মন্থন সাময়িকী জুলাই আগস্ট ২০১১

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

লন্ডনে দাঙ্গা না বিদ্রোহ?

দুর্নীতির লজিক

নীতি-দুর্নীতির পাকেচক্রে

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

আইনি থেকে বেআইনি খনিজ উত্তোলন

দুর্নীতির অদৃশ্য লম্বা হাত

তিব্বতীদের চোখে চীন [২]

শ্যামলী খাস্তগীর স্মরণে


 

আইনি থেকে বেআইনি খনিজ উত্তোলন

দুর্নীতির অদৃশ্য লম্বা হাত

কর্নাটকের লোকআয়ুক্ত সন্তোষ হেগড়ের রিপোর্টের একটি পর্যালোচনা

জিতেন নন্দী

 


কর্নাটকের বেআইনি আকরিক লোহা উত্তোলন নিয়ে ওই রাজ্যের লোকআয়ুক্ত সন্তোষ হেগড়ের দ্বিতীয় রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে ২৭ জুলাই। প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর ২০০৮। আকরিক লোহা হল এমন একমাত্র বস্তু (সম্ভবত খনিজ তেল বাদ দিয়ে) যা বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে অন্য যে কোনো পণ্যের চেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে। কারণ আকরিক লোহা থেকে প্রস্তুত ইস্পাত হল এমন এক ধাতু, বিশ্বে যার ব্যবহার সমস্ত ধাতুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৯৫%। অতএব আমরা এমন এক রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি, যে রিপোর্ট ভারতের একটা রাজ্যের বিষয় বলে আপাতভাবে মনে হলেও তার এক বিশ্ব জোড়া তাৎপর্য রয়েছে।

        দুর্নীতি প্রসঙ্গে মনে প্রশ্ন জাগে, শহরের ট্রাফিক পুলিশ থেকে দেশের মন্ত্রী পর্যন্ত মানুষেরা যেসব দুর্নীতির মধ্যে প্রায়শই জড়িয়ে পড়ে, দুর্নীতি কি সেটুকুই? নাকি দুর্নীতির হাত আরও লম্বা? আর সেই হাত আদৌ সবটা দেখা যায় কিনা, সে প্রশ্নও এই রিপোর্ট পড়লে সঙ্গতভাবেই উঠে পড়বে।

        কর্নাটক লোকআয়ুক্ত আইন, ১৯৮৪-র ৭(২-এ) ধারা বলে কর্নাটক সরকার ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চারটি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি ২০০০ থেকে ১৯ জুলাই ২০১০ অবধি সময়কালে কর্নাটকের বেলারি, টুমকুর ও চিত্রদুর্গা জেলায় বেআইনি খনিজ উত্তোলন (মূলত আকরিক লোহা) ও আনুষঙ্গিক কয়েকটি ক্ষেত্রের দুর্নীতি নিয়ে কর্নাটকের তৎকালীন লোকআয়ুক্ত সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সন্তোষ হেগড়েকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। আমাদের পর্যালোচনার বিষয় শ্রী হেগড়ের রিপোর্ট।

        বেআইনি খনিজ উত্তোলন কথাটা শুনলে মনে হয় খনিজ উত্তোলনের একটা আলাদা আইনি গল্প আছে। যেন আপত্তি কেবল বেআইনি ব্যাপারটুকু নিয়েই। সেখানেও প্রশ্ন জাগে। প্রশ্নটা দুর্নীতি কাকে বলছি সেই অবধি চলে যায়। নৈতিকতা এবং মানবিকতার প্রশ্ন যদি দুর্নীতির সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে বলা যেতে পারে, পৃথিবীর বুক থেকে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ইতিহাস, বেবাক দুর্নীতির ইতিহাস। কিন্তু আমরা ভদ্দরলোকেরা মানবিকতার বিষয়টাকে বাদ দিয়ে নৈতিকতার একটা পরিসর ইচ্ছে মতো গড়ে নিয়েছি। সেখান থেকেই তো দুর্নীতির শুরু। আমরা দিব্যি পাথরের মোজাইক করা মেঝের ওপর বসে পাথর খাদানের নির্মমতা নিয়ে আলোচনা করতে পারি; প্রাইভেট মোটরগাড়িতে চেপে এসে খনিশ্রমিকের দুর্দশা নিয়ে বক্তৃতাও করতে পারি। আমাদের নৈতিকতায় তা আটকায় না। সন্তোষ হেগড়ের রিপোর্টেও এই অ-নৈতিকতার সামাজিক গ্রাহ্যতার বিবরণ রয়েছে ছত্রে ছত্রে। কিন্তু এই নৈতিকতার কলুষতাকে বুঝতে আমাদের নতুন করে একটা রিপোর্ট কেন লাগবে? প্রত্যেকদিন আমাদের ব্যক্তিমন চলতে-ফিরতে যে দুর্নীতিতে সায় দেয়, তার সঙ্গেই তো লেপ্টে রয়েছে আমাদের বিবেক, কাণ্ডজ্ঞান। যথেচ্ছভাবে মাটির ভিতর থেকে খনিজ তুলে লোভী মনের খিদে মেটানোর দুর্নীতিকে আমরা সকলেই বিলক্ষণ চিনি।

আইনি খনিজ উত্তোলন

১৯৬০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বেলারি জেলায় আকরিক লোহা উত্তোলন একভাবে চলছিল। হঠাৎ ঝড়ের মতো কোথা থেকে এল চায়না বুম! বেলারি জেলায় বেলারি, হোসপেট ও সান্দুর তালুক নিয়ে যে খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চল সেখানে ১০০০ মিলিয়ন টন আকরিক লোহার সঞ্চয় রয়েছে। ২০০০ সাল অবধি বাৎসরিক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উৎপাদন মিলিয়ে এই সঞ্চয়ের ১%-এর কিছু বেশি উত্তোলন হত। ২০০১-০২ সালে উৎপাদন ছিল প্রায় ১২.৪ মিলিয়ন টন; ২০০২-০৩ সালে ছিল ১৩.৯ মিলিয়ন টন। ২০০৪-০৫ সালের চায়না বুমের পর ২০০৭-এর শেষে এই উৎপাদন বেড়ে হল ৪১ মিলিয়ন টন। এই চায়না বুমের ধাক্কায় বেলারি জেলায় প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার লরি ভর্তি আকরিক লোহা খনিগুলো থেকে রেলস্টেশন আর সমুদ্র বন্দরে যাতায়াত করত। হঠাৎ খনিজ উত্তোলনে এক লাফে এতখানি বৃদ্ধি এই অঞ্চলের সমস্ত আইনি ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিল।

        কর্নাটকে দীর্ঘকাল যাবৎ আকরিক লোহার ব্যবসায় কিছু পরিবার যুক্ত ছিল। যেমন, সান্দুরের রাজ পরিবার --- যাদের স্থানীয় মানুষ রাজা বলে সম্বোধন করত --- তাদের এলাকায় ম্যাঙ্গানিজ ও আকরিক লোহা উত্তোলন করাত। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন মন্দা এল, দেশের ভিতরেও ক্রেতারাই আকরিকের দাম স্থির করত। ফলে এই পুরনো পরিবারগুলোর ব্যবসা ঝিমিয়ে পড়ল। ২০০২ সালে চীনে প্রচুর আকরিক লোহার দরকার পড়ল। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে ছিল বেজিং অলিম্পিক। আসলে চায়না বুম শুধু অলিম্পিকের ব্যাপার ছিল না। দুই দশক আগে থেকেই চীন হয়ে উঠেছিল পশ্চিমি উন্নত দেশগুলোর উৎপাদন বা ফ্যাকট্রি অঞ্চল। আকরিক লোহার উত্তোলন থেকে শুরু করে ইস্পাত নির্মাণ এবং ইস্পাত ব্যবহার করে গাড়ি শিল্প, সবটাতেই পরিবেশ ভয়াবহ দূষিত হয়। তার প্রতিটি স্তরে জড়িয়ে থাকে বাতাসে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার উষ্ণায়নের সমস্যা। ইউরোপ-আমেরিকার বড়ো কোম্পানিগুলো তাদের ব্র্যান্ড-উৎপাদনের ওয়ার্কশপ এশিয়ার দেশগুলোতে সরিয়ে ফেলতে চাইছিল। এরই ফলশ্রুতিতে এসেছিল চায়না বুম। আর এর জন্যই বেড়েছিল ভারত থেকে আকরিক লোহার রপ্তানি বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান তাগিদ। ২০০৫ সালে চীন ও ভারত সরকারের মধ্যে মাইনিং সেক্টরে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়।

        গোটা শিল্পদুনিয়া জুড়ে ইস্পাতের খিদে যেন রাতারাতি বেড়ে গেল। প্রচুর ইস্পাত তৈরি হবে, প্রচুর আকরিক লোহা দরকার। টার্গেট হল বেলারি-হোসপেট-সান্দুর অঞ্চল। এই অঞ্চলের (সান্দুর বেল্ট) আকরিক লোহা খুবই উচ্চমানের, আকরিকের মধ্যে ধাতব Fe কন্টেন্ট ৬২-৬৮ শতাংশ। বেলারি জেলায় আকরিক লোহা উত্তোলনের ১৩২টি আইনি অনুমোদন (মাইনিং লিজ) রয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি জঙ্গল এলাকায়, ৩৩টি জঙ্গল নয় এমন সরকারি জমিতে, যার মধ্যে রয়েছে পাট্টা জমি। এছাড়া, বিশাল চাষের জমি এলাকাতেও ভাসমান আকরিক লোহা রয়েছে, যা মাটির ৫ থেকে ১০ মিটার গভীরতায় পাওয়া যায়। সরকারি, জঙ্গল এবং পাট্টা জমিতেও ভাসমান আকরিক রয়েছে। এই লিজ নিয়ে যারা আকরিক লোহা উত্তোলন করে, তারা এক মেট্রিক টন আকরিক উত্তোলন বাবদ সরকারকে ১৬-২৭ টাকা রয়ালটি দেয়। আকরিকের মান (Fe কন্টেন্ট) অনুযায়ী তা কমবেশি হয়। যখন এই আকরিকের রপ্তানির তেমন চাহিদা ছিল না, তখন এক মেট্রিক টন আকরিকের রপ্তানি-মূল্য ছিল ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। ২০০৪-০৬ পর্যায়ে যখন রপ্তানি তেজী হল, তখন দর ছিল ৬০০০-৭০০০ টাকা। সরকারি হিসেবে, এক মেট্রিক টন আকরিক উত্তোলনের খরচ ১৫০ টাকা। তার সঙ্গে পরিবহন খরচ পড়ে ২৫০ টাকা এবং রয়ালটি যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় ৪২৭ টাকা। যদি এক মেট্রিক টনের রপ্তানি-মূল্য সর্বনিম্ন অর্থাৎ ১৫০০ টাকা হয়, তাহলেও রপ্তানিকারীর এক মেট্রিক টন পিছু ১০৭৩ টাকা লাভ হয়। টন পিছু এত বেশি লাভের হার, অথচ সরকার খুব বেশি হলে পায় মাত্র ২৭ টাকা।

        তথাকথিত চায়না বুমের পর্বে ইস্পাতের আন্তর্জাতিক দর খু্ব অল্প সময়ের মধ্যে এক লাফে বেড়ে গেল; বেলারি-হোসপেট-সান্দুর অঞ্চল থেকে আকরিক লোহা বিদেশে রপ্তানি করা এক অতি লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠল। সরকারকে বঞ্চিত করে বেসরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে সেই বিপুল মুনাফাকে হস্তগত করার জন্য একটা চক্র গড়ে উঠল। এই চক্রের মধ্যে নানা সরকারি বিভাগ ও সংস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বহু মানুষের মদত যুক্ত হল। ক্রমাগত খনিজ উত্তোলনের আইনি সীমা ছাড়িয়ে বেআইনি পথে খনিজ উত্তোলন এক প্রকাশ্য ও মুখ্য ঘটনা হয়ে উঠল।

        ১৫ মার্চ ২০০৩ কর্নাটক সরকার (কংগ্রেসের এস এম কৃষ্ণা ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, এখন তিনি ভারতের বিদেশমন্ত্রী) সরকারি উদ্যোগে খনিজ উত্তোলনের জন্য সংরক্ষিত ১১৬২০ বর্গ কিমি জমি এবং আকরিক লোহা সমৃদ্ধ আরও ৬৮৩২.৪৮ হেক্টর জমি বেসরকারি খনিজ উত্তোলনের জন্য (ডি-রিজার্ভ) ছেড়ে দিল। এই বিশাল পরিমাণ জমি যেসব ব্যক্তি ও সংস্থার কাছে গেল, তারও কোনো মানদণ্ড সরকারের কাছে ছিল না। সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, খনিজ উত্তোলন ভিত্তিক শিল্পগুলোতে আরও চাকরি সৃষ্টি করা, বেসরকারি পুঁজিকে আকৃষ্ট করা এবং পেশাদার পরিচালকদের হাতে রাজ্যের খনিজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই এইভাবে সরকারি জমি বেহাত করা হচ্ছে। এর ওপর সরকারি লিজের নির্ধারিত সীমানা, সময়কাল ছাড়িয়ে অবাধে খনিজ উত্তোলন হতে থাকল। পাট্টা জমি এবং জঙ্গল এলাকাতেও সেই বেআইনি উত্তোলন প্রসারিত হল। এই বেআইনিভাবে তোলা আকরিক লোহা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেআইনি ট্রান্সপোর্ট পারমিট, ফরেস্ট পাস দেওয়া হল। ট্রাকগুলোতে ইচ্ছে মতো ওভারলোড করে আকরিক পরিবহণ চলতে থাকল।

        ২০০৩-০৪ এবং ২০০৪-০৫ সালের অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের তদন্ত রিপোর্টে ধরা পড়ল, মাইসোর মিনারেলস লিমিটেড নামক পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিং সংস্থার বেআইনি কার্যকলাপ। বেশ কিছু চুক্তি, কন্ট্রাক্ট, যৌথ উদ্যোগ ইত্যাদি করা হয়েছে এমন কিছু বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিদের সঙ্গে, যাতে একতরফাভাবে সরকারের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের অনেক বেশি পরিমাণে আকরিক লোহাচূর্ণ, মাড স্টক/নিম্নমানের আকরিক বাজার দরের থেকে অনেক কম দামে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

        এই হল আইনি ব্যবস্থার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বেআইনি কার্যকলাপের এক বিশাল এবং সুসংগঠিত ব্যবস্থা। কর্নাটকের লোকআয়ুক্ত রিপোর্ট জুড়ে রয়েছে তারই বিবরণ। দু-একটি উদাহরণ দিলে এই ব্যবস্থার স্বরূপ কিছুটা বোঝা যেতে পারে।                                           

ওবুলাপুরম মাইনিং কোম্পানি

ওবুলাপুরম হল বেলারির মধ্যে আকরিক লোহার এক অতি সমৃদ্ধ খনি এলাকা। এক বিশেষ পরিবার এই আকরিক উত্তোলনে আকৃষ্ট হয়। ওবুলাপুরম মাইনিং কোম্পানি তৈরি করে তারা এইসময় খনিজ উত্তোলনের লিজ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। কর্নাটকে লিজ না পেয়ে তারা লাগোয়া অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলায় ১৩৪ হেক্টর খনি এলাকায় লিজ আদায় করে। এই লিজ এলাকায় আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন টন আকরিক লোহার সঞ্চয় রয়েছে। প্রথম থেকেই অন্ধ্রের এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। আইনত তারা অন্ধ্রের ওই এলাকায় আকরিক লোহা তুলতে শুরু করে। কিন্তু রপ্তানি ব্যবসার প্রবল চাহিদা মেটাতে তারা বেআইনিভাবে কর্নাটকের সীমানার মধ্যে ব্যাপকভাবে আকরিক উত্তোলন করতে থাকে। ইতিমধ্যে বিদেশেও তাদের ভালো যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। এই কোম্পানির ডিরেক্টর ছিলেন জি জনার্দন রেড্ডি, জি লক্সমি অরুণা, জি করুণাকর রেড্ডি, ডি পরমেশ্বর রেড্ডি এবং বি শ্রীরামুলু। 

        ২০০৪ সালে সিঙ্গাপুরে ম্যান-গো পাব পিটিই লিমিটেড নামে এক বেসরকারি কোম্পানি নথিভুক্ত হয়। তারা খাদ্য, পানীয় ও আমোদপ্রমোদের পরিষেবা দিত। ২০০৭ সালে এই কোম্পানির নাম বদল করে রাখা হয় জিএলএ ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল পেট লিমিটেড এবং তার কাজের বদল হয়ে যায়। এখন এটি আমদানি-রপ্তানি সহ হোলসেল ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে নথিভুক্ত হয়। ১৯ ডিসেম্বর ২০০৭ জি জনার্দন রেড্ডি এই কোম্পানির ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। এই কোম্পানির একটা শেয়ার আইল অফ ম্যান-এর জিজেআর হোল্ডিংস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে স্থানান্তরিত করা হয়। আইল অফ ম্যান হল একটি ট্যাক্স হেভেন অর্থাৎ করমুক্ত অঞ্চল। ২০০৯ সালে ওই শেয়ারটি ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের ইন্টারলিঙ্ক সার্ভিসেস গ্রুপ লিমিটেডের নামে স্থানান্তরিত হয়। ব্রিটিশ ভার্জিনও ট্যাক্স হেভেন নামে পরিচিত। জনার্দন রেড্ডি ডিরেক্টর থাকাকালীন বেলারির ওবুলাপুরম কোম্পানি থেকে জিএলএ পেট লিমিটেডে কর্নাটক অরিজিনের ৮,৫২,০৩৩ মেট্রিক টন আকরিক লোহা রপ্তানি করা হয়। চালানে কারচুপি করে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) ২০০৭-০৮ এবং ২০০৮-০৯ এই দুবছরে ওবুলাপুরম কোম্পানি রপ্তানি বাবদ প্রায় ২১৫ কোটি টাকার বেশি সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়। ওবুলাপুরম কোম্পানির কর্নাটকে কোনো লিজ বা অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও কর্নাটক উৎসের ৭১,৬১,৪৫৫ মেট্রিক টন আকরিক লোহা তারা রপ্তানি করে ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে। এছাড়া ওইসময় অন্ধ্র উৎসের আকরিক লোহাও তারা রপ্তানি করেছে। কিন্তু কর্নাটকের আকরিক রপ্তানির পুরোটাই ছিল বেআইনি।

২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মোট ১২.৫৭ কোটি মেট্রিক টন কর্নাটক উৎসের আকরিক লোহা রপ্তানি হয়েছিল কর্নাটক, তামিল নাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, গোয়ার দশটি বন্দর থেকে। লোকআয়ুক্ত রিপোর্টে প্রকাশিত হিসেব অনুযায়ী এর মধ্যে ২,৯৮,৬০,৬৪৭ মেট্রিক টন ছিল বেআইনিভাবে রপ্তানি হওয়া আকরিক। প্রথম লোকআয়ুক্ত রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পর কর্নাটক সরকার ২৮ জুলাই ২০১০ রপ্তানির ওপর পারমিট দেওয়া নিষিদ্ধ করে। কিন্তু এর পরেও বিভিন্ন বন্দর থেকে ৮৩টি রপ্তানি করা হয়। তার পরিমাণ ছিল ১৭,৫৮,৩৩৬ মেট্রিক টন।

২০০৫-০৬ নাগাদ রপ্তানিকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রেষারেষি বেড়ে যায়। সকলেই রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহার করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। ওবুলাপুরম পরিবার এইসময় রাজনীতিতে আসে এবং বিজেপিতে যুক্ত হয়। তারা নির্বাচনে সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে সুষমা স্বরাজের পক্ষ নেয়। কর্নাটকের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামীর (জনতা দল, সেকুলার) সঙ্গে রেড্ডি ভাইদের বিরোধ শুরু হয়। তারা কুমারস্বামীর নামে সরকারি সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১৫০ কোটি টাকা হস্তগত করার অভিযোগ তোলে। সরকারি তদন্ত কমিশন বসে। তদন্ত মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জনার্দন রেড্ডি হাইকোর্টে মামলা করেন। এইসময় সন্তোষ হেগড়েকে লোকআয়ুক্ত নিয়োগ করা হয় এবং তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। জি করুণাকার রেড্ডি, জি জনার্দন রেড্ডি এবং জি সোমশেখর রেড্ডি ২০০৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে নতুন বিজেপি সরকারের মন্ত্রীত্ব লাভ করেন। কিন্তু সমস্যা শুধু রেড্ডি ভাইদের নিয়েই ছিল না। আইনি লিজ এলাকার বাইরে ১০০-১৫০ জায়গায় আকরিক লোহার উত্তোলন চলছিল। ওবুলাপুরম একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত মাত্র।              

জিন্দাল স্টিল

১৯৮২ সালে জিন্দাল গ্রুপ তাদের প্রথম স্টিল প্ল্যান্ট তৈরি করে মুম্বাইয়ের কাছে ভাসিন্দ-এ। এরপর তারা পিরামল স্টিল্‌স লিমিটেড নামে একটা কোম্পানি কিনে নেয়। মহারাষ্ট্রের তারাপুরে পিরামলের একটা ছোটো স্টিল প্ল্যান্ট ছিল। জিন্দালের নতুন নামকরণ হয় জিন্দাল আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড (JISCO)। ১৯৯৪ সালে তারা বেলারি-হোসপেট অঞ্চলের উৎকৃষ্ট মানের আকরিক লোহা সমৃদ্ধ এলাকা তোরানাগাল্লু-তে ৩৭০০ একর জমিতে জিন্দাল বিজয়নগর স্টিল লিমিটেড (JVSL) নির্মাণ করে। ২০০৫ সালে JISCO এবং JVSL মিলে তৈরি হয় JSWJSW ঘোষণা করেছে, পশ্চিমবঙ্গ (শালবনী) ও ঝাড়খণ্ডে ১০ মিলিয়ন টন বাৎসরিক উৎপাদন ক্ষমতার দুটি গ্রিনফিল্ড ইন্টিগ্রেটেড স্টিল প্ল্যান্ট তৈরি করে ২০২০ সালে তারা বছরে ৩৪ মিলিয়ন টন ইস্পাত তৈরি করবে

        ১২ এপ্রিল ২০১১ JSW কর্নাটক সরকারকে জানিয়েছে, কর্নাটক মহারাষ্ট্র ও তামিলনাড়ুর স্টিল প্ল্যান্টের জন্য তাদের বছরে মোট ২৭১.৫ লক্ষ টন আকরিক লোহা দরকার। কিন্তু লোকআয়ুক্ত দপ্তরে পাঠানো JSWর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০০৯-১০ সালে ইস্পাত উৎপাদনে তাদের আকরিক লোহা ব্যবহার হয়েছে অনেক কম, ৯৬ লক্ষ টন।

        আকরিক লোহা উত্তোলনের লিজ রয়েছে এবং ট্রেডার মিলিয়ে ৬০টি কোম্পানি JSWকে সড়ক ও রেলপথে আকরিক সরবরাহ করে। ২০০৯-এর এপ্রিল থেকে ২০১০-এর জুলাই পর্যন্ত ট্রাক পিছু হিসেব অনুযায়ী সরকারি পারমিটের বরাদ্দ থেকে কমপক্ষে ১২ লক্ষ ৯৭ হাজার ৭০৭ টন বাড়তি পরিমাণ আকরিক JSWকে সরবরাহ করা হয়েছে (পারমিট অনুযায়ী এক-একটা লরিতে ১৬ টন আকরিক বওয়ার অনুমোদন রয়েছে, বাড়তি লোড করে JSWকে ৬৫,৩৩,৮৭২ টনের জায়গায় ৭৮,২৬,২৭৬ টন আকরিক সরবরাহ করা হয়।) সেইসময় এক টন আকরিকের বাজার দর ছিল ২৫০০ টাকা। সেই হিসেবে সরকারের ৩২৪,৪২,৭২,৫০০ টাকা অর্থাৎ ৩২৪ কোটি টাকার কিছু বেশি ক্ষতি করানো হয়েছে। এর জন্য দায়ী করা হয়েছে ট্রান্সপোর্টারদের। কিন্তু ট্রান্সপোর্টারদের পিছনে কোন অদৃশ্য হাত রয়েছে?  

        ১৭ জানুয়ারি ১৯৯৭ মাইসোর মিনারেল্‌স লিমিটেড (MML) জিন্দালদের JVSLএর সঙ্গে একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি বিজয়নগর মিনারেল্‌স প্রাইভেট লিমিটেড (VMPL) গঠন করে জিন্দাল স্টিল প্ল্যান্টে দরকার মতো আকরিক লোহা সরবরাহ করতে সম্মত হয় রাষ্ট্রায়ত্ত MML। এই ব্যাপারে থিম্মাপ্পানাগুড়ি মাইন VMPLএর হাতে দেওয়া হয়। সেইসময় থেকে ২০০৪-০৫ সাল পর্যন্ত চালানের (ইনভয়েস) কারচুপি (যতটা খাতায় কলমে দেখানো হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি আকরিক লোহা সরবরাহ করা হয়েছে।) করে MMLএর ২৫ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি করানো হয়। এর জন্য লোকআয়ুক্ত রিপোর্টে সেইসময়কার ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের দায়ী করা হয়। অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, জিন্দাল ছাড়াও কল্যাণী স্টিল, কল্যাণী ফেরাস, মুকুন্দ-এর সঙ্গে চুক্তি বাবদ বেআইনি সুবিধা দিয়ে MMLএর প্রচুর টাকা ক্ষতি করানো হয়েছে। এব্যাপারে MML পরিচালকদের কাছে কিছু ব্যক্তি ও সংস্থাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য সুপারিশও করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রী এবং বিধায়কেরা। লোকআয়ুক্ত রিপোর্টে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ উদ্ধৃত করে দেখানো হয়েছে যে এইসব সুপারিশ বেআইনি। কিন্তু যারা সুবিধা পেয়েছে, কখনই তাদের দিকে আঙুল ওঠেনি। লোকআয়ুক্ত আইনের সেই এক্তিয়ার নেই।   

        সরকারি MML কোম্পানির হাতে হাজার হাজার কিমি আয়তনের খুব ভালো মানের খনি রয়েছে। অথচ দেখা যাচ্ছে, আকরিক লোহার চাহিদা যখন তুঙ্গে, তখনও MMLএর খনিজ উত্তোলনে কোনো উদ্যোগ নেই। এই পর্বে তারা কেবল সরকারি হেফাজতে থাকা খনিগুলোর সাব-লিজ বন্টন করে গেছে থার্ড পার্টিদের। ২০০২ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে এই কোম্পানির ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে জিন্দালদের মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে এইভাবে বেআইনি কোটি কোটি টাকা এবং আকরিক লোহা তুলে দেওয়া হয়েছে কেন? শুধু শিল্পায়নের যুক্তি কি এক্ষেত্রে যথেষ্ট মনে করা যায়? সন্তোষ হেগড়ের রিপোর্টে MMLএর একের পর এক ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু পরপর প্রত্যেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর ব্যক্তিগতভাবে এইভাবে দুর্নীতির খপ্পরে পড়ল কীভাবে? এখানেই কি রয়েছে দুর্নীতির সেই অদৃশ্য হাতের নিয়ন্ত্রণ?

        রিপোর্টে দায়ী করা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পাকে। মিডিয়াও ইয়েদুরাপ্পার ওপর এতখানি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে যে এই বিশাল এবং সুসংগঠিত কাণ্ডের অন্য যোগাযোগগুলো জনমনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। JSW তার সাপ্লায়ারদের মাধ্যমে ইয়েদুরাপ্পার পরিবার চালিত প্রেরণা এডুকেশন সোসাইটি নামক এনজিও-কে ১০ কোটি টাকা দান করেছে। সাউথ ওয়েস্ট মাইনিং নামে JSWর এক সহযোগী কোম্পানি ইয়েদুরাপ্পার দুই ছেলে ও নাতির কাছ থেকে ২০ কোটি টাকায় বাঙ্গালোরে এক একর জমি কিনেছে। অথচ সেই জমির বাজার দর ছিল কমবেশি এক কোটি টাকা। কিন্তু সন্তোষ হেগড়ের পুরো রিপোর্ট পড়লে এইসব দুর্নীতির ঘটনাকে নেহাত তুচ্ছ বলেই মনে হয়।

        JSW স্টিল লিমিটেড ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা) সম্পত্তির মালিক ও পি জিন্দাল গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। মাত্র এক দশকের মধ্যে একলাফে তার বিশাল বৃদ্ধি ঘটে। স্টিল, এনার্জি, বন্দর ও পরিকাঠামো, সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম এবং তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের দুনিয়ায় তার প্রবেশ ঘটে। চিলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মোজাম্বিকে এই গ্রুপ আকরিক লোহা সহ খনিজ সম্পদের দখল নিয়েছে। এবছর বলিভিয়া থেকেও জিন্দালরা আকরিক লোহা রপ্তানি শুরু করেছে। বোঝা যায়, ইস্পাত এবং তার কাঁচামাল আকরিক লোহা দুটোর ব্যবসাই জিন্দালদের হস্তগত।

        জিন্দালদের এই আগ্রাসী দখলদারীর মেজাজ শেয়ারবাজারে যথেষ্ট কদর পায়। মিডিয়ার মাধ্যমে তারা তাদের এই আত্মবিশ্বাস জনমনে ছড়িয়ে দেয়। অতীতে আমরা দেখেছি, বাজার দখল হয়েছে কখনও বিশেষজ্ঞতার জোরে, কখনও ঔপনিবেশিকতার মাধ্যমে, কখনও উৎপাদন খরচ কমিয়ে। কিন্তু এখন এই বিশ্ব-কারবারিদের সমস্ত কেনাবেচার ওপরে থাকে স্টক কিনে ফেলার ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার জোরে এরা ইস্পাত, শক্তির মতো বড়ো বড়ো বাজারগুলোকে দখল করে। বাজারের দিক থেকে ধেয়ে এসে এরা কাঁচামালের উৎসগুলোকে কব্জা করে নেয়। কিন্তু মোটেই পুরনো কায়দায় নয়। খনিতে এদের হয়তো সরাসরি তেমন দখল নেই। তার দাবিদারও এরা নয়। যদিও শোনা যাচ্ছে, ওবুলাপুরমের কিছু শেয়ার নাকি JSW কিনতে চাইছে। কিন্তু জিন্দালরা সেই সাবেকি খনিমালিক মোটেই নয়। খনি ও খনিজের ওপর এদের কায়েম হয়েছে এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। দৃশ্য ঘটনাগুলো উঠে আসছে আদালতের কাঠগড়ায়, অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেলের রিপোর্টে, পরিবেশগত পরিসংখ্যানে, সন্তোষ হেগড়ের বিস্তৃত বিবরণে। শত শত সরকারি অফিসার, ১১ জন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার পরিচালক (সিএমডি), মন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রী ফেঁসে যাচ্ছে; তাদের সাজা ও আর্থিক জরিমানার জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে রিপোর্টে। রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে, হোসপেট-সান্দুর-বেলারি অঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতো হিসেব-বহির্ভুত নথিভুক্ত এবং অনথিভুক্ত আকরিক লোহার কারবারি গজিয়ে উঠেছে। গত দু-তিন বছরে, এই বেআইনি ব্যবসায় বড়ো অংকের মুনাফা থাকার কারণে, এক মাফিয়া ধরনের কার্যকলাপ শুরু হয়েছে। এর সম্পূর্ণ মদত করছে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে পুলিশ বিভাগ, আরটিও, মাইন্‌স, ফরেস্ট, রাজস্ব, কমার্সিয়াল ট্যাক্স, রাজ্য পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড, লেবার, ওয়েট অ্যান্ড মেজার্স এবং অন্য দপ্তরের আধিকারিকেরা। এদের ঘুষের পরিমাণ, কে কত টাকা সরকারের ক্ষতি করেছে ইত্যাদি সমস্ত হিসেব এই রিপোর্টে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু ঘুষ যারা দিচ্ছে, যারা বিদেশি ব্যাঙ্কে অর্থ জমা করে দিচ্ছে, যাদের হাতে রয়েছে পাওয়ারফুল অব্যর্থ রিমোট কন্ট্রোল, তাদের তেমনভাবে ধরা যাচ্ছে না। সন্তোষ হেগড়ের রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পরদিন জিন্দালদের শেয়ারের দর ৫% পড়ে গেছে। আদানি, এনএমডিসি-র (এনএমডিসি ন্যাশনাল মিনারেল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন, কর্পোরেট, যাতে ভারত সরকারের প্রচুর শেয়ার রয়েছে) শেয়ারের দরও পড়ে গেছে। এদের নাম রয়েছে সন্তোষ হেগড়ের রিপোর্টে। তার প্রতিক্রিয়ায় শেয়ারবাজারের আত্মবিশ্বাসে সামান্য চিড় ধরেছে। জিন্দালদের কাছে সেটুকুই যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ।

দুর্নীতি এক নতুন ক্ষমতা

জিন্দালদের ব্যবসার গতিবিধি এখানে একটা দৃষ্টান্ত মাত্র। দুর্নীতির এক নতুন ক্ষমতার আন্দাজ পেতে এই দৃষ্টান্ত ধরে আমরা আলোচনা করেছি। জিন্দাল, আর্সেলরমিত্তাল, টাটা স্টিলকে আমরা ভারতীয় কোম্পানি বলেই মনে করি। কিন্তু এদের ব্যবসা মোটেই ভারতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১০ সালে সারা বিশ্বের ১৪১৩.৫ মিলিয়ন (১ মিলিয়ন =দশ লক্ষ) মেট্রিক টন ক্রুড স্টিল উৎপাদনের মধ্যে চীনের মোট উৎপাদন ছিল ৬২৬.৭ মিলিয়ন টন (প্রথম স্থানে), ভারতের উৎপাদন ছিল ৬৮.৩ মিলিয়ন টন (চতুর্থ স্থানে)। একই সময়ে আর্সেলরমিত্তালের একার উৎপাদন ছিল ৯৮.২ মিলিয়ন টন, টাটা স্টিলের ছিল ২৩.২ মিলিয়ন টন এবং JSW-র ছিল ৬.৪ মিলিয়ন টন। বিশ্বে বেসরকারি উৎপাদকদের মধ্যে আর্সেলরমিত্তালের স্থান প্রথম, টাটার সপ্তম এবং জিন্দালের ৩৩তম। জিন্দালরা ক্রমশ আরও সামনের সারিতে এগিয়ে আসছে। পরিসংখ্যানগুলো মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, বেসরকারি উৎপাদকদের উৎপাদন কোনো নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এছাড়া, ২০১০ সালে JSW কানাডার সিআইসি কর্প অধিগ্রহণ করে নেয়। এইভাবে এশিয়ার নতুন বহুজাতিক ইস্পাত কোম্পানিগুলো ইউরোপের পুরনো নামজাদা ইস্পাত কোম্পানিগুলোকে কিনে নিচ্ছে বা পরস্পর সংযুক্ত হচ্ছে, এই প্রবণতাও এই পর্বে লক্ষ্য করা গেছে।

        গ্লোবাল কর্পোরেটদের কোনো বিশেষ পণ্যের (যেমন, ইস্পাত বা আকরিক লোহা) কেনাবেচা কোনো বিশেষ দেশ, কোনো বিশেষ রাজ্য বা অঞ্চল, কোনো বিশেষ প্ল্যান্ট বা সংস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়। তাদের সবচেয়ে বড়ো পুঁজি তামাম বিশ্ববাজারের ওপর কায়েম হয়ে থাকা তাদের অদৃশ্য ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে কোনো দেশের সরকার, সরকারের মন্ত্রী-আমলারা, খনিজ বা প্রাকৃতিক সম্পদের উৎসগুলোর ওপর প্রত্যক্ষ দখলদারী কায়েম করে থাকা ওবুলাপুরমের মতো স্থানীয় বহু কোম্পানি। মিডিয়া থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিল্পায়ন, উন্নয়ন ইত্যাদি বুলির আড়ালে এই নিয়ন্ত্রণকে পুষ্ট করে। এই নতুন ক্ষমতা নিজেই এক দুর্নীতি। কারণ প্রচলিত সমস্ত নীতি, আইন, সংবিধান, গণতন্ত্র এবং মানবিকতার উর্দ্ধে এই ক্ষমতার বিচরণ।

 

সূত্র :

1.   Report of Karnataka Lokayukta, Part I, 18 December 2008

2.   Report of Karnataka Lokayukta, Part II, 27 July 2011

3.   World Steel in Figures 2011, World Steel Association

4.   Mining Lease Is Used As James Bond’s Gun, Tehelka Magazine, Vol 7, Issue 13, Dated April 03, 2010

5.   JSW Group, Obulapuram Mining Company etc. in Wikipedia

 


১ পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাও একইরকম। সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলন হল, একটা সরকারের পতন হল। এত কিছুর পরেও সরকারের সঙ্গে টাটা গোষ্ঠীর যে চুক্তি হয়েছিল, তার কিছু অংশ আজও জনসমক্ষে আসেনি। সেই চুক্তিকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট সিপিআইএম নেতারা যথেষ্ট হেনস্থা হয়েছিলেন। কিন্তু কখনই মিডিয়াতে টাটার সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। আমার কাছে কলকাতার এক নেতৃস্থানীয় সিপিআইএম কর্মী একান্তে বলেছিলেন, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ওপর তৃণমূল এবং মমতা ব্যানার্জি যে অবস্থান করে বসেছিলেন, তা পুলিশ দিয়ে তুলে দেওয়া উচিত ছিল। সেইসময় মুখ্যমন্ত্রী ও দায়িত্বশীল নেতারা দৃঢ় মনোভাব দেখাতে পারেননি। টাটার মতো একটা কোম্পানি রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ায় জনমনে দলের ভাবমূর্তি খারাপ হয়েছে। দলের নেতাদের সততা নিয়ে যদিওবা প্রশ্ন তোলা যায়, টাটার সততা প্রশ্নের উর্দ্ধে। কারণ সমস্ত সরকারের আমলেই উন্নয়ন বা শিল্পায়ন-এর মতো টাটা বা জিন্দালরা অপরিহার্য।

 

Comments