উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে

 


১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বড়োভূমিতে বহু জাতি বা গোষ্ঠীগত দাঙ্গা হয়েছে। ১৯৯৩-এর অক্টোবর মাসে বঙ্গাইগাঁও জেলার বড়ো-মুসলমান দাঙ্গায় প্রায় পঞ্চাশজন নিহত হয়। সেইসময় উৎখাত হওয়া প্রায় পাঁচ হাজার বাঙালি মুসলমান মানুষ কোকরাঝাড় এবং বঙ্গাইগাঁও জেলার বেশ কিছু শরণার্থী শিবিরে আজও চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এরকমই একটি শিবিরে আমরা হঠাৎই গিয়ে পৌঁছাই। বঙ্গাইগাঁওয়ের হাপাসরা গ্রামে সেই শিবির কমিটির সম্পাদক হাবিলউদ্দিন আহমেদের নিজস্ব প্রতিবেদন এখানে প্রকাশ করা হল। ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে বরপেটা জেলাতেও বড়ো-মুসলমান দাঙ্গায় প্রায় একশোজন নিহত হয়। তাদের অনেকে আজও বাঁশবাড়ি শরণার্থী শিবিরে রয়েছে। ১৯৯৬ সালের মে মাসে কোকরাঝাড় ও বঙ্গাইগাঁও জেলায় বড়ো-সাঁওতাল দাঙ্গায় প্রাণ হারায় দুই শতাধিক মানুষ এবং গৃহহীন হয় দুই লক্ষের বেশি মানুষ। ১৯৯৮ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ফের বড়ো-সাঁওতাল সংঘর্ষে পঞ্চাশের বেশি মানুষ মারা যায়। মাঝে সাময়িক বিরতির পর ২০০৮ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর মাসে উদালগুড়ি ও দরং জেলায় মুসলমান-বড়ো সংঘর্ষে প্রায় সত্তরজন মারা যায়, দুই গোষ্ঠীর এক লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়। পরিসংখ্যানগুলি পাওয়া গেছে রিফিউজি ওয়াচ, ৩৭, জুন ২০১১, সাংবাদিক নির্মাল্য ব্যানার্জির প্রতিবেদন থেকে। অনুলিখন জিতেন নন্দী।           


 


আমরা ১৯৯৩ সালের ৭ অক্টোবর উত্তরাঞ্চলের আমডাঙা, মিলনবাজার, আনন্দবাজার, ভওরাগুড়ি, পাটাবাড়ি, মালিভিটা ইত্যাদি গ্রাম থেকে উৎখাত হয়ে এসেছি। সেদিন ভোররাতে চারটার সময় বড়ো উগ্রপন্থীরা আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। তখন ওই অঞ্চলটা ছিল পুরোনো কোকরাঝাড় জেলায়, এখন বিটিএডি এলাকার মধ্যে চিরাং জেলায়। ওখানে ৫৪টা গ্রামে মুসলমান জনসংখ্যা বেশি ছিল। এলএমজি নিয়ে ওরা আক্রমণ করে। ভয়ে ঘরদোর ছেড়ে লোকে ভুটানের দিকে রওনা দেয়। তারা পায়ে হেঁটে ভুটানের গেলামপুর হয়ে বঙ্গাইগাঁওয়ে আসে। পরবর্তীতে কোকরাঝাড়ের ডিসি-কে জানানোর পর আমাদের গাড়ি দেওয়া হল। আমাদের নিয়ে এসে কোকরাঝাড়, বঙ্গাইগাঁও, বাসুগাঁওয়ের বিভিন্ন স্কুল-কলেজে রাখা হয়। পনেরো দিন আমরা ওখানে ছিলাম। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়া এসে আমাদের উত্তরাঞ্চলে ফিরিয়ে নিয়ে যান। সেখানে তিনভাগে আমরা পাঁচ বছর ছিলাম। একদিন হঠাৎ রাতের অন্ধকারে সিআরপি বাহিনী আমাদের ছেড়ে চলে এল। আমাদের লোকেরা সকালে উঠে দেখল, সিআরপি নেই। কী হল? ভয়ের তাড়নায় একসময় আমরা নিজেরাই গাড়ি ভাড়া করে এখানে এলাম। এই জায়গাটা আমরা ভাড়া করে ঠিক করেছিলাম। ২০০০ সালে ১১২২টা পরিবার এখানে এসেছিলাম। লোকে কী খাবে? ইটভাটায় পরিবার নিয়ে গিয়ে, বিভিন্ন শহরে রিকশা টেনে, দৈনিক মজুরি করে লোকে পয়সা রোজগার করেছে। ২০০৪ সালে সরকার আমাদের ভেরিফাই করল। মণ্ডল এসে সার্ভে করল। ৫৫৮ পরিবার তাতে সন্নিবিষ্ট হল। যারা বাইরে কাজ করতে গিয়েছিল, তারা ভেরিফাই থেকে বাদ পড়ল। এরকম ৫৮৮টা পরিবার বাদ পড়ল। যাদের ভেরিফাই হল, তাদের সরকার পঞ্চাশ হাজার করে টাকা দিল। তারা এক পোয়া, আধা পোয়া মাটি নিয়ে একটা-দুটো ঘর করে চলে গেছে। বাকি ৫৮৮টা পরিবার আমরা উনিশ বছর এই ক্যাম্পে আছি।

   বর্তমানে ১৯ জুলাই থেকে বড়োল্যান্ডে আবার দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়ে গেল। তার আগে আমরা বঙ্গাইগাঁও শহরে যেতাম কাজ করতে। এই গণ্ডগোলের পর থেকে আমাদের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। কামলা খাটতে গেলে ওরা হাজিরা নেয় না। বিটিএডি থেকে ঘোষণা করেছে, যারা কামলা করার জন্য আসবে, তাদের কাজ-কামে নেওয়া হবে না। যে নেবে, তাকে দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। আমাদের বলে বাংলাদেশি। এই অবস্থায় কোনো কোনোদিন আমাদের পরিবার নিয়ে না খেয়েও থাকতে হয়।

   এখানে আধি করালি করে (ভাগে) মাটি নেওয়া যায়, যার সুবিধা আছে নিতে পারে। আমাদের টাকাপয়সা নাই, গরুবাছুর নাই, কী করে পারব?

   কারও ১৯৫১ সাল থেকে, কারও ১৯৬৬-৬৭ সাল থেকে কমপ্লিট কাগজপত্র আছে। আমাদের পূর্বপুরুষরা আগের থেকে আসামে আছে। উনিশ বছরে আজ পর্যন্ত উনত্রিশবার গুয়াহাটির দিসপুরে ধরনা দিয়েছি, তেরোবার আমরণ অনশন করেছি। এবছরের ১৫ মার্চ আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ-এর বাসভবনে আমাদের ডাকা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে বদরুদ্দিন আজমলের এআইইউডিএফ এবং শরণার্থীদের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। সেখানে আমরা দাবি দিয়েছিলাম, আমাদের শরণার্থীদের দুই লাখ করে টাকা দিতে হবে; একটা করে ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘর দিতে হবে; আধা বিঘা করে মাটি দিতে হবে আর একটা করে বিপিএল কার্ড দিতে হবে। উনি বলেছেন, আমি মাটি দিতে পারব না। তবে পঞ্চাশ হাজার করে টাকা, একটা করে ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘর আর বিপিএল কার্ড, এই তিনটা বস্তু দিয়ে আমি আপনাদের সমস্যার সমাধান করব। উনি তিনমাস সময় নিয়েছিলেন। আজ সাতমাস চলছে, কোনো কাজই আমরা আসাম সরকারের কাছ থেকে পাইনি।

     আমরা যে ৫৮৮ পরিবার আছি, চাঁদা উঠিয়ে আমরা এই এগারো বিঘা মাটিটার জন্য বছরে পঞ্চাশ হাজার টাকা ভাড়া দিই। প্রথমে ছিল সতেরো হাজার। তারপর বেড়ে বেড়ে এই জায়গায় এসেছে। উনিশ বছর এইভাবে আছি।
Comments