ইতিহাস

www.chowgacha.info
চৌগাছার মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম

চৌগাছার আরো ইতিহাস:


চৌগাছা ভূখন্ডের উৎপত্তি ও জনবসতির পত্তন

নীলবিদ্রোহের সুতিকাগার চৌগাছা

নীলকুঠি

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

মুক্তিযুদ্ধ

শহীদ স্মরণে

মুসলিম কীর্তি

নীল বিদ্রোহের ইতিহাস




শিল্পনগরী চৌগাছা- এক অবলুপ্ত ইতিহাস
তৌহিদুল আলম





        কবি মধুসুদনের অমর লেখনীতে যে ছোট নদীটি মহিমান্বিত হয়ে আছে সেই কপোতাক্ষের তীরে দাঁড়িয়ে আছে আজকের এ পৌরসভা শহর চৌগাছা । বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে ভারতের বয়রা ও বাগদা সীমান্তের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এ উপজেলাটি কেবল স্বাধীনতার তোরণদ্বার কিংবা নীল বিদ্রোহের পীঠস্থান হিসেবেই নয় বরং ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবেও এর খ্যাতি ছিল অতীতকাল থেকেই। একদিন এই চৌগাছার বুকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেকগুলি চিনি কারখানা যার উৎপাদিত চিনি রপ্তানি হতো সুদুর ইংল্যান্ডে, কারখানার  আশে পাশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিলেতী ম্যানেজারের বাড়ীঘর, কলমের বাগান যেখানে ম্যানেজার তাঁর অতি আদরের পোষা কুকুর নিয়ে বিকেলের হাওয়া খেতে বের হতো। কিন্তু এ সকল কারখানায় তখন আখ থেকে চিনি প্রস্তুত হতো না । খেজুর গুড় থেকেই তখন প্রস্তুত হতো চিনি। আবহমানকাল থেকেই এ  দেশের কৃষকরা খেজুর গাছ থেকে রস এবং রস থেকে গুড়, পাটালি ও চিনি প্রস্তুতের প্রক্রিয়া আয়ত্ব করেছিল । তখন বাড়ীতে বাড়ীতে কৃষকেরা কিংবা এ দেশীয় ব্যবসায়ীরা এ দেশীয় গার্হসত্ম্য প্রণালীতে প্রস্তুত করত চিনি। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইংরেজ সাহেবরা এদেশে এসে চিনির করখানা খুলে বসে। কিন্তু সে ঘটনা বিবৃত করবার পূর্বে দেশীয় পদ্ধতিতে চিনি প্রস্তুতের পৃক্রিয়া সম্বন্ধে কিছু কথা বলে নেয় দরকার। দেশীয় প্রণালীতে চিনি প্রস্তুতের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ  চমৎকার। প্রত্যেক চিনি কারখানায় অসংখ্য গুড় ভর্তি ভাড় বা কলসী খরিদ করে মজুত করা হতো । প্রথমতঃ ভাড় গুলি ভেঙ্গে চাড়া বা খাপড়া ফেলে গুড়টুকু ঝুড়ি বা পেতেতে রাখা হতো। পেতেগুলি মাটির তৈরী নাঁদার উপর তেকাঠা (ত্রিভুজ আকৃতির সংযুক্ত তিনটি কাঠের কিংবা বাঁশের দন্ড) দিয়ে বসানো হতো। পেতে হতে গুড়ের রস গলে গলে ঐ নাঁদায় সঞ্চিত হতে হয়। এভাবে সঞ্চিত হবার তৃতীয় দিনে গুড়ের গলাগুলি বেঁকি অস্ত্রদিয়ে কুঁচিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হতো অর্থাৎ 'মুটানো' হতো। এবং পরদিন ঐ গুড়ের উপর শেওলা (শৈবাল) দিয়ে ঢেকে দেয়া হতো। সকল শেওলায় এ কাজ হয় না । শুধুমাত্র পাটা  শেওল দিয়েই একাজ হয় । সেদিন অনেক লোকে এই পাটা শেওলা নদী থেকে তুলে নৌকা ভর্তি করে এনে কারখানায় সরবরাহ করত । এ কাজে অনেকের জীবিকার সংস্থান হতো । যাহোক শেওলা দেয়ার ৭/৮ দিন পরে পেতের উপরের যে অংশ সাদা মিশ্রিত দলার মত চিনি হয়ে থাকে তা কেটে নেয়া হতো এবং অবশিস্ট অংশ পুনরায় 'মুটিয়ে' নতুন শেওলা দিয়ে ঢেকে দেয়া হতো। আবার ৭/৮ দিন পরে কতকটা চিনি কেটে নেয়া হতো । এরকম ৪/৫ বার করলে এক পেতে শেষ হয়। প্রমবারে যে মাৎ বা পাতলা গুড় নাঁদায় পড়ে, তা নিয়ে বড় বড় লোহার কড়ায় জ্বাল দেয়া হতো। পরে সেই মাৎ গুড় মাটির তৈরী জ্বালার মধ্যে ঢেলে ঢেকে দেয়া হতো। ৮/৯ দিনের মধ্যে গুড় জমে যেতো । সে গুড়ও পেতের মধ্যে দিয়ে শেওলা ঢাকা দিয় মুটিয়ে মুটিয়ে তিন চার বার চিনি পাওয়া যেতো।

এই প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত চিনি কিছু সরস, কোমল, সু-স্বদু এবং   ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলাযুক্ত হতো বলে একে 'দলুয়া' চিনি বলা হতো। এ দলুয়া চিনির আবার প্রকার ভেদ ছিল। পেতেয় প্রদত্ত প্রথম বারের গুড় হতে যে উৎকৃষ্ঠ চিনি হতো তার নাম ছিল 'আখড়া' এবং তা অপেক্ষা কিছুটা লাল যে চিনি বের হতো  তার নাম ছিলা 'চলতা'। আবার প্রথম বার চিনি প্রস্তুতের পর যে মাৎ নাঁদায় থাকত তা জ্বাল দিয়ে একই প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয়বার যে চিনি প্রত্তুত করা হতো তাকে বলা হতো 'কুন্দো'। কুন্দোর পেতে হতে যে মাৎ  হতো তা মাৎই থাকত এবং তা তামাক মাখার কাজে ব্যবহৃত হতো। দলুয়া চিনি বেশীদিন ভালভাবে শুষ্ক অবস্থায় থাকেনা শিগ্রই মেতে উঠে বা গলে যায়।
এজন্য একে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য পাকা চিনিতে পরিণত করা হতো। তাকরার জন্য এ চিনি মেটে খোলায় বা বড় কড়াতে জ্বাল দিয়ে এর গাদ কেটে বা ময়লা উঠিয়ে ফেলে ছিদ্রযুক্ত খোলায় রাখা হতো । তারপর শেওলার সাহায্যে চিনি প্রস্তুত করা হতো। এর মধ্যে যা খুব সাদা বড় দানাওয়লা হতো তাকে 'দোবরা' চিনি বলা হতো এবং তদপেক্ষা লালচে চিনির নাম ছিল 'একবরা' চিনি।

দলুয়া চিনি থেকে পাকা চিনি প্রস্তুত ছাড়া চৌগাছা যশোর অঞ্চলের কোথাও কোথাও গুড় থেকে সরসরি পাকা চিনি প্রস্তুত করা হতো । এ প্রক্রিয়ায় ভাড় ভেঙ্গে গুড়টুকু প্রথমতঃ বস্তায় ভরে টাঙিয়ে দেয়া হতো। এর নীচে থাকত বড় বড় নাঁদা । বস্তায় দুপাশে দু খানি বাঁশ দড়ি দ্বারা চেপে বেঁধে বস্তায় গুড়ের মাৎ নিংড়ানোর ব্যবস্থা করা হতো। রস ঝরে গেলে বস্তার শুকনা গুড় জলসহ জ্বাল দিয়ে দুধ দ্বারা গাদ কেটে, পরে নাঁদায় ফেলে শেওলা দিয়ে ঢেকে দেয়া হতো। এর উপর যে সদা চিনি পাওয়া যেতো তা পিটিয়ে গুড়া করে রোদে শুকিয়ে পাকা চিনি করা হতো। পাকা চিনিই সেদিন রপ্তানী হতো সুদুর ইউরোপে।

এ দেশীয় কৃষকগণ কতৃক বহু পূর্ব হতেই এদেশে গার্হস্থ্য প্রণালীতে চিনি প্রস্তুত হয়ে আসলেও উনবিংশ শতাব্দীর আগে বাংলায় (উভয় বাংলা) কোন বিলেতী ব্যবসায়ী চিনি কারখানা খুলে ব্যবসায়ে নামেননি। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বর্ধমানের অনর্ত্মগত ধোবা নামক স্থানে বেস্নক (Mr. Besnok) সাহেব প্রথতম ইংরেজ কুঠি স্থাপন করেন। কিন্তু তাঁর লোকসান হতে লাগলে, একটি কোম্পানী গঠন করে তিনি নীজ কুঠি সাড়ে চার লড়্গ টাকায় বিক্রি করেন। এবার তার প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানী  কোটচাঁদ পুর ও ত্রিমোহিনীতে কুঠি বসালো । আর ঠিক এ সময়েই কলকাতার 'গস্নাড ষ্টোন’ ওয়াইলি এন্ড কোম্পানী চৌগাছায় এসে কারখানা খোলে । চৌগাছার এ কারখানার প্রথম ম্যনেজার ছিলেনর 'স্মিথ' সাহেব । পরে হলেন 'ম্যাকলিয়ড' সাহেব।

ম্যকলিয়ড সাহেব প্রথমে স্থানীয় সমস্ত খেজুর কিনে নিয়ে গুড় ও চিনি প্রস্তুত করতেন। এর পর চৌগাছায় অনেকগুলি কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেদিন এখানে কতটি কারখানা স্হাপিত হয় তার কোন হিসেব আজ আর পাওয়া যায়না। তবে বলা যায় গোটা বাংলায় কোটচাঁদপুর ও কেশবপুর ছিল চিনি কারবারের সর্ব প্রধান স্থান এবং তার পরেই ছিল চৌগাছার স্থান। কোটচঁদপুরে শতাধিক চিনি কারখানা ছিল । এ থেকে অনুমান করা যায় চৌগাছায়ও অনেকগুলি কারখানা স্থাপিত হয়েছিলো । তবে স্থানীয় বয়ঃবৃদ্ধ  ব্যক্তির্গের সহায়তায় মাত্র তিনটি কারখানার স্থান সনাক্ত করা গিয়েছে। এদের একটি ছিল বর্তমান পোষ্ট অফিসের পুর্ব গা ঘেঁষে।দ্বিতীয়টি ছিল চৌগাছা সিনিয়র মাদ্রাসার নতুন ভবনের পিছনে উত্তর দিকে। এবং আর একটি ছিলা একই মাদ্রাসার পুরাতন ভবনের পিছনে বাহার প্রিন্টিং প্রেসের সাথে সংলগ্ন। এ সকল স্থানেই সেদিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিলেতী সাহেবদের চিনি কারখানা। আর এ সকল কারখানার আশে পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সাহেবদের পাকা আবাসিক বাড়ী । চারপাশে ছিল সাহেবদের সুন্দর কলমের বাগান,  কবরস্থান ও সনত্মান সনত্মতীর অকাল মৃত্যু জনিত মর্মস্পর্শী স্মরক লিপি। কিন্তু এ সবের কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই । কেবলমাত্র গুড়ের ভাড়ের খাপড়া আর কারখানার দেয়ালের ধংশস্তুপের সামান্যই তার সাক্ষ বহন করছে। পোষ্ট অফিসের পাশে যে কারখাটি ছিল তার মোটা চওড়া দেওয়াল এ কিছু দিন আগেও দেখা যেতো। সেখানে আজ প্রতিষ্টিত হয়েছে এক বণিজ্যিক ভবন। বাহার প্রিন্টিং প্রেসের সাথে সংলগ্ন কারখানাটির মোটা দেওয়ালের খুব সামান্যই আজ দেখা যায় । গাছপালা আর আগাছায় স্থানটি ভরে গেছে । মাদ্রাসার নতুন ভবনের পিছনের কারখানার কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই । কেবল সবুজ ঘাসের মাঠ পড়ে আছে আর রাসতার কোলঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কয়েকটি দোকান ঘর।

১৮৬১ সালে নিউহাউস সাহেব চৌগাছার কারখানার শাখা রূপে কপেতাক্ষ ও ভৈরবের সংগম স্থলে তাহিরপুরে একটি চিনি কল খুলে ইউরোপীয় মতে চিনি প্রস্তুত করতে থাকন। এ সাথে রামমদ প্রস্তুতের ভাটি খানারও যোগ হয় । কিন্তু ক্রমেই দেনা বাড়তে লাগলে ১৮৮০ সালের পর এমেট চেম্বার্স কোম্পানীর নিকট কারখানাটি বিক্রি করা হয় । সাহেবরা এসে কলকারখানা ও বাড়ীঘরের যথেষ্ট উন্নতি করেন এবং হড়ের গুঁড়ার সাহয্যে চিনি পরিস্কার করার নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। কিন্তু এসব করেও কারবারটি টেকানো গেল না; গেল উঠে । বালুচর নিবাসী ধনপতসিংহ এটি খরিদ করে নিয়ে তাঁর মৃত্যুকাল (১৯০৬) পর্যন্ত চালিয়ে যান। ১৯০৯ সালে কাশিম বাজারের মহারাজ মনীন্দচন্দ্র, হাইকোর্টের জর্জ সারদা চরণ মিত্র, নাড়া-জোলের রাজা বাহাদুর প্রবৃতি ব্যক্তিগণ রায় বাহাদুরের সম্পত্তি খরিদ করে নিয়ে তারপর চিনির কারবার নামক যৌথ কারবার খুলেন এবং ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপান থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে এসে কার্য আরম্ভ করেন। কিন্তু তবুও কারবারটি ভাল চলল না । এরপর আমেরিকা ও জাপান হতে শিড়্গা প্রাপ্ত এদেশের একজন সুযোগ্য ব্যক্তি এর  উন্নতির জন্য বিশেষ চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি যে কতদিন কারবারটি চালিয়েছিলেন এবং তারপর আর কেউ এর দায়িত্ব নিয়েছিল কিনা সে সম্বন্ধে আর কিছুই জানা যায় না । পরবর্তীতে কোন এক সময়ে কারবারটি উঠে যায় । এ অঞ্চল থেকে চিনি কারখানা গুলি উঠে যাবার পিছনে মুলত; বিলেতী কলকারখানার ব্যয়বহুল প্রণালীই  দায়ী।

চৌগাছা এবং তাহিরপুর থেকে চিনি কারখানা উঠে যাবার কিছুকাল আগেও এ অঞ্চলে যে কি পরিমাণ চিনি উৎপাদিত হয়েছিল তার একটি বিবরণ পওয়া যায় Quarterly Journal of the Bengal Agricultural Department  এর "The Date Sugar Palm" শিরোনামের একটি প্রবন্ধে । এ প্রবন্ধে বলা হয়েছে- Inspite of the decline in the manufacture, Jessore is still the chief date sugar producing district in Bengal.

এক সময় যে চৌগাছার বুকে অনেকগুলি চিনি কারখানা স্তাপিত হয়েছিল; আর যে তাহিরপুরে চিনি কারখানার সাথে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মদ প্রস্তুতের ভাটিখানা আজ তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বয়ঃবৃদ্ধ ব্যক্তিবর্গের মুখে এগুলি এখন গল্পের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দেশের মানুষের ইতিহাস অসচেতনতাই মুলতঃ এর জন্য  দায়ী।




তথ্যসূত্রঃ
যশোর খুলনার ইতিহাস-সতীশ চন্দ্র মিত্র
এবং
লেখকের ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রবন্ধটি রচিত।

তথ্য সম্পাদনায়:
মুরসালিন নোমানী





Comments