বড়ো নেত্রীর চোখে বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

বড়ো নেত্রীর চোখে বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ



 

কোকরাঝাড়ে বড়ো পিপল্‌স ফ্রন্টের দপ্তরে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১২ বিধায়ক প্রমীলা রানি ব্রহ্মের সঙ্গে পত্রিকার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিলেন রামজীবন ভৌমিক ও জিতেন নন্দী। শ্রীমতী ব্রহ্ম ভাঙা বাংলায় কথা বলেছেন এবং কিছু ইংরেজি শব্দও মাঝে মাঝে ব্যবহার করেছেন, সেগুলি মোটামুটি অপরিবর্তিত রাখা হল।


 


মন্থন : নমস্কার প্রমীলাদিদি। আপনি কোন অঞ্চলের বিধায়ক?                      

প্রমীলা রানি : আমি ১৯৯১ সাল থেকে কোকরাঝাড় পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক। আগে মন্ত্রী ছিলাম। কোকরাঝাড়ে তিনটি বিধানসভা কেন্দ্র ছিল আর ধুবড়ি থেকে যে অংশটা যুক্ত হয়েছে সেখানকার একটা, মোট চারটি কেন্দ্র।        

মন্থন : আমরা গত পরশু কোকরাঝাড়ের তিতাগুড়িতে গিয়েছিলাম। শুনলাম ওখানে শরণার্থী শিবির আছে। কিন্তু গিয়ে দেখলাম কোনো শিবির নেই।

প্রমীলা রানি : না, তিতাগুড়িতে এখন শিবির নেই। ওদের আলাদা আলাদা সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে দুটি, বিডিও অফিসে দুটি, ডিস্ট্রিক্ট ট্রান্সপোর্ট অফিসে একটি আর কোকরাঝাড় কালচারাল সেন্টারে তিনটি, চিরাংয়ের নইগাঁওতে একটি ... এগুলি আমার নির্বাচনী কেন্দ্রের শিবির। এরা কেউ কোকরাঝাড়ের বাসিন্দা নয়, ধুবড়ি জেলার গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছে। এগুলো সবই বড়োদের শিবির। মুসলমানরা কেউ কোকরাঝাড়ের শিবিরে নেই। গোসাইগাঁওতে কিছু কিছু আছে।

মন্থন : শিবিরে যে বড়োরা আছে, তাদের সকলের কি মাটির পাট্টা আছে?

প্রমীলা রানি : আমাদের সকলের মাটির পাট্টা আছে। সকলেই স্থানীয় লোক। যারা গরিব, তাদের জমিজমা না থাকতে পারে, তবু ভিটামাটি তো আছে। ওদের অসুবিধা নেই। ওরা তো বিদেশি হতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গে বা নেপালে যারা আছে, সেই বড়োরা তো এখানে আসবে না। তবু সংঘর্ষটা যেহেতু কোকরাঝাড় জেলায় হয়েছে, তাই বড়োরা অন্য জায়গা থেকে এখানে এসেছে।

মন্থন : বিটিএডিতে কত বড়ো গ্রাম আছে?

প্রমীলা রানি : আমার কাছে এখন রেকর্ড নেই। তবু রেভিনিউ ভিলেজ হিসেবে প্রায় চার হাজার বড়ো গ্রাম আছে। এছাড়াও ক্লাস্টার ভিলেজ আছে।

মন্থন : বিটিসি কি কিছুটা বাড়ানোর কথা হয়েছিল?

প্রমীলা রানি : কয়েকটা গ্রাম আছে, যেগুলো না বিটিসিতে না আসামে, প্রায় নব্বইটা এরকম গ্রাম আছে। কোনো কোনো গ্রাম আপত্তি করেছে। কিন্তু চুক্তিতে বলা আছে, ৫০%-এর বেশি বড়ো থাকলে বিটিসিতে থাকবে, কন্টিনিউইটি মেইন্টেন করা জন্য ৫০% নেই এরকম মাঝখানের গ্রামও বিটিসিতে পড়ে যাবে।

মন্থন : জুলাই মাসের সংঘর্ষ কেন হল?

প্রমীলা রানি : আসল কথা হল, বিটিএডি-র মধ্যে যারা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তারা তাদের অভিযোগ তুলে ধরার জন্য অবড়ো সুরক্ষা সমিতি নামের একটা সংগঠন তৈরি করেছে। সকলকে তো ব্যক্তি হিসেবে সুবিধা দেওয়া অসম্ভব। এর পিছনে ষড়যন্ত্র হয়েছে বাইরে থেকে। বিটিসি যেন অশান্ত হয়ে থাকে, এখানে যেন ডেভলপমেন্ট না হয়, তার জন্য এটা ষড়যন্ত্র করে করা হয়েছে। যারা স্কিম পায়নি, টাকা পায়নি, তারাই ওদের সঙ্গে শামিল হয়ে গেছে। আমাদের সঙ্গে থেকে যারা এমএলএ পায়নি, টিকিট পায়নি, তারা ওদের সঙ্গে গেছে।

মন্থন : এই বাইরের শক্তি মানে কি ইন্ডিয়ার বাইরের?

প্রমীলা রানি : না, আসামেরই, নেতা সব। চক্রান্ত করে এরকম করেছে। আমি প্রশাসনের কাছ থেকে রেকর্ড পেয়ে একথাটা বলছি। যে কোনো একটা ঘটনা ঘটে গেলেই হাগ্রামা মুর্দাবাদ এই শ্লোগানটাই ওরা দেয়। হাগ্রামাকে অনেক ডিসটার্ব করা হয়েছে। অথচ সবাইকে নিয়ে ডেভলপমেন্টের কাজ করার জন্য হাগ্রামা তৈরি। এখানে সবার উন্নতি হোক, এটাই উনি চেয়েছেন। তবু ওদের মাঝখান থেকে কয়েকটা লোক বের হয়ে ওখানে যোগদান করেছে। ১৯ জুলাই তারিখে রাতুল হক নামে এক ভদ্রলোককে কোনো দুষ্কৃতিকারী গুলি করেছিল। গোরাং নদীর ব্রিজ পার হয়ে মাগুরমারি গ্রামে এটা হয়েছিল। রাতুল হক আসলে পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন। সেই অবস্থায় তিনি অনেক খারাপ কাজ করে ফেলেছেন। তিনি ক্রিমিনাল কাজ করে ফেলেছেন। মাঝখানে ওঁর সাসপেনশন হল। ওই সময় একজন নাবালিকাকে তিনি রেপ করে মার্ডার করেন। আগে তো মোবাইল ছিল না। পিসিও থেকে ফোন করে আলফার হয়ে তিনি পয়সা কালেকশন করতেন। তারপর ব্লু ফিল্মও করতেন। এইসব ক্রিমিনাল কাজ করার জন্য কয়েকজন ওঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বোধ হয় ওঁর ওপর গুলি করেছিল। যদি এক্স-বিএলটি থেকে করত, ওঁর বাঁচার সম্ভাবনাই ছিল না।

মন্থন : এক্স-বিএলটি মানে?

প্রমীলা রানি : আমাদের এখানে আন্দোলন করার একটা ছিল বিএলটি। এই এক্সট্রিমিস্ট অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ভারত সরকার, আসাম সরকার ২০০৩ সালে বিটিসি চুক্তি করে। তারপর ওরা সবাই আর্মস সারেন্ডার করে ওভারগ্রাউন্ডে এসে গেল। এই ছেলেদের নিয়ে একটা সংগঠন বানিয়েছে ওয়েলফেয়ার অফ এক্স-বিএলটি। এরা বেশিরভাগই ইউথ বিপিএলের মেম্বার হয়। তাও কিছু এখনও এক্স-বিএলটি হিসেবে কাজ করে। এই বিএলটির ওপরে ওরা সমস্ত অভিযোগ দেয়। মুসলিম এলাকায় যে সব ঘটনা হয়েছে সব ওরা বিএলটির ওপর চাপিয়ে দেয়। তারপত ওরা কোকরাঝাড় বন্‌ধ করে। আমাদের এদিকে তো বেশিরভাগ বড়ো মানুষ। তাছাড়া বাঙালি, অ-মুসলিম মানুষ থাকে। অ-মুসলিমরা ওদের বন্‌ধ কল সাপোর্ট করেনি। না করার জন্যই কয়েকটা ইনসিডেন্ট হল এখানে। পুলিশের ওপর হামলা, আমাদের ছেলেদের ওপর হামলা হল। তারপর একটা ফরেস্ট ল্যান্ডের ওপর ওরা একটা ঈদগাহ্‌ বানিয়েছিল। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ওই ঈদগাহ্‌টা এভিকশন করে।

মন্থন : ওটা কি চক্রশীলা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি, বেদলংমারিতে?

প্রমীলা রানি : হ্যাঁ। এভিকশন করার পর ৬ জুলাই ওরা গণ্ডগোল করল। পুলিশের ওপর আক্রোশ মেটায়। এদিকে অ-মুসলিম যারা, তারা আশ্চর্য হয়ে গেল, মুসলিমগুলোর এত আস্পর্ধা হয়ে গেছে, এত সাহস ওরা কোথায় পেল, এই ভাবটা জেগে উঠল সবার অন্তরে। হাগ্রামা মুর্দাবাদ এই শ্লোগানটাই থাকে ওদের মুখে। তারপর ১৯ তারিখ রাতুল হককে গুলি করা হল, এরপরেই পরের দিন ভাটিপাড়া গ্রামে একটা বাড়িতে গিয়ে ওরা হামলা করেছিল। ওই হামলার কথা শোনার পর আমাদের চারটে ছেলে গ্রামে গিয়েছিল মোটরবাইকে চেপে। ফেরার পথে জয়পুর নামক এলাকা থেকে সমস্ত মুসলিম বের হয়ে এসে এদের বাধা দিল। এই চারজনকে হত্যা করা হল। সেই পিকচারটা দেখে আমাদের বড়ো ছেলেরা থাকতে পারেনি, তারা উত্তেজিত হয়ে পড়ল। এর থেকেই কিলিং আফটার কিলিংয়ের সূত্রপাত হল ২০ তারিখ থেকে। ২০ তারিখের পর কয়েকটা গ্রামের গাঁওবুড়াকে নিয়ে মুসলিম ছেলেরা আমাদের বড়ো গ্রামে গিয়ে আলাপ করেছিলেন, পরিস্থিতি এখন ভালো নয়, আমরা এখানেই থাকব, বসবাস করব। আমাদের বড়ো গাঁওবুড়া বললেন, ঠিক আছে, কালকে আমি সকলকে ডেকে পিস মিটিং করব। এই আলাপের মাঝেই একটা মুসলিম চ্যাংড়া দূরে গিয়ে টেলিফোনে কয়েকটা মুসলিম ছেলেকে ডেকে নেয়। তখনই ওরা ওই গ্রামটা অ্যাটাক করে। ওখানে দুজন মহিলা, দুজন বৃদ্ধ এবং একজন পুরুষ মানুষকে হত্যা করা হয়। এখনও বোধ হয় একজন হাসপাতালে আছে। এটাই শুরু। শুরুটা তো বড়োরা করেনি।

   বাইরের মিডিয়াতে অনেক কথা বলা হয়েছে, বড়োরা এথনিক ক্লিন্সিং করার চেষ্টা করছে। এটা সত্য নয়। অন্যান্য সম্প্রদায়কে শান্ত করার জন্য অনেকগুলি সংগঠনকে নিয়ে আমরা একটা কো-অর্ডিনেশন কমিটি ফর কমিউনাল হারমনি তৈরি করেছি। এটা নিয়ে আমরা গ্রামে গ্রামে যাই।

মন্থন : এর মধ্যে কি স্থানীয় মুসলমানরাও আছে?

প্রমীলা রানি : না, ওদের নেওয়া হয়নি।

মন্থন : ওদের সঙ্গেও তো কথা বলা দরকার?

প্রমীলা রানি : কথা বলা দরকার ঠিকই। কিন্তু এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, একটা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দিয়েছিল, মুসলিমদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর বড়োরা অন্য জাতিকেও তাড়িয়ে দেবে। অন্য জাতিকে আমরা কিছুতেই তাড়িয়ে দিতে পারি না, এটা অন্যদের বোঝানোর দরকার আছে। এই চিন্তা থেকেই হাগ্রামা মহিলারি সবাইকে দায়িত্ব দিল এবং আমরা ওই কমিটি তৈরি করেছি। এতে ব্যক্তি নয়, সামাজিক সংগঠনগুলো মেম্বার। এতে ২৭টা সংগঠন যোগ দিয়েছে। তারপর আমরা সবাইকে শান্ত করতে পারলাম। আদিবাসীদের অন্তরে সামান্য সন্দেহ ছিল। কেননা ১৯৯৬ সালে একটা ঘটনা নিয়ে আমাদের বড়োদের সঙ্গে আদিবাসীদের হাঙ্গামা হয়েছিল। তার জন্য আমরা ভিতরে ভিতরে কাজ করছি। যেহেতু উত্তেজনা থামেনি, তাই আমরা মুসলিমদের এর মধ্যে ডাকিনি। পরে আমরা ওদের ডাকব। সরকারকেও আমি বলেছি মিটিংয়ে, এখন যদি ওদের গ্রামে নেওয়া হয়, তাহলে ঠিক হবে না। কারণ এখনও সব শান্ত হয়নি। 

মন্থন : বিটিএডির মধ্যে শতাংশ হিসেবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী কারা কত আছে?

প্রমীলা রানি : এটা তো ট্রাইবাল বেল্ট অ্যান্ড ব্লক এলাকা নিয়ে বিটিসি গড়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে এখানে আমরা ৫০%-এর ওপরে। ট্রাইবাল (এসটি) হিসেবে বড়ো ছাড়াও রাভা আছে, সনোয়াল কাছারি আছে, আরও কিছু আছে। এর বাইরে রাজবংশী, নাথ গোষ্ঠী, আদিবাসী আছে --- আদিবাসীরাও বাইরে থেকে এসেছে ... লোকাল মুসলিমদের পপুলেশন অত বাড়েনি, বেড়েছে বাংলাদেশ থেকে যারা এসেছে তাদের সংখ্যা।
Comments