মন্থন সাময়িকী জুলাই আগস্ট ২০১১

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

লন্ডনে দাঙ্গা না বিদ্রোহ?

দুর্নীতির লজিক

নীতি-দুর্নীতির পাকেচক্রে

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

আইনি থেকে বেআইনি খনিজ উত্তোলন

দুর্নীতির অদৃশ্য লম্বা হাত

তিব্বতীদের চোখে চীন [২]

শ্যামলী খাস্তগীর স্মরণে


 

তিব্বতীদের চোখে চীন [২]

তমাল ভৌমিক

 


গত সংখ্যায় লেখা শেষ হয়েছিল ৭৯ বছরের বৃদ্ধা পেমোর কাহিনী দিয়ে। এবারের শুরু আরেকজন তিব্বতী মহিলা তেনজিন সেরিং-এর কথায়। ১৯৯৯ সালে লাইভ্‌স ইন এক্সাইল-এর লেখিকা হানি যখন তেনজিন সেরিং-এর সাক্ষাৎকার নেন, তখন তাঁর বয়স ৬৮। এই মহিলার জন্ম তিব্বতের পূর্বদিকে আমদো অঞ্চলে এক কৃষক পরিবারে। ১৯৫৯ সালে চীন তিব্বত আক্রমণ করলে তিনিও পেমোর মতো ভারতে পালিয়ে আসেন। স্বভাবত পেমোর সঙ্গে এঁর জীবনকাহিনীর অনেক মিল। অমিলের দিকগুলো আমরা তেনজিন সেরিং-এর মুখেই শুনব। সবচেয়ে বড়ো অমিল, অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পেমো আর তিব্বতে যেতে পারেননি, তেনজিন গিয়েছিলেন। কিন্তু থাকতে পারেননি, ধরমশালায় ফিরে এসেছিলেন।

          এই প্রসঙ্গে দুটো কথা সেরে নেওয়া দরকার। দুটোই এই লেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। প্রথম কথা, তিব্বতী উদ্বাস্তুদের জীবনী পড়তে গিয়ে দেখলাম মা-মাসিদের কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের মা-মাসিরা পূর্ববঙ্গ থেকে উৎখাত হয়ে এসেছিল দেশভাগের সময়ে। ওদের দুঃখ-কষ্ট, দেশের প্রতি টান, সেখানে ফিরতে না পারার অসহায়তা --এইসবের সঙ্গে তিব্বতীদের অনেক মিল। আর উদ্বাস্তু হওয়ার ঘটনা কাছে-দূরে সদাই চলছে। কখনও তা জাতীয়তাবাদের ঠেলায় কাশ্মীরে বা মণিপুরে, কখনও উন্নয়নের ছকে উড়িষ্যার জগৎসিংহপুরে, কখনও বা আমাদেরই পাড়ায় পাশের বাড়িতে প্রোমোটারের উৎপাতে। তাই এই লেখা দরকারি।

দ্বিতীয়ত, চীন প্রসঙ্গে সেখানকার কমিউন, মাওবাদ ইত্যাদি বিষয়ে নানা লেখা মন্থন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তখনই কথা উঠেছিল যে মঙ্গোলিয়া, তিব্বত ইত্যাদি জায়গায় চীনের সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাগুলো গণপ্রজাতন্ত্রী চীন বা চীনা কমিউনিস্টদের কী চোখে দেখছে সেটাও আমাদের আলোচনার পরিসরে আসা উচিত। --- তমাল ভৌমিক  



ফেরা : এক দ্বিতীয় নির্বাসন, আবার নির্বাসনে ফিরে আসা

আমরা বড়োলোক ছিলাম না, গরিবও নয়। এক মাঝারি কৃষক পরিবারে আমার জন্ম। আমাদের পরিবার ছিল বেশ বড়ো। স্বাধীন দেশে মুক্ত পরিবেশে আমার ছেলেবেলাটা সুখেই কেটেছে। চীনা কম্যুনিস্টরা যখন দেশ দখল করে, তখন আমার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। বাবা চেয়েছিলেন ছেলেমেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করে সবার বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে এবং সেটা তিনি পেরেওছিলেন। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পরপরই চারিদিকে সব দ্রুত বদলে যেতে লাগল --- শুধু আমাদের গ্রামেই নয়, গোটা আমদো অঞ্চলে। খামপার প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়ে কম্যুনিস্টরা দ্রুত এগোতে লাগল। জীবন হয়ে উঠল বিপজ্জনক এবং অনিশ্চিত। অন্যদের মতো আমার স্বামীও ভাবছিল লাসায় চলে গেলেই বিপদমুক্ত হওয়া যাবে। কারণ সেখানে দলাই লামা ও তিব্বতী সেনারা আছে। প্রথমে আমি আত্মীয়দের ছেড়ে যেতে রাজি হইনি। পরে গিয়ে দেখলাম সেখানে নানা জায়গা থেকে লাখে লাখে তিব্বতী জড়ো হয়েছে। সেই আমাদের প্রথম উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা। আমরা শহরের গায়ে শিবির খাটিয়ে বসলাম। সর্বত্র বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি। আমরা সবাই খুব ভয়ে আবার খানিক আশায় বুক বেঁধে প্রতিদিন নতুন খবরের জন্য অপেক্ষা করতাম। ১৯৫৯-এর মার্চে চীনারা দলাই লামাকে ভোজসভায় নিমন্ত্রণ করল। আমরা ভয় পেলাম, ওরা দলাই লামাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবে। প্রায় ত্রিশ হাজার তিব্বতী নরবুলিনকার বিভিন্ন গেটে প্রতিরোধ গড়ে তুলল। তারা আওয়াজ তুলল, চীনাবাহিনী ফিরে যাও! আমার স্বামী এবং আমি সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। লাসায় এমন কেউ ছিল না যে এই প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দেয়নি। আমি নারী প্রতিরোধ বাহিনীতে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু নরবুলিনকায় কামানের গোলা এসে আছড়ে পড়তেই সবাই ছত্রভঙ্গ ও উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ল। এর মধ্যে দলাই লামার দেশত্যাগের খবর এল। অতিকষ্টে আমরা পালাতে পারলাম। আমাদের অনেক বন্ধু সেই প্রতিরোধ আন্দোলনে মারা গিয়েছিল। তিনদিনের মধ্যেই লাসা এক পরাভূত বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত হল। আমরা দেখলাম আমাদের আর কিছু করার নেই। পালানোই বাঁচার একমাত্র রাস্তা। আমি চিরকালই ধর্মভীরু। সারা রাস্তা প্রার্থনা করতে করতে আর মন্ত্র যা জানতাম তাই উচ্চারণ করতে করতে এগিয়েছি। আমার স্বামীও প্রার্থনা করতেন। পথে একজন বৌদ্ধ লামা ও আরও কিছু লোককে সঙ্গী পেলাম। সেই লামা আমাদের মনে সাহস জোগাতেন, বুদ্ধের উপদেশ শুনিয়ে কঠিন বাস্তবকে মেনে নিতে শিখিয়েছিলেন।

        কয়েক সপ্তাহ হাঁটার পরে আমরা বক্সারে পৌঁছাই। সেখান থেকে চলে যাই দক্ষিণ ভারতে। অন্যান্য তিব্বতীদের মতোই আমরা নির্মাণ-শ্রমিক হিসেবে রাস্তাঘাট তৈরির কাজে যোগ দিই। প্রথমদিকের কয়েকটা বছর এমন তাড়াহুড়োয় কাটল যে পিছনে যা কিছু ফেলে রেখে এসেছি তা নিয়ে ভাবার কোনো অবকাশই পেলাম না। স্বপ্নে আমি প্রায়ই তিব্বতকে দেখতে পেতাম। কিন্তু প্রতিদিনকার বাঁচার চেষ্টা, অন্নসংস্থানের উপায় আর উদ্বাস্তু শিবিরের অসুস্থদের সেবায় একটুও ফুরসত পেতাম না অতীত নিয়ে কিছু ভাবার।

        ভারতে এসে কিছুটা থিতু হওয়ার পরে আমাদের একটা মেয়ে হয়েছিল। আমাদের তখন এমন দুর্দশা যে মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না। শৈশবেই সে চলে গেল। আমাদের মেনে নিতে হয়েছিল। পরে অবশ্য আমরা একটা অনাথ মেয়েকে পোষ্য নিই। তাকে বিয়েও দিয়েছিলাম। এখন সে আর আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। সে আরেক দুঃখের কাহিনী।

১৯৮৩ সালে আমার স্বামীর সঙ্গে আমি তিব্বতে গিয়েছিলাম। আমাদের আত্মীয়স্বজন ভাইবোনদের সঙ্গে আমরা দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিব্বতে গিয়ে আমার স্বামী অসুখে পড়ল এবং বেশ কিছুদিন ভুগে মারা গেল। আমার বড়ো বোন বলল, তুই আর ধরমশালায় গিয়ে কী করবি? তার চেয়ে বরং ওর পরিবারের সঙ্গে তিব্বতে থেকে যাওয়াই ভালো। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৫ --- এই বারো বছর আমি ওদের সঙ্গেই থাকলাম। কিন্তু কোনোভাবেই আমি ওখানকার পরিবেশের সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে মেলাতে পারছিলাম না। ওখানকার জীবনধারা ভারতবর্ষে আমার জীবনধারা থেকে আলাদা। ১৯৯৫ সালে ভারত থেকে কয়েকজন তিব্বতী ভ্রমণার্থী ওখানে যায়। তাদেরকে সাক্ষী দাঁড় করিয়ে আমি চীনা সরকারের কাছ থেকে তিনমাসের জন্য ভারতে আসার অনুমতি পাই। তখন আমি চলে আসি। তারপর থেকে আমি এখানেই আছি। একটা ভাড়াবাড়িতে এখানে থাকি। আমি একমাত্র মুক্ত তিব্বতেই ফিরে যেতে পারি। আর আমার জীবদ্দশায় তা যদি না ঘটে, তাহলে আমি এখানেই থাকব। আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে যাব যাতে তাঁর শান্তির অভিযান অটুট থাকে।

অন্য তিব্বত : তেনজিন সেরিং-এর ভাষ্য

না, ওখানে আমাকে কেউ উত্ত্যক্ত করেনি। একদমই নয়। ওপর থেকে দেখলে, যে এলাকায় আমাদের বাড়ি সেখানকার অবস্থা বেশ স্থিতিশীল বলেই মনে হয়। বর্তমানে আমদো আমাদের দেশের সবচেয়ে উন্নত অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটা। উন্নয়নের চিহ্ন হিসেবে সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক বড়ো বড়ো বাড়ি, কারখানা, শিল্পাঞ্চল ও উন্নত কারিগরির নানা ব্যবস্থা। কিন্তু আমার চোখে সেটাকে তিব্বতের কোনো জায়গা বলে মনে হচ্ছে না। ১৯৫৯ সালে যখন পালিয়ে গিয়েছিলাম, তখন আমাদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়ালে আমরা দেখতে পেতাম পাহাড়ের সারি, গাছপালা আর দীর্ঘ পশুচারণভূমি। যখন আমি শিশু বা তরুণী ছিলাম, তখন উঠোনের একটা প্রিয় কোণ ছিল আমার। সেখানে এবার যখন গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন চোখে পড়ল শুধু উঁচু উঁচু প্রবল প্রতাপান্বিত সব বহুতল বাড়ি। না, আমি মনে করি না যে শুধু পুরনোর প্রতি মোহাবিষ্ট হয়েই আমি ওইসব পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারছিলাম না। পুরনোর প্রতি মোহই শুধু নয়, তার চেয়ে আরও বেশি কিছু আমাকে পীড়া দিচ্ছিল। ... তিব্বতী মানুষদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার আলাপ হচ্ছিল, আমি দেখছিলাম, তাদের মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কী একটা জিনিস যেন নেই। আমার মনে হচ্ছিল ওদের  যেন বুক ভরা ভয়। চীনাদের কাছে ওরা এমন বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল, ওরা কখনও চীনাদের সামনে কথা বলত না। মনে হয় ওরা ধরে নিয়েছিল যে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় নীরবতা পালন করা।

        জানেন, বেশিরভাগ অফিসারেরাই চীনা আর তিব্বতীরা তাদের অধস্তন কর্মী। ওরা কম্যুনিস্টদের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। যে কর্তৃপক্ষ আপনার জীবনের সমস্ত অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা সহজ নয়। তিব্বতীরা সহজে এসব কথা স্বীকার করবে না। কিন্তু আপনি ওদের দেখলেই বুঝতে পারবেন, ওরা কেমন ভয়ে ভয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখলে সবই ভালো, সকলেরই মনে হবে সব স্বাভাবিক চলছে, তিব্বতের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে অনেক কিছু আমরা হারিয়েছি। তিব্বতীরা ছিল খোলামেলা মনের মানুষ, তাদের জীবনের প্রতি ভালোবাসা ও রসবোধের পরিচয় সকলেই জানে। তারা ছিল উচ্ছ্বল ও উদ্যমী। এখন তারা সবসময় গুম মেরে থাকে, অবদমিত। এটা আমি বারবার অনুভব করেছি। আমি যখন প্রকৃতির কথা বলছিলাম, তখন এটাকেও বোঝাতে চাইছিলাম। প্রাকৃতিক সমৃদ্ধি যেমন শূন্য হয়ে গেছে, তেমন মানুষগুলোও ঊষর। উঁচু বাড়ির আড়ালে ঢাকা পড়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য্য আর উঁচু পদের চাকরির আড়ালে মানুষের নীরবতা।

        তিব্বতীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ সর্বব্যাপী। ভালোভাবে বানানো বড়ো বাড়িগুলো সব চীনাদের। বেশিরভাগ তিব্বতী থাকে ছোটো ছোটো ঘিঞ্জি নোংরা ঘরে। সবাই সাবলীলভাবে চীনা ভাষায় কথা বলে, যেন ওটাই এদেশের ভাষা। তিব্বতীরা যদি তাদের বাচ্চাদের তিব্বতী ভাষা শেখাতে চায়, তাহলে তা গোপনে নিজেদের ঘরে শেখাতে হয়। স্কুল-কলেজে শিক্ষাদানের মাধ্যম চীনা ভাষা। ... আমাদের লোকেরা, বিশেষত যারা কমবয়সি, তারা চীনা পোশাকে নিজেদের সাজাচ্ছে। কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে মনে হয় না। বাইরের থেকে দেখলে মনে হয়, তিব্বতীরা যেন কম্যুনিজ্‌মকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু ভিতরে গভীরে গিয়ে আমি দেখেছি তারা বিক্ষুব্ধ। ... আমার ভগ্নীপতি চীনাদের অধীনে কাজ করে। সে আমাকে বলেছে, ওইভাবে কাজ করা, নিজে দমিত হয়েও ভালো থাকার ভাব দেখানো কেমন কঠিন। সে, আমার বোন এবং অল্প আর দুচারজন বাদে, অন্য যাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, কেউ এব্যাপারে টুঁ শব্দ করেনি।

        বেশিরভাগ তিব্বতীদের কাছে আমি ছিলাম বিদেশি। আমি ছিলাম অন্য দেশে, ওদের ধারণা ওখানে আমি একটা স্বাধীন জীবন কাটিয়েছি। ওরা যে দুঃখের মধ্যে দিয়ে এখানে জীবন কাটিয়েছে, তার কোনো ভাগ আমি নিইনি। আমাদের উদ্বাস্তুদের সম্পর্কে বেশিরভাগ তিব্বতীর এরকমই ধারণা। ওদের সামান্য কজন মাত্র বোঝে যে আমরাও কষ্ট পেয়েছি। ওদের পক্ষে বোঝা মুশকিল যে কী কঠিন অবস্থার মধ্যে দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। ওদের মনে হয় আমাদের জীবনে আমরা অনেক সুবিধা ও সুরক্ষা পেয়েছি। নির্বাসন ও পীড়ন যেন তিব্বতীদের দুইভাগে ভাগ করে দিয়েছে --- একদল নির্বাসিত এবং আরেকদল নিপীড়িত। প্রথমদিকে আমি এটা খুব তীব্রভাবে অনুভব করেছিলাম। দীর্ঘ বিচ্ছেদ মানুষকে বিভক্ত করে দেয়। ওরা যেমন আমাকে বুঝে উঠতে পারছিল না, আমিও ওদের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না, পালিয়ে গিয়ে উদ্বাস্তু হওয়ার যে বেদনা ও আতঙ্ক সেরকমই হল বাড়ি ফিরে আসায়। আমরা একই মানুষ, সবাই তিব্বতী। কিন্তু একে অন্যের দুঃখকষ্টকে চিনে উঠতে পারলাম না। বেশ কিছু বিষয়ে তাদের কাছে আমি অচিন মানুষ। চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে ওদের বশ্যতা ও নীরবতার অর্থ বুঝতে আমারও অনেকটা সময় লেগেছে।

        এই যে এতগুলো বছর আমরা পৃথক ছিলাম, সেই সময় আমাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের কী প্রচণ্ড কষ্ট পেতে হয়েছিল, সে সম্পর্কে অনেক ঘটনা শুনলাম। আমাদের বড়দার মৃত্যুর খবর শুনলাম। ১৯৬২-র দুর্ভিক্ষে চীন ও তিব্বতে লাখে লাখে মানুষ মারা যায়, তখন আমাদের আরেক ভাই ও এক দিদি কীভাবে মারা গিয়েছিল, তা বোনের কাছে শুনলাম। এই সমস্ত শুনে আমার মনে হল, ওখানে আর আমার জন্য কেউ নেই, কিছুই অবশিষ্ট নেই, যে বোনের কাছে গিয়ে উঠেছিলাম তাকে ছেড়ে আসতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। তবু আমি ভারতে ফিরে আসাই ঠিক করলাম।

        যে তিব্বতে আমি ফিরে গিয়েছিলাম আর যে তিব্বতে আমি ফিরে যাব ভেবেছিলাম, এই দুইয়ের মধ্যে অনেক তফাত। জানেন, আমাদের মতো বাস্তুচ্যুতদের কাছে এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। যখন আমরা পরবাসে থাকি, তখন আমাদের ফেলে আসা দেশ-ঘরের একটা ছবি আমাদের মনের মধ্যে সাজিয়ে রেখে আমরা আশাটাকে বাঁচিয়ে রাখি। সেই আপন গৃহে ফিরে যাওয়ার জন্য আমরা আকুল হয়ে উঠি। কিন্তু যখন আমরা সত্যিকারের যাই ? তখন একটা অন্যরকম বাস্তবতার মুখোমুখি হই। তিব্বতে যাওয়ার আগে আমার স্বামী ও আমি ভারতে বেশ থিতু হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিব্বত থেকে ঘুরে আসার পরে আমার এখানে মানিয়ে নিতে আরও অসুবিধা হচ্ছে। উদ্বাস্তু জীবনের পরেরদিকে যেমন এখানটাকেই আমার দেশ বলে মনে হচ্ছিল, এখন তা নয়। তিব্বতে যা দেখে এলাম, যা ফেলে এলাম, আমার মন জুড়ে তা এক অস্থিরতা তৈরি করেছে।

বিবেকের বন্দী : বন্দী বিবেক

ভারতের ধূলাময় সমতলের দিকে তাকিয়ে আমার হৃদয় দুঃখে ভরে গেল। আমার গত ত্রিশ বছরের বন্দী জীবনের সমস্ত খুঁটিনাটি মনে পড়ে গেল। নিয়মিত পাঠচক্র আর স্বীকারোক্তির সভা, পুরস্কার আর শাস্তিপ্রদানের সভা, যা আমার জীবনকে এক নিয়মের নিগড়ে বন্দী করে রেখেছিল। ... এই বিদেশে এখন আমি মুক্ত। কিন্তু বন্দীদশার দগদগে ঘা আর বিভীষিকার ছায়া সবসময় আমাকে তাড়া করে বেড়ায় ... প্রতিদিন আমি আমার সহ-বন্দীদের সঙ্গে দেখা করি। অনেক কষ্ট করে আমরা হিমালয়ের পাদদেশ বেয়ে এক দুর্গম পথ ডিঙিয়ে এখানে এসেছি। ওদের মুক্ত হওয়ার আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে অন্যদের অতীত যন্ত্রণাভোগের স্বীকৃতি। স্রেফ বেঁচে যেতে পারার সৌভাগ্যে আমরা একে অপরকে অভিনন্দন জানাই ...

        এই কথা লিখেছেন পালদেন গিয়াতসো, ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ে। বইয়ের নাম এক তিব্বতী সন্ন্যাসীর আত্মজীবনী। আমাদের লেখিকা হানি ১৯৯৮ সালে তাঁর সঙ্গে তিনবার দেখা করেন। সেই তিনটে সাক্ষাৎকার এবং ওই বই থেকে যা জানা যায় তা সংক্ষেপে এরকম :

পালদেন গিয়েতসোর জন্ম ১৯৩৩ সালে, দক্ষিণ-মধ্য তিব্বতের সাং সমভূমির পানাম এলাকার এক উচ্চশ্রেণীর ধনী পরিবারে। পালদেনের জন্মের কিছুদিন পরেই তাঁর মা মারা যান। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারের দায়িত্ব পড়ে বাবার ঘাড়ে। তাঁর বাবা অবশ্য পরে আরেকটি বিয়ে করেন। পালদেনের পরিবারের লোকজন খুব কম বয়স থেকেই বালক পালদেনের মধ্যে নানা ঐশ্বরিক চিহ্ন খুঁজে পায়। ছোটোবেলায় তাঁর নাম ছিল নোদুপ। দশ বছর বয়সে তাঁকে দীক্ষা দেওয়ার সময় পরিবারের লোকজন তাঁর নাম রাখে পালদেন। সেই থেকে তিনি তাঁর কাকার কাছে এক বিশাল মঠে থাকতে শুরু করেন এবং কাকার কাছেই তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার শুরু হয়। সেখানে দ্রেপাং থেকে গেশি (অর্থাৎ অধ্যাপক) রিগজিন টেম্‌পা একবার বৌদ্ধ দর্শন বিষয়ে বক্তৃতা দিতে আসেন। দ্রেপাং তখন তিব্বতের শ্রেষ্ঠ তিনটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। রিগজিন টেম্‌পার জন্ম হয়েছিল ভারতে। তাঁর বক্তৃতা শুনে পালদেন বুঝতে পারেন, কাকার কাছে যে গ্যাদং মঠে তিনি থাকতেন সেটা একটা কুয়োর মতো। বৌদ্ধ দর্শনের মহাসমুদ্রে সাঁতার কাটতে হলে দ্রেপাং যেতে হবে।

        পরে রিগজেন টেম্‌পার আহ্বানে দ্রেপাংয়ে পড়তে যাওয়ার একটা সুযোগ এলেও বাবা-কাকারা তাঁকে ছাড়তে চাননি। পালদেং তখন দ্রেপাং যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে পালাবেন ভেবেছিলেন। এর কিছুদিন পরে তিনি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু কাকা অসুস্থ বলে তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে পাঠানো হয়। বৃদ্ধ কাকাকে দেখভাল করা এবং গ্যাদংয়ের মঠ পরিচালনার জন্য তাঁকে সেখানে থেকে যেতে হয়। অনেক পরে ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ভারতে এসে দলাই লামার সঙ্গে দেখা করেন। দলাই লামার নির্দেশে তিনি আবার তাঁর শিক্ষকদের কাছে দ্রেপাংয়ে ফিরে যান। তখন বাড়ির লোকেরা আর তাঁকে বাধা দেয়নি। ইতিমধ্যে, তাঁর ভাষায়, ১৯৫২ সালেই কুড়িজন তরুণের সঙ্গে এক মঠে আমি সন্ন্যাসী হওয়ার শপথ গ্রহণ করি। ... সেই কুড়িজনের মধ্যে আজ আমি একাই বেঁচে আছি। ওদের কেউ মারা গিয়েছে কারাগারে, কাউকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পিটিয়ে মারা হয়েছে।

ভারতে দলাই লামার সঙ্গে দেখা করে আসার পরে দ্রেপাংয়ের মঠে বেশিদিন থাকা গেল না। পূর্ব তিব্বতের থেকে তিব্বতীরা পালিয়ে এসে জানালো, চীনারা সব মঠ ধ্বংস করে দিচ্ছে। ১৯৫৯-এর অভ্যুত্থানের পরে চারিদিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। পালদেন তখন শুনেছিলেন যে লাসায় চীনাদের তিব্বত থেকে ফিরে যাওয়ার দাবিতে মহিলাদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কুন্দালিং কুসাংলা। এই মহিলাকে পরে কারাগারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে দেখেছিলেন পালদেন।

রাতের অন্ধকারে দ্রেপাং মঠ ছেড়ে যখন সব সন্ন্যাসীরা পালালো, তখনও পালদেন এবং আরও দুজন থেকে গেলেন। কারণ তাঁদের ৭২ বছরের বৃদ্ধ অধ্যাপক গিয়েন রিগজিন টেম্‌পা তখন চলচ্ছক্তিহীন। শেষে চীনারা দ্রেপাং মঠে গোলাবর্ষণ শুরু করলে পালদেনরা তিনজন গিয়েনকে পিঠে তুলে পালালেন। তিনজনে পালা করে করে অধ্যাপককে বয়ে নিয়ে চলে গেলেন পালদেনের বাসস্থান পানাম এলাকায়। সেইখানে সেই গ্যাদং মঠে তাঁরা আশ্রয় নিলেন। যদিও পানাম ছিল তিব্বতের বেশ অন্তর্বর্তী একটা জায়গা। কিন্তু পালদেনের ভাষায়, চীনারা মাকড়সার মতো তিব্বতের সর্বত্র তখন জাল ছড়িয়ে ফেলছে এবং আমাদের আর কিছুই করার নেই।

শীঘ্রই শুরু হয়ে গেল মিটিং আর আলোচনার পর আলোচনা। এগুলো পরিচালনা করত চীনা অফিসারেরা আর একজন তিব্বতী দোভাষীর কাজ করত। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল উপস্থিত শোষণ ও নিপীড়ন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। সব মানুষকে প্রধান চারটে শ্রেণীতে ভাগ করে ফেলা হল --- জমিদার, ধনী কৃষক, মাঝারি কৃষক ও গরিব কৃষক। পালদেন বলছেন, পারিবারিক পরিচয়ে আমি ছিলাম ধনী সন্ন্যাসী। তার অর্থ নতুন সর্বহারার সমাজে আমার আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। প্রত্যেকের পরিচয়পত্রে সে কোন শ্রেণী থেকে এসেছে তা লেখা থাকবে এবং খাদ্য, শিক্ষা ও চাকরি কে কেমন পাবে তা নির্ধারণ করবে ওই শ্রেণী পরিচয়ই।

প্রথমে মঠের সন্ন্যাসীদের বলা হত, তারা শোষণ চালানোর কথা স্বীকার করুক। তাতে বেশি সাড়া না পেলে সবাইকে ডেকে জনসমক্ষে স্বরূপ উন্মোচনের নাম করে তাদের হেয় করা হত। ধনী সন্ন্যাসীর জিনিসপত্রের সঙ্গে গরিব সন্ন্যাসীদের সম্বলগুলোর ফারাকও দেখানো হত। গ্রামবাসীদের ডেকে এই ফারাক দেখানোর সময়ে সম্পদের এই অসাম্য দেখে গ্রামবাসীদের বাধ্যতামূলকভাবে বিস্ময় প্রকাশ করতে হত। সেরকম না করলে, যথেষ্ট উৎসাহের সঙ্গে থামসিং নামক এই স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ না করলে তাদের ওপর পার্টির ক্যাডাররা নজর রাখত। এবং সেদিন সন্ধ্যেবেলায় বা পরের দিন সকালে পার্টির অফিসারেরা তাদের সঙ্গে দেখা করত। ... পরের মিটিংয়েই তাদের কোনো নিরীহ একজনের চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করিয়ে গালাগাল দিতে হবে এবং এইভাবেই পার্টির প্রতি ভালোবাসা ও জনগণের পক্ষে দাঁড়া নোর প্রমাণ দিতে হবে।

সবটাই পালদেনের কাছে বানানো একটা নাটকের মতো মনে হত, যেখানে সবাই অভিনয়ে অংশ নিতে বাধ্য। পালদেনের মোট ৩১ বছরের বন্দী জীবনের মধ্যেই সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়েছিল। সে সময়ে পালদেন লিখছেন, সমালোচনা ও দোষ স্বীকার করার অবিরাম অনিঃশেষ চাপ ছিল। ফলে পারস্পরিক নজরদারি ও সন্দেহ করার একটা পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। শত শত জোড়া চোখ আপনার সমস্ত নড়াচড়ায় নজর রাখছে। ভয়ে যেন আমরা বশীভুত, অবনত হয়ে পড়েছিলাম। যদিও চীনা কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে অন্তরে আমি এক তিক্ত অনিচ্ছা পোষণ করতাম ... বন্দীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহানুভূতি গড়ে উঠেছিল। আমরা জানতাম, সবাই আমরা একই জিনিস করতে বাধ্য হচ্ছি। সেহেতু। যদিও প্রথমদিকে সমালোচনা করার ফলে শত্রুতা গড়ে উঠেছিল, আমরা যে কোনো অভিযোগকারীকে ক্ষমা করতে শিখে গিয়েছিলাম এবং কেউই কারোর প্রতি মনে কোনো রাগ পুষে রাখতাম না ... আপনার কোনো উপায়ান্তর নেই ... এই ধরনের সমালোচনা-সভায় যোগ না দিতে চাওয়া হচ্ছে সমাজবিরোধী কাজ --- প্রায় বিদ্রোহ দেখানোর মতো   --- ওরা চাইত আমরা সহবন্দীর ক্ষতি করি, যেন সবাই পরস্পরের শত্রু ...

১৯৬০ সালে পালদেন প্রথমবার গ্রেপ্তার হল গ্যাদং মঠ থেকে। সেখানে তাঁর সেই বৃদ্ধ শিক্ষক রিগজিন টেম্‌পার তৈজসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে চীনারা একটা ফটো দেখতে পায়। সেখানে একদল তিব্বতী প্রতিনিধির মধ্যে রিগজিনের ছবি। তারা দাঁড়িয়ে আছে ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতা নেহেরু এবং গান্ধীর সঙ্গে। চীনারা খুব উত্তেজিত হয়ে রিগজিনকে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। তিনি সবই জানান, তিনি যে ভারতীয় নাগরিক এবং সেখান থেকে লাসায় ছাত্র হিসেবে এসেছিলেন, শেষে চীনা অফিসারদের অনুরোধ করেন তাঁকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। পালদেন তাঁর শিক্ষককে কিছু বইপত্র সহ ছোটো একটা ব্যাগ গুছিয়ে দিতে সাহায্য করেন। চীনা অফিসারদের আদেশ মতো সেই ব্যাগ নিয়ে হেঁটে গিয়ে তিনি একটা জিপগাড়িতে ওঠেন। দুজন বন্দুকধারী পাহারাদার তাঁকে নিয়ে চলে যায়। সেই শেষ দেখা। তারপর আর পালদেন কোনোদিন রিগজিন টেম্‌পাকে দেখতে পাননি।

এরপর শুরু হয় পালদেনের ওপর অত্যাচার। তাঁর শিক্ষক যে ভারতীয় গুপ্তচর এই স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য পালদেনকে দুহাত বেঁধে ঝুলিয়ে পেটানো হয়েছে ব্যাটন দিয়ে, রাইফেলের বাঁট দিয়ে। বারবার তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন। জ্ঞান ফিরেছে নিজেরই পেচ্ছাপ আর বমির মধ্যে শুয়ে। আবার তাঁর ওপর চালানো হয়েছে অমানুষিক অত্যাচার। পালদেন বারবার বলেছেন যে তাঁর শিক্ষক গুপ্তচর নন। তবু তাঁর কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য অত্যাচার করা হয়েছে। শেষে তা না পেয়ে তাঁকে সাত বছরের জেলের সাজা দেওয়া হয়েছে। পালদেনের ভাষায়, কোনো শুনানি হয়নি, কোনো আবেদনের অধিকার দেওয়া হয়নি। আমাকে সাত বছরের জন্য কয়েদ করা হয়েছে আর গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীর লেবেল --- এ এমন এক চিহ্ন যার জন্য আমার সাত বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও আরও তিন বছর আমার কোনোরকম রাজনৈতিক অধিকার থাকবে না।

এত অত্যাচার পালদেন সহ্য করে গেছেন শুধু এই কথা ভেবে যে লড়াইটা তাঁর প্রশ্নকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত নয়, লড়াইটা হল পার্টির নিপীড়কক্ষমতার সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের আদর্শ ও সেই ধর্মের প্রতি আনুগত্যের। এই বোধ তাঁকে এক আত্মিক শক্তি জুগিয়েছিল। এই শক্তির জোরেই পালদেন তাঁর বন্দীজীবনের প্রতিটা খুঁটিনাটি মনে রেখেছেন এবং আশা রেখেছেন যে মুক্তির পর তিনি তাঁর সহবন্দীদের মুখপাত্র হিসেবে বাইরের সবাইকে সব কথা জানাবেন। সে কারণে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন, যাদের মৃত্যুশিবির-এ পাঠানো হয়েছিল তাদের সকলের নাম, ১৯৬০-এর দুর্ভিক্ষে যেসব বন্দীর অনাহারে মৃত্যু হয়েছিল তাদের নাম। এর পাশাপাশি পার্টির ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তব ক্রিয়াকলাপের বিরোধের বিষয়টাও তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ বিষয়ে লেখিকা হানির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এ কেমন অদৃষ্টের পরিহাস যাতে তথাকথিত শ্রেণীহীন সমাজ তার সদস্যদের জোর করে এমন এক রাজনীতি গেলাচ্ছে যেখানে প্রশ্নহীনভাবে পুজো করতে হবে মার্ক্স, এঙ্গেল্‌স, লেনিন, স্তালিন থেকে সর্বশেষ ভগবান মাও-এর মতো সমস্ত কম্যুনিস্ট নেতাদের, আরও ক্রোধের সঙ্গে পালদেন বলেন, পার্টি মিথ্যে গর্ব করেছিল যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন মানুষও না খেয়ে মরতে পারে না। অথচ বন্দীরা ভয়ে অনাহারে মৃত্যুর কথা বলত না, সেটাকে চালিয়ে দেওয়া হত স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে।

১৯৬২-তে চীন-ভারত যুদ্ধ শুরু হল। সেইসময় পালদেন সাতজন বন্দী সহ জেল থেকে পালালেন। পালাতে পালাতে চীন সীমান্ত প্রায় পার হয়ে যাওয়ার মুখে সবাই ধরা পড়ে গেল। আবার জিজ্ঞাসাবাদের নামে অত্যাচার শুরু হল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় পালদেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন তারা পালাচ্ছিল? পালদেন বলেছিলেন, এটা খুব স্বাভাবিক। ১৯৬০ সালে গ্রেপ্তার করার পর থেকে আমার ওপর যে অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়েছিল, যেভাবে আমার চোখের সামনে বন্দীরা খেতে না পেয়ে মারা গিয়েছিল, তারপরও যেভাবে আমরা ক্ষুধার যন্ত্রণা আর মৃত্যুর প্রতীক্ষা নিয়ে বেঁচেছিলাম, তাতে পালানোটাই স্বাভাবিক।

এবার পালদেনের আরও আট বছরের অর্থাৎ সব মিলে মোট পনেরো বছরের জেল খাটার সাজা হল। আবার তাঁর দুই হাতে আর পায়ে লোহার বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হল। এইসময় সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ অনুসারে পালদেনকে তাঁত বোনার কাজ শিখতে হয়েছিল। দুপায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় সারাদিন কঠিন পরিশ্রমের মাঝে তিনি বিকেলের দুঘন্টার বিশ্রামের সময়ে প্রার্থনা করতেন। এই প্রার্থনা তাঁকে মনের জোর বাড়াতে সাহায্য করেছিল। অনেক বন্দী আত্মহত্যা করল। পালদেন মনের জোরে বেঁচে থাকলেন শুধু অত্যাচারীদের অত্যাচার সহ্য করে বেঁচে থাকার সাহস দেখাতে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে চার পুরনোকে দূর করার নামে পুরনো রীতি, পুরনো অভ্যাস, পুরনো ঐতিহ্য ও পুরনো চিন্তা ধ্বংসের নামে পালদেনদের প্রিয় সমস্ত অবলম্বন পুড়িয়ে ধ্বংস করা হল। ... কারাগারে নতুন ভাষায় বলা ও লেখা চালু করা হল। সে ভাষায় নতুন সর্বহারা সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন সব সমাজতান্ত্রিক শব্দ। ইচ্ছা না থাকলেও বন্দীরা ওইসব মেনে নিয়ে সন্তুষ্টির ভাব প্রকাশ করত।

আর তা না করলে কী হত, পালদেন তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন। প্রত্যেকদিন সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার মিটিং হত। বেশিরভাগ সময় পালদেন নিজেকে অলস বলে আত্মসমালোচনার পর্ব সারতেন। একদিন তিনি কোনো আত্মসমালোচনা না করায় তাঁকে তাঁর সেলের নেতা বলেন, পালদেন নিজেকে পুরো শুধরে ফেলেছে আর তাই তাঁকে মুক্তি দেওয়া উচিত। তাই না? তারপর সেদিন সন্ধ্যে থেকে লড়াইয়ের মিটিং শুরু হয়। সেখানে সবার মধ্যে পালদেনকে ডেকে দাঁড় করিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের ধ্বংস করো আওয়াজ তুলে সেলের প্রহরী ও সেলের নেতা প্রথমে তাঁকে আঘাত করে। তারপর সব বন্দীকে দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের ধ্বংস করার শ্লোগান দেওয়ানো হয় আর তাঁকে ক্রমাগত মারতে থাকে। গোটা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর্যায়ে পালদেনকে এইভাবে পেটানো হয় ৩০ থেকে ৪০ বার।

আরেকবার পালদেনকে চোখে জলের ঝাপটা দিতে দেখে একজন সহবন্দী। সমালোচনার মিটিংয়ে এসে সে অভিযোগ করে যে ওইভাবে জল দেওয়া আসলে তিব্বতী ধর্মরীতিতে ঈশ্বরকে জল উৎসর্গ করা। এই ঘটনা নিয়ে ১৩টা ভর্ৎসনা সভা হয়। সেখানে সহবন্দীরা পালদেনকে মারার বদলে জামা ধরে ঝাঁকাতো। কারণ পালদেনকে তারা মারতে চাইত না এবং মার খেয়ে খেয়ে পালদেনের শারীরিক অবস্থা তখন অত্যন্ত খারাপ হয়ে পড়েছিল। যাই হোক, এতেও পালদেনের স্বীকারোক্তি আদায় করা গেল না। কর্তৃপক্ষ ভয়ানক চটল। কারণ পালদেন যা করেছেন তা ধর্মীয় কাজ এবং গর্হিত অপরাধ। তাই শাস্তিস্বরূপ একদিন ভোরে পালদেনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল এক বধ্যভূমিতে। সেখানে পনেরোজন বন্দীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে বলে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পালদেনকে তাদের দিকে মুখ করিয়ে দাঁড় করানো হল। সেখানে একজন নতমস্তক মহিলার চুলের মুঠি ধরে মাথাটাকে সোজা করা হল আর একজন সৈন্য তার অপরাধের ফিরিস্তি দিতে থাকল। পালদেনের শরীর শিউরে উঠল --- এই সেই বীরাঙ্গনা মহিলা কুন্দালিং কুসাংলা --- ১৯৫৯ সালের তিব্বতীদের অভ্যুত্থানে যিনি মহিলা বাহিনীর নেত্রী ছিলেন। তাঁর মুখের চামড়া বয়সের ভারে কুঁচকে গেছে, মুখে অত্যাচারের দাগ, বিকৃত ফোলা মুখে একটাও দাঁত নেই। ক্ষোভে ভয়ে পালদেনের মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে একজন প্রহরী তখন বলছিল, বুঝেছ, একেবারে খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছ। পালদেনের সামনে ওই পনেরোজন বন্দীকে গুলি করে মেরে গর্তে ফেলে দেওয়া হয়।

মৃত্যুভয় দেখানো, অত্যাচার, কোনো কিছুতেই চীনারা পালদেনকে কাবু করতে পারেনি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অনেক বন্দী যে সাহসের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে নিয়েছিল, তাকেই পালদেনের মনে হয়েছিল তিব্বতীদের জয়ের চিহ্ন। পনেরো বছর জেলে কাটানোর পর পালদেনকে জানানো হল যে তাঁকে আরও আট বছর শ্রমশিবিরে থাকতে হবে। আবার আট বছরের জন্য বন্দী থাকার এই ঘোষণা পালদেনকে মনে মনে দারুণ আঘাত করলেও বাইরে তিনি তা প্রকাশ করলেন না। উল্টে জেলখানা থেকে শ্রমশিবিরে নিয়ে যাওয়ার সময়ে তিনি দাবি করলেন যে গ্রেপ্তার করার সময় বাজেয়াপ্ত করা তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ফেরত দেওয়া হোক। ফেরত নেওয়ার সময় তিনি দেখলেন যে তাঁর প্রিয় বড়োদাদার উপহার দেওয়া একটা সোনার রোলেক্স হাতঘড়ি নেই। তিনি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে চীনা অফিসারকে বললেন, এই হাতঘড়ি চুরি করা পার্টির নিয়ম-বিরোধী, চেয়ারম্যান মাও পিএলএ-কে (গণমুক্তি ফৌজ) কতকগুলো আচরণবিধি শিখিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটা হল বন্দীদের একটা আলপিনও গ্রহণ না করা। একমাত্র একজন প্রতিক্রিয়াশীল সৈন্যই একজন বন্দীর জিনিস চুরি করতে পারে।

এরপরের আট বছর তিনি নিয়েথাং লুয়াওয়া চ্যাং নামক এক টালির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তিনি তাঁদের বাড়ির এক পুরনো ভৃত্যের কাছে খবর পান, গণআদালতে বিচারের সময় তাঁর বোনেদের বাবাকে জনসমক্ষে হেয় করতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেখানেই তাঁর বাবাকে পিটিয়ে মারা হয়। পরে তাঁর দাদারও একই পরিণতি হয়। আর তাঁর সৎমা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়েন। এইসব ঘটনা জানার পর পালদেন ঘুমাতে পারতেন না, বিশ্রামও নিতে পারতেন না। তাঁর খালি পরিবারের সবার কথা আর তাদের দুর্ভোগের কথা মনে পড়ে যেত। ইতিমধ্যে মাও সেতুঙের মৃত্যু হল। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় যেসব বাড়াবাড়ি হয়েছে, তা নিয়ে পার্টির মধ্যেও সমালোচনা উঠল। সেই সময় গিয়েন সামসুং ওয়াংচুক নামক একজন বয়স্ক লামার সঙ্গে মাঝবয়সি পালদেন ঠিক করেন যে তাঁরা তিব্বতী জনগণের উদ্দেশ্যে একটি আবেদনপত্র লিখবেন। কারণ সেই সময় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সমালোচনার কালে তিব্বতীদের গলার ফাঁস একটু আলগা হলেই গতদিনের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা দলাই লামার বিশ্বজনীন সত্য নামক প্রার্থনার থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রচারপত্র লেখেন। তার এক অংশে ছিল, তিব্বতীদের যে দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, তার বর্ণনা। দ্বিতীয় অংশে ছিল, স্বাধীন জাতি হিসেবে তিব্বতীদের ২৫০০ বছরের ইতিহাস।

এটাই ছিল মাওয়ের মৃত্যুর পর লাসার দেওয়ালে প্রথম পোস্টার। এই ঘটনায় রাজধানীতে খুব নাড়াচাড়া পড়ে যায়। এরপরও পালদেনের লেখা আরেক প্রস্থ প্রচারপত্র প্রকাশিত হয়। সেইসময় তিব্বতী বন্দীদের কী অবস্থা সে সংবাদও তিনি ভারতে পাঠাতে সমর্থ হন। এর মধ্যে জেলের ভিতর ওয়াংচুকের মৃত্যু ও বন্দীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও দলাই লামা সহ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। ১৯৮৩-তে সামান্য কিছুদিনের জন্য মুক্তি দেওয়ার পরে ১৯৮৪-র এপ্রিলে পালদেনকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিচারের সময় প্রকাশ্যে তিনি তিব্বতে চীনা শাসনের বিরোধিতা করেন। তাঁকে আরও আট বছরের জন্য জেলে পাঠানো হয় --- এবার অরিথ্রিডুর বন্দীশালায়।

মাওয়ের যুগ শেষ হয়ে তখন দেঙ-এর যুগ শুরু হয়েছে। কিন্তু বন্দীদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। পালদেন তাঁর কয়েদি জীবনের প্রায় শেষদিন পর্যন্ত তাঁর ওপর মারাত্মক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। ইলেকট্রিক শক দেওয়া থেকে আরম্ভ করে মুখের মধ্যে ব্যাটন ঢুকিয়ে দেওয়া, যতরকমভাবে যন্ত্রণা দেওয়ার পর ... পালদেন বর্ণনা দিচ্ছেন, ভীষণ যন্ত্রণায় বমি করতে গিয়ে দেখি আমারই রক্তের মধ্যে আমারই তিনখানা দাঁত উপড়ে এসেছে। পরে আমার সব দাঁত চলে যায়।

তাঁর ভাষায়, দেঙ কোনোভাবেই মাওয়ের থেকে ভালো নয়। ওয়াচ টাওয়ারের মাথায় সৈন্যদের বদলে ভিডিও ক্যামেরা, মারার জন্য লাঠির বদলে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার রড। অত্যাচারের কায়দা পাল্টেছে, কিন্ত অত্যাচারের অস্তিত্ব ঘোচেনি। কারাগারের প্রহরীরা হয়তো আরও আধুনিক হাতিয়ার নিয়ে আরও আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে এসেছে। কিন্তু চারিদিকের উঁচু প্রাচীরের পিছনে সমস্ত কিছুকে ঘিরে যে দৃষ্টি তার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

পালদেন তখন জানতেন না যে ১৯৮৩ সালেই তাঁর ঘটনা দুনিয়াময় ছড়িয়ে পড়ে এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাঁকে বিবেকের বন্দী বলে ঘোষণা করে। এইসব আন্তর্জাতিক চাপেই শেষপর্যন্ত ১৯৯২ সালে পালদেন মুক্তি পান। ততদিনে তিব্বতের মুক্তিকামী সংগ্রামী যুবকদের কাছে তিনি এক জীবন্ত রূপকথার নায়ক। আমাদের লেখিকা ১৯৯৮ সালের পরে ২০০২ সালেও তাঁর সঙ্গে আরেকবার সাক্ষাৎ করেন। তারপর ২০০৬ সালে শীতকালে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা করতে গেলে তিনি দেখা দিয়েও আর কথা বলতে চাননি। ধরমশালায় সেই শীতের সন্ধ্যায় হানির মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, তবে কি বয়স ও বিস্মরণ সেই একাকি বৃদ্ধকে গ্রাস করে ফেলল? অথবা, ত্রিশ বছরেরও বেশি বন্দীজীবনের ভয়াবহতা, অন্তরের যন্ত্রণা তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে?

এক অতৃপ্ত শূন্যতা

ভয়ানক অত্যাচার ও মৃত্যুর হাত থেকে যারা বেঁচে ফেরে, তাদের নানারকম মানসিক রোগ দেখা যায়। হানি একজন মনোচিকিৎসক হিসেবেও এইসব অত্যাচারিত, নির্বাসিত তিব্বতীদের দেখেছেন। তিব্বতীদের স্বাধীনতা সংগ্রামে পালদেন যেমন একজন পুরোধা ও পুরোনো কর্মী, তেমনই নতুন এক রাজনৈতিক কর্মী হল নবীন সন্ন্যাসী বাগদ্রো। বাগদ্রোর জন্ম সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ১৯৬৫ সাল নাগাদ। তাঁর বাবাও মঠের সাধু ছিলেন। কিন্তু বাগদ্রোর জন্মের আগেই চীনারা তিব্বত দখল করার পরে সেই মঠ ভেঙে দেওয়া হয় এবং তাঁর বাবা সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করেন। খুব ছোটোবেলা থেকেই বাগদ্রো দেখতেন, গ্রামের রাস্তা দিয়ে কয়েকজন মানুষকে খালি গায়ে পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাদের মাথা অর্ধেক কামানো, মুখে কালি লেপা আর সারা গায়ে নানারকম পোস্টার সাঁটা। সঙ্গে মাইকে তাদের সম্পর্কে নানা মন্তব্য ঘোষণা করা হচ্ছে। শেষে তাদের একটা কাঠের সঙ্গে হাত বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। তাদের মধ্যে অনেকেই সেই ঝুলন্ত অবস্থা থেকে পড়ে গিয়ে সাংঘাতিক আহত হত। আর দর্শকদের বাধ্য করা হত তাদের থুতু দিতে আর গালিগালাজ করতে। এর সঙ্গে সঙ্গে চলত বন্দীদের ওপর লাথি, মার ও চিৎকার। অনেকে এই অত্যাচারে মারাও যেত। ... বালক বাগদ্রো এসবের কারণ বুঝতেন না। বাড়িতে বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা তাঁকে চুপ করতে বলতেন এবং আর কোনো প্রশ্ন না করতে বলতেন। বাগদ্রো দেখতেন, তাঁর বাবা-মা সবসময় কেমন যেন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকেন।

        সেইসময় সারাদিন প্রতিটা রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাউডস্পিকারে সকাল থেকে সন্ধ্যা চেয়ারম্যান মাওয়ের মহত্ত্ব প্রচার করে ধারাবাহিক বক্তৃতা চলত। বুদ্ধ ও অন্যান্য দেবতার পরিবর্তে মাও, স্তালিন, মার্ক্স ইত্যাদিদের ছবি টাঙানো থাকত। প্রত্যেককে, বিশেষত ছোটোদের সবাইকে, মাওয়ের লেখা ছোট্ট রেডবুক দেওয়া হত। সেই বই সেই সময়ের এমন পবিত্র প্রতীক ছিল যে তার থেকে একটা শব্দও ভুলে যাওয়াকে সহজে ক্ষমা করা হত না।

        বাগদ্রোর ভাষায়, স্কুলে কোনো ক্লাস করতে হত না। আমরা শুধু মতাদর্শ শিখতাম। তাছাড়া অন্য কোনো বিষয় ছিল না। স্কুল শুরু হত মাওয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে। মাও আমাদের হৃদয়ে লাল তারা, মাও সেতুঙের চিন্তাধারাই আমাদের জীবন --- এইসব কথার শুধু পুনরাবৃত্তি করে যেতাম। স্কুলে কেবল সিনেমা দেখানো হত, সেখানে শুধু চীনাদের বীরত্বের কাহিনী। ভয়ানক হিংস্র সব যুদ্ধ --- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, চীন-আমেরিকার যুদ্ধ, চীন-জাপান ও চীন-ভিয়েতনামের যুদ্ধ। সব কটা সিনেমাই শেষ হত এই বক্তৃতা দিয়ে যে মহান নেতা মাও ও চীনা কম্যুনিস্ট পার্টি কীভাবে আমাদের বিজয় প্রতিষ্ঠা করেছে। কত যে অসংখ্যবার আমি ওইসব সিনেমা দেখেছি, তা আমি বলতে পারব না। ...

        রাস্তায় যত পশু দেখা যেত, সেগুলোকে মেরে ফেলার জন্য বাচ্চা ছেলেদের গুলি করা ও লড়াই করা শেখানো হত। আমাদের রোজই নির্দিষ্ট পরিমাণ কিছু পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ মেরে কম্যুনিস্ট ক্যাডারদের কাছে জমা দিতে হত। তখনকার দিনে বলা হত, তিব্বতীদের মধ্যে মঠের সন্ন্যাসীরা সবচেয়ে খারাপ। যদিও আমার বাবা মঠের সন্ন্যাসী ছিলেন। কিন্তু ছোটোবেলায় আমি সন্ন্যাসী কাউকে চোখেও দেখিনি। আসলে, অনেক পরে দলাই লামার বই যখন পড়েছিলাম, তার আগে অবধি জানতাম না যে তিনি বেঁচে আছেন। ছোটোবেলায় আমরা জানতাম, তিনি একজন অতীতকালের ব্যক্তি, যিনি ধর্মের মুখোশ ব্যবহার করে সাধারণের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিলেন।

        আমি তখন এত ছোটো যে কিছুই বুঝতাম না। ভাবতাম যে যুদ্ধ-লড়াইয়ের মধ্যেই শক্তি লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমি শুধু খাবারের জন্য লড়তাম। কারণ আমার সবসময় খিদে লেগে থাকত। বাড়িতে খাবার থাকত না। ভোর থেকে ভিক্ষে করতাম আর রাস্তায় নোংরা ফেলার গাদা থেকে খাবার খুঁজতাম। শুয়োরের নাড়িভুঁড়ি যা পেতাম তাই খেতাম। বাড়িতে ফিরতে চাইতাম না। কারণ বাড়িতে খাবার থাকত না। বাবা আর মা সবসময় ক্লান্ত বিধ্বস্ত থাকতেন। ওঁরা সকালে দূরের এক জঙ্গলে গাছ কাটার কাজ করতে বেরোতেন। সারাদিন কাজের পর সন্ধ্যেবেলা একটানা মিটিংয়ে থাকতে হত রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনার জন্য। তারপর তাঁরা অনেক রাতে বাড়ি ফিরতেন। প্রচণ্ড পরিশ্রম করেও তাঁরা এত কম পরিমাণ রেশনের খাদ্য পেতেন যে তা দিয়ে আমাদের পরিবারের ছয়জনের এক সপ্তাহের বেশি চলত না। মাসের বাকি দিনগুলো প্রায় না খেয়ে কাটাতে হত। সব পরিবারেই এই একই অবস্থা চলছিল। ফলে আমরা সবাই চোর বা ভিখিরি হয়ে পড়লাম। ... চীনারা বলেছিল, তুমি যত উৎপাদন করবে, তত তুমি খেতে পাবে ... কিন্তু দেখা গেল, যতই খাটো না কেন, খাবারের কোটা আর বাড়ে না। বুড়োরা, শিশুরা সবাই সকাল থেকে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়াত আর খাবার চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লে তাদের জুটত কঠিন শাস্তি। ... একটা সময় সেই সামান্য খাবারের রেশনও বন্ধ হয়ে গেল। আমার বাবা অনেক দূরে দূরে গিয়ে ভিক্ষা করা শুরু করলেন। আমিও তাঁর সঙ্গে যেতাম। ঘরে মা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। সে সময়ে আমরা কাঠ সিদ্ধ করেও খেয়েছি। কিন্তু খাবারের অভাবে মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে এল। শেষে তাঁর কোলে লুটিয়ে পড়ল আমার সবচেয়ে ছোটো বোন। মায়ের শুকনো স্তনে মুখ রেখে তার মৃত্যু হল। আমার মা নিজের চুল ছিঁড়ে নিজেকে আর দুনিয়ার সবাইকে উন্মাদের মতো অভিশাপ দিতে লাগলেন।

        এরকম সব ঘটনা বাগদ্রোর ভিতরে চিরন্তন ক্রোধ আর ক্ষুধার আগুন জ্বালিয়ে রেখেছিল সারাটা জীবন ধরে। ১৯৮০ সালে যখন তিব্বতীদের গলার ফাঁসটা খানিক আলগা করা হল, তারা তিব্বতী ভাষায় কথা বলা এবং তিব্বতী পোশাক পরার অনুমতি সহ আরও কিছু স্বাধীনতা পেল। তখন বাগদ্রো গ্যানদেন মঠে সন্ন্যাসী হিসেবে যোগ দিলেন। সালটা ছিল ১৯৮৩ এবং তাঁর বয়স তখন আঠারো। বাগদ্রো নিজে বলেন, আমি কোনো ধর্ম বা স্বাধীনতার ভাবনা থেকে মঠের সন্ন্যাসী হইনি। আমি আসলে খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম এবং আমার অন্তস্থ ক্রোধ ও ক্ষুধা থেকে মুক্তি পেতেই আমি মঠে ঢুকেছিলাম। এরপরে তিনি দলাই লামার আত্মজীবনী আমার দেশ, আমার মানুষজন পড়েন। এই বইটা তাঁকে গোপনে উপহার দিয়েছিলেন তাঁদের মঠ পরিদর্শন করতে এসে এক বিদেশি ভ্রমণার্থী। ১৯৮৮ সালের ৫ মার্চ মোনাম উৎসবে বিক্ষোভ দেখানোর সময় বাগদ্রোর ছবি উঠে যায়, দেখা যায় যে তিনি চীনা সৈন্যদের দিকে পাথর ছুঁড়ছেন। চারমাস আত্মগোপন করে থাকার পর বাগদ্রো গ্রেপ্তার হন। এক চীনা সৈন্যকে হত্যা করার অজুহাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিনা বিচারে আটক করে রেখে বাগদ্রোকে একের পর এক জেলে নিয়ে গিয়ে তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়।

        জেলেও তাঁকে দিনের পর দিন খেতে দেওয়া হত না। খিদের জ্বালায় পাগল বাগদ্রো একবার জেলের পায়খানায় ভেসে যাওয়া মানুষের বিষ্ঠা জড়ানো মোমো মুখে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এইসব ঘটনা আজও তিনি ভুলতে পারেননি। মুক্তি পাওয়ার পরেও ভারতে এসে ধরমশালায় লেখিকা হানির সঙ্গে সাক্ষাতের আগে তাঁর অনেকরকম মানসিক চিকিৎসা হয়েছে। কিন্তু কখনও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি। দেশে-বিদেশে বহু জায়গায় তিনি তাঁর এইসব দুর্ভোগের বৃত্তান্ত বলেছেন। কিন্তু হানি দেখেছেন, এখনও বাগদ্রো রাস্তাঘাটে যাকে তাকে ধরে তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো জানাতে চান। তাঁর ওপর যে অত্যাচার চালানো হয়েছে তা লিপিবদ্ধ করে ছাপিয়ে দেয় তিব্বতী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক নামক এক সংস্থা। সেই প্রচারপত্র বিলি করে বাগদ্রো যেন তাঁর সেই লাঞ্ছনা ও ক্রোধ প্রশমিত করতে চান। বারবার সেই খিদের যন্ত্রণার কথা উচ্চারণ করার মধ্য দিয়ে বাগদ্রোর ভিতরে এক শূন্যতাকে দেখতে পাওয়া যায়। এই শূন্যতা জন্ম নিয়েছিল তাঁর অতীত জীবনের উদ্ভ্রান্তি ও হিংসার সময়ে। বাগদ্রো এই শূন্যতাকে মোকাবিলা করার মতো কোনো অন্তর্বস্তু খুঁজে পাননি।                                [ক্রমশ]


 

Comments