মন্থন সাময়িকী জুলাই আগস্ট ২০১১

হোম পেজ

সম্পাদকীয়

লন্ডনে দাঙ্গা না বিদ্রোহ?

দুর্নীতির লজিক

নীতি-দুর্নীতির পাকেচক্রে

টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা

আইনি থেকে বেআইনি খনিজ উত্তোলন

দুর্নীতির অদৃশ্য লম্বা হাত

তিব্বতীদের চোখে চীন [২]

শ্যামলী খাস্তগীর স্মরণে


 

লন্ডনে দাঙ্গা না বিদ্রোহ?

একটি সাক্ষাৎকার

ডেমোক্রেসি নাও টিভি চ্যানেলের পক্ষে ১০ আগস্ট ২০১১ অ্যামি গুডম্যান-এর সঙ্গে লন্ডন থেকে ডার্কাস হাওই ও রিচার্ড সেমোর-এর কিছু কথাবার্তা হয়। ৯ আগস্ট বিবিসি নিউজ-এর পক্ষ থেকে ফিওনা আর্মস্ট্রং ডার্কাস হাউইয়ের এক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে ডার্কাস হাউইয়ের স্পষ্ট বক্তব্যে ভীত হয়ে বিবিসি তার সম্প্রচার বন্ধ রাখে। কিন্তু সেই সাক্ষাৎকার ইউটিউব-এর মাধ্যমে সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ ইন্টারনেট শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। নিন্দার ঝড় বয়ে যায় বিবিসির সাংবাদিকের প্রতি। অবশেষে বিবিসি ডার্কাস হাউইয়ের প্রতি দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে ১০ আগস্ট বিবৃতি দেয়।

প্রসঙ্গত, লন্ডন এবং ইংল্যান্ডের শহরগুলির ঘটনাবলীর একটি যথাযথ বিবরণ জনপ্রিয় মিডিয়াতে পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গেছে, তা হল সংবাদের নামে কিছু বাগাড়ম্বর এবং চটজলদি গতানুগতিক কিছু সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। এই ঘটনাবলীর এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ এবং অনুভূতির কথা জানতে ডার্কাস হাওই এবং রিচার্ড সেমোরের সঙ্গে ডেমোক্রেসি নাও-এর কথাবার্তা আমরা এখানে প্রকাশ করছি। এটি বাংলায় তর্জমা করেছেন তমাল ভৌমিক। বিষয়টি অনুধাবন করার জন্য পত্রিকার পক্ষ থেকে পাদটীকা সংযোজন করা হল। সূত্র : উইকিপিডিয়া।


অ্যামি গুডম্যান : এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে পুলিশ গুলি করে মারার প্রতিবাদে শনিবার যে বিক্ষোভ ফেটে পড়ে, তা এখন সারা ব্রিটেনে ছড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের সন্দেহ, ওই যুবক এক গুন্ডাদলের সদস্য। বিক্ষুব্ধ জনতা ম্যানচেস্টার, স্যাফোর্ড, লিভারপুল, নটিংহাম ও বার্মিংহামে পুলিশ স্টেশন এবং দোকানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

সেসময় ইতালিতে ছুটি কাটাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন। কয়েকদিন অপেক্ষা করার পর তিনি তড়িঘড়ি ফিরে এসে পার্লামেন্টের সদস্যদের ডেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলেছেন। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তার অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছে, সম্পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করে এবং প্রয়োজনে প্লাস্টিকের বুলেট ছুঁড়ে দাঙ্গা থামাও। লন্ডনে গতকাল ১৬,০০০ পুলিশ রাস্তায় নেমেছিল। ব্রিটেনের রাজধানীর ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি আগে কখনও দেখা যায়নি।

ইতিমধ্যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কমপ্লেন্ট কমিশন[1] আইপিসিসি অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছে যে মার্ক দুগান নামে ২৯ বছর বয়সি যে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের মৃত্যুতে এই দাঙ্গার শুরু, তার ওপর পুলিশ গুলি চালানোর আগে সে কোনোরকম গুলি চালায়নি।         

র‍্যাচেল সেরফোন্টাইন : এ বিষয়ে একটা অন্যতম প্রধান ঘটনা আমি বলতে পারিফরেন্সিক সায়েন্স সার্ভিস পরীক্ষা করে জানিয়েছে যে, এমপিএস (লন্ডনের মেট্রোপলিটান পুলিশ সার্ভিস) পুলিশের রেডিওতে যে গুলির দাগ দেখানো হয়েছে, তা জ্যাকেটবৃত গুলির ছিদ্র। এই ধরনের গুলি পুলিশই ব্যবহার করে। এই বিষয়ে ডিএনএ পরীক্ষা বাকি আছে। তবে অবশ্যই এই গুলি চালানো হয়েছে এমপিএস হেকলার কচ এমপিফাইভ নামক আগ্নেয়াস্ত্র থেকে।

অ্যামি গুডম্যান : মার্ক দুগানের পরিবারের এক সদস্য জানিয়েছেন, তার মৃত্যু যে দাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তার জন্য তাঁরা দুঃখিত। ইনকোয়েস্ট নামক মানবাধিকার গোষ্ঠীর কর্মী হেলেন শ জানাচ্ছেন, দুগানের আত্মীয়রা এইরকম বিক্ষোভে পীড়িত বোধ করছে।   

দুগানের পরিবারের সদস্যরা জানাতে চায় যে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মার্কের হত্যার কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারা সকলকে একথাও জানাতে চায়, এই বিশৃঙ্খলার ফলে দেশ জুড়ে বিভিন্ন অংশের মানুষ যে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে, তাতে তারা খুবই পীড়িত বোধ করছে। --- হেলেন শ

অ্যামি গুডম্যান : দুগানের মৃত্যুর সঙ্গে এই বিক্ষোভকে জড়াতে চান না ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ। তাঁর মতে এই বিশৃঙ্খলা অকারণ, কিছু সুবিধাবাদী চুরি ও হিংস্রতা। এর বেশি কিছু নয়, কমও নয়।

যাই হোক, বিক্ষোভের আজ চতুর্থ দিন। লন্ডনে ৭৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ম্যানচেস্টার ও স্যাফোর্ডে কম করে ৫০ জন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা বাড়ি ও গাড়িতে আগুন লাগাচ্ছিল। ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আমরা লন্ডনে যাই। সেখানে যোগাযোগ করি ডার্কাস হাউই-এর সঙ্গে। তিনি বেতার ও টিভির একজন বার্তাবাহক এবং সংবাদপত্রের বিভাগীয় লেখক। থাকেন দক্ষিণ লন্ডনের ব্রিক্সটনে। তিনি টিভিতেও কাজ করেছেন। এঁর একটা বিখ্যাত কাজ হল হোয়াইট ট্রাইব, যেখানে তিনি ব্রিটেনের অ্যাংলো-স্যাক্সনদের অবস্থা তুলে ধরেছেন। ১৯৮১ সালে নিউ ক্রস ফায়ার[2] তদন্তে ১৩ জন কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরের মৃত্যুর জন্য পুলিশের কর্তব্যে অবহেলা ও অদক্ষতাকে দায়ী করা হয়। এর প্রতিবাদে হাউই কুড়ি হাজার কালো মানুষের এক মিছিল সংগঠিত করেছিলেন।

এছাড়াও, আমরা লন্ডনে যোগাযোগ করি ব্রিটেনের জনপ্রিয় ব্লগার রিচার্ড সেমোরের সঙ্গে। এঁর ব্লগের নাম লেনিনস টম্ব। এছাড়া, তাঁর দুটি বিখ্যাত লেখা হল, দ্য লিবারেল ডিফেন্স অফ মার্ডার এবং দ্য মিনিং অফ ডেভিড ক্যামেরন

প্রথমে ডার্কাস হাউই-কে প্রশ্ন করি, আপনাদের দেশে এখন ঠিক কী ঘটছে? ব্রিটেনের অবস্থাটা বলুন।

ডার্কাস হাউই : এটা একটা গণবিদ্রোহ। আর আমি কোনো দাঙ্গা সম্পর্কে বলছি না। আমি গণবিদ্রোহ সম্পর্কে বলছি, যা সমাজের গভীর থেকে উঠে এসেছে, কালো ও সাদা যুবকদের সামগ্রিক চেতনা থেকে। অবশ্যই কালোদের সংখ্যা বেশি। তাদের যখন তখন বিনা কারণে যেখানে সেখানে দাঁড় করিয়ে পুলিশ তল্লাশি করে। এর জন্য ওরা আইনও পাল্টে নিয়েছে। আগে এরকম তল্লাশি চালাতে হলে একটা অভিযোগ খাড়া করতে হত, যেমন --- এই তুমি ওরকমভাবে তাকিয়েছ, বা হেন-তেন করেছ, কোনো মহিলাকে ধাক্কা দিয়েছ, বা কারও ব্যাগে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছ। এখন সন্ত্রাসবাদ বিরোধী নতুন আইনের সাহায্যে যেখানে সেখানে যখন তখন পুলিশ তল্লাশি চালাতে পারে। আগের মতো কোনো অভিযোগও খাড়া করতে হয় না। আমার নাতির বয়স ১৪ বছর। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি, নাথান, তোমায় কতবার ওরকম দাঁড় করিয়ে তল্লাশি করা হয়েছে। সে বলেছে, দাদু, সে যে কতবার, আমি গুনেও তোমায় বলতে পারব না। এই ক্রোধ তলায় তলায় ফুঁসছিল। কারণ শতসহস্র তরুণ কিশোরের একই রকম তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারা তো একই সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই মার্ক দুগান খুন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই তার সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করল। জীবন মানে কী আর কী নয়, সেটা সবার মনেই ছিল।      

        দ্বিতীয় বাস্তব ঘটনা হল, ওদের এখন ছুটি চলছে। স্কুলের বর্ষ শেষ। আর, আপনাদের কৈশোরের কথা মনে করুন, ক্লাসরুমে যে আটকা থাকে তার মনটা বাইরে বেরোনোর জন্য আনচান করে। বাইরে বেরোলেই মুক্তি --- আহা, প্রাণের মুক্তি। শ্বাস ছেড়ে হা হা করে হাসা যায়, স্কুল নেই, বাঁদরের খাটনি নেই। এই একটা সময় বটে। আমার মনে হয়, জানুয়ারি বা অক্টোবরের মাঝামাঝি হলে এমনটা ঘটত না। এখন গ্রীষ্মের উষ্ণতা। কিছু কিছু রাত সত্যি বেশ গরম।

        আর এসময় মার্ক দুগান প্রাণ হারাল। অপারেশন ট্রাইডেন্ট[3]-এর নাম এবং সেই অপারেশনের কথা আমরা অনেকদিন ধরে জানি। ওরা খুনের তদন্ত করতে আসত আর তা বেশ বুদ্ধি খাটিয়েই করত। আমি খোলা মনেই বলছি, ওদের তদন্তকারী দলটা আগে বেশ ভালো ছিল। কিন্তু এখন মেট্রোপলিটান পুলিশের সব কিছুই পাল্টে গেছে। সম্ভবত যুক্তরাজ্যে এখন এটা সবচেয়ে লজ্জাজনক সংগঠন। এদের কোনো পরিচালক নেই, কোনো ডেপুটি কমিশনার বা কমিশনার নেই। ফলে এই ধরনের বিশেষ অপারেশন, যার নাম রেজরব্যাক বা ট্রাইডেন্ট অপারেশন, সব পুলিশই সেসবের মাথা। এরা সব জায়গাতে গিয়েই ওস্তাদি দেখাচ্ছে, এদের উদ্দেশ্য কর্তৃপক্ষের নজরে আসা এবং ডেপুটির মতো নানা উঁচু পদে ওঠা। আর সেইজন্য ওরা টোটেনহামে গিয়েছিল, যেখানে প্রথম বিস্ফোরণের ঘটনাটা ঘটে। সেখানকার আঞ্চলিক কমান্ডারকে কোনো খবর না দিয়েই ওরা গিয়েছিল। ওদের সঙ্গে ছিল গ্লক হেকলার পিস্তলের মতো মারাত্মক অস্ত্র। ওর চেয়ে প্রাণঘাতী অস্ত্র আর হয় না। ওরা প্রকাশ্যে ঝকঝকে দিনের আলোয় দুগানের বুক ফুঁড়ে দিল। এতদিন ওরা বলছিল, দুগানের কাছেও পিস্তল ছিল। আর এখন বলছে, তা নয়, আমরা কিছুই জানি না।

        যখন ওর পরিবারের লোকজন পুলিশ স্টেশনে গিয়ে জানতে চাইল, তখন ওখানকার কমান্ডার ওদের সঙ্গে কথা বলেননি। কারণ তিনি তখন ব্যস্ত ছিলেন অকুস্থলে যে পুলিশেরা উপস্থিত ছিল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যাপারটাকে ঘেঁটে দিতে। কেউই কিছু জানতে পারল না। ওরা ওদের কাজ করে চলে গেল। এই হচ্ছে মেট্রোপলিটান পুলিশের অবক্ষয়ী চেহারা। ওদের শুধু প্রতিযোগিতা --- কে কমিশনার হবে, কে ডেপুটি কমিশনার হবে। প্রত্যেকেই ওরা চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেবে আর বুক বাজিয়ে বলবে, আমিই উঁচু পদে বসার যোগ্য। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মানসিকতাই এখন এরকম।

অ্যামি গুডম্যান : আমি এখন আমাদের আলোচনায় রিচার্ড সেমোরকে অংশ নিতে আহ্বান করছি।

ডার্কাস হাউই : হ্যাঁ, ঠিক আছে।

অ্যামি গুডম্যান : আমি রিচার্ডকে বলছি, একদম শুরুর আলোচনায় চলে যাওয়ার জন্য। অর্থাৎ ২৯ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ যুবক মার্ক দুগানের[4] হত্যার ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বোঝা দরকার। রিচার্ড, আপনি তো এ বিষয়ে লিখেছিলেন। পুলিশ প্রথমে কী বলেছিল? কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন তারা কী বলছে, যাতে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে? আপনি এ বিষয়ে বলুন।      

রিচার্ড সেমোর : হ্যাঁ, হত্যার প্রেক্ষাপট ওরা এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে জনসাধারণ বিশ্বাস করে যে মার্ক দুগানের কাছে অস্ত্র ছিল, সেই অস্ত্র থেকে সে পুলিশের ওপর গুলি ছুঁড়েছিল। অতএব সবাই ধরে নেবে যে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালিয়েছে। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আইপিসিসি এটা নিশ্চিতভাবে জানিয়েছে, গুলি যেটা ছোঁড়া হয়েছিল এবং যা পুলিশের রেডিওতে আঘাত করেছে, সেটা পুলিশেরই বুলেট। অতএব এটা একটা কৌতূহল-উদ্দীপক প্রশ্ন যে কে গুলি ছুঁড়েছিল এবং কেন ছুঁড়েছিল? পুলিশ অফিসারদের মধ্যে কে এটা করেছে? কিন্তু দুগান অবশ্যই গুলি ছোঁড়েনি। অতএব ওরা মিথ্যা বলেছে।

        এর পাশাপাশি, ওরা দুগানের পরিবারকে কিছু জানায়নি। মিডিয়া মারফত পরিবার ঘটনাটা জেনে যাক, এরকমভাবেই বিষয়টাকে ফেলে রাখা হয়েছিল। দুগানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কোনো অফিসারকে ওরা পাঠায়নি। এরকম এক অস্বাভাবিক ঘটনায় যেসব সাধারণ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, তার কোনোটাই ওরা নেয়নি। সাধারণভাবে এটা বলাই যায় যে এর ফলে পুলিশের বিরুদ্ধে একটা প্রতিক্রিয়া থেকেই এই প্রত্যাঘাতের সূচনা।

        আরেকটা কথাও আমি বলতে চাই। মেট্রোপলিটান পুলিশের প্রতিযোগিতার বিষয়ে ডার্কাস যা বলেছেন, সেই প্রসঙ্গে। এখানে পরিপ্রেক্ষিতটা গুরুত্বপূর্ণ। নিউজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড নামে নিউজ ইন্টারন্যাশনাল-এর যে সাম্রাজ্য, তার সঙ্গে মেট্রোপলিটান পুলিশের ওপরমহলের কর্তাদের সম্পর্ক নিয়ে এক কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে গেছে। এর ফলে পুলিশ বাহিনীতে এক গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটের নানা চেহারার মধ্যে নৈতিক সংকটও বিরাটভাবে আছে। আর এর জন্যই এই মুহূর্তে এদের মধ্যে এত বেশি বিশৃঙ্খলা। এটা আরও বাড়বে। এদের হাতে আজকেই নতুন অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে। ডেভিড ক্যামেরন পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে, দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে জলকামান ব্যবহার করো। এটা এই দেশে প্রথম।  

অ্যামি গুডম্যান : একটু বুঝে নিই, ওটা আপনি [রুপার্ট] মার্ডকের[5] কেলেঙ্কারি নিয়ে বলছেন ---

রিচার্ড সেমোর : হ্যাঁ।

অ্যামি গুডম্যান : আপনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের উঁচু কর্তাব্যক্তিদের কেলেঙ্কারির কথা বললেন। এবার মার্ক দুগানকে হত্যার দিন পুলিশ স্টেশনে রাতে যে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছিল, সে বিষয়ে কিছু বলবেন?

রিচার্ড সেমোর : হ্যাঁ। পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে কিছুটা উসকে দেওয়ার আগে পর্যন্ত প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল। যা জানি, এই প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিয়েছিল স্থানীয় জনসমাজের সমাজকর্মীরা। তারা জবাব চাইছিল, পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল। কিন্তু পুলিশ কোনো জবাব দিচ্ছিল না, একটা ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরি করছিল। এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে জানা যাচ্ছে, প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে যখন ষোলো বছরের এক প্রতিবাদী মেয়েকে পুলিশ আক্রমণ করে। দাঙ্গারোধকারী পুলিশ বাহিনী যেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল, সেই লাইনের সামনে গিয়ে মেয়েটা চেঁচিয়ে জবাব চায়। পুলিশেরা মেয়েটাকে লাঠি ও ঢাল দিয়ে পেটায়। সেই দৃশ্যের কিছুটা আপনারা টিভিতেও দেখে থাকবেন। তাতে দেখা যায়, মেয়েটা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে আর তাকে প্রচণ্ডভাবে লাথি মারছে কয়েকজন পুলিশ। আরও কয়েকজন নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী এই ঘটনাটার সাক্ষ্য দিয়েছে। সুতরাং আমি বলব যে পুলিশ ওই পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজক করার পক্ষে যথেষ্টর চেয়েও বেশি পরিমাণে উস্কানি দিয়েছে। অতএব এই প্রশ্ন উঠবেই, যে পুলিশ উস্কানি দিয়ে সমস্যা বাড়ায়, সেই পুলিশ সমস্যার সমাধান করবে কীভাবে?

[বিরতি] লিনটন কুরেসি জনসন ডার্কাস হাউইয়ের উদ্দেশ্যে ম্যান ফ্রি নামে একটা গান করেন।

অ্যামি গুডম্যান : ম্যান ফ্রি গানটা আমাদের অতিথি ডার্কাস হাউইয়ের জন্য। ডার্কাস বলুন, গানটা কেমন? আর ব্রিক্সটনে আপনাদের সমাজের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন। বলুন, আজকে যা ঘটে চলেছে, যখন সারা ব্রিটেনে এক হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ওই ইতিহাসের সঙ্গে তা কতটা খাপ খায়?

ডার্কাস হাউই : ১৯৮১ সালে ব্রিক্সটনে যা ঘটেছিল, আজকের ঘটনা যেন ঠিক তার পুনরাবৃত্তি। ওরা প্রত্যেককে থামিয়ে তল্লাশি করছিল আর মারছিল। ওটার নাম ছিল অপারেশন সোয়াম্প, মানে প্লাবিত করা বা ডুবিয়ে দেওয়া। ওরা সত্যিই আমাদের সমাজটাকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। চলাফেরা করতে সক্ষম কোনো পুরুষ যদি কালো হয়, তাকেই ওরা ধরছিল। কালো আর সাদাদের মধ্যে পরিষ্কার তফাত টানা হয়েছিল। ফলে বিস্ফোরণটা ঘটেছিল। জায়গাটা আমার বাড়ি থেকে চল্লিশ গজ তফাতে হবে। আমি ছিলাম দ্য জার্নাল পত্রিকার সম্পাদক। তার হপ্তাখানেক আগে আমি কুড়ি হাজার কালো মানুষের একটা মিছিলে নেতৃত্বও দিয়েছিলাম। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, চলো আমরা রাস্তার ওপাশে আমাদের অফিসে গিয়ে বসি। ভেবেছিলাম সেটাই ভালো হবে। আমার অফিসের সামনে একসারি পুলিশ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তারা আমায় জিজ্ঞেস করল, দাঙ্গার সময় আপনি কোথায় ছিলেন? আমি বললাম, পুলিশকেই জিজ্ঞেস করুন। আমি কোথায় কখন ছিলাম, সে খবর তো বটেই, এমনকী আমি ফোনে কাকে কী বলেছি সবই পুলিশের কাছে রেকর্ড করা আছে।

এবারেও ঘটনায় একটা স্বতঃস্ফূর্ততা আছে। কিন্তু সবসময়ের মতো এবারেও একইরকম দুর্বলতা আছে প্রেস ও সংবাদ-পরিবেশকদের। ওদের কাছে খবর আসে, ঠিক যেমন রাত্রিবেলায় ঘরে চোর আসে তেমনভাবে। কারণ ওদের কারবার কেবল কী ঘটে গেছে তাই নিয়ে। কী ঘটতে পারে বা আনুমানিক সত্য নিয়ে নয়। অতএব ওরা সবসময়ই অবাক হয়ে যায়। আর যখনই ওরা অবাক হয়ে যায়, তখনই ওরা নিজেদের ঘাটতিকে ঢাকা দেওয়ার জন্য কিছু লোককে দোষী হিসেবে খুঁজে নেয়। যখনই ওরা অবাক হয়, তখনই ঘটনার পিছনে কিছু লোকের ষড়যন্ত্রের একটা ছক ওরা তৈরি করে নেয়। আমি জানি না ওরা মঙ্গলগ্রহ থেকে নাকি অন্য কোথা থেকে আসে। আসলে এটা একটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।

এখন ব্রিক্সটনের পর দাঙ্গা পাক খেয়ে বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার হয়ে লিড্‌স, ব্রাডফোর্ড সর্বত্র পৌঁছে গেছে। দক্ষিণের সাইরেনসেস্টার বলে একটা জায়গা, যে জায়গাটা সম্পর্কে আমি কিছু জানি না, সেটাও দাঙ্গা কবলিত হয়ে পড়েছে। ওই জায়গাটা গ্লসেস্টারশায়ার অঞ্চলে, কিন্তু সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ থাকে কিনা আমি জানি না। সব মিলে দাঙ্গার সর্পিল গতি আবার সেই ১৯৮১-র পথ ধরেই এগোচ্ছে।  

অ্যামি গুডম্যান : ডার্কাস, এই জনসমাজগুলোর মধ্যে কি কোনো মিল  রয়েছে?      

ডার্কাস হাউই : আদৌ কোনো তফাত নেই। বিদ্রোহ আর লুটতরাজ কোনোটাতেই এতটুকু তফাত নেই। আমার মনে হয়, স্কুলগুলো ছুটি থাকায় এখন লুটতরাজ কিছু বেশি হচ্ছে। তরুণদের ব্যাপারে একটা বিষয় আমি বুঝি। কারণ আমিও একসময় তরুণ ছিলাম। আমিও তখনকার উঠতি ফ্যাশনের জিনিস খুব পছন্দ করতাম, সেগুলো না পেলে আমার মেয়ে বন্ধুও জুটবে না। তরুণদের মনোভাব এমনই। ভালো প্যান্ট-জুতো চাই।

অ্যামি গুডম্যান : ডার্কাস, লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানতে চাই। বরিস মঙ্গলবার দক্ষিণ লন্ডনের ক্ল্যাপহামের রাস্তায় ঝাঁটা হাতে হেঁটেছেন। ওই এলাকাটা সবচেয়ে বেশি দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকার মধ্যে একটা। ওখানকার বাসিন্দারা সেদিন পথ পরিষ্কারের কর্মসূচি নিয়েছিল। যারা এই বিক্ষোভকে সমর্থন করছে, মেয়র বরিস ওখানে তাদের সমালোচনা করেছেন।

জনসাধারণের সম্পত্তি ধ্বংস করা ও অপরাধমূলক কাজের পিছনে গভীর সামাজিক কারণ আছে --- এই ধরনের নির্বোধ কথাবার্তা শোনা আমাদের এখনই বন্ধ করা উচিত। মানুষের নানারকম ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু তার জন্য কারও দোকান ভাঙচুর করা, জীবিকার ক্ষতি করা, চাকরি খেয়ে নেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। এটা সঠিক আচরণ নয়। এই পথে শহরের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন হতে পারে না। --- মেয়র বরিস জনসন

অ্যামি গুডম্যান : এই হচ্ছে লন্ডনের মেয়রের বক্তব্য। ডার্কাস হাউই, আপনি কি এই বিক্ষোভকে নিন্দা করেন? যে দাঙ্গা এই মুহূর্তে ব্রিটেনের দরিদ্রতম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই একাংশের ব্যাবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি করছে এবং তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাকে কি আপনি নিন্দা করছেন?

ডার্কাস হাউই : ইতিহাসের একটা কোনো পর্যায়ে কালো আমেরিকানদের ক্রোধের কথা আমেরিকানরা মনে রাখবে। শিকাগোয় প্রত্যেকদিন যখন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছিল, র‍্যাপ ব্রাউন সেই বিস্ফোরণকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, জ্বাল বেবি, জ্বাল শ্লোগান দিয়ে। তাঁর এই শ্লোগানকে সমর্থন জানিয়েছিল সমস্ত প্রগতিপন্থী বা বিপ্লববাদী শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গরা। এর একটা কারণ ছিল।

        দ্বিতীয়ত, এখানে এরা এখন খুব গরিব। আমি কখনও এখনকার মতো এত গরিব যুবসমাজ দেখিনি। এদের মাঝখান দিয়ে তুষারপাতের মতো বয়ে চলেছে অজস্র বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনে সব নামজাদা লোকেরা অত্যাধুনিক জুতো-জামা পরে আর মাথায় ছোট্ট টুপি লাগিয়ে চারদিকে নেচে বেড়াচ্ছে। আর এই ছেলেমেয়েগুলোর ওসব কেনার পয়সা নেই। ওরা দোকানের শো-কেস ভেঙে ওইসব চুরি করছে।

আমি ইংরেজ সরকারের গীর্জার খ্রিস্টান অনুগামী নই। আমার বাবা তা ছিলেন। আমি ঈশ্বরের দশটি আদেশ টেন কমান্ডমেন্ট্‌স সঙ্গে নিয়ে ঘুরি না। কোনো উপজাতির ইতিহাসে, কোনো দেশের ইতিহাসে, কোনো শহরের ভিতরকার শহরের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মুহূর্তে সেগুলোকে কাজে লাগাই না। এরা চুরি করেছে এবং এটা চুরি। যখন ওদের হাউজ অফ লর্ডসের একগুচ্ছ পার্লামেন্ট সদস্য চুরি করে জেলে যায়, তখন আমি কোনো হৈচৈ করি না। ওদের মধ্যে অনেকে চোর বলে আমি গণতন্ত্র সম্পর্কে কোনো কটুকাটব্য করি না। অতএব বরিসের লোকেদের এত কলঙ্ক, কারণ আমরা তো সবাই তাঁর নাগরিক। কিন্তু তুমি শুধু একজনের দিকে তাকাবে এবং তাদের ব্যাপারে একটা বিশেষ সুরে কথা বলবে। কিন্তু বরিস হচ্ছে বরিস।

অ্যামি গুডম্যান : লন্ডনের মেয়র।

ডার্কাস হাউই : খুবই উচ্চশিক্ষিত মানুষ, তিনি গ্রিক সভ্যতা খুব ভালোবাসেন এবং সেই সভ্যতার সব কিছুই খুব ভালোবাসেন। কিন্তু বরিসের তো আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কারণ পরের বছর অলিম্পিকের আসর বসবে লন্ডন শহরের ভিতরেই।

অ্যামি গুডম্যান : এবার আমি রিচার্ড সেমোরকে বলব দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় ক্যারোলিন ডেভিসের লেখা সম্পর্কে কিছু বলতে। ক্যারোলিন লিখেছেন, গত এগারো বছরে পুলিশ হেফাজতে বা হেফাজত থেকে বেরিয়েই ৩৩৩ জন মারা গেছে। কিন্তু কোনো পুলিশ অফিসারের এতটুকু শাস্তি হয়নি। এটা সরকারি হিসেব। অন্য একটি সমীক্ষায় বলেছে, ১৩ জন অফিসারের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলা বা দুর্ব্যবহারের জোরালো সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করা সত্ত্বেও তাদের একজনও দোষী সাব্যস্ত হয়নি। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগারো বছরে ৩৩৩ জন মানে মাসে দুজনেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে পুলিশি হেফাজতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। রিচার্ডের মতে এর তাৎপর্য কী? 

রিচার্ড সেমোর : হ্যাঁ। আমি বলব। প্রথমত, গত এক প্রজন্ম ধরে পুলিশ ও কালো মানুষদের মধ্যে বিরোধ দূর করার কিছু প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও ব্রিটেনে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য রয়ে গেছে। লরেন্স তদন্ত-এ এই সত্য উদ্ঘাটন হলেও এই বর্ণবৈষম্য দূর করার জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর ফলেই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকদের দাঁড় করিয়ে যখন তখন তল্লাশি, হেনস্থা, হিংস্রতা এবং পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

        তবে শুধু পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বললেই চলবে না। পুলিশি হেফাজতের বাইরেও কতকগুলো জঘন্য মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যেমন, জি২০ মহাসম্মেলনে প্রতিবাদের সময় ইয়ান টমলিনসনের মৃত্যু এবং শিল্পী স্মাইলি কালচারের মৃত্যু। পুলিশের বক্তব্য হল, স্মাইলির বাড়িতে ড্রাগ বা নেশার জিনিসের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালাতে গেলে স্মাইলি নিজেই তাঁর রান্নাঘরে নিজেকে ছুরি মারেন। আমার মনে হয় না কেউ একথা বিশ্বাস করবে। কিন্তু এর প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ উপায়েই এলাকার বাসিন্দারা বেশ বড়ো আকারের বিক্ষোভ দেখায়। সত্যি বলতে কি, এসব ঘটনাগুলোকে মিডিয়া একেবারেই গ্রাহ্য করে না। এগুলো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণ। কিন্তু মিডিয়া এগুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন।

        এবং এর ফলে দাঙ্গাকে একটা খুব আশ্চর্য আলোয় দেখা যায়। কারণ, এক বিক্ষুব্ধ যুবককে জনৈক সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করে, তুমি কি সত্যি মনে কর যে তুমি যা চাও তা পাওয়ার এটাই সঠিক রাস্তা? যুবকটি উত্তর দেয়, হ্যাঁ। কারণ আমরা যদি দাঙ্গা না করি, আপনারা আমাদের সঙ্গে কথাই বলতে চাইবেন না।। একটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, একটা মিডিয়া, একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা জনসাধারণের মনে এমনই একটা ধারণা গড়ে তুলেছে যাতে তাদের মনে হয়, যতক্ষণ না তারা জোর করে ওদের নজর জনসাধারণের দিকে ঘোরাচ্ছে, ততক্ষণ তাদের কথায় কর্ণপাত করা হবে না। এই মনোভাবও দাঙ্গার জন্ম দেয়।       

অ্যামি গুডম্যান : ডার্কাস, আপনার কেমন বোধ হয়, এই যে দারিদ্র্য-অভাবজনিত হতাশার মনোভাব জনসাধারণকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে, যা কিনা বর্ণনিরপেক্ষভাবে --- আপনি যেমন বলেছেন --- গরিব শ্বেতাঙ্গদেরও মনোভাব। অর্থাৎ এটা একটা শ্রেণীর সমস্যা। সেক্ষেত্রে অনেকে যখন এই হতাশ ও ক্ষুব্ধ মুহূর্তের সুযোগে দাঙ্গা করছে, চুরি করছে, তখন আপনার বক্তব্য কী?

ডার্কাস হাউই : শুনুন, আমি বলছি। আমি এক পাক্ষিক পত্রিকায় লিখি। পত্রিকাটা যুক্তরাজ্যের কৃষ্ণাঙ্গদের একমাত্র পত্রিকা। গত সপ্তাহে, যখন মার্ক দুগানের ঘটনা বা অন্য কিছুই ঘটেনি, তখনও আমি এ বিষয়ে লিখেছি। কোনো ঘটনা দেখে লিখিনি। আমার ইতিহাস চেতনা থেকে আমার সত্য অনুমানের ক্ষমতা দিয়ে আমি লিখেছি। আমি লিখেছিলাম, অ্যামি ওয়াইনহাউজ[6] তারায় তারায় ভেসে বেড়াচ্ছে, কর্তাদের কাছে ভেসে যাচ্ছে তার কথা, সে বলছে, না। না, না।’’ ওটা ছিল এক সতর্কবার্তা। আমি এমন কোনো বিশেষ গুণসম্পন্ন মানুষ নই যে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি। যারা যাদু বা জ্যোতিষ জানে -- যাদের পয়সা দিয়ে আপনারা জেনে নেন কাল কী হবে --- আমি তাদের দলে নেই। আমি ওটা লিখেছিলাম বিশেষ করে আমার নাতির বলা কথাগুলোর জন্য, আর বিশেষ করে, কথা বলার সময় ওর গলায় যে স্বর বেজে উঠেছিল, তার জন্য। আপনিও বুঝতে পারবেন, যদি আপনি ওর কথা, ওর বন্ধুদের কথা, ওর মা বা আমার বন্ধুদের সন্তানদের কথা শোনেন, সেসব কথার সুরই অন্যরকম। বোঝা যাচ্ছিল যে চাপা দেওয়া ঢাকনাটা ফেটে যাবে আর ফেটে গিয়ে উঠে যাবে অনেক উঁচুতে। তাই আমি একটুও অবাক হইনি।

        কারা অবাক হতে বাধ্য? যারা শাসন করে। ওদের পক্ষে এটা থামানো সম্ভব নয়। কারণ ওরা জানেই না কোথায় কী অবস্থা হয়ে আছে। ওরা এমনকী এটাও জানে না যে কালো রঙের কিছু মানুষ আছে। পার্লামেন্টও জানে না ওখানে কী ছিল। যারা ওদের খেয়াল রাখছিল, দেখছিল, যারা সাধারণ মানুষের কথা শুনছিল, তারা জানে ওখানে কী ছিল। তোমরা কি কাল দাঙ্গা করতে চলেছ? --- এমন কোনো প্রশ্ন নয়, যে কোনো প্রশ্ন করলেই ওরা ফেটে পড়ত, আপনি বুঝতে পারতেন ওরা কতটা হতাশ। আমি আপনাকে এবং আপনার চ্যানেলের দর্শকদের নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমি জানতাম কী বিষয় হয়ে উঠছে। পুলিশ কিন্তু জানত না। যখন ট্রাইডেন্ট (অপারেশন ট্রাইডেন্ট) দুগানকে হত্যা করল, আমি অবাক হইনি। অন্য কাউকে হত্যা করলেও হতাম না। আমি অবাক নই যে ওরা আরও অস্ত্র চালাবে। পথে পথে অস্ত্র হাতে পুলিশ। স্বাভাবিক সময়ে যত সশস্ত্র পুলিশ থাকে তার চেয়ে সংখ্যায় অনেক বেশি। সবাইকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন না। কোথাও হয়তো গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে।     

অ্যামি গুডম্যান : বলুন, আপনার অনুভূতির কথা বলুন --- 

ডার্কাস হাউই : আমি অবাক হচ্ছি না যে আমরা যারা মুখ খুলছি তাদের ফোনে ওরা আড়ি পাতছে। আমি এতেও অবাক হব না, যদি এরপর রাস্তায় বেরোলে ওরা অন্যদের ছেড়ে আমারই ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে আবার এক গল্প ফেঁদে বসে। এরকম অবস্থার মধ্যেই আমরা এখন আছি। 

অ্যামি গুডম্যান : ডার্কাস, এখন কী হলে ভালো হয়? কীভাবে আজকের সমস্যার সমাধান হবে বলে আপনার মনে হয়? চারদিনের বিদ্রোহ, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ এবং হাজার জনেরও বেশি মানুষের গ্রেপ্তারি নিয়ে আমরা কথা বলছি। লন্ডন এবং অন্যান্য শহরে এত পুলিশ নামার ঘটনা ইতিহাসে নেই। এখন কী করা দরকার বলে আপনার মনে হচ্ছে?   

ডার্কাস হাউই : এখন কৃষ্ণাঙ্গ যুবকদের কাছে অবশ্যই শান্তির প্রস্তাব দিতে হবে। এটা করা সম্ভব, যদি প্রধানমন্ত্রী অপারেশন ট্রাইডেন্ট বন্ধ করবেন বলে পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন। অপারেশন ট্রাইডেন্ট ও অপারেশন রেজরব্যাক বাতিল করতে হবে। এগুলোই বর্তমানে কৃষ্ণাঙ্গদের সন্ত্রস্ত করে রাখছে।

        আর একটা কাজ করতে হবে, কালো মানুষদের মধ্যে যারা সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী আছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে সবাই মিলে আগামী ছমাসের মধ্যে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডেকে বর্তমান সামাজিক অবস্থাটা তুলে ধরতে হবে। সেখানে অবশ্যই আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের উপস্থিত থাকতে হবে। পৃথিবীর সব জায়গার সাংবাদিকদের সেখানে উপস্থিত করতে হবে। এই যে একটা সভ্যতার মধ্যে আরেকটা সভ্যতা রয়েছে, তার ভবিষ্যত নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা করতে হবে। আমরা আফ্রিকা থেকে, ক্যারিবিয়ান (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) থেকে প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানাব। আমরা জানাব, ক্যামেরন যে দেশকে নিয়ে গর্ব করে এটা সেই দেশ নয় --- এখানে উপরিতলের নিচে, প্রধানত বর্ণগত প্রশ্নে কীভাবে সন্ত্রাস আর অবহেলার চোরাস্রোত বয়ে চলেছে, আমাদের তার সমাধান করতে হবে। আমাদের এই সমাধান করতেই হবে এবং তা সুসভ্য উপায়েই করতে হবে।

অ্যামি গুডম্যান : আমরা তাহলে এখানেই শেষ করতে যাচ্ছি ...

ডার্কাস হাউই : লর্ড্‌স, পার্লামেন্ট বা আপনাদের পার্লামেন্ট সদস্যদের কাছে গিয়ে অথবা সেই ধরনের কিছু করে কোনো লাভ নেই। আমরা আমাদের কথাগুলো এমন উঁচুতে তুলে ধরব যাতে সমস্ত সভ্য জগৎ জানতে পারে। ওরা আফগানিস্তানে যা করছে, এখানেও তা-ই করছে সাধারণ মানুষকে খুন করার জন্য। আমি ক্রুদ্ধ নই, কিন্তু আপ্রাণ আন্তরিক। যখন আমি রাস্তায় হাঁটি, প্রত্যেকবার চারদিকে খালি তাকিয়ে তাকিয়ে নজর রাখি কোথায় দুর্বৃত্ত পুলিশ অফিসারেরা ঘাপটি মেরে রয়েছে। আমি আমার সন্তান এবং নাতিনাতনিদের ওদের থেকে সতর্ক থাকতে বলি। ...

অ্যামি গুডম্যান : আপনাকে ধন্যবাদ, এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য।



[1] ১৯৮১ সালে ব্রিক্সটন দাঙ্গার তদন্ত করতে ব্রিটেনের হোম সেক্রেটারি উইলিয়াম হোয়াইটল লর্ড স্কারম্যান-এর নেতৃত্বে কমিশন গঠন করেন সেই কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায়, পুলিশের হাতে যথেচ্ছ খানাতল্লাশির ক্ষমতা রয়েছে। পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পোলিশ অ্যান্ড ক্রিমিনাল এভিডেন্স অ্যাক্ট ১৯৮৪ নামে এক আইন তৈরি করা হয়। সেই আইন অনুযায়ী ১৯৮৫ সালে স্বাধীন পোলিশ কমপ্লেইন্টস অথরিটি গঠিত হয়, যাতে পুলিশের ওপর জনসাধারণের আস্থা ফিরে আসে।   

[2] দক্ষিণ লন্ডনের ব্রিক্সটনে মূলত আফ্রিকান-ক্যারিবিয়ান সমাজের বাস। ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে সেখানকার নিউ ক্রস এলাকায় একটা বাড়িতে আগুন লেগে ১৩ জন কৃষ্ণাঙ্গ যুবক মারা যায়। সন্দেহ করা হয়, বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব থেকে আগুন লাগানো হয়েছিল এবং এই ঘটনার পুলিশি তদন্ত জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ সৃষ্টি করে। মার্চ মাসে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের এক বিশাল মিছিলের দিন ফ্লিট স্ট্রীটে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এপ্রিল মাসে মেট্রোপলিটান পুলিশ সাদা পোশাকে অপারেশন সোয়াম্প ৮১ শুরু করে। পাঁচদিনে ব্রিক্সটনে ১০০০ জনকে রাস্তায় থামিয়ে তল্লাশি করা হয় এবং ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর থেকেই সূত্রপাত হয় ব্রিক্সটন দাঙ্গার --- অন্য মতে তা ছিল ব্রিক্সটন বিদ্রোহ   

[3] ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে অপারেশন ট্রাইডেন্ট নামে মেট্রোপলিটান পুলিশের একটি শাখা গঠন করা হয়, যারা বেআইনি মাদক বিক্রিকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বন্দুক নিয়ে অপরাধমূলক কাজের নজরদারি করবে। ট্রাইডেন্ট কথার অর্থ ত্রিশূল। প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ওপর ভারতীয় নৌবাহিনীর অভিযানের নামও ছিল অপারেশন ট্রাইডেন্ট 

[4] ৪ আগস্ট সন্ধ্যা সওয়া ছটা নাগাদ টোটেনহাম হেলের ফেরি লেন ব্রিজের ওপরে পুলিশ একটি মিনিক্যাব থামিয়ে আরোহী মার্ক দুগানকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করে এবং দুবার গুলি চালায়। দুগানের বুকে গুলি লাগে। ওইদিনই রিপোর্ট করা হয় এবং সমস্ত মিডিয়া প্রচার করে, এক পুলিশ অফিসারের ওপর গুলি চালানোর পর দুগানকে গুলিবিদ্ধ করা হয়। পাঁচ সন্তানের পিতা দুগান মারা যান। পরদিন আইপিসিসি স্বীকার করে, রিপোর্টে অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়েছে। ফলে টোটেনহামে তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশিরা দাবি করে, আমরা সত্যটা জানতে চাই, কীভাবে মার্ক মারা গেল, সেই তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত ছাড়ছি না। এমনকী আইপিসিসি-র নিরপেক্ষতা সম্পর্কে তাঁর পরিবার সরাসরি প্রশ্ন তোলে এবং স্বাধীনভাবে দ্বিতীয় পোস্টমর্টেম করার দাবি করে। তাঁকে মাদক-বিক্রেতা এবং গ্যাঙস্টার হিসেবে চিহ্নিত করার প্রতিবাদে দুগানের এক পারিবারিক বন্ধু জানান, সে গ্যাঙ সদস্য নয় এবং ওর কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। ওর ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধু রয়েছে, যারা সপ্তাহে একদিন অন্য কিছু করে, যেমন ছেলেবেলার বন্ধুরা একত্রিত হয়। কিছু লোক ওদের গ্যাঙ হিসেবে চিত্রিত করতে চাইছে।        

[5] গ্লোবাল কর্পোরেট রুপার্ট মার্ডকের মালিকানাধীন নিউজ কর্পোরেশ-এর সাবসিডিয়ারি নিউজ ইন্টারন্যাশনাল-এর সংবাদপত্র ১৬৮ বছরের পুরনো নিউজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড-এর কর্মাচারীদের বিরুদ্ধে ফোনে আড়িপাতা এবং পুলিশকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ১৫ জুলাই নিউজ ইন্টারন্যাশনালের সিইও রেবেকা ব্রুক্‌স এবং দাও জোন্‌স অ্যান্ড কোম্পানির সিইও লেস হিন্টন পদত্যাগ করেন। ১৭ জুলাই দুর্নীতির দায়ে ব্রুক্‌সকে গ্রেপ্তার করা হয়। মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনার স্যার পল স্টিফেনসন পদত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে কর্পোরেট জগৎ, মিডিয়া এবং পুলিশের এক যৌথ অপরাধ-চক্র সকলের সামনে উন্মোচিত হয়। এই দুর্নীতির সরকারি তদন্ত চলছে। ১৯ জুলাই রুপার্ট মাডককেও পার্লামেন্টারি মিডিয়া কমিটির কাছে জবাবদিহি করা হয়। 

[6] ২৩ জুলাই ২০১১ প্রখ্যাত গায়িকা এবং সঙ্গীত রচয়িতা ২৭ বছর বয়সি অ্যামি ওয়াইনহাউজের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে লন্ডনে তাঁর নিজের বাড়িতে। তাঁর সম্পর্কে মৃত্যুর আগে বেআইনি মাদক সেবনের সন্দেহ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

 

Comments