারা ভেগে এসে পড়ল। আর দুটো লোক ওদের নজদিকে ছিল, ওরা ভাগবার কুল পায়নি। অন্যদিকে গেছিল, গ্রামে এল রাত বারোটার সময়। আমরা ভাবছি, ওরা নাই, চারটেই মারা গেছে। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে চারটা নাগাদ চতুর্দিক থেকে বড়োরা এসে আমাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিল।

Comments