র হ স্য গ ল্প
কালোপ্রহরী
নাফে মোহাম্মদ এনাম
ভয়ের গল্প উপন্যাসে ভূতুড়ে বাড়ি কিংবা পুরোনো ভাঙা মন্দিরের প্রভাবটা থাকে বেশি। ভূতের গল্প হলেই যেন শত বছরের পুরাতন পরিত্যক্ত একটা বাড়ির কাঠামো না হলেই নয়। মাকড়শা বাধানো জাল...চুন কালি খসে পড়া ইটের ভাঙা দেয়াল...বাড়ি জুড়ে অগোছালোভাবে গজিয়ে ওঠা আগাছা , জঞ্জাল...চারিদিকে সুনসান নিরবতা বিরাজ করা পরিবেশ...লোকজনের মুখে মুখে নানান গুজবের ছড়াছড়ি, যেমন-শত শত বছর আগে মরে গিয়েছিলো জমিদার কন্যা লায়লা বানু...তার করুন বিলাপ আজও বাড়িটা ঘিরে প্রতিধ্বনিত হয়... ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে সিদ্দিক সাহেবের দালানবাড়িটা কিন্তু মোটেও সেরকম কিছু নয়। কালের সাি হয়ে কোনমতে টিকে আছে এ বাড়িটা। কোন পুরোনো শীতল গল্প গাঁথা ছড়ায়নি এ বাড়িটি নিয়ে। কেউ কখনো...বাড়িটা একরকম খালিই পড়ে আছে আজ বহুদিন। মালিকবিহীন বাড়িটাতে কেবল মাত্র দু’টি প্রাণীর সাড়াশব্দ পাওয়া যায়। কেয়ারটেকার গনেশ চ্যাটার্জি আর তার একটা পোষা কুকুর। সিদ্দিক সাহেব স্বপরিবারে শহরে থাকেন। মাঝেমধ্যে আসা পড়ে এখানে। কুকুরটা তারই রেখে যাওয়া। গনেশের বাবা এবাড়িতেই ইহকাল ত্যাগ করেন। ওর মাও এখানে গত হন। সে প্রায় বছর বিশেক পুরোনো কথা। তারাও বাড়িটা দেখাশোনার কাজ করতেন। গনেশ চ্যাটার্জির বয়সটাও বোধহয় চল্লিশ ছুই ছুই। কেমন জানি গোবেছার টাইপের মানুষ সে। কোনমতন লিখতে পড়তে পারে। একা থেকে থেকে অভ্যাস। বিয়ে তা করেনি কেন তা সে নিজেই ভাল বোঝে। সিদ্দিক সাহেবের সাথে ভাল খাতির। জিগড়ি দোস্তের মতন সম্পর্ক। মোটকথা, সাধারণ একটা চরিত্র গনেশ চ্যাটার্জি।
তো, এই হচ্ছে মোটামুটি এ গল্পের চরিত্র এবং পটভূমির সহজ রুপায়ন। কেমন জানি গল্পটা আন্দাজ করে ফেলার মতন হয়ে গেল তাই না? মনে হয় গল্পটা এ পুরোনো বাড়ি আর গনেশ চ্যাটার্জিকে ঘিরেই। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন-তবে পটভূমিটা এ বিশাল বাড়িটা হলেও গল্পটা বাড়িটাকে ঘিরে নয়। যদিও প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে ভয়ের গল্পে ভূতুড়ে বাড়ির প্রাধান্যই থাকে বেশি। তবে আসুন, একটু একটু করে এগোই...
আজ সোমবার। গনেশ চ্যাটার্জির হঠাৎ মনে হলো সে ভুল করে মুদির দোকানে নিজের চাদরটা ফেলে এসেছে। এখন শীতের মৌসুম চলছে। তাই গায়ে একটা মোটা চাদর জড়িয়ে পাশের দোকানটাতে গিয়েছিলো। এখন ঘরে এসে চা বানাতে গিয়ে মনে পড়ল। নিজেকে মনে মনে ধমক লাগাল সে। তবে এখন আর ফিরে গিয়ে চাদরটা আনতে ইচ্ছে করছে না। কাল ঘরের সদাইপত্র করতে হবে, তখনই নিয়ে আসা যাবে। দোকানের মালিকের সাথে পরিচয় আছে। সুতরাং চাদরটা হারাবে না।
আস্তে ধীরে দু’কাপ চা বানিয়ে বারান্দায় এলো গনেশ চ্যাটার্জি। এসে দেখে একটু আগে যে তরুন ছেলেটা এসেছে সে তার কুকুরটার সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। আদর করে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। কুকুরটাও আদর পেয়ে ঘনঘন লেজ নাড়ছে।
ছেলেটার সঙ্গে একটা বড়সর ব্যাগ। কাপড়-চোপড়ে ভর্তি মনে হয়, এরমানে থাকা-খাওয়ার ঝামেলা। এরই কথা বুঝি বলে রেখেছিলেন সিদ্দিক সাহেব। দোকানে যখন যাচ্ছিল গনেশ, ছেলেটাকে এলাকায় ঘুরঘুর করতে দেখেছিলো। বাড়িতে এসে দেখে বান্দা হাজির। নিজের পরিচয় দিল মুহিন বলে। মুহিন খান। এর কোন অসুবিধে হওয়া চলবে না। বয়সটা যাচ্ছেতাই নয়, পচিশ-ত্রিশ হবে হয়ত। এদিকটায় ঘুরতে এসেছে মনে হয়। অসুবিধে নেই, জেনে নেয়া যাবে একসময়। আগে একটু খাতির যতœ হোক।
‘নিন, এইমাত্র বানিয়েছি।’ মুহিন খানের দিকে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিল গনেশ।
হাটু গড়ে বসে কুকুরটাকে আদর করছিলো মুহিন। সোজা হয়ে চায়ের কাপটা নিয়ে পাশের চোয়ারটাতে বসে পড়ল। ‘আপনার কুকুরটা বেশ ভদ্র। আমার পছন্দ হয়েছে। এর কি কোন নাম আছে?’ চায়ের কাপে চুমুক দিল মুহিন খান।
‘নাহ্! কুকুরের আবার নাম কি জন্য! শীস্ দিলেই তো ছুটে আসে।’ সরল জবাব গনেশের। জবাবে মুহিন খান হাসল। ‘তবে যতটা ভাবছেন ততটা ভদ্র এ নয়।’ নিজের মুখেও হাসি ফোটালো গনেশ।
‘তাই নাকি! দেখবেন, আমাকে যেন বিপদে ফেলে দিয়েন না।’
‘চিন্তার কিছু নেই। আমি হলাম এ বাড়ির পাহারাদার, আর এ হল আমার!’
‘বাহ্! মজার ব্যাপার তো!’
‘তবে লেই দেয়েছেন, এখন দেখবেন সারান আপনাকে বিরক্ত করছে...’
‘আরে আমি পশুপাখির ভক্ত। এর সঙ্গে সময়টা আমার ভালই যাবে।’
‘তা...আসার পথে কোন...’
এভাবেই নানান কথাবার্তার মধ্য দিয়ে চা পর্ব শেষ হলো। গনেশ মুহিনের জন্য একটা ঘর গুছিয়ে দিলো। রাতের খাবারটাও দু’জনে জমিয়ে খেল। নতুন মেহমানের আগমনে রান্না হওয়া খাবারে নিজের ভাগটাও জারি করল গনেশের কুকুরটা।
পরের দিন। মুহিন খান প্রায় পুরোটা সময়ই বাড়ির বাইরে ছিল। ঘুরে দেখতে বেরিয়েছিলো সে এ জায়গাটা। ফিরে এসে দেখল গনেশ বাইরে। পুরো বাড়িটাই খালি। কুকুরটাও বোধহয় গনেশের সাথে।
মুহিন খান এবার গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখতে লাগল। বাড়িটা একতলা হলেও বিশাল। কম করে হলেও পনেরো বিশটা কামরা আছে এ বাড়িতে। সবগুলোই তো খালি। তবে...একটা ঘর মনে হল...ছাদে ওঠার সিড়িঁর পাশে যে দু’টি কামরা, তার একটিতে তালা ঝুলানো। বিশাল একটা তালা ঝুলছে দরজায়। বহু পুরোনো তালা। দেখে বোঝা যাচ্ছে এ ঘরে কারো পদার্পন ঘটেনি সেই বহুকাল ধরে। গুনে ধরা হাতলগুলোই এর প্রমাণ। মরচে ধরে গেছে। হঠাৎ সিদ্দিক সাহেবের কথা মনে হল মুহিনের। সেই কবে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে পরিচয়। একটা টুরিস্ট কাবে সদস্য ছিল মুহিন। টুরিস্টদের গাইড দেয়াই ছিল তার কাজ। ওই সময় সিদ্দিক সাহেবও গিয়েছিলেন বেড়াতে। তার পরিবারকে ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব বর্তেছিলো তখন মুহিনের ওপর। অন্তরঙ্গতার সূচনা সেভাবেই। পরিচয় ঠিকানা রেখেছিলো মুহিন। এবার ছুটিতে দেখা করেছিলো সিদ্দিক সাহেবের সঙ্গে। তিনি ওকে পাঠিয়ে দিলেন এখানে। সত্যিই সুন্দর একটা জায়গা এটা। বাড়িটা পুরোনো হয়েছে অনেক, কিন্তু সিদ্দিক সাহেব ধরে রেখেছে। ভাল কাজই করেছেন। মনে মনে উৎফুল্ল অনুভব করল মুহিন খান। ভাবলো, কয়েকটা দিন ভালই কাটবে তার।
হন্হন্ করে হাঁটা ধরেছে গনেশ চ্যাটার্জি। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়েছে অনেক আগেই। গতকাল দোকানে ফেলে যাওয়া চাদরটা গায়ে দিয়েছে এবার। দু’হাতেই ভর্তি ঘরের বাজারপাত।
দ্রুত পদপে ফেলছে গনেশ। ভীষণ রকম উত্তেজিত হয়ে আছে সে। কিছু নিয়ে ভাবছে। বারবার কি যেন ভেবেই মাথা ঝাঁকাচ্ছে। আপন ভঙ্গিতে। সাথের কুকুরটা আগে আগে চলছে আর লেজ নাড়ছে ঘনঘন।
বাজারে দু'টো লোক তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে যা বলল তা বিশ্বাস করতে বেশ সময় লেগেছে গনেশ চ্যাটার্জির। পত্রিকাতে ছাপা মুহিন খানের ছবি দেখে বিশ্বাসই হতে চায়নি প্রথম প্রথম। একটা মারাত্মক খুনি এই মুহিন! দু’হপ্তা আগে কক্সবাজারে দু’জন টুরিস্টকে খুন করে তাদের লাধিক টাকা নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে এ। পুলিশ তাকেই খুঁজছিলো। পিছু পিছু এ পর্যন্ত চলে এসেছে পুলিশ। কিন্তু এখনই ধরতে চাচ্ছে না ওরা মুহিনকে। মুহিনের সাথে আরো লোক আছে। সবগুলোকে ধরার ইচ্ছে পুলিশের। গনেশের সহযোগিতা চায় পুলিশ। তাই গনেশ ঘরে ফিরছে। গনেশ ভয় পাচ্ছে এই মুহিন খুনিটা টের না পেয়ে যায় যে পুলিশ তার ওপর নজর রাখছে! যদি কিছু একটা করে বসে...কিন্তু তার আগেই একটা কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে।
গনেশের হাঁটার গতি আরো বাড়লো।
একটু আগে ফোনটা এসেছিলো মুহিনের মোবাইলে। বস্ জানালো পুলিশ নাকি তার অবস্থান জেনে ফেলেছে। এখান থেকে পালাতে হবে তাড়াতাড়ি। মুহিন তাই দ্রুত ব্যাগ গোছাচ্ছে। গনেশ চ্যাটার্জি এখনও ফেরেনি। লোকটা ফেরার আগেই চম্পট দিতে হবে। সিদ্দিক সাহেবের তালাবদ্ধ ঘরটাতে ঢুকেছিলো মুহিন। তালা ভেঙেই। বিনিময়ে এমন কিছু জিনিস ও পেয়ে গেল যা সত্যিই দুর্লভ। শত বছর আগের ব্যবহৃত সোনা আর রুপোর বিশাল অ্যান্টিক। বেশ ভালই একটা ধাক্কা খেয়েছিলো ও তখন। কথায় বলে, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম...কিন্তু সত্যি সত্যি অনেকগুলো সোনার চামচ হাতিয়ে নিল মুহিন। সোনার চামচ। কোটি টাকার ধন। এই গনেশ ব্যাটা কি জানত না এগুলোর কথা! ওর কি জানা নেই এ সাত রাজার ধন? সিদ্দিক সাহেব কি জানে না এসব?
মুহিন সবকিছু গুছিয়ে যখন দরজার দিকে এগুলো দেখতে পেল দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে গনেশ!
‘ঘটনাটা ছিল নৃশংস। ভাবলেই গাটা শিউরে ওঠে!’ মুহিনের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত হাসি হাসল গনেশ। রহস্যময় হাসি। গাটা অজান্তে কেঁপে উঠল মুহিনের! গনেশ বলে যাচ্ছে,‘নিজের চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটতে দেখেছিলাম। কয়েক বছর আগের পত্রিকা ঘাটলে পাওয়া যাবে রমিজ ডাকুর নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ। এ বাড়িতেই রমিজ ডাকু এসেছিলো। নিজের আস্তানা ফাঁদতে। আমাকে মেরেই ফেলছিলো, হঠাৎ তালাবদ্ধ একটা ঘরের দিকে নজর যায় ওর। আমার শত আপত্তির পরেও ভেঙে ফেলে সে ওই তালা। তারপর...আমার কুকুরটা! বুঝলে? লেলিয়ে দেই ওটাকে রমিজ ডাকুর ওপর। একটা মানুষ আর পশুর মধ্যে চলতে থাকা সংঘর্ষের সুযোগে আমি প্রচন্ড আহত রমিজ ডাকুকে খুন করতে সম হই। লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলেছিলাম। কিন্তু একটা নয়, দুটো! রমিজ ডাকুর ধারালো ছুরির আঘাতে ফালা ফালা হয়ে গিয়েছিলো আমার প্রিয় কুকুরের শরীরটা! সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়েছিলো বেচারী! এ অঞ্চলের সবাই ভাবে অন্য কোথাও চলে গেছে কুকুরটা। আমি তো বলি কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো অনেকে বলে এ বাড়ির আশেপাশে হঠাৎ হঠাৎ প্রায়ই যেন কুকুরের ডাক শোনা যায়!’ দরজার পাশ থেকে ধীরে ধীরে সরে গেল গনেশ চ্যাটার্জি। একটা প্রশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। যেন বহু বহু দূর দিগন্ত থেকে ছুটে আসছে কোন ভয়ংকর এক জানোয়ার। এগিয়ে আসছে...
মুহিন খান। প্রচন্ড আতঙ্কে জায়গায় জমে গেল। একচুলও নড়তে পারছে না। বাইরের আকাশে ঝড়ের আগমন জানান দিল প্রকৃতি। ধীরে ধীরে শঁ শঁ বাতাসের ডাক ভেসে আসছে। শুকনো পাতার শব্দ, মৃত্যুর শব্দ! বিশাল কালো এক ছায়া পড়ল দরজার ওপাশে। অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে গনেশ চ্যাটার্জির মুখ। আস্তে আস্তে যেন অন্ধকার হয়ে আসছে প্রকৃতি। অন্ধকার নেমে আসছে এ ঘরে...
প্রিয় পাঠক, বাকিটা অন্য গল্প। কিন্ত গনেশ চ্যাটার্জি আর তার কালো কুকুরের গল্পের সমাপ্তি এখানেই...!
রহস্য সাহিত্যের বিকাশে
নতুনদের প্রতিনিধি...