মন্থন সাময়িকী জুলাই আগস্ট ২০১১

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

লন্ডনে দাঙ্গা না বিদ্রোহ?

দুর্নীতির লজিক

নীতি-দুর্নীতির পাকেচক্রে

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

আইনি থেকে বেআইনি খনিজ উত্তোলন

দুর্নীতির অদৃশ্য লম্বা হাত

তিব্বতীদের চোখে চীন [২]

শ্যামলী খাস্তগীর স্মরণে


 

নীতি-দুর্নীতির পাকেচক্রে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

শমীক সরকার

 


দুর্নীতি আবার আমাদের দেশের জনমানসে একটা মুখ্য আসন নিয়ে বসে গেছেআর শোনা যাচ্ছে, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড়ো দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারির মর্যাদা পেতে চলেছে টেলিকম কেলেঙ্কারি বা ২জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি৩জি লাইসেন্স নিলাম করার পর সরকারের কোষাগারে আসে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকাএর তুলনা টেনে বিভিন্ন মহল থেকে হিসেব করে দেখানো হতে থাকে, ২জি লাইসেন্সও যদি এভাবে নিলাম করা হত, তাহলে সরকারের ঘরে আসতে পারত আরও পৌনে দু' লক্ষ কোটি টাকাসিবিআই তদন্ত করতে নেমে এর মধ্যে গ্রেফতার করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের দুই প্রাক্তন টেলিকম মন্ত্রী, এবং কয়েকজন আমলা ও কর্পোরেট কর্তাকেতিহার জেলে আছে তারাসওয়াল চলছে সিবিআই কোর্টেএই ফাঁকে একবার টেলিকম দুর্নীতিটি খতিয়ে দেখে নেওয়া যাক

টেলিযোগাযোগ

নয়ের দশকে বলা, কম্পিউটার দুনিয়ার বড়ো কারবারি বিল গেট্‌সের কথাটা ছিল, ইনফরমেশন সুপারহাইওয়ে৳ কর্পোরেট পুঁজির দুনিয়াদারির সঙ্গে তার অমোঘ যোগাযোগ৳ পুরোনো পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রের সীমানা, আঞ্চলিকতার সীমানা, বাজারের সীমানা, ছকবাঁধা পুঁজিবাদ ভেঙে ফেলে এক ণ্ণস্বাধীন', ণ্ণমুক্ত' পুঁজিবাদের যুগের সূচনা হল৳ মার্কিন দেশে এই ধারণার লিখিত রূপ ছিল এরকম, ণ্ণইনফরমেশন সুপারহাইওয়ে সরাসরি যুক্ত করবে কোটি কোটি মানুষকে, প্রত্যেকেই তথ্যের ভোক্তা এবং নির্মাতা ... ঐতিহ্যবাহী বাজারের কোনো ধারণা, যেমন কৃষি-বাজার বা হাট, অথবা যে কোনো ব্যবস্থা --- যেখানে ব্যক্তি কম্পিউটার স্ক্রিন বা কোথাও দাম দেখে কিনতে আসবে --- ভয়ানক অপর্যাপ্ত এই বিশাল সংখ্যক জটিল বেচাকেনার কাছে৳'  লিবারালাইজেশন কথাটা তখন খুব চলত, নয়ের দশকের প্রথম দিকে৳ অর্থাৎ আগল মুক্ত করা৳ আর সেই সময়ই ভারতে তৈরি হয় জাতীয় টেলিকম নীতি ১৯৯৪৳ সেই নীতিকথা শুরু হচ্ছে এই কথাগুলি আউড়ে :

বিশ্ববাজারে ভারতের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা এবং রপ্তানির দ্রুত বৃদ্ধির জন্য সরকার নয়া অর্থনৈতিক নীতি নিয়েছে। এছাড়া আরও একটি কারণ হল, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং দেশি লগ্নি বাড়ানো। এই নীতির সাফল্যের জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের টেলিকমিউনিকেশন পরিষেবা। তাই এদেশের টেলিযোগাযোগ পরিষেবার উন্নতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

সরকারের কোষাগার এই লক্ষ্য পূরণে পর্যাপ্ত ছিল না৳ প্রয়োজন ছিল অতিরিক্ত তেইশ হাজার কোটি টাকা৳ আর এর জন্য সেই ১৯৯২ সালের জুলাই মাস থেকেই বেসরকারি লগ্নির জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল ৮টি পরিষেবা, নীতিমালা উদ্ধৃত করলে যা দাঁড়ায়, ক) ইলেক্ট্রনিক মেল; খ) ভয়েস মেল; গ) ডাটা সার্ভিস; ঘ) অডিও টেক্সট সার্ভিস; ঙ) ভিডিও টেক্সট সার্ভিস; চ) ভিডিও কনফারেন্সিং; ছ) রেডিও পেজিং এবং জ) সেলুলার মোবাইল টেলিফোন৳

এর মধ্যে প্রথম ছ'টি পরিষেবা দিতে পারে যে কোনো ভারতীয় কোম্পানি৳ তারা স্বীকৃত একটি লাইসেন্সের মাধ্যমে তা করতে পারে এবং সেই লাইসেন্স স্বতন্ত্র কিছু নয়৳ কিন্তু শেষ দুটি, অর্থাৎ রেডিও পেজিং এবং সেলুলার মোবাইল টেলিফোন সার্ভিসের ক্ষেত্রে টেন্ডারের ভিত্তিতে মনোনীত দুটি কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া হবে৳ এই মনোনয়ন হবে কোম্পানির ছ'টি দিক বিবেচনা করে, যার মধ্যে রয়েছে তার ট্র্যাক রেকর্ড, প্রযুক্তি প্রভৃতি৳ ছোটোখাটো এই নীতিমালায় এর বেশি কিছু ছিল না৳

টেলিফোনিক প্রযুক্তি

টেলিযোগাযোগের বিবর্তন বুঝতে হলে টেলিফোন প্রযুক্তিটির বিবর্তন একটু না জানলেই নয়৳ সেলফোন আসলে প্রযুক্তিগতভাবে একটি উন্নতমানের রেডিও ভিন্ন আর কিছু নয়৳ আমরা সবাই জানি, ল্যান্ডলাইন টেলিফোনে তার লাগে৳ তার দিয়ে বাড়ি থেকে পাড়ার ফোনবক্সে সংযোগ করা থাকে৳ সেই ফোনবক্স থেকে তারের মাধ্যমে বার্তা যায় স্থানীয় এক্সচেঞ্জে৳ কিন্তু সেলফোন বা মোবাইল ফোন প্রযুক্তিগতভাবে আলাদা৳ রেডিওতে যেমন তরঙ্গ বাহিত হয়ে কথা পৌঁছে যায় রেডিও সেটে, সেলফোনেও তাই৳ এ যুগে সেলফোন আসার আগে ছিল ওয়াকি টকি বা ওয়ারলেস রেডিও, যা সাধারণত ট্রাফিক পুলিশদের বা পুলিশের হাতে আমরা দেখে থাকি৳

ওয়াকি টকি বা ওয়ারলেস রেডিও একটি ণ্ণহাফ ডুপ্লেক্স ডিভাইস'৳ অর্থাৎ যে দু'জন পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে, তারা একই কম্পাঙ্কের তরঙ্গে (সহজ করে বললে, একই তরঙ্গে) কথা বলছে৳ ফলে একজন যখন কথা বলছে, তখন সে কিছু শুনতে পাবে না; অর্থাৎ অন্যজন তখন কিছু বলতে পারবে না, বললে শোনা যাবে না৳ তাই ওয়ারলেসে কথা বলার সময় কথা বলা শেষ হলে ণ্ণওভার' বলা হয়, জানিয়ে দেবার জন্য, আমার কথা বলা শেষ, এবার তুমি বলতে পারো৳ সেলফোন একটি ণ্ণফুল ডুপ্লেক্স ডিভাইস', অর্থাৎ একটি তরঙ্গে কথা বলা হয়, আরেকটিতে শোনা হয়৳ তাই একইসাথে কথা বলাও যায়, শোনাও যায়৳

এছাড়া এই রেডিও ফোনের ক্ষেত্রে সাধারণত শহরে একটিই অ্যান্টেনা থাকে৳ এবার একজন যখন একটি ফোনে কথা বলে, তখন তাকে খুব শক্তিশালী একটা ণ্ণট্র্যান্সমিশন' (অর্থাৎ উচ্চ ক্ষমতার তরঙ্গ, যা পাঠাতে বেশি বিদ্যুৎশক্তি লাগে) পাঠাতে হয়, যা ওই অ্যান্টেনাতে ধরা পড়তে হবে৳ সেখান থেকে তা যাবে রিসিভারের কাছে৳

রেডিও ফোন হোক বা সেলফোন, একই কম্পাঙ্কের তরঙ্গ একইসাথে দু'জনের ব্যবহারে প্রযুক্তিগত সমস্যা আছে৳ ধরা যাক, একই তরঙ্গের দুটি রেডিও সিগনাল পাঠানো হচ্ছে দুই জায়গা থেকে৳ সেক্ষেত্রে, গ্রাহক সেই তরঙ্গে রেডিও সেটটিকে নিয়ে গিয়ে হয় কিছুই শুনতে পাবে না, অথবা এই দুই তরঙ্গের অনুরণনে বিচ্ছিরি কিছু জিনিস শুনতে পাবে৳ তাই প্রযুক্তিগতভাবেই এক কম্পাঙ্কের একটিই তরঙ্গ ছাড়া প্রয়োজন৳ 

রেডিও ফোনে গোটা শহরটাতে একটাই অ্যান্টেনা, কিন্তু সেলফোনের ক্ষেত্রে গোটা শহরকে ছোটো ছোটো সেল-এ ভাগ করে নেওয়া হয়৳ একেকটা সেল-এর কেন্দ্রে থাকে একেকটা টাওয়ার (অ্যান্টেনা)৳ সেলফোন খুব কম শক্তিশালী ট্র্যান্সমিশন পাঠায়, তা সেলফোনটি যে সেল-এ আছে, বড়ো জোর তার ঠিক গায়ে লাগা সেলগুলিতে পৌঁছতে পারে৳ প্রতিটি ষড়ভুজাকার সেল ঘিরে থাকে আরও ছয়টি সেল৳ একটি (আসলে একজোড়া, বলা-শোনা) কম্পাঙ্কের ট্রান্সমিশন যে সেলফোন থেকে করা হচ্ছে, সেই সেল এবং তার লাগোয়া আরও ছ'টি সেল ওইসময় আর কেউ ব্যবহার করতে পারবে না৳ ওই ৭টি বাদে বাদবাকি সেলগুলি যে কেউ ব্যবহার করতে পারে৳ প্রসঙ্গত, প্রযুক্তির দিক থেকে এই কম শক্তিশালী ট্র্যান্সমিশন আরও একদিক দিয়ে সুখকর৳ এতে ছোটো ব্যাটারিতেই সেলফোনের কাজ হয়ে যায়৳ তাই সেলফোনের আকৃতিও ছোটো করে দেওয়া গেল৳

এখন ধরা যাক, প্রতিটি সেলফোন পরিষেবা-প্রদানকারী কোম্পানি ১ মেগাহার্জ বা ১০ লক্ষ ৫৭৬টি কম্পাঙ্ক পেয়েছে৳ এর মধ্যে ৫৭৬টি ব্যবহার হয় ফোন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশাবলী পরিবহণের জন্য, কথোপকথনের জন্য পড়ে থাকে ১০ লক্ষ কম্পাঙ্ক৳ ধরা যাক, মানুষের আওয়াজ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবাহিত হওয়ার জন্য একযোগে ১০ হাজার কম্পাঙ্কের তরঙ্গমালা লাগে৳ সেক্ষেত্রে, ২০ হাজার কম্পাঙ্ক নিয়ে তৈরি হয় একটা ডুপ্লেক্স চ্যানেল (দশ হাজার বলার, দশ হাজার শোনার কম্পাঙ্ক)৳ ১০ লক্ষ কম্পাঙ্ক এরকম (১০ লক্ষ/২০ হাজার =) ৫০টা চ্যানেল তৈরি করতে পারে৳ প্রতি ৭টি সেল ওই ৫০টা কথোপকথনের চ্যানেল ভাগাভাগি করে নেবে৳ অর্থাৎ, একেকটি সেলের ভাগে পড়বে প্রায় (৫০/৭ =) ৭টি কথোপকথনের চ্যানেল৳ অর্থাৎ, দাঁড়াচ্ছে যে, একেকটা সেলের মধ্যে ৭ জন একসাথে কথা বলতে সক্ষম৳ সেলফোনে প্রথমদিকে যখন ণ্ণঅ্যানালগ' প্রযুক্তি ছিল (প্রথম যুগের বা ১ জেনারেশন বা ১জি মোবাইল), তখন এইরকমই দাঁড়াত হিসেবটা৳ এখন সেলফোনে ডিজিট্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার হয় (অর্থাৎ দ্বিতীয় যুগ বা ২জি, আমাদের চেনা ডিজিট্যাল প্রযুক্তি জিএসএম, সিডিএমএ)৳ এখন হিসেবটায় একটু হেরফের হলেও মোটের ওপর একইরকম থাকে৳ প্রসঙ্গত, কম্পাঙ্কের ইংরেজি হল ফ্রিকোয়েন্সি আর স্পেকট্রামের বাংলা তরঙ্গমালা৳ এখানে ধরে নেওয়া যেতে পারে, একটা কম্পাঙ্কের একটাই তরঙ্গ হতে পারে৳ অনেকগুলো পাশাপাশি কম্পাঙ্ক অর্থাৎ অনেকগুলো পাশাপাশি তরঙ্গ মিলে তৈরি হয় তরঙ্গমালা৳

যাই হোক, এবার একটি অঞ্চলে গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে গেলে, প্রাথমিকভাবে সেল-ঘনত্ব (অর্থাৎ টাওয়ার-ঘনত্ব) বাড়িয়ে নিলেই হল৳ কিন্তু একসময় দেখা যায়, আর সেল বাড়ানো যাচ্ছে না৳ বেশি ঘন ঘন সেল করলে লাগোয়া ছ'টি সেল ছাপিয়ে চলে যেতে পারে ট্রান্সমিশনের প্রভাব৳ তাতে একটি সেল-এ একসাথে কথোপকথনের সর্বোচ্চ চ্যানেল সংখ্যা (আগের উদাহরণে যা ৭) কমে যেতে বাধ্য৳ তখন প্রয়োজন আরও বেশি পরিমাণ কম্পাঙ্ক বা তরঙ্গ বা তরঙ্গমালা৳

রেডিও যোগাযোগের কাজে ব্যবহারযোগ্য কম্পাঙ্ক ৩ কিলোহার্জ থেকে ৩০০০ গিগাহার্জ৳ এক গিগাহার্জ = (প্রায়) ১০০০ মেগাহার্জ = (প্রায়) ১০০০ x ১০০০ কিলোহার্জ৳ এই সীমার বাইরের কম্পাঙ্কগুলি সাধারণত এক্স রে, ইনফ্রা রেড রে, গামা রে প্রভৃতি৳ এর মধ্যেও নিরাপদ সীমা হিসেবে ৯ কিলোহার্জ থেকে ১০০০ গিগাহার্জ কম্পাঙ্ক তরঙ্গমালা বা স্পেকট্রাম ব্যবহার করার আন্তর্জাতিক অনুমতি থাকলেও যন্ত্রপাতি দুর্মূল্য বলে ১০০ গিগাহার্জ কম্পাঙ্কর নিচে থাকা রেডিও তরঙ্গকেই টেলিফোনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয়৳ এই রেডিও কম্পাঙ্ক আমাদের দেশে ব্যবহার হয় পাবলিক টেলিযোগাযোগ পরিষেবা, নৌ/আকাশ নিরাপত্তার কাজ, রাডার, ভূকম্প-বিষয়ক সমীক্ষা, রকেট এবং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন, ভূ-গর্ভ অনুসন্ধান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস ইত্যাদিতে৳ আমাদের দেশে এরকম ৪০টি কাজে এই রেডিও কম্পাঙ্ক ব্যবহার হয়৳ এই তরঙ্গমালা যে কেউ যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারে না, তা বেআইনি৳ যেমন যে কেউ যা খুশি তরঙ্গে রেডিও স্টেশন খুললে তা বেআইনি৳ তাই প্রয়োজন হয় স্পেকট্রাম বা তরঙ্গমালা বরাদ্দ করার, যার দায়িত্বে প্রাথমিকভাবে আছে দেশের সরকার৳ অন্তত সেরকমই ভাবা হয়৳

সেলফোন প্রযুক্তি নিয়ে আরেকটু বলা যাক৳ একজন একই সেলফোন নিয়ে মাইলের পর মাইল চলে গেলেও তার কথোপকথন বন্ধ হয় না৳ এক সেল থেকে অন্য সেল-এ সে সরতে থাকে৳ প্রসঙ্গত, প্রতিটি শহরে প্রতিটি সেলফোন পরিষেবা প্রদানকারী কোম্পানির একটি কেন্দ্রীয় অফিস (এমটিএসও) থাকে৳ কেউ যখন ফোন করে, তখন সেই অফিস দেখে নেয়, সেলফোনটি কোন সেল-এ আছে, এবং সেটা দেখে তার জন্য একটা কথোপকথনের চ্যানেল নির্দিষ্ট করে দেয়, এবং সেটা তাকে ও ওই সেলের টাওয়ারটিকে জানিয়ে দেয় (এই জানিয়ে দেওয়াটা হয় পূর্বে উল্লিখিত ৫৭৬টি নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশাবলী পরিবহণের কম্পাঙ্ক মারফত)৳ যতক্ষণ না এটা হয়, ততক্ষণ মোবাইলে লেখা থাকে, কানেকটিং৳

যদি যে কোম্পানির ফোন, সেই কোম্পানির টাওয়ার না থাকে, তাহলে অন্য যে কোম্পানির টাওয়ার থাকে, সেই টাওয়ারের আওতায়, সেলের আওতায় এবং ওই কোম্পানির কেন্দ্রীয় অফিসের আওতায় চলে আসে সেলফোনটি৳ যদি ফোনটি স্থান বদল করে চলে আসে এমন এক জায়গায়, যেখানে পরিষেবা প্রদানকারী কোম্পানির কোনও পরিষেবা নেই, অন্য কোম্পানির পরিষেবা আছে, তাহলে রোমিং-এ চলে যায় সেলফোনটি৳

অ্যানালগ প্রযুক্তির মোবাইলে স্পেকট্রাম বা তরঙ্গমালা বেশি লাগে৳ অ্যানালগ সিগন্যাল পর্যাপ্ত পরিমাণে ভাঁজ করে চালান করা যায় না৳ ফলে গলার আওয়াজ বা সিগন্যাল পরিবহণের জন্য বেশি জায়গা লাগে, অর্থাৎ বেশি কম্পাঙ্ক লাগে (ওপরের উদাহরণে একযোগে দশ হাজার পরিমাণ কম্পাঙ্ক লাগার কথা আছে)৳ ফলে প্রাপ্ত কথোপকথনের চ্যানেল সংখ্যা কমে যায়৳ অতএব এল ডিজিট্যাল প্রযুক্তি৳ ডিজিটাল ফোন আমাদের গলার আওয়াজকে এক এবং শূন্যতে ভেঙে নেয়৳ তারপর সেটাকে ভালো করে ভাঁজ করে নিতে পারে৳ এতটাই যে, একটা অ্যানালগ সিগন্যালের যে জায়গা লাগে, তাতে তিন থেকে দশটা ডিজিটাল সিগন্যাল ধরে যায়৳ পরবর্তী ডিজিটাল প্রযুক্তি, যেমন টিডিএমএ (যা জিএসএম মোবাইলে থাকে), সিডিএমএ --- এগুলোতে আরও কম কম্পাঙ্কে বেশি কথোপকথনের চ্যানেল পাওয়া সম্ভব৳ সিডিএমএ প্রযুক্তিতে সিগন্যালগুলিকে আলাদা করে ভাঁজ করে প্যাকেটে প্যাকেটে বিভক্ত করে এমনকী বিভিন্ন কম্পাঙ্কতে ছড়িয়ে দেওয়া যায় নির্দিষ্ট একটি নাম্বার লিখে, যাতে পরবর্তীতে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়৳ এভাবে চ্যানেল না বাড়লেও, সেই একই পরিমাণ চ্যানেল ব্যবহার করে আরও বেশি লোক যাতে একইসঙ্গে কথোপকথন চালাতে পারে, তার বন্দোবস্ত করা যায়৳

জিএসএম এবং সিডিএমএ প্রযুক্তির পার্থক্য আরও একটু বোঝা দরকার, পরে কাজে লাগবে৳ প্রথমত, সিডিএমএ প্রযুক্তিতে একটা টাওয়ারেই (অর্থাৎ একটা সেল) যে পরিমাণ জায়গা কভার করা সম্ভব, জিএসএম-এ তার জন্য ৪ থেকে ৫টা টাওয়ার (অর্থাৎ সেল) লাগে৳ এর ফলে আপাত দৃষ্টিতে সিডিএমএ তে প্রাথমিক পরিকাঠামোগত খরচ কম৳ কিন্তু এটা আরেক দিক দিয়ে অভিশাপ৳ সে কথায় পরে আসছি৳ দ্বিতীয়ত, প্রতি সেল-এ একসাথে কতজন কথা বলতে পারে? তার পরিমাপেও সিডিএমএ এগিয়ে৳ ১০ মেগাহার্জ কম্পাঙ্ক বরাদ্দ থাকলে, একটি জিএসএম প্রযুক্তির মোবাইল পরিষেবায় একটি সেল-এ যতজন কথা বলতে পারে, তার অন্তত চারগুণ লোক একসাথে কথা বলতে পারে সিডিএমএ প্রযুক্তির পরিষেবার একটি সেল-এ৳ অর্থাৎ, সিডিএমএ প্রযুক্তির পরিষেবার তরঙ্গমালা ব্যবহারে দক্ষতা বেশি৳ তাই হয়ত ভারত সরকার জিএসএম পরিষেবার জন্য বরাদ্দ করেছিল প্রাথমিকভাবে ৪ মেগাহার্জ কম্পাঙ্ক, আর সিডিএমএ-এর জন্য ২.৫ মেগাহার্জ কম্পাঙ্ক৳ এই দুই ক্ষেত্রে সেলপিছু যুগপৎ কথোপকথনের সর্বোচ্চ সংখ্যা প্রায় সমান৳ কিন্তু সিডিএমএ প্রযুক্তিতে সেল-এর আয়তন অনেক বেশি হওয়াটা সমস্যার জন্ম দেবে৳ ধরা যাক, একটি ঘন বসতিপূর্ণ অঞ্চলে যুগপৎ কথোপকথনের সর্বোচ্চ সংখ্যা এলাকার আয়তন পিছু অনেক বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়৳ সেক্ষেত্রে সিডিএমএ পারবে না, জিএসএম পারবে৳ সিডিএমএ-কে হাল ছেড়ে দিতে হবে, ইচ্ছে মতো সেলসংখ্যা বাড়িয়ে যাওয়া যায় না৳ সিডিএমএ উঠে যাবে, কারণ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় লোকে সিডিএমএ মোবাইল ছেড়ে দেবে৳ কিন্তু হালকা জনবসতি অঞ্চলে সিডিএমএ জিএসএম-এর চেয়ে অনেক লাভজনক, পরিষেবা প্রদানকারী কোম্পানিদের কাছে৳ তৃতীয়ত, সিডিএমএ-তে মোবাইল হ্যান্ডসেট-এর একটি কোড-এর সাহায্যে সিগন্যাল রিসিভ করা হয়, তাই সিগন্যালের অংশ মাঝপথে খোয়া যাওয়ার সম্ভাবনা জিএসএম-এর তুলনায় কম৳ ফলে সিডিএমএ মোবাইলে আওয়াজ অনেক পরিষ্কার শোনা যায়৳

যে পরিষেবা জিএসএম এবং সিডিএমএ এই দুই-ই দিতে সক্ষম, তাকে বলে ডুয়াল টেকনোলজি বা দ্বৈত প্রযুক্তি৳ এখনকার যে কোনো পরিষেবাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির পাশাপাশি অ্যানালগ প্রযুক্তিরও বন্দোবস্ত থাকে, যাতে কোনও অ্যানালগ পরিষেবার সেল-এ ঢুকে মোবাইল অচল না হয়ে যায়৳

কিন্তু প্রযুক্তির এত দক্ষতাবৃদ্ধির পরেও, গ্রাহক বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত খোঁজ পড়ে বেশি কম্পাঙ্ক বরাদ্দের৳ গ্রাহক বৃদ্ধি পিছু কম্পাঙ্ক বরাদ্দ বাড়ানোর ব্যাপারে ভারত সরকার প্রথম থেকেই উদ্যোগ নিয়েছে৳ এই প্রযুক্তিগত উল্লম্ফনের ওপর দাঁড়িয়ে কর্পোরেটদের সক্রিয়তা এবং ভারত সরকারের টেলিকম নীতি কীভাবে বদলেছে তার আলোচনা এবার করা হবে৳ ছে, তার আলোচনা এবার করা ৳

দেশের টেলিকম বা টেলিযোগাযোগ নীতিমালা

১৯৯৪ সালের জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতিতে সেলুলার মোবাইল নেটওয়ার্ক চারটি মেট্রো সিটিতে চালু হয়েছিল, কিন্তু তা প্রত্যাশা মতো প্রসারিত হচ্ছিল নাফলে যে কর্পোরেটগুলি সেলুলার পরিষেবার জন্য লাইসেন্স পেয়েছিল, তারাও লাভ করতে না পেরে হতোদ্যম হয়ে পড়ছিলনতুন টাওয়ার বসানোর ব্যাপারে তারা পিছিয়ে আসছিল, ফলে পরিষেবার মানও উন্নত করা যাচ্ছিল নাতা গ্রাহক আকর্ষণ করতে আরও ব্যর্থ হচ্ছিলএর ওপরে প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা লাইসেন্সের শর্ত মোতাবেক ফি হিসেবে দিয়ে যেতে হচ্ছিল, তা সে লাভ হোক আর না হোকফলে কোম্পানিগুলি মোবাইলের খরচ কমালো নাগ্রাহক সংখ্যাও বাড়ল নাএ যেন এক দুষ্টচক্রসব মিলিয়ে ১৯৯৪ সালের নীতি ব্যর্থ হচ্ছিল১৯৯৯ সালে এই কারণেই আরেকটি টেলিকম নীতিমালার দরকার পড়লতাতে ১৯৯৪ সালের নীতির পর্যালোচনা করে বলা হল, ণ্ণলাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এমন ৬টা সার্কেলের মধ্যে মাত্র ২টিতে বেসরকারি পরিষেবা প্রদানকারীরা মাত্র সীমাবদ্ধ আকারে প্রাথমিক টেলিকম পরিষেবা শুরু করেছেফলে ১৯৯৪ সালের জাতীয় টেলিকম নীতিমালায় যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছিল, তার অনেকগুলিই পূরণ হয়নি১৯৯৪ নীতিতে যা ভাবা হয়েছিল তার তুলনায় অনেক ধীর গতিতে বেসরকারি ক্ষেত্রের অনুপ্রবেশ ঘটেছে'

ক) ১৯৯৯ সালের নয়া টেলিযোগাযোগ নীতি

১৯৯৯ সালের নীতিমালায় অনেকগুলি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছিল : আইটি, টেলিকম, মিডিয়া, কনজিউমার ইলেক্ট্রনিক্স --- এইসব প্রযুক্তির মধ্যে বিভাজন আর থাকছে না, তাই প্রয়োজন আরও উন্নত পরিকাঠামো;  ণ্ণস্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্টে স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা অর্জন করা'; ণ্ণভারতীয় টেলিকম কোম্পানিগুলিকে সত্যিকারের গ্লোবাল প্লেয়ার করে তোলা'

সেলুলার মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই ১৯৯৯ নীতিমালায়প্রথমত, তার লাইসেন্স পাওয়া পরিষেবা ক্ষেত্রের মধ্যে সে সমস্ত ধরনের মোবাইল পরিষেবা দিতে পারে, ভয়েস মেসেজ, টেক্সট মেসেজ, ডাটা পরিষেবা ...দ্বিতীয়ত, নিজের এরিয়ার মধ্যে দূর সঞ্চার লাইনের (long distance telephone) নিজস্ব বন্দোবস্ত করে নিতে পারেতৃতীয়ত, পাশাপাশি এরিয়ার লাইসেন্সপ্রাপ্ত পরিষেবা প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগের নিজস্ব বন্দোবস্তে কোনো বিধিনিষেধ নেইচতুর্থত, নিজের এরিয়ার পরিকাঠামো অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারীর সঙ্গে সে ইচ্ছে মতো 'শেয়ার'ও করতে পারেপঞ্চমত, ইচ্ছে মতো সে ভিএসএনএল-এর কায়দায় ণ্ণসরকারি' কোম্পানির পরিকাঠামোও ব্যবহার করতে পারেএখানে এরিয়া বা ক্ষেত্র হল গোটা দেশের মধ্যে একেকটি টেলিফোনিক প্রদেশমোটামুটি একেকটা রাজ্য মানে হল একেকটা টেলিফোনিক প্রদেশএছাড়া আছে চারটে মেট্রো সিটি

১৯৯৯ সালের নয়া টেলিকম নীতিতে আর একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়১৯৯৪ সালের নীতিতে ছিল, যে কোম্পানি লাইসেন্স নেবে, তারা এককালীন দশ বছরের জন্য নেবে এবং তার জন্য তাদের বছর বছর ভাড়া গুনতে হবে, সে লাভ হোক বা না-ই হোক১৯৯৯ সালের নীতিতে ঠিক হয়, লাইসেন্স পেতে একটা এনট্রি ফি দিতে হবেতারপর মোট আয়ের (adjusted gross revenue) একটা শতাংশ (৬-১৫ শতাংশ) প্রতি চারমাস অন্তর লাইসেন্স ফি হিসেবে এবং যে স্পেকট্রাম ব্যান্ড সে পাচ্ছে, তার জন্য দিতে হবেআয়ের শতাংশের হিসেবে ভাড়া নেওয়ার ফলে কোম্পানিগুলির মধ্যে একটা উৎসাহ আসেএছাড়া, একেকটা সার্কেলে যে দু'টি করে কোম্পানির একচ্ছত্র ছিল, তার বদলে সরকার প্রয়োজন মতো বেশি সংখ্যক কোম্পানিকেও লাইসেন্স দিতে পারে

খ) দূরসঞ্চার লাইন কর্পোরেটদের হাতে যাওয়ার নীতি

২০০০ সালের আগস্ট মাসে সরকার (ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশন) একটি গাইডলাইন ইস্যু করে জাতীয় দূর সঞ্চার লাইন (সাদা বাংলায় এসটিডি পরিকাঠামো) কর্পোরেটদের জন্য ছেড়ে দেয়কতজন লাইসেন্স পেতে পারে সে বিষয়ে কোনো সীমা রাখা হয়নিঠিক হয়, সমস্ত ধরনের ল্যান্ডলাইন, সেলুলার বা কেব্‌ল পরিষেবাকারীরা বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় দূরসঞ্চার লাইসেন্সধারীকে ইন্টারকানেকশন দেবেএক্ষেত্রে এই লাইসেন্সধারী অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারীদের সাথে নিজস্ব বন্দোবস্ত করে নিতে পারেএকইসাথে বিভিন্ন লাইসেন্সধারীদের মধ্যেও বন্দোবস্ত হতে পারেএই লাইসেন্সে এনট্রি ফি ছিল ১০০ কোটি টাকা এবং চারটি ফেজ-এ সারা ভারতে তাদের পরিষেবা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রতি ফেজ-এর জন্য ১০০ কোটি টাকা করে ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি রাখার কথা বলা ছিল

২০০৪ সালের জুন মাসে একটি সংযোজনী ইস্যু করে এই ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির পরিমাণ কমিয়ে আনা হয় ২৫ কোটি টাকায়এতে একটা ধারা ছিল, লাইসেন্স ফি দিতে দেরি হলে জাতীয় ব্যাঙ্কগুলির ঋণের ওপর সুদের হারের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি সুদ নেওয়া হবে২০০৫ সালের মার্চ মাসের একটি সংযোজনীতে এটা কমিয়ে ২ শতাংশ বেশি নেওয়ার কথা বলা হয়তাছাড়া, লাইসেন্স ফি দিতে দেরি হলে, ফাইনের মোট পরিমাণও কমানো হয় দুই-তৃতীয়াংশবদলে, সাধারণভাবে মোট ৫০ কোটি টাকা ফাইনের কথা বলা হয়২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি সংযোজনী দিয়ে লাইসেন্সপ্রাপক ও লাইসেন্সের আবেদনকারী কোম্পানিতে মোট বিদেশি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ পরিমাণ ৪৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৪ শতাংশ করা হয়, অর্থাৎ সোজা করে বললে, বিদেশি মালিকানার কোম্পানির অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীর ব্যবহারযোগ্য পুঁজির সর্বনিম্ন পরিমাণ ধার্য হয়েছিল ২৫০ কোটি টাকা, তা কমিয়ে করা হয় ২.৫ কোটি টাকাআবেদনকারীর অ্যাসেট-এর সর্বনিম্ন মূল্য ২৫০০ কোটি টাকা থাকার কথা ছিল, এবারে তা তুলে দেওয়া হলপ্রতিটি ফেজ-এর জন্য কমিয়ে করা ২৫ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি এবার তুলেই দেওয়া হয়এতদিন পর্যন্ত মূল গাইডলাইন অনুসারে বার্ষিক লাইসেন্স ফি ছিল মোট আয়ের ১৫ শতাংশএই সংযোজনীতে বলা হয়, ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তা হবে মোট আয়ের ৬ শতাংশ, অর্থাৎ নয় শতাংশ কমানো হয়লাইসেন্স পাওয়ার সাত বছরের মধ্যে  সারা ভারতে পরিষেবা ছড়িয়ে দেওয়ার সময়সীমাও তুলে দেওয়া হয়অর্থাৎ এখন থেকে সারা ভারতে পরিকাঠামো নির্মাণ করার বাধ্যবাধকতা থাকল নাবিশেষত অলাভজনক গ্রাম এলাকায় পরিকাঠামো নির্মাণ থেকে দূরে থাকা গেলসেখানে অন্যান্য অপারেটরের (আইনগতভাবে সরকারি এবং বেসরকারি, বাস্তবত গ্রাম্য এবং দুর্গম এলাকায় সরকারি) পরিকাঠামো বোঝাপড়া করে নিয়ে ব্যবহার করার স্বাধীনতা থাকলএইভাবে কর্পোরেটদের পক্ষে সরাসরি অর্থনৈতিক দিক থেকে সুবিধাজনকভাবে গাইডলাইন বদলানো হল

২০০৬ সাল পর্যন্ত দূরসঞ্চারে প্রাইভেট কর্পোরেট ছিল মাত্র তিনটি, এয়ারটেল, রিলায়েন্স এবং টাটা (২০০২-এর মধ্যেই এরা লাইসেন্স নিয়েছিল)আর ছিল সরকারি বিএসএনএল (এরাও কিন্তু কর্পোরেট, ২০০০ সালে বিএসএনএল কর্পোরেট হিসেবেই জন্মেছিল, যার সিংহভাগ শেয়ার সরকারের)২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ধামাকাদার সংযোজনীর পর ২০০৬ সালের প্রথমদিকে তিনটি সরকারি কোম্পানি -- এমটিএনএল, পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন এবং ভারতীয় রেল টেল কর্পোরেশন (এবং পরে ২০০৭-এ জাতীয় গ্যাস কোম্পানি য়েল ইন্ডিয়া) লাইসেন্স নেয়, যার অর্থ, তাদের দেশজোড়া পরিকাঠামো নেটওয়ার্ক প্রাইভেট কোম্পানিগুলির জন্য খুলে দেওয়া হলঅর্থাৎ ডাবল ধামাকাএরপর লাইসেন্সের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে কর্পোরেটদের আর দেরি হয়নি২০০৬ সালেই আটটি কর্পোরেট (এইচসিএল, বিটি গ্লোবাল, টিউলিপ, লুপ টেলিকম, এটি অ্যান্ড টি, ভোদাফোন, সিফি, আইডিয়া এবং ডিশনেট), ২০০৭ সালে তিনটি (বিটি, টাটা, স্পাইস), ২০০৮ সালে ছ'টি (ভেরিজোন, ইকুয়ান্ত, সোয়ান, সিটিকম, সোয়ান), ২০০৯ সালে তিনটি (সিংটেল, ডাটাকম, ইউনিটেক) কর্পোরেট লাইসেন্স নেয়৳ প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক দূরসঞ্চার লাইনের ক্ষেত্রেও একই রকমের সংযোজনী ইস্যু করা হয়েছিলশুধুমাত্র দূরসঞ্চার লাইনের বার্ষিক লাইসেন্স ফি আয়ের ১৫ থেকে ৬ শতাংশে নিয়ে আসার কারণে প্রতি বছর সরকারের কমপক্ষে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা করে ক্ষতি হয়েছে

গ) আরও কর্পোরেটদের সেলুলার লাইসেন্স প্রদান নীতি

১৯৯৯ নয়া টেলিকম নীতি অনুযায়ী ৪টি মহানগর এবং আরও তেরোটি সার্কেলের জন্য ২টি অপারেটরের লাইসেন্সের পাশাপাশি আরও একটা লাইসেন্স সরকার রেখেছিল সরকারি কোম্পানির জন্যচতুর্থ অপারেটর (অবশ্যই বেসরকারি) ঢোকানো হয় ২০০১ সালে২০০১ সালের সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে ট্রাই-এর (টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অব ইন্ডিয়া) পরামর্শ মতো প্রতিটি সার্কেলের জন্য একটি করে লাইসেন্স, অর্থাৎ মোট সতেরোটি লাইসেন্স ছাড়া হয়এই লাইসেন্সের মধ্যেই ছিল, কতটা করে স্পেকট্রাম এক একজন পাবে, তার শর্তআলাদা করে স্পেকট্রামের জন্য নিলাম করতে হয়নিকেবল লাইসেন্স-ই দেওয়া হয়েছিল, এককালীন এনট্রি ফি-র ওপর নিলাম করে২০০১ সালেই বেস বা ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের জন্য ২৫টি লাইসেন্স ছাড়া হয়েছিল

কিন্তু আস্তে আস্তে বেস টেলিফোন আর লাভজনক থাকছিল নামোবাইল ফোন সংযোগ বাড়ছিল হুহু করে আর মোবাইল ফোনের কল চার্জ বেস টেলিফোনের কলচার্জের কাছাকাছি চলে আসছিলভয়েস ওভার ইন্টারনেট বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে টেলিফোন পরিষেবা প্রযুক্তির আমদানির ফলে দূরত্বের ব্যবধান ঘুচে যাচ্ছিলদূরসঞ্চার লাইন (জাতীয় বা আন্তর্জাতিক) বাস্তবত কোনো আলাদা পরিষেবা হিসেবে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিলযদি তাই হয় সেক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত কারণেই এইসব পরিষেবাগুলির অকাল পতন হতে পারেযেমন, সেলুলার পরিষেবা WLL বা বেস টেলিফোনের কাছাকাছি এলাকায় বিনা তারে পরিষেবার পতন ঘটিয়ে দিচ্ছিলতখন যারা টাকা খরচ করে ওইসব পরিষেবার লাইসেন্স নিয়েছে, তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেএইসব আশঙ্কা প্রকাশ করে ট্রাই ২০০৩ সালে সামগ্রিক একটি লাইসেন্স প্রথার সুপারিশ করেছিলবেস ফোন এবং সেল ফোন পরিষেবা একটি লাইসেন্সের অন্তর্ভুক্ত থাকবেপ্রসঙ্গত বলে দেওয়া ভালো, আগে প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য আলাদা নিয়মকানুন এবং লাইসেন্স ফি ছিল৳ সামগ্রিক একটি লাইসেন্সে আলাদা আলাদা লাইসেন্স ফি এবং নিয়মকানুন থাকল না

ট্রাই-এর ২০০৩ সালের এই সুপারিশটি দেখার মতোএতে চীনের মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যার সঙ্গে ভারতের গ্রাহক সংখ্যা তুলনা করে একটা সম্ভাব্য গ্রাহক সংখ্যা দেখানো হয়েছিলআশা করা হয়েছিল, WLL এবং সেলুলার ফোন দুই-ই থাকবেদুই-ই বাড়বে সমান তালেবলা হয়েছিল, মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ণ্ণ১০০ মিলিয়নে' (১০ কোটি) পৌঁছতে গেলে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা দরকারকিন্তু এত টাকা কোথায়? এখনও পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলি মোবাইল কোম্পানিগুলোকে ৮৪৮০ কোটি টাকা পুঁজি দেবার কথা বলেছে, তার মধ্যে ২৬৬৪ কোটি টাকা এখনও দিতেই পারেনিপুঁজির অভাবে বাজারের চাহিদা মেটানো যাবে না, এ তো খুব খারাপ ব্যাপার! লাইসেন্সের এনট্রি ফি কত হবে? সুপারিশটিতে বলা হল, ২০০১ সালে চতুর্থ মোবাইল অপারেটর ঢোকানোর সময় লাইসেন্স নিলাম করে যে এনট্রি ফি ঠিক হয়েছিল, তা-ই রাখতেএখন আবার নিলাম করা হবে না কেন? ট্রাই একটি যুক্তি দিল বটে, জাস্ট বলল, তাতে দেরি হয়ে যাবে!

২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে এক মন্ত্রীগোষ্ঠী ট্রাই-এর প্রস্তাবিত ইউনিফায়েড অ্যাকসেস সার্ভিস লাইসেন্স (UASL) মঞ্জুর করল১৯৯৯ সালের টেলিকম নীতির পর এটা সরকারি টেলিকম নীতির এক উল্লেখযোগ্য বাঁক২০০৩ সালের ১১ নভেম্বর ইস্যু করা হল এই গাইডলাইন, যাতে নয়া ইউএএস লাইসেন্সের ব্যাপারে কিছু বলা নেই, কেবল বলা হল, বিভিন্ন লাইসেন্সধারীরা কীভাবে নয়া লাইসেন্স জমানায় আসবেআর ১৯৯৯ সালের নয়া টেলিযোগাযোগ নীতিমালায় যুক্ত হল এক পাতার একটি সংযোজনীতাতে বলা হল, ণ্ণসাধারণভাবে জনস্বার্থে এবং বিশেষভাবে ভোক্তাদের স্বার্থে ...' এই সামগ্রিক লাইসেন্স প্রথায় যাওয়া হচ্ছেরাজনৈতিক ক্ষমতায় কারা আছে, এ ব্যাপারে যারা খোঁজখবর করেন, তাদের জন্য খবর, তখন এনডিএ সরকারবাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রীআর ক'মাস পরে ভোট 

এই গাইডলাইনে স্পষ্ট বলা হল, এই ণ্ণলাইসেন্সের (এনট্রি) ফি, পরিষেবা এলাকা, প্রসারের বাধ্যবাধ্যকতা এবং ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি' হবে ২০০১ সালে চতুর্থ সেলুলার অপারেটর ঢোকানোর সময় যা যা ছিল, তাইযারা আগের লাইসেন্সগুলির কোনো একটা পেয়েছে, তারা ইচ্ছে হলে এই নয়া লাইসেন্স প্রথায় চলে আসতে পারেযাদের সেলুলার লাইসেন্স ছিল, তারা বিনে পয়সায় এই লাইসেন্সে চলে আসতে পারবেআর যাদের কেবল বেসফোন লাইসেন্স ছিল, তাদের বাড়তি ফি-টুকু দিতে হবেএকই পরিষেবা ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রাপকরা নিজেদের মধ্যে মার্জার, অ্যাকুইজিশন বা লাইসেন্স ট্র্যান্সফার করতেই পারে, যদি সেই পরিষেবা ক্ষেত্রে মোট তিনজনের চেয়ে বেশি অপারেটর থাকে৳ এসবই  প্রতিযোগিতা বজায় রাখার জন্য করা হল৳ প্রতিটি লাইসেন্সধারী, জিএসএম প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ২x৪.৪ মেগাহার্জ এবং সিডিএমএ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ২x২.৫ মেগাহার্জ করে কম্পাঙ্ক পাবে লাইসেন্সের সাথে৳ পরে গ্রাহক সংখ্যা বাড়লে এই প্রাপ্য বাড়তে পারেকিন্তু মোটের ওপর তা জিএসএম-এর ক্ষেত্রে ২x৬.২ মেগাহার্জ এবং সিডিএমএ-র ক্ষেত্রে ২x৫ মেগাহার্জের বেশি হবে নামোট ১৯টা সেক্টর এবং চারটি মহানগর, সর্বমোট ২৩টি এরিয়াতে দেওয়া হল এই লাইসেন্স৳ এরিয়াগুলির জন্য ক্যাটেগরি করা হয়েছিল ২০০১ সালেই, এ, বি এবং সি৳ এ ভাগে ছিল মহানগর এবং কিছু অধিক জনঘনত্বের এরিয়া, বি ভাগে তার চেয়ে কম ঘনত্বের কিছু এরিয়া এবং সি ভাগে দুর্গম এরিয়াগুলি৳ এ, বি এবং সি ভাগের জন্য লাইসেন্স ফি, অর্থাৎ মোট আয়ের শতাংশের পরিমাণ ভিন্ন হতে থাকে৳ প্রসঙ্গত, এই লাইসেন্সে গ্রাম্য এরিয়াতে পরিষেবার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা ছিল না৳ নিজে পরিকাঠামো তৈরি না করে অন্যান্য লাইসেন্সধারীর পরিকাঠামো সমঝোতা করে নিয়ে ব্যবহারের ব্যাপারেও এতে সম্মতি ছিল৳

লাইসেন্স ফি হিসেবে মোট আয়ের শতাংশ সরকারকে দেওয়ার ব্যাপারে শতাংশটির পরিমাণ কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে, তা দেখা যাক৳ প্রথমে সেলফোন অপারেটরদের প্রদেয় ছিল ১৫ শতাংশ৳ ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে তা কমিয়ে করা হয় এ, বি ও সি এরিয়ার জন্য ১২, ১০ এবং ৮ শতাংশ৳ ট্রাই-এর ইউএএস সুপারিশটিতেও এই হারই দেওয়া ছিল৳ প্রাথমিক গাইডলাইনেও তাই ছিল৳ পরে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সংশোধিত গাইডলাইনে তা কমে হয় ১০, ৮ এবং ৬ শতাংশ৳ একইভাবে কমানো হয় ব্যাঙ্ক গ্যারান্টিও৳ পারফরমেন্স ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি দাঁড়ায় ২০, ১০ ও ২ কোটি টাকা এবং লগ্নির ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি দাঁড়ায় ৫০, ২৫ এবং ৫ কোটি টাকা৳

২৪ নভেম্বর ২০০৩ সালে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক আগে-এলে-আগে-পাবে ভিত্তিতে নয়া ইউএএস লাইসেন্স দেওয়া হবে বলে ঠিক করে৳ গাইডলাইনে ছিল, লাইসেন্স প্রদান হবে একটি চলমান প্রক্রিয়া৳ কিন্তু স্পেকট্রাম সবসময় পাওয়া যায় না৳ স্পেকট্রাম যেমন ডিফেন্স বা অন্যান্য মন্ত্রক থেকে পাওয়া যাবে, সেই মোতাবেক আগে এলে আগে পাওয়া যাবে ভিত্তিতে লাইসেন্স দেওয়া হবে৳ প্রসঙ্গত, ১৯৮০-র দশকে, যখন স্পেকট্রামের কোনো দাম ছিল না, তখন বিনে পয়সায় এই স্পেকট্রামগুলি বিভিন্ন মন্ত্রকের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়েছিল৳

স্পেকট্রামের দাম কত হতে পারে? কত স্পেকট্রাম দেশের কাছে আছে? এ বিষয়ে কোনোদিন কোনো হিসেব করা হয়নি৳ ২০০৩ সালে ইউএএস লাইসেন্স প্রদানের প্রাকমুহূর্তে সরকারি মন্ত্রীগোষ্ঠী জানায়, এটা অর্থমন্ত্রক এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রক মিলে ঠিক করবে৳ স্পেকট্রামের দাম কত হতে পারে, তার হদিশ না থাকাটাকেও ইউএএস লাইসেন্সের এনট্রি ফি-র জন্য নিলাম না ডাকার একটা কারণ হিসেবে ট্রাই তার সুপারিশে চিহ্নিত করেছিল৳

২০০৫-এর ডিসেম্বরে ইউএএস লাইসেন্সের গাইডলাইন পাল্টানো হল৳ এটাতে লাইসেন্সধারী কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ৪৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৬ শতাংশ করা হল৳ এই সীমা বাড়ানোর কথা প্রথম বলা হয়েছিল বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি এবং প্রমোশন ডিপার্টমেন্টের ২০০৫ সালের একটি প্রেসনোটে৳ লাইসেন্সধারী কোম্পানি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানের সম্মতি পেল৳ নয়া গাইডলাইনে জরিমানার হার প্রভৃতিও কমানো হয়; জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দূরসঞ্চার লাইনের ক্ষেত্রে সংযোজনী দিয়ে যে পর্যায়ে কমিয়ে আনা হয়েছিল, এক্ষেত্রেও তার সাথে সমান করে দেওয়া হয়৳ এতে নয়া লাইসেন্সের জন্য টেলিকম সেক্টরে আগের অভিজ্ঞতা কোনো শর্ত হিসেবে রইল না৳

২০০৪ সালে ২৮টি নয়া ইউএএস লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল৳ ২০০৬ সালে দেওয়া হয় ২২টি নয়া ইউএএস লাইসেন্স৳ ২০০৭ সালে একটা৳ ইউএএস লাইসেন্স প্রদানের ধারাবাহিকতায় দুর্নীতির স্তরে যাওয়ার আগে অন্য আরও দুটি নীতির স্তরের কাজ নিয়ে আলোচনা করা যাক৳

ঘ) স্পেকট্রামের বরাদ্দ বৃদ্ধির নীতি

২০০১ সালে যখন চতুর্থ সেলুলার অপারেটরকে আনা হয়, তখন ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকম ঠিক করে, লাইসেন্স ফি বাবদ সরকারের পাওনা কোম্পানির বার্ষিক আয়ের ১৭ শতাংশ৳ এর মধ্যে স্পেকট্রামের ভাড়া ছিল ২ শতাংশ৳ এটা ২x৪.৪ মেগাহার্জ স্পেকট্রামের জন্য৳ যদি তার বেশি নেয় (মোট ২x৬.২ মেগাহার্জ), তাহলে আরও ১ শতাংশ যোগ হবে৳ ২০০১ সালের ১২ নভেম্বর টেলিকম ডিপার্টমেন্ট একটি আদেশে বলে, ওই বাড়তি ২x১.৮ মেগাহার্জ কম্পাঙ্ক চাইলে কেউ নিতে পারে৳ ২০০২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি টেলিকম ডিপার্টমেন্ট আরেকটি অর্ডার দিয়ে জানায়, কোনো একটি পরিষেবা অঞ্চলে কোনো অপারেটরের ৫ লাখের বেশি গ্রাহক হয়ে গেলে ২x৬.২ মেগাহার্জের চেয়েও বাড়তি আরও ২x১.৮ মেগাহার্জ কম্পাঙ্ক চাইলে কেউ নিতে পারে৳ বার্ষিক লাইসেন্স ফি তাতে আরও ১ শতাংশ বাড়বে৳ টেলিকম কমিশন বা ট্রাই-এর সুপারিশ ছাড়াই, টেলিকম ডিপার্টমেন্ট নিজে নিজেই এই বাড়তি কম্পাঙ্ক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল৳ প্রসঙ্গত, কাকে আগে দেওয়া হবে স্পেকট্রাম? ২৫ জানুয়ারি ২০০১ বেস ফোনের লাইসেন্সের গাইডলাইন ঘোষণা করার সময়ই সরকার বলেছিল, স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা হবে আগে-এলে-আগে-পাওয়া-যাবে এই ভিত্তিতে৳ যাই হোক, এইভাবে, ক্রমে সর্বোচ্চ সীমা করা হয় ২x১০ মেগাহার্জ (স্পেকট্রামের ভাড়া আয়ের ৪ শতাংশ)৳ ২০০৪ সালে এই সীমা ছাড়িয়ে যায়৳ সরকার আরও বাড়তি ২x৫ মেগাহার্জ কম্পাঙ্ক বিলির সিদ্ধান্ত নেয়৳ যারা নিচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে মোট স্পেকট্রাম ভাড়া হয় আয়ের ৬ শতাংশ৳ অপারেটরের গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর দাঁড়িয়ে এই বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছিল৳ প্রসঙ্গত, এগুলি সবই টিডিএমএ (জিএসএম) প্রযুক্তির জন্য প্রযোজ্য কম্পাঙ্ক পরিসর৳ সিডিএমএ-এর বিষয়টি এখানে আলোচিত হল না৳

ঙ) ভিএসএনএল নীতি

১৯৮৬ সালে সরকারি কর্পোরেট কোম্পানি হিসেবে ভিএসএনএল বা বিদেশ সঞ্চার নিগম লিমিটেড তৈরি হয়েছিল৳ কারণ, তখন টাকার দরকার৳ কর্পোরেট হলে বাজার থেকে টাকা তুলতে পারবে, সরকারি নিয়মনীতি অত কিছু মানার দরকার পড়বে না৳ ১৯৯২ সালে প্রথম ইকুইটি বেচে দেওয়া শুরু হয়, প্রায় ১৫ শতাংশ শেয়ার বেচে দিয়ে৳ আস্তে আস্তে কোম্পানির গতরের ৪৯ শতাংশ হয়ে দাঁড়ায় বেসরকারি পুঁজি৳ টাটাদের ছিল ২০ শতাংশ৳ ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক দূরসঞ্চার লাইনের লাইসেন্স, যা এতদিন সরকারি সম্পত্তি ছিল, এক কথায় তা ছেড়ে দেওয়া হয় প্রাইভেট পার্টির জন্য৳ এই আন্তর্জাতিক লাইনটি এতদিন ছিল ভিএসএনএল-এর একচেটিয়া৳ তাই সরকারকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হয়৳ কীভাবে? একটি জাতীয় দূরসঞ্চার লাইসেন্স পায় ভিএসএনএল --- বিনা পয়সায়৳ ভিএসএনএল-এর আরও ২৫ শতাংশ শেয়ার সরকার টাটাদের বিক্রি করে দেয়৳ অর্থাৎ টাটারাই এখন ৭৪ শতাংশ শেয়ারহোল্ডার হয়ে কোম্পানিটির হর্তাকর্তা হয়ে যায়৳ প্রসঙ্গত ২০০৮ সালে ভিএসএনএল-এর পুরোটাই কিনে নেয় টাটা৳ এখন আর ভিএসএনএল-এর কোনো অস্তিত্ব নেই৳ এখন তার নাম টাটা কমিউনিকেশন৳

চ) নীতি আর ণ্ণদুর্নীতি'র গোধূলি

আবার ইউএএস লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে ফিরে আসা যাক৳ ১৭ জুন ২০০৭ থেকে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রকের পক্ষ থেকেই নয়া ইউএএস লাইসেন্স দেওয়া স্থগিত রাখা হয়৳ কারণ একই পরিষেবা ক্ষেত্রে আর নতুন অপারেটর দেওয়া হবে কিনা এবং লাইসেন্সের শর্ত কিছু পরিবর্তন হবে কিনা, এই বিষয়ে ট্রাই-এর কাছে সুপারিশ চেয়ে পাঠানো হয়েছিল৳ ২৮ আগস্ট ট্রাই বলে, যত খুশি নতুন অপারেটর আসতে পারে (no cap)৳ আরও বলে, বাড়তি স্পেকট্রাম নিতে চাইলে কী শর্ত হবে তা সেলুলার অপারেটরদের সংগঠন, সরকার, স্পেকট্রাম কমিটি, এবং বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা বসে ঠিক করুক৳ কারণ, পরিষেবা ক্ষেত্রের জনঘনত্বের ওপর নির্ভর করে স্পেকট্রাম কম-বেশি লাগে৳ এতদিন স্পেকট্রাম দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখা হয়নি৳ সব জায়গাতেই সমান স্পেকট্রাম দেওয়া হয়েছে৳ একইসাথে জিএসএম ও সিডিএমএ অপারেটররা লাইসেন্সের সাথেই ন্যূনতম প্রাপ্য যথাক্রমে ২x৪.৪ মেগাহার্জ ও ২x২.৫ মেগাহার্জ করে যে স্পেকট্রাম পায়, তা পাবে৳ তবে বাড়তি স্পেকট্রাম নিতে গেলে তাদের গ্রাহক সংখ্যা এবং পরিষেবার প্রসারের কথা বিবেচনা করতে হবে৳ ২জি ব্যান্ড, অর্থাৎ এতদিন যে সমস্ত ব্যান্ডের স্পেকট্রাম দেওয়া হয়েছে জিএসএম ও সিডিএমএ অপারেটরদের, সেগুলোর (৮০০, ৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ড) আশেপাশের ব্যান্ডগুলো বাদ দিয়ে বাদবাকি সমস্ত ব্যান্ড ভবিষ্যতে নিলাম করার পরামর্শ দেওয়া হয়৳ এই ব্যান্ডগুলির আশেপাশে ২x১০ মেগাহার্জ পর্যন্ত ব্যান্ড যারা নিচ্ছে বা নিয়েছে, তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল বার্ষিক আয়ের একটি শতাংশ সরকারকে প্রদান, লাইসেন্স ফি-এর মতো স্পেকট্রাম ফি (২-৪ শতাংশের মতো)৳ ২x১০ মেগাহার্জের চেয়ে বেশি ব্যান্ড যারা নিচ্ছে, তাদের কাছ থেকে এককালীন এনট্রি ফি নেওয়ার প্রস্তাব করে ট্রাই৳ তার সাথেই বাড়তি ব্যান্ডধারীদের বার্ষিক দেয় শতাংশ বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়৳ একটি প্রযুক্তির লাইসেন্সধারী (পড়ুন সিডিএমএ প্রযুক্তির লাইসেন্সধারী) অন্য প্রযুক্তিতে (জিএসএম) যেতেই পারে, সেক্ষেত্রে সে দ্বৈত প্রযুক্তির লাইসেন্সধারী হবে৳ কিন্তু সেক্ষেত্রে তাকে ওই লাইসেন্স যাদের আছে বা যারা নিতে চলেছে, তাদের সমান পরিমাণ টাকা এনট্রি ফি দিতে হবে৳ দ্বৈত প্রযুক্তিতে যেতে চাওয়া অপারেটর যখন দ্বিতীয় প্রযুক্তিতে ব্যবহারের জন্য বাড়তি স্পেকট্রাম চাইবে, তখন তাকে ওই প্রযুক্তির স্পেকট্রাম পাওয়ার জন্য যে লাইন পড়েছে, সেই লাইনেই দাঁড়াতে হবে৳

২৯ আগস্ট ট্রাই-এর এই সুপারিশ পায় টেলিযোগাযোগ মন্ত্রক৳ ২৪ সেপ্টেম্বর টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এ রাজা ইউএএস লাইসেন্সের জন্য আবেদনপত্র জমা নেওয়ার শেষ তারিখ ঘোষণা করেন, ১ অক্টোবর ২০০৭৳ পরদিন প্রেস রিলিজ বেরিয়ে যায়৳ এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর ডিপার্টমেন্ট অটেলিকম একটা আভ্যন্তরীণ কমিটি তৈরি করেছিল ট্রাই-এর সুপারিশটিকে খতিয়ে দেখার জন্য৳ ১০ অক্টোবর ২০০৭ ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকম তড়িঘড়ি টেলিকম কমিশনের পুরোনো সময়ের জনা কয়েক সদস্যকে নিয়ে একটি মিটিং করে ট্রাই-এর no cap সুপারিশটি গ্রহণ করে৳ ট্রাই-এর সুপারিশ খতিয়ে দেখার জন্য তৈরি হওয়া আভ্যন্তরীণ কমিটি বলেছিল, নয়া লাইসেন্স দেওয়া যেতেই পারে কোনও সীমা না রেখে৳ কিন্তু স্পেকট্রাম যেন না দেওয়া হয়৳ স্পেকট্রাম দুর্লভ, তা মাথায় রেখে নয়া লাইসেন্সধারীদের স্পেকট্রাম দেওয়ার আগে ট্রাই এনিয়ে একটা নীতি তৈরি করুক৳ এই মর্মে ট্রাইকে স্পেকট্রাম বিষয়ক সুপারিশটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোর কথা বলে আভ্যন্তরীণ কমিটি৳ কিন্তু টেলিকম কমিশন আভ্যন্তরীণ কমিটির এই প্রস্তাব খারিজ করে দেয়৳ ট্রাই-এর একটি সুপারিশও খারিজ করে এই কমিশন, যেটাতে ট্রাই বলেছিল, যারা কেবল লাইসেন্সটুকু নিতে চায়, কিন্তু প্রাপ্য ন্যূনতম স্পেকট্রাম নিতে চায় না, তাদের জন্য আলাদা লাইসেন্স এনট্রি ফি ঠিক হোক৳ স্পেকট্রামের দুর্লভ হওয়ার কারণে লাইসেন্স পাওয়া এবং স্পেকট্রাম পাওয়ার বিষয়টিকে আলাদা করার যে পরামর্শ আভ্যন্তরীণ কমিটি দিয়েছিল এবং ট্রাই-এর সুপারিশেও যার আংশিক ইঙ্গিত ছিল, তাকে অস্বীকার করে টেলিকম কমিশন৳ টেলিকম কমিশনের সিদ্ধান্তে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সিলমোহর লাগিয়ে দেন ১৭ অক্টোবর ২০০৭৳ ১৫ অক্টোবর এবং ১৯ অক্টোবর, অর্থাৎ মন্ত্রীর সিলমোহর লাগানোর দু'দিন আগে ও দু'দিন পরে ট্রাই দু'বার দু'টি চিঠি পাঠায় ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমকে৳ তারা একথা জানায় যে, ট্রাই-এর সুপারিশকে মর্যাদা দেওয়া হোক এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা কাজ শুরুর আগে ট্রাই-এর সুপারিশ সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা হোক৳ এসবকে পাত্তা না দিয়ে ১৯ অক্টোবর ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকম প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলে দেয়, দ্বৈত প্রযুক্তিতে যারা যেতে চাইছে, তারা লাইসেন্স ও স্পেকট্রাম পাবে; যে সমস্ত ইউএএস লাইসেন্সধারী ওই দ্বিতীয় ধরনের স্পেকট্রামের জন্য এর মধ্যেই আবেদন জানিয়েছে, তারা স্পেকট্রাম পাবে, আবেদনের তারিখের ভিত্তিতে তাদের সারণিতে রাখা হবে৳ নয়া লাইসেন্স প্রদান এবং স্পেকট্রাম প্রদান নির্ভর করবে স্পেকট্রামের ভাঁড়ারের ওপর৳ বাড়তি স্পেকট্রাম যারা চাইছে, তারাও পাবে৳ অর্থাৎ, স্পেকট্রামের দুর্লভ হওয়ার কারণে এই বিজ্ঞপ্তিতে স্পেকট্রাম বিলিতে লাগাম টানার কোনো হদিশ ছিল না৳ একইসাথে আবেদনের তারিখের ভিত্তিতে সারণিতে রাখার কথা বলে আগে-এলে-আগে-পাওয়া যাবে, এইভাবে লাইসেন্স ও স্পেকট্রাম বিতরণের পদ্ধতিকেও সিলমোহর দেওয়া হল৳

এরপর ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকম কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রকের কাছে এই বিষয়টিতে আইনগত মতামত চাইলে, আইন মন্ত্রক ১ নভেম্বর ২০০৭ জানায়, এই গুরুতর বিষয়ে মন্ত্রীগোষ্ঠী আগে বিবেচনা করুক, তারপর অ্যাটর্নি জেনারেল (আইন মন্ত্রকের অধীন) মতামত দেবে৳ ২ নভেম্বর টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আইন মন্ত্রকের এই পরামর্শ এক্তিয়ার বহির্ভূত বলে খারিজ করে দেয় এবং নয়া ইউএএস লাইসেন্স পাওয়ার আবেদনের সময়সীমা ১ অক্টোবর ২০০৭ থেকে পিছিয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৭ করে দেন৳ উল্লেখ্য, ওই ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখেই ১ অক্টোবরের সময়সীমাটি বিজ্ঞাপিত হয়েছিল৳ একইসাথে তিনি চলতি পদ্ধতিতে (অর্থাৎ আগে-এলে-আগে-পাওয়া যাবে ভিত্তিতে) নয়া লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া চালু রাখার কথা বলেন৳ শুধু একটা কথা জুড়ে দেওয়া হয় লাইসেন্সের গাইডলাইনে, লাইসেন্স পেলেই যে স্পেকট্রাম পাওয়া যাবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই৳ কারণ স্পেকট্রাম পাওয়া যাবে কিনা তা নির্ভর করছে কতটা স্পেকট্রাম ভাঁড়ারে তখন আছে তার ওপর৳  

৭ নভেম্বর থেকে জমে থাকা আবেদনের ভিত্তিতে নয়া ইউএএস লাইসেন্স ও দ্বৈত প্রযুক্তি লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি শুরু হয়৳ ২২ নভেম্বর ডিপার্টমেন্ট অব ইকনমিক অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমকে বলে, ২০০১-এর এনট্রি ফি নিয়ে কোনরকম মূল্যায়ন ছাড়াই ২০০৭-এ লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে৳ এটা কি ঠিক হচ্ছে? এ ব্যাপারে যেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়৳ ২৯ নভেম্বর ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকম (সেক্রেটারি ডি এস মাথুরের সই করা চিঠি) উত্তর দেয়৳ তারা জানায়, যা হচ্ছে তা ক্যাবিনেট ও ট্রাই-এর সুপারিশ মেনেই হচ্ছে (ইউএএস লাইসেন্স বিষয়ে ২০০৩ সালের ক্যাবিনেট ডিসিশন এবং দ্বৈত প্রযুক্তি বিষয়ে ২০০৭ সালের আগস্ট মাসের ট্রাই-এর সুপারিশ)৳ ৩০ নভেম্বর ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমের ফাইনান্স মেম্বার সেক্রেটারি মঞ্জু মাধবন একটি নোট দিয়ে জানান, আর এগোনোর আগে ডিপার্টমেন্ট অফ ইকনমিক অ্যাফেয়ার্স-এর এই পর্যবেক্ষণটিকে গুরুত্ব দিয়ে এনট্রি ফি পুনর্বিবেচনা করা হোক৳ ৪ ডিসেম্বর ২০০৭ মন্ত্রী এই নোটের বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে নোট লেখেন৳ তাতে বলা হয়, ণ্ণএইভাবে ফাইলে লাগাতার বাধা সৃষ্টি করা আইনের জ্ঞান বা একাগ্রতা দেখায় না, দেখায় গোপন স্বার্থ (vested interest)'৳ ২৬ ডিসেম্বর মন্ত্রী নয়া লাইসেন্স প্রদানের পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানান৳ ৭ জানুয়ারি ২০০৮ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ওই চিঠিটিকেই লাইসেন্সের বিষয়ে নীতিগত নির্দেশ হিসেবে নেওয়া হয় টেলিযোগাযোগ মন্ত্রকের তরফে এবং ওইদিনই ওটা সলিসিটর জেনারেল মঞ্জুর করে৳

১০ জানুয়ারি দুপুর পৌনে দুটোয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নীতিগত নির্দেশটি প্রকাশ্যে আনা হয়৳ সেখানে ইউএএস লাইসেন্স দেওয়া হবে একথা জানানো হয়৳ ওই ইউএএস লাইসেন্স খতিয়ে দেখা হবে যে আগে আবেদন করেছে, তারটা আগে --- এই ভিত্তিতে৳ খতিয়ে দেখার পর যে আবেদনকারী ইউএএস লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে, তাকে ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমের কাউন্টারে ওই লাইসেন্সের জন্য যা যা জমা দেওয়া দরকার, তা জমা দিতে হবে৳ তারপর আগে-জমা-দিলে-আগে পাবে ভিত্তিতে ইউএএস লাইসেন্স দেওয়া হবে৳

ওইদিনই এক ঘন্টা পরে, দুপুর পৌনে তিনটেয় আরেকটি প্রেস রিলিজ দেয় ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকম৳ তাতে ছিল, ইউএএস এবং দ্বৈত প্রযুক্তির আবেদন যারা করেছিল, তারা সেই আবেদনের বিষয়ে ডিপার্টমেন্টের মতামত জানতে তাদের প্রতিনিধিকে কোম্পানির স্ট্যাম্প সহ যেন সাড়ে তিনটের মধ্যে নয়া দিল্লির সঞ্চার ভবনের তিনতলায় পাঠায়৳ সাড়ে চারটের মধ্যে যে আবেদনকারীর প্রতিনিধি আসবেন না, তার আবেদন বিষয়ে ডিপার্টমেন্টের মতামত পোস্টে পাঠানো হবে৳ যাদের আবেদন যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে, তারা ছুটির দিন বাদে যে কোনোদিন সকাল ন'টা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ডিপার্টমেন্টের কাউন্টারে যা যা জমা দেওয়ার তা জমা দিতে পারে৳   

ওইদিন বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে সঞ্চার ভবনের তিনতলায় যোগ্য বিবেচিত আবেদনগুলি কোম্পানি প্রতিনিধিদের দেওয়া হয়৳ ওই দিনই সঞ্চার ভবনের একতলায় চারটে বিশেষ কাউন্টার খোলা হয়, লাইসেন্সের যোগ্য আবেদনকারীর থেকে যা যা জমা নেওয়ার কথা তা জমা নেওয়ার জন্য৳ দেওয়ালের একটি ডিজিটাল ঘড়িতে সময় দেখে কখন জমা দেওয়া হচ্ছে, তা দাগিয়েও নেওয়া হচ্ছিল৳ উল্লেখ্য, গোটা ঘটনাটা ঘটতে সময় লাগে পৌনে দুটো থেকে সাড়ে পাঁচটা৳ এই সময়টুকুর মধ্যে শুধু সঞ্চারভবনে কর্পোরেটটির প্রতিনিধি পৌঁছনোই নয়, তার সাথে জমা দেওয়ার জন্য প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা করে তাকে নিয়ে যেতে হয়েছে৳

সাংবাদিক জে গোপীকৃষ্ণনের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছে, কাউন্টারের সারণিতে প্রথমে আসার জন্য কোম্পানি প্রতিনিধিদের মধ্যে মারপিট লেগে গিয়েছিল৳ কর্পোরেটদের সিইও স্তরের লোকেরা এসেছিল টাকা জমা দিতে, তারা শুধু নিজেদের মধ্যে মারপিট করেনি, টেলিকম অফিসের কিছু কর্মীকেও মারধোর লাগায়৳ সামলাতে প্রথমে ষণ্ডা এবং পরে পুলিশ আনা হয়৳ কিন্তু মন্ত্রী এ রাজার ব্যক্তিগত সচিব আর কে চাণ্ডোলিয়ার হস্তক্ষেপে কারোর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়নি৳

২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২৩২টা আবেদন জমা পড়েছিল এবং ১ অক্টোবরের মধ্যে আরও ৩৪৩টা আবেদন জমা পড়ে, অর্থাৎ মোট ৫৭৫টি আবেদন৳ তার মধ্যে ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা পড়া আবেদনগুলিই কেবল যোগ্য বলে বিবেচিত হয়, এই ২৩২টি আবেদনের মধ্যে ১২২টা লাইসেন্স মঞ্জুর হয়৳

দুর্নীতির অভিযোগকারীদের বক্তব্য রাজা এবং তার পারিষদবর্গের একাংশ (যেমন, টেলিকম সচিব সিদ্ধার্থ বেহুরা প্রভৃতি) কর্পোরেটদের একাংশের কাছ থেকে টাকা খেয়ে নিম্নলিখিত বাজে কাজগুলি করেছেন :

১) ট্রাই-এর সুপারিশের পুরোটা না মেনে আংশিকভাবে মানা হয়েছে; ২০০১ সালের লাইসেন্স এনট্রি ফি-র সমমূল্যে ২০০৮ সালে ইউএএস লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে৳ ২০০১ সালে মোবাইলের যা প্রসার ছিল দেশে, তাতে তখন মোবাইল ব্যবসা যতটা লাভজনক ছিল, তার তুলনায় তার লাভ ২০০৮ সালে অনেক গুণ বেড়ে গেছে৳ তাই এনট্রি ফি-ও অনেক বেশি হওয়ার কথা (কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল পরে হিসেব করে বলে, সরকারের ঘরে আসতে পারত আরও এক লক্ষ ছিয়াত্তর হাজার কোটি টাকা)৳

২) দ্বৈত প্রযুক্তির আবেদনকারীরা, মূলত রিলায়েন্স এবং টাটা, সিডিএমএ থেকে লাভজনক জিএসএম প্রযুক্তিতে যেতে চাইছিল৳ তাদের ২০০১ সালের সমমূল্যে এনট্রি ফি নিয়ে ২০০৮ সালে লাইসেন্স দেওয়া হয়৳

৩) ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হয়, ইউএএস লাইসেন্সের জন্য আবেদনের সময়সীমা ১ অক্টোবর৳ কিন্তু সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর তা পিছিয়ে করা হয় ২৫ সেপ্টেম্বর৳ এর পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে৳

৪) মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে যোগ্য আবেদনকারীদের ১৬০০ কোটি টাকা (ডিমান্ড ড্রাফটে) জমা দিতে বলা হয়েছিল৳ তার মানে দাঁড়ায়, আগে থেকেই কিছু কোম্পানিকে টাকা তুলে রেডি রাখতে বলে দেওয়া হয়েছিল৳ সাংবাদিক গোপীকৃষ্ণনের রিপোর্টে অভিযোগ, বিকেল সাড়ে তিনটেয় কাউন্টার খোলার আগেই রাজার ব্যক্তিগত সচিব চাণ্ডোলিয়ার ঘরে বসে সোয়ান টেলিকম এবং ইউনিটেক --- এই দুটি কোম্পানির নাম সারণিতে এক এবং দুই নম্বর হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল৳

নীতি-দুর্নীতির সিরিয়ালের কর্পোরেট পরিচালনা

সবচেয়ে সাদা চোখে নীতি-দুর্নীতি গোটাটাই শাসক দলের ব্যাপার, সরকারি ব্যাপার, পার্লামেন্টের ব্যাপার, মন্ত্রকের ব্যাপার, আমলাদের ব্যাপার৳ নীতি-দুর্নীতির সমালোচনা বিতণ্ডায় এরাই কাঠগড়ায় আসে৳ কিন্তু আগের অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, টেলিকম নীতির ক্ষেত্রে ট্রাই-এর সুপারিশ সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং ট্রাই সেসবের মধ্যে দেশের কথা বলতে গিয়ে চীনের কথা টেনে আনে!

ক) ট্রাই

১৯৯৭ সালে তৈরি হয় টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অব ইন্ডিয়া (সংক্ষেপে ট্রাই)৳ প্রথমে এটি একটি সাংবিধানিক বডি হিসেবে গড়ে না উঠলেও, পরে এটাকে সাংবিধানিক বডির স্বীকৃতি দেওয়া হয়৳ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে এর উল্লেখ আছে, . যেহেতু আগামী কয়েক বছর বেসরকারি ক্ষেত্র টেলিকম নেটওয়ার্ক নির্মাণে টেলিকম ডিপার্টমেন্ট/এমটিএনএল এর চেয়ে বেশি কাজ করবে, একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা সম্পন্ন স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রয়োজন, যা সামাজিক প্রয়োজনের তাগিদে বেসরকারি মুনাফাকে শিকল পরাতে পারবে৳' আর কর্পোরেটদের দিক থেকে ট্রাই খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ টেলিকম সেক্টরে সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি কর্পোরেট পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী৳ সরকার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলে, তা সরকারি অপারেটরের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কর্পোরেট অপারেটরদের যদি স্বার্থ হানি ঘটায়! ১৯৯৭ সালে তৈরি হওয়া নিয়মাবলী এবং ২০০০ সালের পরিমার্জনের মধ্যে দিয়ে দাঁড়ায়, কখন লাইসেন্স দেওয়া হবে, শর্ত কী কী হবে, প্রযুক্তি, টেলিকম গ্রোথের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ানো, স্পেকট্রামের এফিসিয়েন্ট ব্যবহার, লাইসেন্স প্রত্যাহার প্রভৃতি ব্যাপারে ট্রাই নিজে থেকে বা সরকারের অনুরোধে সুপারিশ করতে পারবে৳

ট্রাই-এর পরামর্শ সরকার মানতে বাধ্য তা নয়, কিন্তু নয়া লাইসেন্স প্রদান ও তার শর্তের ব্যাপারে সরকার ট্রাই-এর সুপারিশ নিতে বাধ্য এবং ট্রাই ৬০ দিনের মধ্যে তা না দিলে সরকার কাউকে ট্রাই-এর সুপারিশ ছাড়াই লাইসেন্স দিতে পারে৳ ট্রাই-এর সুপারিশ না মানতে চাইলে ট্রাইকে তা জানিয়ে সুপারিশ পরিমার্জন করার জন্য পাঠাতে হবে৳ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ট্রাই-এর পরিমার্জিত সুপারিশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে৳ অর্থাৎ, লাইসেন্স প্রদান এবং তার শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার স্বাধীন নয়৳ সে ট্রাই-এর সুপারিশ অনুযায়ী চলতে বাধ্য --- আইনের স্পিরিটটি কিন্তু তাই৳ সুপারিশ করা ছাড়াও ট্রাই-এর দায় নিয়ন্ত্রণ, পরিষেবার স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করা এবং দাম ঠিক করা৳ বিভিন্ন অপারেটরের মধ্যে ঝামেলা এবং গ্রাহক-অপারেটরের মধ্যে ঝামেলা মেটানোর দায়ও ট্রাই-এর ছিল প্রথমে, কিন্তু ২০০০ সালে টিডিস্যাট (টেলিকম ডিসপিউট সেট্‌লমেন্ট অ্যান্ড অ্যাপেলেট ট্রাইবুনাল) গঠন করে তার ওপর এই দায় ন্যস্ত করা হয়৳

খ) কর্পোরেট ও তার প্রকাশ্য কার্যকলাপ

উদাহরণ : ণ্ণট্রাই-কে স্বাধীন হতে হবে'

১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে দিল্লি হাইকোর্ট রায় দেয়, দিল্লি এবং বোম্বে শহরে সরকারি সংস্থা এমটিএনএল সেলফোন পরিষেবা দিতে পারবে৳ এর আগে ট্রাই ফেব্রুয়ারি মাসে সেলুলার ফোন পরিষেবায় এমটিএনএল-এর প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল৳ ট্রাই বলেছিল যে, এমটিএনএল ক্ষমতা দেখিয়ে প্রাইভেট অপারেটরদের ব্যবসা থেকে দূর করে দেবে৳ সরকারি এমটিএনএল, যারা দিল্লি এবং বোম্বেতে ল্যান্ডলাইন পরিষেবা দেয়, তারা সেলুলার পরিষেবায় আসতে চেয়েছিল৳ কারণ তাহলে প্রাইভেট অপারেটররা মোবাইল কলের (৩২ টাকা/মিনিট) যে চড়া মূল্য রেখেছে, তা কমবে৳ তাছাড়া ইনকামিং কলের জন্য পয়সা না নেওয়ার কথাও ভাবছিল এমটিএনএল৳ যাই হোক, হাইকোর্ট বলে, ট্রাই-এর এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই৳ ব্যস, শুরু হয়ে যায় প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কর্পোরেট সেলুলার অপারেটরদের চিৎকার৳ বিপিএল মোবাইল : ণ্ণএটা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে ধাক্কা ... ট্রাই-কে স্বাধীন হতে হবে এবং তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে৳' ভারতী (পরবর্তীতে এয়ারটেল) টেলিকমের সুনীল মিত্তল : ণ্ণটেলিযোগাযোগের লিবারালাইজেশন সম্ভব নয় যদি ট্রাই-এর ক্ষমতা খর্ব করা হয়৳' এমটিএনএল এক বছরের মধ্যে কলরেট নামিয়ে আনে তিন মিনিটে এক টাকা চল্লিশ, প্রাইভেট অপারেটররা তখন রেখেছিল ৬ টাকা প্রতি মিনিট৳ স্বভাবতই রেগে গিয়ে ট্রাই-এর কাছে নালিশ জানায় তারা৳ ট্রাই এমটিএনএল-এর কম কলরেট-এর প্রস্তাব আগে অনুমোদন না করে ফেলে রেখেছিল, এবার নালিশ পেয়ে সে এমটিএনএল-কে শো-কজ করে : কেন তাদের সম্মতি ছাড়া এত কম কলরেট রাখা হয়েছে৳  

উদাহরণ : ণ্ণপ্রতিটি সরকারি কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেছি'

টাটা এবং রিলায়েন্স ভারতবর্ষের প্রায় সবক'টি সার্ভিস এরিয়াতে এবং আরও দুটি কর্পোরেট শ্যাম ও ইনফোটেল মাত্র একটি করে সিডিএমএ প্রযুক্তির মোবাইল পরিষেবা দিতে শুরু করেছিল৳ ফলে জিএসএম প্রযুক্তির লাইসেন্স তারা পায়নি৳ সিডিএমএ প্রযুক্তি জিএসএম প্রযুক্তির চেয়ে বেশি দক্ষতা সম্পন্ন৳ কিন্তু স্পেকট্রামের অভাব হচ্ছিল তাদের৳ ফলে পরিকাঠামো বাড়িয়ে অভাব পূরণ করতে হচ্ছিল৳ তাতেও ভবিষ্যতে কী হবে বলা যাচ্ছিল না৳ কারণ জিএসএম-এর জন্য দুটি তরঙ্গমালা ব্যান্ড বরাদ্দ (৯০০ ও ১৮০০ মেগাহার্জ) থাকলেও সিডিএমএ-র জন্য বরাদ্দ ছিল একটি ব্যান্ড (৮০০ মেগাহার্জ)৳ টাটার এক কর্তার কথায়, ণ্ণআমরা প্রসারের জন্য দ্বিগুণ খরচ করেছি, এতে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে ঘা লাগছে৳ আমরা এটা স্পেকট্রাম বিষয়ক প্রতিটি সরকারি কমিটির সঙ্গে আলোচনা করেছি৳ ... জিএসএম প্রযুক্তির লাইসেন্স পাওয়া আমাদের কাছে বাধ্যতামূলক'৳ প্রসঙ্গত, দ্বৈত প্রযুক্তির লাইসেন্স প্রদানে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় এই দুটি কর্পোরেট --- এরা বেশিরভাগটাই সিডিএমএ থেকে জিএসএম প্রযুক্তিতে চলে যায়৳ টাটা গোষ্টী দ্বৈত প্রযুক্তি লাইসেন্স পাওয়ার পরই বিদেশি টেলিকম কর্পোরেট ডোকোমো-কে ১৩ হাজার কোটি টাকায় নিজেদের ২৭ শতাংশ ইকুইটি বিক্রি করে দেয়৳

উদাহরণ : মামলা

১৯৯৯ সালে যখন বার্ষিক নির্দিষ্ট লাইসেন্স ফি থেকে আয়ের ভাগ দেওয়ার জমানায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নয়া টেলিকম নীতিতে, তখন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করে সিপিআইএম বলেছিল, এটা ণ্ণসহস্রাব্দের সবচেয়ে বড়ো কেলেঙ্কারি, এতে সরকারের ক্ষতি হবে ৫০ হাজার কোটি টাকা৳' এই নীতিতে সরকারি সংস্থার (এমটিএনএল) তৃতীয় সেলুলার অপারেটর হিসেবে জুড়ে যাওয়ার যে নীতি ছিল, তাকে দিল্লি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল সেলুলার অপারেটরদের ইউনিয়ন ণ্ণসেলুলার অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন ইন্ডিয়া'৳ পরে তারা সেটা প্রত্যাহার করে নেয়৳

উদাহরণ : হামলা

১০ জানুয়ারি ২০০৮ দিল্লিতে সঞ্চারভবনের কাউন্টারের সামনে কর্পোরেট সিইও স্তরের মানুষদের নিজেদের মধ্যে মারপিট এবং টেলিকম দপ্তরের কর্মীদের মারধোর, যার বিবরণ আগেই দেওয়া হয়েছে৳

এরকম প্রকাশ্য কার্যকলাপ আছে প্রচুর৳ প্রেস বিজ্ঞপ্তি, পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া, মামলা, ট্রাই সহ সরকারি কমিটিগুলোকে প্রভাবিত করা প্রভৃতির মাধ্যমে এই নীতি-দুর্নীতির রঙ্গে কুশীলবদের পরিচালনা করা চলে৳

গ) কর্পোরেট ও তার গোপন সংগঠন

একটা কোম্পানির নাম বৈষ্ণবী কর্পোরেট কনসালটেন্ট৳ পরিচয়, কর্পোরেট লবিস্ট৳ মালিক নীরা রাদিয়া৳ এই নীরা রাদিয়ার সাথে কিছু সাংবাদিক, কর্পোরেট কর্তা, রাজনীতিবিদের ফোনালাপ ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট ট্যাপ করেছিল, ২০০৯ সালের মে-জুন মাসে৳ মাত্র দুই মাসের ফোনালাপে হদিশ পাওয়া যায় কর্পোরেটের গোপন সংগঠনের৳ দুনিয়াজোড়া আল কায়দার মতো ছড়ানো কর্পোরেটের গোপন সংগঠনের একটি ধরন হল কর্পোরেট লবিবাজির সংগঠন৳ তার মধ্যে একটি হল এই নীরা রাদিয়ার সংগঠনটি৳ এরকম আরও হাজার হাজার হয়ত আছে৳ ওই ফোনালাপে দেখা যায়, কর্পোরেটরা তাদের ক্লায়েন্ট আর তারা রাজনীতিবিদ থেকে আমলা, মিডিয়ার লোক থেকে মন্ত্রী, রাজ্যপাল থেকে এনজিও-দের কাছে কর্পোরেটের হয়ে সওয়াল করে৳ আলোচ্য নীরা রাদিয়ার ক্লায়েন্টদের মধ্যে রয়েছে রিলায়েন্স (মুকেশ) এবং টাটা৳ টাটা প্রায়শই দাবি করেন, তিনি ঘুষ দেন না৳ সেই টাটা রাদিয়া টেপ প্রকাশ হবার পর সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন, যাতে ওই টেপ প্রকাশ বেআইনি ঘোষিত হয়৳ টাটাবাবু প্রেসকে জানান, ণ্ণআমরা ব্যবসায়ীদের সুযোগের মধ্যে সমতা চাই৳ আমরা নীতির পরিবর্তন চেয়েছি, কখনও তার (রাদিয়া) মাধ্যমে, কখনও সরাসরি৳ ... কিন্তু তাকে কখনও ঘুষ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করিনি'! আরেকটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এগুলো তাদেরই সংগঠন!

কী করে এই গোপন সংগঠন? ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের এক অতি গোপন (টপ সিক্রেট) রিপোর্টে (ফাঁস হওয়া) লেখা আছে, ণ্ণনীরা রাদিয়া এই সংগঠনগুলির প্রধান : বৈষ্ণবী কর্পোরেট কনসালটেন্ট, নোয়েসিস কনসালটিং, ভিটকম, নিউকম কনসালটিং৳ ভিটকম ণ্ণএনডিটিভি ইমাজিন'-এর ব্যবসা দেখে৳ নিউকম তৈরি হয়েছে কেবলমাত্র মুকেশ আম্বানি গ্রুপের কোম্পানিগুলির বিষয় দেখাশোনার জন্য৳ বৈষ্ণবী দেখে টাটা গ্রুপ, ইউনিটেক, স্টার টিভি এবং অন্যান্য কর্পোরেট ক্লায়েন্টের মিডিয়া সংক্রান্ত বিষয়গুলি এবং ণ্ণপরিবেশ ম্যানেজমেন্ট'৳ রাদিয়া নিয়ন্ত্রিত নোয়েসিস অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের নিয়ে তৈরি, পাওয়ার-টেলিকম-বিমানশিল্প-পরিকাঠামো বিষয়ে পরামর্শদাতা৳ এই সংগঠনগুলি কেবল মিডিয়া ম্যানেজ করে তাই নয়, এরা এদের ক্লায়েন্টদের ব্যবসায়িক স্বার্থে নীতির পরিবর্তন ও সরকারি দপ্তরগুলির সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করে বলে অভিযোগ৳ এরা কে কোন দপ্তরের মন্ত্রী হবে, সে বিষয়েও নাক গলায়৳ ট্যাপ করা ফোনালাপগুলি থেকে মনে হয়, সরকারের উচ্চতম স্তরে নীতির পরিবর্তনে নীরা রাদিয়ার ভূমিকা আছে, যার সঙ্গে যুক্ত ইউনিটেক, সোয়ান এবং এয়ারসেল সহ অন্যান্য কর্পোরেটদের টেলিকম লাইসেন্স পাওয়া৳ ফোনালাপগুলো থেকে আরও মনে হয়, অনেক গোপন নথি ও নীতিগত কাগজ রাদিয়ার কাছে যায়৳ এছাড়া বৈষ্ণবী চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টদের মাধ্যমে এনট্রি অপারেটরদের অ্যাডজাস্টমেন্ট ও ঘুষ দেওয়ার কাজ করে দেয়৳ ...

ণ্ণকথোপকথনগুলি থেকে বোঝা যায়, রাদিয়া টেলিকম মন্ত্রী এ রাজার খুব ঘনিষ্ঠ এবং সোয়ান, এয়ারসেল, ইউনিটেক ও ডাটাকমকে লাইসেন্স ও স্পেকট্রাম পাইয়ে দেওয়ার হোতা৳ এর মধ্যে ডাটাকম, যা তৈরি হয়েছে এইচএফসিএল গ্রুপ ও ভিডিওকনের উদ্যোগে, সেখানে পুঁজি আছে মুকেশ আম্বানি গোষ্ঠীর৳ রিলায়েন্সের (মুকেশ) মনোজ মোদী রাদিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন৳ সোয়ান, যারা দিল্লি ও মুম্বইয়ে স্পেকট্রাম পাওয়ার ব্যাপারে সরকারি লিস্টে এগিয়ে, তাদের ফান্ডিং করছে মুম্বই ভিত্তিক একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি৳ ...'

এছাড়া ওই অতি গোপন নোটে ট্যাপ করা ফোনালাপ থেকে পাওয়া আরও কিছু তথ্যের উল্লেখ করা হয় : ১) টাটা চাইছে দয়ানিধি মারান যেন টেলিকম মন্ত্রী না হয়৳ টাটা অপ্রত্যক্ষভাবে এয়ারসেলের ইকুইটি নিয়ন্ত্রণ করে, এয়ারসেলের শেয়ারহোল্ডার ম্যাক্সিস কমিউনিকেশন ও অ্যাপোলো-র মাধ্যমে৳ মারান মন্ত্রী হলে টাটাকে তা ছেড়ে দিতে হবে৳ ২) টাটা গ্রুপ তার রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ভোল্টাসের মাধ্যমে চেন্নাইয়ে তামিলনাড়ুর শাসক দল ও কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক ডিএমকের নেতা করুনানিধি পরিবারের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বাড়ি বানাবে৳ মনে হয় এটা মারানকে না করে রাজাকে মন্ত্রী করার ভেট৳ উল্লেখ্য, রাজা ও মারান উভয়েই ডিএমকে দলের৳ ৩) ডিএমকের কেউ, বিশেষত রাজা যাতে টেলিকম মন্ত্রী হয়, তার জন্য কংগ্রেসের কাছে তদ্বির করার জন্য রাদিয়া নিযুক্ত করে সাংবাদিক বরখা দত্ত ও বীর সাংভিকে৳ ৪) এয়ারটেল (সুনীল মিত্তল) চাইছিল না, রাজা টেলিকম মন্ত্রী হোক৳ সে চায় মারান মন্ত্রী হোক৳ সে রিলায়েন্সকে (অনিল) শয়তানের সাম্রাজ্য বলে৳ মিত্তলের অভিযোগ, রাজা জিএসএম লবির বদলে সিডিএমএ লবিকে বেশি সুবিধা দিয়েছে আগের বারের মন্ত্রীত্বে৳ মিত্তল রাদিয়াকে তার হয়ে কাজ করতে বলে৳ রাদিয়া রাজি হয়ে বলে, টাটার হয়ে তার কাজের সঙ্গে সংঘাত না ঘটলে সে মিত্তলের হয়েও কাজ করতে রাজি৳ সে মিত্তলের সঙ্গে রাজার বন্ধুত্বে ভূমিকা পালন করবে৳ ৫) টাটা ইউনিটেককে আড়াইশো কোটি টাকা দিয়েছে রাদিয়ার মাধ্যমে৳ ৬) রাদিয়া বিদেশি বিনিয়োগেও ভূমিকা নিয়েছে৳ লেম্যান ব্রাদার্স ইউনিটেক রিয়েল এস্টেটে প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে৳ তার মধ্যে কিছু টাকা আসার পরই লেম্যান ব্রাদার্স মার্কিন রিয়েল এস্টেট শিল্পে ধস নামলে ডুবে যায়৳ সেই টাকা ইউনিটেক টেলিকম কোম্পানির ইকুইটি বিক্রি করে ফেরত দেওয়া হবে আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীদের, এমনই ডিল হয়েছিল৳ এ প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল প্রথমে ইতালির টেলিকম ইতালিয়া এবং নরওয়ের টেলিনরের সঙ্গে৳ শেষ পর্যন্ত টেলিনরকেই ইকুইটি বিক্রি করে ইউনিটেক৳ রাদিয়ার সঙ্গে ইউনিটেকের অজয় চন্দ্রর কথা থেকে বোঝা যায়, একটা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে৳  সরকারি তদন্ত হলে সরকারকে বোঝাতে হবে যে এতে ইউনিটেকের প্রোমোটারদের খুব একটা লাভ হয়নি, কেবল কিছু বিনিয়োগ এসেছে মাত্র৳ ৭) নীরা রাদিয়া ণ্ণনঈ দুনিয়া' নামের একটি মিডিয়ার ছাজলানিকে বলছে, তাকে কোনো একজনের মুখোশ হিসেবে কাজ করার জন্য৳ ওই তৃতীয় ব্যক্তি (মুকেশ আম্বানি) নঈ দুনিয়ার মুখোশে ণ্ণনিউজ এক্স' চ্যানেলটি পিটার ও ইন্দ্রানী মুখার্জির কাছ থেকে কিনে নিতে চায়৳ রাদিয়া সাংবাদিকদের নিজের বশে রাখেন গাড়ি, ছুটি কাটানোর টাকা গিফট্‌ করে৳ ৮) ঝাড়খণ্ডে একটি খনির লিজের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য টাটা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মধু কোড়াকে ১৮০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিল৳ রাদিয়া সেই লিজ বাড়িয়ে নিতে সফল হয় ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপালের মাধ্যমে (রাষ্ট্রপতি শাসনে)৳ এর জন্য টাটা রাদিয়াকে ণ্ণসাফল্যের ফি' এবং তার সাথে ১ কোটি টাকা পুরষ্কার দেয়৳ প্রসঙ্গত, সেই সময় ঝাড়খণ্ড ছিল পাঁচ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসনে, সিবতে রাজি ছিলেন রাজ্যপাল৳ দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর গদি যায়৳ তাঁর দুই আপ্ত সহায়ক আমলার বিরুদ্ধে সিবিআই দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত করছে৳  ৯) বণিকসভা ফিকি-র প্রধান তরুণ দাস একইসাথে হলদিয়া পেট্রোকেমেরও চেয়ারম্যান৳ মুকেশ আম্বানি চাইছে হলদিয়া পেট্রোকেম দখলে নিতে এবং এর জন্য রাদিয়ার মাধ্যমে তরুণ দাসকে কাজে লাগাচ্ছে৳ তরুণ দাস পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল সিপিএমের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছেন৳ নিরুপম সেন প্রকাশ কারাটের সঙ্গে বৈঠকের বন্দোবস্ত করছেন৳ মুকেশদের ভয়, পুর্ণেন্দু না বাগড়া দেন, সেক্ষেত্রে সেটা মুকেশকেই সামলাতে হবে৳ ১০) রিলায়েন্স (মুকেশ)-এর মনোজ মোদী এবং রাদিয়ার একটি কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, রাদিয়া দিল্লি ভিত্তিক এক এনজিও-কে দিয়ে রিলায়েন্স (অনিল)-এর বিরুদ্ধে একটি জনস্বার্থ মামলা করাচ্ছে৳ এই এনজিও-কে রাদিয়া আগেও কাজে লাগিয়েছিল ডিএলএফ-এর বিরুদ্ধে৳ এই এনজিও-র মাথায় আছে তিনজন৳ একজন রাদিয়ার ঘনিষ্ঠ, আরেকজন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সর্দার, এবং তৃতীয় ব্যক্তি খুব নামকরা৳ এছাড়াও আরও নানা তথ্য পাওয়া যায় ওই অতি গোপন নোট থেকে৳

কিন্তু ...

নয়ের দশকে ভারতে টেলি-ঘনত্ব ছিল একশ' জনে এক জনও নয়, পাড়ার টেলিফোন বুথগুলো ধরে৳ টেলি-ঘনত্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়৳ ২০০০ সাল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে এই ঘনত্ব৳ ১৯৯৯ সালের সরকারি নীতিতে ভাবা হয়েছিল, পাড়ার টেলিফোন বুথগুলোরও ভূমিকা থাকবে এই বৃদ্ধিতে৳ কর্পোরেট আর মানুষ ভেবেছিল একটু অন্যভাবে৳ আস্তে আস্তে শুকিয়ে মরল পাড়ার টেলিফোন বুথ৳ এল হাতে হাতে ফোন৳ কারোর আবার একটা নয়, দুটো তিনটে ...৳ ১৯৯৯ থেকে ২০০৩, কখনোই সরকারি নীতি ভাবতে পারেনি, ২০১০ সালে ভারতের টেলি-ঘনত্ব ১৫-২০ শতাংশ ছাড়াবে৳ কর্পোরেটরাই বা ভাবতে পেরেছিল কি? মোটেই না৳ কিন্তু কী দাঁড়াল? ভারতে মোট টেলিফোনের সংখ্যা এখন ৮৮.৬ কোটি, আর টেলি-ঘনত্ব ৭৩.৯৭ শতাংশ, ২০১১ সালের ৩০ জুনের হিসেব৳ হিসেবে যদি ভরসা না-ও থাকে, তবে একটু চারপাশে তাকালেই হয়৳ হাতে হাতে মোবাইল৳ মোবাইল ছোটো ব্যবসায়ীদের অপরিহার্য সম্পদ, কমবয়সী পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছেও তার মূল্য অপরিসীম৳ মোবাইল মেয়েদের সামাজিক বাঁধন থেকে আপাত-মুক্তি৳ মোবাইল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া মধ্যবিত্তের হাতিয়ার৳ সর্বোপরি, মোবাইল কমবয়সীদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে গামছা বা জামাকাপড়ের মতো অপরিহার্য একটি জিনিস৳

মোবাইলের এই বিস্ফোরক প্রসার শুধু এদেশে হয়নি৳ আমেরিকা থেকে ইংল্যান্ড হয়ে চীন, সব জায়গায় একই অবস্থা৳ আর এর জোরেই উড়ে যাচ্ছে নীতি-দুর্নীতির যাবতীয় সওয়াল৳ বন্দী প্রাক্তন টেলিকম মন্ত্রী এ রাজা সিবিআই কোর্টে সওয়াল করছেন শহীদের জোশ নিয়ে, আমি তো প্রতি হাতে মোবাইলের সরকারি স্বপ্নকে সাকার করার চেষ্টা করেছি মাত্র৳ বর্তমান টেলিকম মন্ত্রী কপিল সিবাল বলছেন, সরকারের রেভিনিউর চেয়ে বড়ো মানুষের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া৳ বিরোধী নেতা মুরলী মনোহর যোশীর নেতৃত্বাধীন পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) ২জি স্পেকট্রাম দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্টে কমিটির প্রশ্নের উত্তরে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ণ্ণউৎপাদকের দৃষ্টিতে স্পেকট্রাম একটা দুর্মূল্য সম্পদ৳ কিন্তু সেটা দেওয়া মানেই ক্ষতি নয়, যদি বিষয়টিকে গ্রাহক এবং জনস্বার্থের দিক থেকে দেখা হয়৳ সরকারি নীতি তৈরি হয় সর্বোচ্চ জনস্বার্থের কথা ভেবে, কেবল সরকারের আয়ের কথা ভেবে নয়৳ প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য প্রায়শই নির্ধারণ করা হয় এই লক্ষ্যেই৳ ... দশম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও বলা আছে, নীতি নির্ধারণে সরকারের আয় বাড়ানো মুখ্য উদ্দেশ্য নয়৳ ... তাই কয়েক বছর আগের দামে স্পেকট্রাম দিয়ে দেওয়াকে জাতীয় ক্ষতির চোখে দেখার জবাব হয়ে যায় গ্রাহকের লাভ এবং জনস্বার্থের সাধারণ উন্নয়ন, দ্রুততর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মাধ্যমে' (পিএসি রিপোর্ট, এপ্রিল ২০১১)৳ নব্য প্রজন্মের কর্পোরেটরা (যাঁদের মধ্যে পড়েন ইনফোসিসের নারায়ণমূর্তি) বলতে পারছেন, ঘুষ দূর করার উপায় ঘুষকে আইনসিদ্ধ করে দেওয়া৳ দুর্নীতির দায়ে চীনে এমনকি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় চীন গত এক দশকে থাকছে বেশ ওপরের দিকে৳  

সব মিলিয়ে অন্য এক বাস্তবতায় যেতে চাওয়া দুনিয়াতে পুরোনো নিয়ম বা ণ্ণনীতি-আদর্শ' কেমন খাপ না খাওয়া, বস্তাপচা জিনিস বলে মনে হয়৳

 

তথ্যসূত্র :

এই লেখায় ব্যবহৃত তথ্যাদি সবই বিভিন্ন প্রকাশ্য সূত্র থেকে নেওয়া৳ টেলিকম প্রযুক্তি বিষয়টি মূলত ণ্ণহাউ থিংস ওয়ার্ক'-এর ওয়েবসাইট থেকে উপলব্ধ৳ টেলিকম নীতির ধারাবাহিকতা বর্ণনা করা হয়েছে ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমের ওয়েবসাইটে পাওয়া আইন ও সংযোজনীর বয়ান থেকে৳ স্পেকট্রাম এবং ইউএএস লাইসেন্স বিলির কালপঞ্জি তৈরি করা হয়েছে মূলত জাস্টিস শিবরাজ পাতিলের রিপোর্ট থেকে (৩১ জানুয়ারি ২০১১)৳ কর্পোরেট কার্যকলাপের বিবরণ তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট থেকে৳ নীরা রাদিয়ার টেপের সারাংশ নিয়ে তৈরি ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের গোপন নথি পাওয়া গেছে http://indiasreport.com/magazine/data/the-radia-papers-raja-tata-ambani-connection-এই ওয়েবসাইটে৳ এছাড়া লেখাটি তৈরিতে আরও কিছু নথি ও সূত্র পড়া হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিএজি-র ২জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি বিষয়ে রিপোর্ট, সাংবাদিক গোপীকৃষ্ণনের ইন্টারনেট ডায়েরি, তহলকা ডট কমের ওয়েবসাইটে পাওয়া পিএসি রিপোর্ট (এপ্রিল ২০১১) এবং আউটলুক, ডেইলি পাইওনিয়ার প্রভৃতি মিডিয়ার ওয়েবসাইট৳


 

Comments