মন্থন সাময়িকী নভেম্বর ডিসেম্বর ২০১১

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

একচিকিৎসকের চোখে আমরি-কাণ্ড


তিব্বতীদেরচোখে চীন


অকুপাই আন্দোলনের কিছু বৈশিষ্ট্য


অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট আন্দোলনকারীদেরউদ্দেশ্যে দুজন শ্বেতকায় মানুষের খোলা চিঠি


অকুপাই আন্দোলন

দাবিদাওয়া, কে কী চায়?



এক শতাংশেরআমেরিকা



নতুন প্রতিরোধ আন্দোলন











 

সম্পাদকীয়


আমরি-কাণ্ড : কে দায়ী?


কে দায়ী? তারা কি সেই সিকিউরিটি গার্ড, যারা মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে রেখেছিল এবং বিপর্যয় দেখেও টলেনি যাদের মন? যখন পাশের পাড়া থেকে মানুষ এসে উদ্ধারকার্যে হাত লাগাতে চাইছিল, তখনও তারা ছিল নির্দেশমাফিক কর্তব্যপালনে অটল। টানা সাড়ে চার ঘন্টা বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যার ফলে স্থানীয় যুবকদের মাঝরাতে পাঁচিল টপকে, গাছে উঠে, জানলা ভেঙে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিষাক্ত গ্যাস আর ধোঁয়ার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল, নিজেদের জীবন বিপন্ন করে রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয়েছিল। আমরা কি ভুলতে পারি শঙ্কর মাইতি, তড়িৎ পুরকাইতদের কথা? অথচ ওদের পঞ্চাননতলার বস্তির লোকেরা কোনোদিনও মৃত্যুর মুখে পড়েও আমরিতে চিকিৎসা পায়নি! সামান্য মানুষের মতো ব্যবহারটুকুও কি কোনোদিন ওরা আমরির লোকেদের কাছে পেয়েছে? স্থানীয় হওয়ার দোষে এই পাড়ার যোগ্য লোককেও আমরিতে কাজ দেওয়া হয়নি।


কে দায়ী? সিকিউরিটি গার্ডেরা বলেছিল, আমাদের অর্ডার নেই, আমরা দরজা খুলতে পারব না। ওই নার্সিং হোমে কোনো নাইট-সুপার ছিল না। আসলে এবারের ঘটনার কিছুদিন আগেই আমরিতে আগুন লেগেছিল। সিকিউরিটির লোক ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করেছিল। ইতিমধ্যে স্টাফেরা মিলে আগুন নিভিয়ে ফেলল। একজন সিকিউরিটি গার্ডকে পনেরো দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হল। সুতরাং অর্ডার ছাড়া মানবিক বিবেচনা দেখানোর সাজা ওরা জেনে গিয়েছিল। তাই পরের ঘটনার দিন ওরা ডাবল তালা মেরে দিয়েছিল গেটে! আর যাদের অর্ডার দেওয়ার এক্তিয়ার, তারা ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টা চালিয়ে গেছে যাতে ফায়ার ব্রিগেডের কাছে খবর না যায়, কোথাও না খবর যায়! রোগীদের অসহায় বাড়ির লোক যখন গেটে এসে ঢুকতে চেয়েছে, সিকিউরিটি বলেছে, আপনারা এখানে থাকুন, আমরা সবাইকে নামিয়ে আনব। আর ভিতরে ছিল কিছু আনট্রেন্‌ড নার্স, যাদের দেড়-দুই থেকে খুব বেশি হলে পাঁচ হাজার টাকা মাসমাইনে দিয়ে খাটিয়ে নেওয়া হয়। তারা এই কম মজুরিতেও এখানে কাজ করে, নিজেদের শিক্ষিত (ট্রেন্‌ড) করে নেওয়ার জন্য। রোগীদের কী হল না-হল, তাতে তাদের বয়েই গেল! তবু যে দুজন কেরলী মেয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শেষ রোগীটিকে বার করে এনেছিল, তারা বিষাক্ত গ্যাসের বলি হয়। তাদের শেষকৃত্যে কোনো সহকর্মীকে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি, কারণ সেটাও ছিল অর্ডার। সকল কর্মীর মনে গেঁথে রাখা হয়েছিল এক অলিখিত স্ট্যান্ডিং অর্ডার : মানবিকতা দেখানো এখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ!

তাহলে কি অর্ডার দায়ী? একজন ডাক্তার সংবাদপত্রের কাছে বলেছেন, দায়ী হল আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। যে দৃষ্টিভঙ্গি বলে, যত বড়ো কাণ্ডই হোক না কেন, ম্যানেজ করে নাও। অর্থাৎ দুটো যোগ করে নিলে দাঁড়ায়, যে দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরি চলে (কিংবা অন্য কোনো নার্সিং হোম) তারই স্বাভাবিক ফলশ্রতি হল কর্তাদের বিশেষ ধরনের অর্ডার।

কিন্তু একজন অফিসার বা প্রশাসকের অর্ডার কীভাবে সকলে একবাক্যে পালন করে চলে। শুধু কি চাকরি হারানোর ভয়ে? আমার পরিচিত একজন নার্স পরেরদিন সকালে বাড়িতে তাঁর স্বামীকে বলেছেন, চুপ, কাউকে বোলো না। ইতিমধ্যে এত বড়ো কাণ্ড, এত মৃত্যু ঘটে গেছে। তারপরও ওই প্রতিষ্ঠানের এক সাধারণ কর্মী বলছেন, চেপে যাও! আর এক জায়গায় একটা গল্পও শুনেছি, এই হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগে ঘটা করে এক-একটা অ্যানুয়াল মিট হয়, সেখানে বাবু ও কর্মচারী সকলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া ফুর্তি করে, মদ আর খাদ্যের এলাহি আয়োজন


--- জানো বাইশ রকম মাংস হয়েছিল! এইভাবে নরমে-গরমে গাজর আর চাবুকের প্রশাসন সবাইকে অর্ডারের প্রতি অনুগত করে তোলে, সবাই ম্যানেজ করতে শেখে! কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি কোথা থেকে আসে? আসুন অন্যত্র আরও একটু খুঁজে দেখা যাক।


কে দায়ী? প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে (ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায়) আমরিতে যুক্ত ইমামি গোষ্ঠীর চার বোর্ড-সদস্য আর এস আগরওয়াল, আর এস গোয়েঙ্কা, মনীশ গোয়েঙ্কা, প্রশান্ত গোয়েঙ্কা এবং শ্রাচী গোষ্ঠীর এস কে টোডি ও রবি টোডিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; ইমামির অপর দুই বোর্ড-সদস্য আদিত্য আগরওয়াল এবং প্রীতি সুরেকা পলাতক। ইমামি গোষ্ঠীর তরফে আদিত্য আগরওয়ালের হাসপাতাল ব্যবসা দেখভাল করার দায়িত্ব রয়েছে। শ্রাচী গোষ্ঠীর এস কে টোডি ঢাকুরিয়ার আমরির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আগরওয়াল বা গোয়েঙ্কা পরিবারের সদস্য না হয়েও তিনি কিন্তু ইমামির বোর্ড-সদস্য। বোরোপ্লাস, নবরত্ন কেশতেল, ঝান্ডু বাম, চ্যবনপ্রাশের মতো প্রোডাক্ট নিয়ে বাজার মাত করা ইমামি গোষ্ঠীর ৬৬% শেয়ার রয়েছে আমরি হাসপাতালে। ইমামির কর্ণধার (চিফ একজিকিউটিভ অফিসার) এন এইচ ভানসালি এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমাদের কোনো কাজকর্ম এই ঘটনার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। ... কোনো প্রভাব পড়বে না, দুইয়ের মধ্যে কোনো আর্থিক বা পরিচালনগত যোগাযোগ নেই। এই প্রসঙ্গে দিল্লি থেকে ২ জানুয়ারি ২০১২ আলাদা বিবৃতি দিয়ে ব্যবসায়ী সংস্থা ফিকি (ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ) দুটো কথা জানিয়েছে : এক, যারা এই হাসপাতালের পরিচালন-কর্মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তাদের দায়িত্ব চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। এটা স্বচ্ছ এবং বাস্তবোচিতভাবে করতে হবে। দুই, একই সঙ্গে, যারা দোষী নয় এবং কোনো ব্যবসার দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য দায়ী নয়, তাদের এখনই ছেড়ে দিতে হবে। এটাই ন্যায্য এবং এটা করলে দেশীয় বিনিয়োগকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো নেতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে পড়া রোধ করা যাবে এবং তা ভবিষ্যতে লোকহিতৈষী কার্যকলাপকে উৎসাহিত করবে, যার ফলে আরও অনেক হাসপাতাল তৈরি হতে পারবে। এছাড়া, আমরি-কাণ্ডের জন্য নিয়মমাফিক দুঃখপ্রকাশ এবং প্রকৃত দোষীদের বিচার ও শাস্তি দেওয়ার কথাও ফিকি বলেছে।

কে দায়ী! আমরি-কাণ্ডের এই প্রশ্ন হয়ে ওঠে বড়ো সংবাদপত্র এবং টিভি-চ্যানেলগুলোর রেটিং বাড়ানোর খাদ্য! ফিকির বিবৃতিদানের পরই  তারা আরও এক দফা সুর চড়িয়ে বলে, কেন অন্য বোর্ড-সদস্য, যেমন চিকিৎসক ও সরকারি প্রতিনিধিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? (অভিযোগ উঠে এসেছে, চিকিৎসক এম কে ছেত্রী, প্রণব দাসগুপ্ত এবং মেডিকাল এডুকেশনের ডাইরেক্টর সুশান্ত ব্যানার্জির প্রতি প্রশাসন নরম মনোভাব দেখিয়েছে। এঁরাও প্রত্যেকে আমরির ডাইরেক্টর।) আমরি হল এরাজ্যের অন্যতম প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ ব্যবসা (সরকারি শেয়ার ২%)। অতএব মিডিয়া বাজার গরম করার জন্য শুরু করে দিল তুই থুলি না মুই থুলি নাট্যরঙ্গ। কে দায়ী? এটা একটা জমজমাট মজার তর্ক! ফায়ার ব্রিগেড না পুলিশ? আগের সরকার না বর্তমান সরকার? পুরসভা না স্বাস্থ্যদপ্তর? অর্থাৎ যতক্ষণ লোকের নজর থাকবে এই ঘটনার ওপর, যতক্ষণ আত্মীয়-বন্ধুদের টাটকা শোকের আয়ু, ততক্ষণ তরজা চালিয়ে যাও। তারপর একই গড্ডালিকা প্রবাহে চলতে থাকুক দুনিয়া!

এত অবধি এসে আমরা একটা গোলকধাঁধায় আটকে যাচ্ছি। সরাসরি দায় হিসেবে কর্তব্যরত সিকিউরিটি গার্ডের গর্দান (!) নেওয়া যেতে পারে। আবার তলিয়ে দেখলে, দায় তো অর্ডারের, অর্ডারের পিছনে কাজ করেছে যে মানসিকতা বা নীতি, তার। কিন্তু সেই নীতি তৈরি হয় ব্যবসার সামগ্রিক নীতিমালার সঙ্গেই। এই নীতিমালার প্রেরণা আসে কোথা থেকে? সেটা আবার যে কোনো বড়ো (কর্পোরেট) ব্যবসার ক্ষেত্রে মোটামুটি এক : ক্রমাগত অধিকতর মুনাফার হার অর্জন করা। তা স্বাস্থ্যকেন্দ্র হোক, ঝান্ডু বাম হোক বা প্যাকেট-বন্দী মুরগির ঠ্যাং হোক, সর্বক্ষেত্রে সেই একই প্রেরণা। ফিকি ভয় দেখাচ্ছে, আগরওয়াল-গোয়েঙ্কা-টোডিদের আটকে রাখলে লোকহিতৈষী কাজে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। লোকহিতৈষী কাজ বলতে কী বোঝায়? যেমন, হাসপাতাল, স্কুল, গবেষণাকেন্দ্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা। কিছুদিনের মধ্যেই আমরি সমেত অন্য হাসপাতাল ব্যবসায় ইমামি গোষ্ঠীর কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ লোকের হিত বা মঙ্গল লোকে করবে না, করবে ফিনান্স বা পুঁজি। আমরির ক্ষেত্রে এই পুঁজির সিংহভাগ ইমামির। ইমামির পুঁজির মধ্যে যেমন আগরওয়াল-গোয়েঙ্কার পয়সা ও বুদ্ধি আছে, তেমনই আছে জনগণের পয়সা। ইমামির পাবলিক শেয়ার প্রায় ২৮%। সেদিক থেকে পাবলিকও জড়িয়ে রয়েছে আমরির ঘটনার সঙ্গে। আমরি থেকে যদি বেশি বেশি মুনাফা কামানো না যায়, তাহলে ডিভিডেন্ড কমে যাবে। যেমন দেখা গেছে, আমরির ঘটনার পরেই ইমামির শেয়ারের দর পড়তে শুরু করেছিল। যারা টাকা খাটায়, তারা নিমেষে পালিয়ে অন্য কোম্পানির শেয়ার কিনতে চলে যাবে। আগরওয়াল-গোয়েঙ্কার বুদ্ধিই নয়, পাবলিকের বৈষয়িক বুদ্ধিও এখানে পরোক্ষভাবে কাজ করছে। প্রসঙ্গত, আমরা জানি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বেঙ্গল কেমিকাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড কম রাখতে চাওয়ায় তাঁর সঙ্গে বেঙ্গল কেমিকালের অন্য কর্মকর্তাদের বিরোধ হয়। প্রফুল্ল চন্দ্র নিঃশব্দে বেঙ্গল কেমিকাল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তিনি চেয়েছিলেন, বেঙ্গল কেমিকালের উৎপন্ন জিনিস কেবল স্বদেশি-ই নয়, তা দেশের মানুষ স্বল্প দাম দিয়ে ব্যবহার করতে পারবে। সেদিন তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। মুনাফার প্রেরণার জয় হয়েছে।

তবে মুনাফার প্রেরণাও সব নয়। শেয়ারবাজারে ফাটকার লোভ ছাড়াও এত বড়ো প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বা বাইশ রকম মাংস খাওয়ার লোভ কি নেই? টাকার লোভ ছাড়াও আমাদের রয়েছে ক্ষমতার লোভ, নাম করার লোভ, এরকম আরও কত বিচিত্র লোভ। হালফিল অকুপাই আন্দোলনের জনসমাবেশে উঠে এসেছে এই কথাটা, গ্রিড। গ্রিড তো শুধু কর্পোরেট-লোভ নয়, কর্পোরেট ব্যবস্থায় বাস করা বঞ্চিত ৯৯ শতাংশেরও লোভ। লোভ কি আমাদের সমূলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?   

 

আপাতত আমরা এক গোলকধাঁধায় আটকে রইলাম। তবে একটা কথা সাহস করে ভাবা যেতে পারে, লোকহিত বা লোকের মঙ্গলের কাজ অন্যের ঘাড়ে না ফেলে লোক বা লোকসমাজ কি নিতে পারে? কীভাবে? মন্থনের পাতায় পাতায় সেই সাহসী চর্চার উদ্‌গম হোক।
Ċ
Manthan Samayiki,
Apr 16, 2012, 10:26 PM
Comments