মন্থন সাময়িকী জুলাই আগস্ট ২০১১

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

লন্ডনে দাঙ্গা না বিদ্রোহ?

দুর্নীতির লজিক

নীতি-দুর্নীতির পাকেচক্রে

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

আইনি থেকে বেআইনি খনিজ উত্তোলন

দুর্নীতির অদৃশ্য লম্বা হাত

তিব্বতীদের চোখে চীন [২]

শ্যামলী খাস্তগীর স্মরণে


 

শ্যামলী খাস্তগীর স্মরণে

জন্ম : ২৩ জুন ১৯৪০                            মৃত্যু : ১৫ আগস্ট ২০১১

 


শ্যামলী খাস্তগীরের জীবনাবসান হল ২০১১ সালের স্বাধীনতা দিবসের দিন। কয়েক সপ্তাহ আগে স্ট্রোক হয়ে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং তখন থেকে তিনি ভুগছিলেন। জীবনের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা বিচ্ছুরিত হত তাঁর বাঙ্ময় দুটি চোখে। তাঁর দৃষ্টি ছিল সোজাসাপটা, অনুসন্ধানী। কেউ কেউ বলত বড়ো দুঃখী বিষাদময় সেই দৃষ্টি। সুন্দর সেই দৃষ্টিতে ফুটে উঠত জীবনের প্রতি, সমগ্র জীবজগতের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং এক সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা --- যেখানে তিনি নিজে আর সক্রিয়ভাবে থাকবেন না।

        তাঁর পিতা সুধীর খাস্তগীর ছিলেন এক প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর এবং বেঙ্গল স্কুল অফ ইন্ডিয়ান আর্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অত্যন্ত ছোটো বয়সে দুঃখজনকভাবে শ্যামলীর মাতৃবিয়োগ হয়। তিনি দেরাদুনে বড়ো হয়ে ওঠেন এবং শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেন। ২১ বছর বয়সে চীনা যুবক তান লি-কে বিয়ে করার পর কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। সেখানেই ১৯৬৬ সালে তাঁদের পুত্র আনন্দ-র জন্ম হয়। পরবর্তীকালে তান লির কাজের সূত্রে তাঁরা পশ্চিম কানাডায় চলে যান। সেখানেই পরিবেশ ও মানবসম্পদের ক্ষতির বিনিময়ে যেসব অর্থনৈতিক ও সামরিক উন্নয়ন হয়, সেসব বিষয়ে শ্যামলী প্রথম চিন্তাভাবনা শুরু করেন। যেসব গোষ্ঠী এই ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। এইসব বিষয়গুলোকে তিনি নিজের দেশীয় পটভূমির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, যে উদ্দেশ্যে এবং ক্ষোভ প্রকাশের যে উপায়ে ওই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে সেক্ষেত্রে গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি ওখানকার স্থানীয় উপকরণগুলোকে সংগ্রহ করে ভারতীয় রন্ধনপ্রণালীর অবয়বে সেগুলোকে সংহত করে এক অন্যন্য রন্ধনশৈলী গড়ে তুলেছিলেন। বেশ কয়েক বছর তিনি মধ্য আমেরিকা সহ ওখানকার নানা জায়গায় এইভাবে আন্দোলন চালিয়ে যান। ওই সময়ে শ্যামলীর সঙ্গে তান লির বিচ্ছেদ ঘটে। শ্যামলী তখন পরমাণু অস্ত্র ও পরমাণু শক্তির বিরুদ্ধে খুবই দায়িত্বশীল এক প্রতিবাদী কর্মী। এই বিষয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে অহিংস আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করার জন্য শ্যামলীকে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারও করা হয়েছে এবং তিনি জেলও খেটেছেন। তাঁর অসুস্থ বাবাকে দেখভাল করার জন্য আর ছেলের কাছে থাকার জন্য শ্যামলী মাঝেমাঝে ভারতে ফিরতেন। এর আগেই অবশ্য তাঁর ছেলেকে লেখাপড়া শেখার জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮২ সালে শ্যামলী পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে আসেন।

        ভারতে এসে শ্যামলী তাঁর মানসিকতার সঙ্গে মেলে এমন সব সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। অনেক সময় তিনি তাঁর ভিতরের কথা একাই সাহসভরে প্রকাশ করেছেন। তাঁর ছিল আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং পৃথিবীর নানা জায়গায় সামাজিক ন্যায় ও পরিবেশ নিয়ে যারা আন্দোলন করছে তাদের সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগ। এগুলোর মূল্য ছিল অপরিসীম। এই গ্রহে বিভিন্ন জায়গায় যেসব মানুষ একই স্বার্থে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে এক যোগাযোগের সূত্র ছিলেন তিনি। অজস্র ঠিকানায় ভর্তি একটা নীল নোটবই, অনেকটা আজকের ওয়ার্ল্ড ওয়েবের মতো, কয়েক দশক ধরে অনেক অসাধারণ আন্তর্জাতিক যোগসূত্র তৈরি করেছিল। ভারতবর্ষের মধ্যে অনেক প্রত্যক্ষ প্রতিরোধে শ্যামলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। শেষ বয়সে তাঁর হাঁপানির অসুখ এবং হাঁটার অসুবিধা তাঁকে খানিকটা কাবু করে ফেললেও তিনি বীরের মতো তাঁর কাজকর্ম চালিয়ে গিয়েছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী গান্ধীবাদী পান্নালাল দাশগুপ্তকে তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছর শ্যামলী নিজের বাড়িতে রেখে সেবা শুশ্রূষা করেছিলেন। তাঁর যাত্রা চলছিলই। ২০০২ সালে তাঁর নাতি তাও-এর জন্ম তাঁকে খুশি করেছিল। তাঁর ছেলে আনন্দও যে তাঁরই প্রিয় পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছে, তাতেও তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন।

        তিনি তাঁর বিভিন্ন কাজে নানারকম যে সৃষ্টিশীল উপায় গ্রহণ করেছিলেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব খুব স্পষ্ট। তিনি নিজে ছিলেন এক প্রতিভাময়ী শিল্পী। তিনি নানারকম পোস্টার এঁকে ও পুতুল নাচের প্রদর্শনী করে তাঁর বক্তব্যগুলো তাদের কাছে পৌঁছে দিতেন যাদের কাছে আর অন্যভাবে ওগুলো পৌঁছানো সম্ভব হত না। এইভাবে সারাজীবন ধরে শ্যামলী বিভিন্ন মানুষের কাছে গিয়েছেন, কোনোরকম প্রভেদ না রেখে বা পূর্বধারণাবশত কোনো মানুষকে বাদ না দিয়ে। এইজন্য তিনি অনেক মানুষের ভালোবাসা ও আদর পেয়েছেন। গ্রামসমাজের লোকেরা তাঁকে খুব ভালোবাসত। কারণ তিনি তাদের মধ্যে অক্লান্তভাবে কাজ করতেন। এবং সবসময় বলতেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে মেলামেশায় তিনি যা দিয়েছেন তার চেয়ে পেয়েছেন অনেক বেশি। তাঁর চিন্তাপদ্ধতি ও প্রকাশভঙ্গী ছিল এক শিল্পীর মতো। যারা একটু প্রথাগত কায়দায় বিতর্কে অভ্যস্ত, তারা কিন্তু অনেক সময় ওঁর কথা শুনে একটু বিব্রত হত এবং সেই অবকাশে একজন গভীর চিন্তাবিদকে চিনতে ভুল করত। শ্যামলীর প্রত্যয় গড়ে উঠেছিল সাধারণভাবে আপন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। কিন্তু সেই প্রত্যয় নির্মাণে যেভাবে তিনি যুক্তি সাজাতেন তা ছিল খুবই আকর্ষণীয় ও অপ্রত্যাশিত। খুবই উচ্চ আদর্শের এক ব্যক্তি হিসেবে তিনি চাইতেন তাঁর চারপাশের সবাইও যেন অমনটাই হয়। তিনি কখনও তাঁর মতামত খোলামনে ও স্পষ্ট করে বলতে ভয় পেতেন না। অনেক সময় হয়তো এই কারণে তাঁর কিছু ব্যক্তিগত সম্পর্ক হোঁচট খেয়েছে। কিন্তু তাঁর এই আচরণের মধ্যে ছিল সত্যের প্রতি এক নিঃস্বার্থ আনুগত্য।

        সত্যের প্রতি তাঁর এই আনুগত্যের ভার বহন করা নিয়ে কারোই কোনো সন্দেহ নেই। তবু অনেক অজানা উৎস থেকে আলোকিত হয়ে তিনি তাঁর সতেজতা ও উদারতা বজায় রাখতে পেরেছিলেন। যথাসময়ে প্রাণখোলা হাসিতে তিনি মন ভুলিয়ে দিতেও পারতেন। কঠিন অসুখ থেকে আরোগ্যলাভের সময় যখন সবার মন অশান্তিতে পীড়িত, তখনও তিনি অমন করে হাসি দিয়ে সবার কষ্ট ভোলাতেন। এর থেকে বোঝা যায় তাঁর অন্তরে এক সদাহাস্যময় মানুষ সমস্ত

জীবনভর খেলে বেড়াতো। অন্যেরা যখন বলেছিল শান্তিনিকেতনের আত্মপ্রদীপ নিভে গিয়েছে, তখন তিনি তার শিখা জ্বালিয়ে তুলেছিলেন এবং নিজের মধ্যে সেই দীপালোক বয়ে বেড়িয়েছিলেন। তাঁর বাড়ির দরজা সকলের জন্য খোলা ছিল। সেখানে সবাই মিলে গিয়ে পড়াশুনা করা, আড্ডা মারা, ধরাবাঁধা ছকের বাইরে নানারকম কর্মশালা করা আর তার সঙ্গে তাঁর প্রবাদপ্রতিম রান্না করা সুখাদ্য ও গানবানানোর মজা সম্পর্কে যাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাদের স্মৃতিতে সেসব উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আমার কাছে এবং আমার মতো অনেকের কাছে শান্তিনিকেতনকে অর্থবহ করেছেন শ্যামলীদি।

        আমার সঙ্গে তাঁর শেষবার যখন দেখা হয়, তখন তাঁকে আমি রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা থেকে কয়েক লাইন গান গেয়ে শুনিয়েছিলাম। পরেরদিন সকালে তাঁকে আমরা গাড়ি করে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাচ্ছিলাম, ওখানকার তিলুটিয়া গ্রামে তাঁকে কবর দেওয়ার জন্য। সেদিন আনন্দ বলছিল, উনি নিজেই আসলে চিত্রাঙ্গদা। শ্যামলী দুর্জয় সাহস ও নিঃস্বার্থ আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে দিয়ে একটা জীবন কাটিয়ে গেলেন এবং সত্যের দিকে তাঁর নিজের পথ ধরেই চলে গেলেন। এইজন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরেই শ্রদ্ধার পাত্রী হয়ে থাকবেন। আমরা যদি পরে তাঁর কথা খানিক ভুলেও যাই, তাঁর সততাময় চোখ দুটোর সৌন্দর্য আমরা ভুলব না। সেই চোখ যা মানুষের অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ দৃশ্যাভিনয়ের সাক্ষী এবং তা সেই চোখ থেকেই প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে তাঁর অসাধারণ ভালোবাসতে পারার ক্ষমতায় আরও বড়ো হয়ে আরও বিপুল বৈভবে।

 

নাইজেল হিউজ, ডিপার্টমেন্ট অফ আর্থ সায়েন্সেস, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়; অনুবাদ : তমাল ভৌমিক

 

Comments