মন্থন সাময়িকী জুলাই আগস্ট ২০১১

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

লন্ডনে দাঙ্গা না বিদ্রোহ?

দুর্নীতির লজিক

নীতি-দুর্নীতির পাকেচক্রে

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

আইনি থেকে বেআইনি খনিজ উত্তোলন

দুর্নীতির অদৃশ্য লম্বা হাত

তিব্বতীদের চোখে চীন [২]

শ্যামলী খাস্তগীর স্মরণে


 


দুর্নীতির লজিক

দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়


গল্পটা ছিল অনেকটা এইরকম : এক রাজা ঠিক করলেন দুধের পুকুর বানাবেন, তবে সমবায় প্রথায়৳ সবাই মিলে বিশাল গর্ত কাটবে আর প্রজারা এসে অমাবস্যার রাত্তিরে ঐ গর্তে এক ঘটি করে দুধ ফেলে দিয়ে যাবে৳ চমৎকার বন্দোবস্ত৳

কিন্তু, পরদিন সক্কালে উঠে দেখা গেল দুধের পুকুর তৈরি হয়নি, হয়েছে জলেরই পুকুর৳ কেন? সব্বাই ভেবেছেন, তাঁর পাশের বাড়ির লোকটি ভালো লোক --- সে তো দুধ ফেলবেই, তাহলে আমি যদি এক ঘটি জল ফেলি, তাহলে কে আর টের পাবে?

সব্বার ভাবনাই যদি এমনটি হয়, দায়িত্বের ভার যদি প্রতিবেশীর হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে সমবেত চুক্তির আর কোনো মানে থাকে না --- এরকম দুধে-জলে জল মেশানোর পরিণামই বেড়ে যায়৳

এ অংকটা ছোটোবেলায় আমরা কষেছি, অনুপাতের অংক! দুই বিশ্ব এক হওয়ার আগে ছোটোবেলায় আমরা এরকম দুধ-জল মেশানোর আর একটা গপ্পো শুনেছিলুম৳ স্রেফ এনেকডোট্‌ বা কিস্‌সা যাকে বলে আর কি!

মার্কিনী সাহেবদের সাধ হল সোভিয়েত পড়াশোনার হাল জানার --- তাঁরা সোভিয়েত দেশের ইস্কুলে সদলবলে হাজির৳ তাঁরা দুধ-জলের অনুপাতের অংক কষতে দিলেন ক্লাসের বয়ঃসন্ধি পেরোনো ছাত্রছাত্রীদের৳ তা সোভিয়েত বাচ্চারা বলল, আমরা সবাই মিলে পরামর্শ করে কাজ করি৳ একটু আমাদের পরামর্শ করতে দিন৳ মার্কিনী সাহেবরা ভাবলেন, এটা হল কালেকশন-এর মতো টোকাটুকি নয় তো? বাচ্চারা তাদের আশ্বস্ত করল : এক এক দেশ-কালে এক-এক রকম রীতিরেওয়াজ চালু --- আজকের ভালো কালকের মন্দ বা উল্টো হতেই পারে৳ তা খানিক ক্ষণ পরে, তারা একটা উত্তর এনে হাজির করে৳ দুধে জল মেশানোর আঁকের উত্তর : পুলিশে ধরবে!

দুধ-জলের পুকুর বা অনুপাতের আঁকে আমরা একটা ব্যাপার এড়িয়ে যাচ্ছি কিন্তু! ব্যাপারটা গরু রচনাতেও অনুপস্থিত৳ মানুষকে নিরন্তর দুধের জোগান দিতে গিয়ে বেচারা গরু-বাছুরের কী হাল হয়? এ প্রশ্নটা করতেই আমরা বেমালুম ভুলে গেছি৳ অ-ন্যায় করেছি কি? গরু দুগ্ধদায়িনী তখনই হবে, যখন সে গর্ভধারণ করবে৳ কতবার গর্ভধারণ করবে? মানুষের ইচ্ছে-অনুযায়ী যতবার পারে, ততবার --- যতক্ষণ না এতবার গর্ভধারণের ফলে তার মৃত্যু হচ্ছে! আর বাছুর যে দুধ পেল না? না, নানান দুধের মিষ্টি, আইসক্রিম খেতে খেতে বা গুজরাতের সফল দুগ্ধ সমবায় প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করার সময় এসব তুশ্চু ব্যাপার আমাদের মনে থাকে না৳

ব্যাপারটা এবার একটু বড়ো করে ভাবা যাক্‌৳ প্রকৃতিতে কি এত্তো সম্পদ আছে যা আমরা এরকম ভাবে দোহন করে নিতে পারি? পৃথিবী গ্রহের ভাঁড়ার অফুরন্ত নয়৳ কিন্তু অর্থনীতিবিদ্‌ বলেন, এসবে না কি একমাত্র মানুষেরই স্বত্বাধিকার আছে! ব্যাপারটা সামলাতে প্রয়াত নিসর্গবিদ অনিল আগরওয়াল চমৎকার একটা ধারণা দিলেন, নৈসর্গিক স্বত্বাধিকার(Ecological Entitlement)৳ ব্যাপারটা খোলসা করে বলি৳ আমি ঈষৎ টেন্সিত, কেননা আমি জেনে গেছি পৃথিবীতে এত্তো সম্পদ নেই, অথচ মনের মধ্যে লোভ-লালসা রিপু চাগিয়ে উঠছে৳ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাড়াতেই হবে যেন-তেন-প্রকারেণ৳ তাই আমার পাশের জন আমার সহযোগী নয়, প্রতিযোগী! তৈরি হল অপর-হিংসে, ভালো কথায় মাৎসর্য৳ একে খতম করো৳ আর একটু আগ বাড়িয়ে ভাবলুম, যে সব আম জনতা আছে, তাদের খতম করি, ভাগিদার কমবে৳ তাই যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণেও আমার ঘাটতি নেই --- প্রতি মানুষের জন্য দুটো বুলেট আপাতত বরাদ্দ করলুম৳ এদিকে নিসর্গকে লুটে পুটে শুধু ছারখারই করলুম না --- একে এমন বদলে দিলুম যে প্রলয়কাল (গ্লোবাল ওয়ার্মিং যে মানুষের কারণেই হচ্ছে --- এ তো আপনারা জানেন!) উপস্থিত হল৳ আমিস্বয়ং তার থেকে ছাড় পাব কি?

টাকা-ঝাড়া, ঘুষ-নেওয়া ইত্যাদি আদতে রোগলক্ষণ বা symptom৳ এই নৈসর্গিক স্বত্বাধিকারের বাটোয়ারার ওপরেই কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে চলতি বাংলা/হিন্দি করাপশান (হা, হা --- এটা এখন ভারতীয় শব্দ!) কথাটা৳ কিন্তু, দার্শনিকরা (যাঁরা এখন প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতি!) প্রশ্ন তুলবেন, কাকে তোমরা প্রতিমান বা norm হিসেবে সাব্যস্ত করো? কোন প্রতিমান থেকে টস্‌কে গেলে সেটা অনৈতিক ক্রিয়া হয়? প্রতিমান তো দেশ-কালে বদলায়!

এত্তো শক্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার গুরুভার থেকে বাঁচার তাগিদে বা করাপশানের সংজ্ঞার্থ ঠিক করার কঠিন কাজ এড়াতে বরং একটা চুটকি বলি৳ তাহলে ঐ নৈসর্গিক স্বত্বাধিকার আর ব্যক্তিগত সম্পত্তি-পাপের খেইটা ধরা যাবে৳ এক রাজনৈতিক নেতা তাঁর নামে-বেনামে যত্ত সম্পত্তি দেশে বিদেশে আছে, তার একটা হিসেব কষতে বসলেন অডিটরকে সঙ্গে নিয়েই৳ অডিটর সম্পত্তি হিসেব করে বললেন, আপনার যা আছে স্যার, তাতে সাত-পুরুষ অনায়াসে চলে যাবে৳ অষ্টম-পুরুষের কী হবে, তা ভেবে ঐ নেতার হৃদয়-আক্রান্ত হয়, তিনি মুচ্ছো যান৳

নেতাটিকে যথেষ্ট দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন বলে মনে হচ্ছে৳ তিনি পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল৳ একজনের প্রতি দায়িত্বশীল হলে অন্যজনের প্রতি দায়িত্বশীল তিনি নাও হতে পারেন৳ কিন্তু নৈসর্গিক স্বত্বাধিকার আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির গাঁটছড়াটা তো বোঝা গেল, নাকি?

আজকাল গণমাধ্যমের দৌলতে নানান কেলেংকারির খবর পড়তে পড়তে বা দেখতে দেখতে খেয়াল করছি, আমাদের কমবেশি জানা এই ব্যাপারটায় তিনটে ঘটনা ঘটছে : (অ) ভ্রষ্টাচার/দুর্নীতির খবরের বাড়বাড়ন্ত৳ এটাকে আমরা বলব দুর্নীতি-খবরের প্রমুখন (foregrounding); (আ) একই সঙ্গে আবার দুর্নীতি-খবরের প্রমুখবন্ধ (foreclosure); (ই) এই সব খবর শুনে/দেখে বা না-শুনে-দেখে আমরা এবার দুধ পুকুর-বানানোর কিস্‌সা-মোতাবেক এসব ঘটনাকে যুক্তিসিদ্ধ করে নিই, পরিভাষায় বলব, Rationalization বা যৌক্তিকরণ৳

(অ) বিষয়ে বলা বাহুল্য৳ গণমাধ্যমে নানান কুচ্ছোর রসাস্বাদনে আমরা অভ্যস্ত ও আমাদের মগজ এসব ঘটনা গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে৳ এই অভ্যস্তকরণে এবার কাটছাঁটের খেলা চলে : রামদেবের খবরে আমরা যতটা বিচলিত, নিগমানন্দের খবরে নয়৳ আন্না হাজারে হিরো হওয়ার পর, এক ম্যানেজমেন্ট সংস্থা তাঁকে কোটি টাকার পুরস্কার দেয়৳ কেউ প্রশ্ন করেননি, এই ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ সংস্থা এই দেদার টাকা পাচ্ছেন কোথা থেকে? এর মধ্যে ম্যানেজমেন্ট শাস্ত্র-পড়ুয়ার বাবা-মাদের রক্তজল-করা এবং ধার-নেওয়া পয়সাকড়ি অসংগত-ভাবে ঢুকে নেই তো? তারপর ধরুন এই যে নারী-ভ্রূণ হত্যার হার বেড়ে গিয়ে নারী-পুং অনুপাতে ক্যাঁচাল বাধছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ধর্ষণ-সংখ্যা৳ এ নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা নেই৳ এ তো আমার-তোমার পাপ! এইসব আমাদের নিজেদের না-মোছা ইয়ের দিকে না তাকিয়ে রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির কথা কইছি বড্ডো বেশি৳ এখানেই সামনে (প্রমুখ) খুলছি এবং বন্ধ রাখছি৳ সমস্যাজনক প্রশ্ন হল : এই প্রমুখন ও প্রমুখবন্ধের ক্ষেত্রে আমার বা গণমাধ্যমের চয়নের রাজনীতি কী? কার দুর্নীতি বেশি বা কম আপেক্ষিক গুরুত্ব পাবে, তা আমরা হিসেব করি কী করে?

এই হিসেব করার ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা এখন একটা প্রবাদপ্রতিম বাক্য ব্যবহার করছি যৌক্তিকরণ-প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে --- এরকম তো কতই হয়৳ এক কেন্দ্রীয় স্বয়ংশাসিত বিদ্যে-প্রতিষ্ঠানের এক দীর্ঘদিন পদোন্নতি না-পাওয়া নিম্নবর্গীয় অধ্যাপকের ক্ষেত্রে আর এক উচ্চবর্গীয় অধ্যাপক যখন বলেন, তাতে কী হয়েছে, এরকম উদাহরণ আমাদের প্রতিষ্ঠানে ভুরি ভুরি আছে৳, তখন বুঝতে পারি (তথাকথিত) দুর্নীতির যৌক্তিকরণ কদ্দূর এগিয়েছে৳ আমরা দুর্নীতিতে অভ্যস্তই (habituated) শুধু হইনি, যৌক্তিকরণে অভ্যস্ত হয়ে গেছি৳ এবং নিজেও কচুগাছ কাটতে শুরু করেছি --- শুধু নিজের দিকে তাকিয়ে, নিজের আয়নায় নিজের মুখ দেখে বলিনি, আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে৳ নাহ্‌, এ গান এখন চলবে না, বরং অটোয় বসে শুনছি বাবা লোকনাথের গান, লিরিক মনে নেই, তবে মোদ্দা কথা হল, তুমি যতই পাপ করো না কেন, বাবা লোকনাথ আছেন সামলে দেবেন৳ এই প্রভুকে কলমা দিয়ে আত্ম-পাপমোচনের ভক্তিভর রাজনীতিতে প্রার্থনা শক্তি-নির্ভর : প্রভু নষ্ট হয়ে যাই৳ ভগবান খুন হয়ে গেছেন (নীৎসে বলেছিলেন বটে), কিন্তু প্রভুর পায়ে প্রাণমন সঁপে দিয়ে একটাই প্রেরণাবাক্য এখন : চালিয়ে যাও গুরু, তুমি মাল ঝাড়তে যদি না পারো, তবে তুমি আস্ত মেদা৳

মন-মুখ এক করতে হয় রে শালা৳, কয়েছিলেন এক পুরুতমশাই; কার্যগতিকে পোগতিশীল আধুনিক-আমি এই পুরুতমশাইকে যেমন বর্জন করেছি, তেমনি তাঁর কথাগুলোও তেমন মন দিয়ে শুনিনি অ-সেকুলার হয়ে যাবার ভয়ে৳ অথচ এই চাষাদের বুদ্ধিজীবী ঠাকুরমশাই বলেছিলেন, সবাই ভাবে তার ঘড়িটাই একমাত্তর ঠিকঠাক চলছে৳ তা আমি যে আমি, যে কিনা মনে করে তার নানান বিষয়ে ফান্ডা (ফান্ডামেন্টাল নলেজ) আছে, মৌলিক জ্ঞানে সে ফাটাফাটি, মূল সত্য এক্কারে বিজ্ঞানের দোর ধরে আবিষ্কার করে ফেলেছে, সে এত্তোগুলো মূল-মৌল-মৌলিকের ফান্ডা ফাটিয়েও কোনোমতেই ফান্ডামেন্টালিস্ট নয়৳ কালিভক্ত ঠাকুর ফান্ডামেন্টালিস্ট, তাঁর প্রধান শিষ্য নাকি হিঁদুয়ানির বিগ বস্‌৳ উনি মৌলবাদী, আমি নই --- আমার ঘড়ি ঠিকঠাক!

এঁদের নিয়ে আমার অবশ্যি তেমন মাথা ব্যথা নেই, কেননা বুর্জোয়াদের কালো হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবার জন্য আমি সদা প্রস্তুত, কালো টাকা সুইস ব্যাঙ্কে কীভাবে জমা হল তা নিয়ে আমার চূড়ান্ত মাথা ব্যথা এবং একই সঙ্গে কালো মানুষ এবং কালো মেয়ের জন্য দরদ উথলে উঠছে৳ সফেদ পরিসর থেকে আসা আলোকপর্বের জ্ঞানেয়ামি এতই দড় যে খারাপ কালো আর ভালো কালো আমার কাছে গুলিয়ে মুলিয়ে একাকার৳ মনে আছে ইডেনে নেলসন মান্ডেলার অনুষ্ঠান থেকে ফিরে আমার এক বন্ধু মায়ের কাছে ফর্সা মেয়ে বিয়ে করার জন্য আবদার করেছিল৳ তার অনেকদিন পরে এক জনসভায় তাকে একই সঙ্গে বলতে শুনেছিলুম, বুর্জোয়াদের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও এবং পশ্চিমবঙ্গে পুঁজির বিনিয়োগ নিতান্তই জরুরি ইস্যু৳ আবার সেই বাংলা আকাদেমির সভায় সওয়াল করেছে ইংরেজি ব্যাকরণের বিপক্ষে (ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রকল্পের সপক্ষে) আর প্রাথমিক থেকে বাংলা ব্যাকরণ পাঠের সপক্ষে৳ আবার তাকেই দেখেছি জাতপাতের বিজ্ঞাপনী পৈতে বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে বা শ্রাদ্ধশান্তির আচার-আচরণ পালন করতে ...

এইসব নানান প্যাঁচে, পাঠক নিশ্চিত সমঝে গেছেন আমাদের স/স্ব-পক্ষে বিপক্ষ ঢুকে গেছে শুধু তাই নয়, আমাদের অনেকগুলো ঠিকঠাক ঘড়ি আছে৳ এতগুলো ঘড়ি আমরা ঠিকঠাক সামলাতে পারি না বলে BT বা বেঙ্গল টাইম বলে একটা কথা চালু আছে৳

আরে, আমি বা আমার ঐ বন্ধুর মতো আকন্ঠ সাহেবি সফেদ জ্ঞান-সত্যে নিমজ্জ ব্যক্তির কথা তো তুশ্চু৳ স্বয়ং সি. ডি. রমন কী করেছেন? সূর্যগ্রহণের সময় যাবতীয় হিঁদু আচার-আচরণ তিনি যেমন পালন করতেন,তেমনি আবার সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক সত্য-টিও জানতেন৳ প্রশ্ন হল, এই দুই সি. ডি. রমনের মধ্যে সংলাপ চলত কী করে? একটা উত্তর দিয়েছেন দীপেশ চক্রবর্তী, এসব হল গিয়ে সফেদের আলোকপর্বী একবগ্‌গা বিজ্ঞানবাদের বিরুদ্ধে মেকলের বিষবৃক্ষের ফলেদের তীব্র প্রতিক্রিয়া! মনের মধ্যে নানান পার্টিশনস্‌ --- থাকবন্দি জ্ঞান ও তথ্য৳ এদের মধ্যে অন্তর্জাল রচনা করে প্রজ্ঞার প্রভায় তো পৌঁছতে পারিনি৳ তাই কাজে-কম্মে মানে থিওরি-প্র্যাক্টিসে সেতুবন্ধ করে উঠতে পারিনি৳

এ তো গেল জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু নমুনা৳ হাতে আংটি, গলায় পৈতে, হাতে তাগা তাবিজ পরে বস্তুবাদী বিজ্ঞানের সেবকদের সোচ্চার বক্তিমে৳ বুঝলুম না হয়, এইসব মানুষরা নানান কষ্টে আছেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস থেকে জ্ঞান ও কম্মে অমিল ঘটিয়ে ফেলেছেন৳ এই বিষয় নিয়ে জ্ঞানতত্ত্ব থেকে যদি রাজনীতিতে পাড়ি দিই, তাহলে যেসব উদাহরণ পেশ করতে হবে, তা আপনাদের সবারই জানা৳ তাত্ত্বিকরা বলেন (যেমন, রাসেল সাহেব) জ্ঞানতত্ত্ব আর নীতিশাস্ত্রে শাসন এক আধারে ঠাঁই পাবে না৳ বেশ কথা --- দুটো আলাদা ব্যাপার৳ এবার দেখছি বিশুদ্ধ জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাসেলভক্ত মানুষটি সামান্য চা-বিস্কুটের জন্য কন্‌টিনজেন্সি বিল বানিয়ে ফেলেছেন, যাতে ঐ জলখাবারের উল্লেখ পর্যন্ত নেই৳ তাঁর গুরু আবার সিয়া-এমআইটি যোগসাজসে সমাজসম্পর্কহীন সম্বচ্ছর মডেলস্‌ জোগান দেন৳ সেগুলো নিয়ে আমরা, এই এঁদো গলির বৈজ্ঞানিকরা, নানান তথ্য সাজিয়ে দিই৳ এসব তথ্য ঐ মডেলে খাপ খাইয়ে সফেদ পরিসরে পেশ করলে আমার পদোন্নতি হবে শুধু তাই নয়, দেশের হাঁড়ির খবরও চালান হবে সফেদ-পরিসরে৳

যাঁদের কথা কইলুম, তাঁরা দুর্নীতি নিয়ে অত্যন্ত সোচ্চার --- অথচ দ্বিচারি আচরণ করছেন ও পয়হা পেঁদাচ্ছেন৳ ব্যাপারটা কী? বেশি তাত্ত্বিক কথা না ভাটিয়ে বলেই দেওয়া যায়, এসব হল গিয়ে সুবিধেবাদী (অপার্চুনিস্ট) বন্দোবস্ত৳ যখন যে ঘড়ি দরকার, সেই ঘড়ি ব্যবহার করা --- একেই বলে কিনা রণ কৌশল! কীসের রণ কে জানে বাবা!

এত্তোগুলো ঘড়ি থাকার দরুন ব্যাপারটা ঠিক দ্বি-চারিতা বলে অবশ্য পার পাওয়া যাচ্ছে না৳ বরং বলি, n-চারিতা৳ n-আখরটি অংকশাস্ত্রে অসংখ্য-কে উপস্থাপিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়৳ n-চারিতার ক্ষেত্রে আমাদের একাধিক প্রতিমান (norms) ঘেঁটেঘুঁটে একাক্কার হয়ে যায়৳ কিন্তু কেন এমন হয়? স্বয়ং দুর্নীতি করি এবং লোকপাল বিলের ব্যাপারে হাজারেকে সমর্থন করে একটা সই দিয়েই পাপ-মুক্ত হই৳ কেন এই আত্মপ্রবঞ্চনা?

এমন প্রশ্নের উত্তর এর আগেই একটু আধটু দিয়ে দিয়েছি৳ কিন্তু, আর একটু ভালো করে বোঝার জন্য নিজেই ন্যাংটো হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যাই৳ অন্যকে দোষারোপ করার থেকে নিজের n-চারিতা বুঝে নেওয়া জরুরি৳ এই নিজেকে দেখা বোঝার আত্মানাং বিদ্ধি-র প্র্যাকটিসটা দীর্ঘদিন অবলুপ্ত৳ তবু ...

আমি অসংগঠিত শ্রমিকদের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত৳ এ নিয়ে আলোচনার দৌড় অবিশ্যি চায়ের কাপের ধোঁয়া বা ক্যালকাটা ক্লাবের ঠান্ডা ঘর৳ আমার বাড়ির ঝি থুড়ি কাজের মেয়ের ক্ষেত্রে আমি কী করি? আমার মাগ্‌গি ভাতা বাড়লে, তার মাগ্‌গি ভাতা বাড়াই না৳ তাঁর জন্য আমার মতো পে কমিশনও বসে না৳ বছর শেষে ইনক্রিমেন্টও হয় না৳ আমার বই বা জার্নাল-পেপারে তার নাম উল্লেখ করি না৳ অথচ তার সাহায্য ছাড়া আমি চলতে পারি না৳ একথাটা আবিষ্কার করে আর একটু মনের মধ্যে গর্ত খুঁড়লুম৳ দেখলুম, পাপের অন্ত নেই৳

এবং দেখলুম আমার নিজের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম যে প্রাথমিক দক্ষতা থাকা দরকার, তার ছিঁটেফোঁটাও আমার ইস্কুল-কলেজি শিক্ষা আমায় দেয়নি৳ এক, আমি আমার খাবার উৎপাদন করি না --- শিশু-বৃদ্ধ-অক্ষমদের জন্য তো নয়ই৳ আরও ক্যাঁচাল আমার বাঙালি-পুং হিসেবে --- নিদেনপক্ষে রান্নাও করতে পারি না! দুই, আমি আমার জামাকাপড় বানাতে পারি না; তিন, আমি ঘরামির কাজও করতে পারি না; চার, এইসব আবশ্যিক কাজ দৈনিক গড়পড়তা আড়াই ঘন্টায় সানন্দে সেরে নিয়ে, তারপর যৌথ নাচ নাচা বা সেতার বাজানো বা ক্ল্যাসিক পড়া ইত্যাদি আমার খুশি মোতাবেক কাজ করার ফুরসৎ-ই নেই আমার৳ বরং সে সময় গান্ধিয়ান স্টাডিজে একটা ঘ্যাম বক্তিমের খসড়া রচনা করি নাম-খ্যাতি-প্রতিপত্তির আশায়৳ বলা বাহুল্য, গান্ধি নিয়ে এমন রচনার মহড়ার সময় আমার আবার স্কচ্‌ ও বিড়ির অনুষঙ্গ না থাকলে চলে না৳ এসময় বেমালুম ভুলে যাই, আমি গান্ধিকে আর একবার খুন করছি৳

এইরকম একটা বাঁকে এসে বুঝে গেলুম, আমি হতভাগা একটা প্যারাসাইট বা পরজীবী৳ প্রচুর মানুষ বাড়তি শ্রম দিয়ে আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে; তাঁদের রক্ত-ঘাম-ক্লেদ আমার n-চারি ফুটানির উৎসমুখ এবং এই বাড়তি শ্রম-ঝাড়া আর পুলিশ-মিলিটারি দিয়ে আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি সংরক্ষণ আমার যাবতীয় দুর্নীতির (কচুগাছ কাটা থেকে ডাকাত হওয়া পর্যন্ত) মোদ্দা কারণ৳ আর আমার যাপন? সে তো নিসর্গকে ধ্বংস করেই; কেননা আমি যে ঘ্যাম জীবনযাপন করি, তা যদি এই গ্রহের সব মানুষকে সমানভাবে দিতে হয়, তাহলে পৃথিবীর মতো আরও চোদ্দোটা গ্রহে উপনিবেশ বানাতে হবে৳ এসব গোপন কথা ঢাকতে চাই বলেই সুবিধেবাদী n-চারিতা আমার স্বভাবসিদ্ধ হয়ে গেছে৳ আমার মতো ন্যাজামুড়োধারীর এত্তো ঘড়ি দেখে আমজনতার সবকিছু গুলিয়ে যায়৳ আমাদের অতীব নীতিপরায়ণ শিক্ষেব্যবস্থা এটাই চায়৳ আমার বাথরুমে দুর্গন্ধ, ফিনাইল দিয়ে ঢাকি৳ ফিনাইলের ব্র্যান্ড নেম : n-চারিতা৳ আমার এই কনফেশনে বুকে বড়ো ব্যথা হল, পেইন কিলার খাব৳ সুগন্ধি ফিনাইলে নোংরার গন্ধ যায়, নোংরা যায় না, পেইনকীলারে যেমন পেইনের এন্তেকাল নেই --- তেমনই! তাহলে কিং কর্তব্যম্‌? আমার বিচার যে তুমি করবে, সেই তুমিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আমার ভেতরে-বাইরে কোত্থাও না! আমার n-চারিতায় তুমি আমার আমিতে লীন হয়ে নেই৳ শেষ পর্যন্ত কি তবে হৃদয় জুড়োবে মর্গে?

সংযোজন : ন্যাশানাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত বছর পাঁচেক পশ্চিমবঙ্গ চল্লিশ-না পেরোনোদের মধ্যে আত্মহত্যার হারে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে৳ n-চারিরা বাঁচার স্ট্রেস্‌ সহ্য করতে পারছেন না৳

 

Comments