মন্থন সাময়িকী : জুলাই আগস্ট ২০১২

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

উনিশ বছর শরণার্থী শিবিরে


দাঙ্গা-বিধ্বস্ত বড়োভূমি থেকে ফিরে


বড়োভূমিতে দাঙ্গার দিনলিপি


বড়োভূমি ও বড়ো জনজাতির ইতিহাস


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিত


১৯৯৬ সালের বড়ো আদিবাসী

সংঘর্ষের বৃত্তান্ত 


বড়ো মুসলমান সংঘর্ষের

অবসান কোন পথে


আত্মঘাতী সংঘর্ষ : সমাধান কোনপথে


কোকরাঝাড়ের ডায়েরি


বড়ো নেত্রীর চোখে

বড়ো মুসলমান সংঘর্ষ


শরণার্থী শিবির থেকে বলছি








 

সম্পাদকীয়

দাঙ্গার নেপথ্যে  


বড়ো জাতির নিজ ভূমে পরবাসী হওয়ার ইতিহাস অনেক পুরোনো। ব্রহ্মপুত্র নদী তীরবর্তী আদিম অধিবাসী বড়োরা ভারতবর্ষের চাষিসমাজ গড়ে ওঠার আগেই সেখানে বসবাস করত। বর্ণ বা জাত ব্যবস্থা ভিত্তিক গ্রামসমাজে হাল-লাঙল দিয়ে চাষ এল ব্রহ্মপুত্রের উর্বর নদী উপত্যকায়। ক্রমশ বড়োরা গভীর অরণ্যে সরে যেতে থাকে। চাষের কাজে তারা সেচ ব্যবস্থার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। চালিয়ে যেতে থাকে ঝুম চাষ আর শিকার।

     আমরা সম্প্রতি আসামে গিয়েও শুনেছি, বড়োদের শিকারের দক্ষতার কথা। তীর দিয়ে ময়াল সাপকে গাছের গায়ে গেঁথে ফেলার গল্প শুনেছি গুয়াহাটির প্রবীণদের কাছে। দুঃখের কথা, আজ সেই তীর-ধনুক আর বাঁটুল (গুলতি) ব্যবহার হল প্রতিবেশি আর এক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

     পূর্ববঙ্গের মুসলমান চাষি এসেছে অনেক পরে। তারপর এসেছে চা বাগিচার শ্রমিক। তাদের মধ্যেও এসেছিল অন্য প্রদেশের বহু আদিবাসী। প্রায় এক শতাব্দী বড়ো জাতি এ নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন হয়নি। আমরা এমন গল্পও শুনেছি, বড়ো গাঁওবুড়া উদারভাবে আগত অন্য জাতির মানুষকে তাদের পাশে ঠাঁই দিয়েছে।

     সমতলের বড়োরা যখন ঝুম চাষ থেকে হাল-লাঙল দিয়ে ধান চাষে এল, সময়টা বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ শাসকদের হাত ধরে আমাদের আধুনিক রাজনীতির হাতেখড়ি হয়ে গেছে। আমরা শিখে গেছি রাষ্ট্রের কাছে দাবি করতে। কংগ্রেস, কমিউনিস্ট তো এসেছেই। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকেই অল আসাম প্লেন্‌স ট্রাইবাল লিগ এসে গেছে। সকলেই রাষ্ট্রের প্রাধান্য মেনে নিয়েছে। যে আদিবাসী, অরণ্যবাসী, পাহাড়িরা আলাদা স্বশাসিত সমাজ হিসেবে স্বাধীন এবং স্বনির্ভর জীবনযাপন করত, তারাও শিখল রাষ্ট্রের কাছে স্বশাসন প্রার্থনা করতে।

     নিউ বঙ্গাইগাঁও স্টেশনের কাছে এক চায়ের দোকানে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে। এরা বাঙালি মুসলমান। এখানকার গ্রামের খেতে শালিধান (আমন) লাগানো হয়েছে। একজন বলছিলেন, চায়না ধান নামে একটা বিদেশি বীজের কথা। দেশি স্থানীয় বীজে ফলন যেখানে বিঘা প্রতি দশ মণের নিচে, চায়না বীজে ফলন বিশ মণ। উপযুক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও জল ব্যবহার করলে নাকি হাতেনাতে ফল পাওয়া যায়। এই হল আধুনিক চাষ।

     এর সঙ্গেই রয়েছে আধুনিক জীবনযাপন এবং আধুনিক শিক্ষা। তার ডালি উজার করে বসে রয়েছে আধুনিক বাজার। ফলে নানান দিক থেকে জমির চাহিদা এবং কেনাবেচা বেড়েছে। তথাকথিত স্বশাসিত বড়োভূমি এবং তার দস্তুর দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না জমির টানাপোড়েন।

     বড়ো যুবক এমনও বলে ফেলছেন, অবৈধ বাংলাদেশি তাড়াতে পারলে নাকি বড়োভূমির আধা জমি ফাঁকা হয়ে যাবে! কী নিশ্চিন্তি!

       যে ভূমির অধিকারের জন্য সারা দেশ জুড়ে আদিবাসীরা লড়াই করছে, প্রাণ দিচ্ছে, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়ে কোথাও কোথাও ফিরিয়ে দিচ্ছে কর্পোরেট লুঠেরাদের। একই সময়ে সেই ভূমির অধিকারের জন্য দাঙ্গায় শামিল হয়েছে বড়ো-সমাজ। রক্তাক্ত আসামের বড়োভূমি; ভূমি থেকে উৎখাত লক্ষ লক্ষ দরিদ্র বাঙালি মুসলমান।
Comments