অদৃষ্টযাত্রা | রন্টি চৌধুরী

Home 

সকালে চোখ থেকে ঘুম যেতেই রু'র মনে হল আজ আর বাইরে যাবে না, সারাদিন প্রাচীনকালীন কাগজের বই পড়ে কাটাবে। অনেকগুলা অতি প্রাচীন কাগজে ছাপা বই এক আ্যানটিকের দোকানে ভাগ্যক্রমেই জলের দামে পেয়ে গেছে সে। এই জীবনটাই ভাল লাগে তার। ঘুরো ফিরো পড়। বিনিময় কার্ডে বেশ ভাল পরিমানে ইউনিট জমা আছে, তাতে আরও বছরখানিক গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় ভালভাবে। মনে মনে নিজের বাবা মা কে আরো একবার ধন্যবাদ দিলো রু, তাসে গত ছমাস ধরে প্রায় প্রতি সকালেই দেয়। তার বিছানায় অলস গড়াগড়ি খাবার নিশ্চয়তা দেবার জন্য প্রয়াত বাবা মা'র প্রতি কৃতগ্গতার শেষ নেই রুর।

ঘুম ঘুম চোখে বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে দাত ব্রাশ করতে গিয়ে আয়নার কোনার স্ক্রীনে একটি পাচঁতারকা লালরঙা মেইল এলার্ট পেয়ে ঘুম ছুটে যায় রু'র। তারমত একজন ছাপোষা সাধারন মানুষের কাছে পাচঁতারকা রেডমেইল কেন আসবে? সেকি বড় কোন অপরাধ করেছে? কোন বিশেষ কৃতিত্বপূর্ন কাজও তো করেনি যে সর্বোচ্চ গুরুত্বপুর্ন মেইল আসবে।

পরদিন, বিজ্ঞান একাডেমির একটি আকাশযানে করে অনেকটুকু পথ পাড়ি দিয়ে রু হাজির হল বিজ্ঞান একাডেমি ভবনে। এখানে সাধারনের প্রবেশাধিকার নেই। সেকি সৌভাগ্যবান? ভাবনাটা শেষ হবার আগেই তাকে নিয়ে যাওয়া হল একটি আলো আধারি কক্ষে। সেখানে বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মহামান্য সিমথন অপেক্ষা করছিলেন রু'র জন্য। শান্ত সৌম্য প্রায় বৃদ্ধ অথচ অবয়বে তরুন একজন মানুষ। তার দেখা পাওয়া সাধারন মানুষের সাধ্যের বাইরে।অবশ্য রু তো এখন আর সাধারন নয়, মাত্র গতকালই সে জানতে পেরেছে সে পৃথিবীর সবচাইতে নিখুত মানুষটি। সিমথন রু'র হাত ধরে অভ্যর্থনা জানালেন। তাকে একটি আসনে বসিয়ে নিজে বসলেন।'কেমন আছো,রু?"
'ভালো । আপনি '
মহামান্য সিমথন এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সরাসরি গেলেন কাজের কথায় 'তুমি কি যাত্রার জন্য প্রস্তুত? আর রু, তোমাকে এর পরিনতি সম্পর্কে নিশ্চই অবহিত করা হয়েছে, যে কোন কিছু ঘটতে পারে এ মিশনে, হয়ত তুমি আর নাও ফিরতে পার এ পৃথিবীতে। তোমার ভাগ্য যেকোন রকম হতে পারে।'
' আমি তা জানি মহামান্য সিমথন। কিন্তু আমি প্রস্তুত।' শান্ত কন্ঠ রু'র
মহামান্য সিমথন স্মিত হাসি হাসলেন। রু'র মাথায় হাত বুলালেন পরম আদরে।
' রু, তুমি হয়ত বুঝতেও পারছ না তুমি এ পৃথিবীর মানুষের জন্য কতবড় উপকার করছ। ইতিহাসে তোমার নাম উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে।' রু'র সাথে সাক্ষাৎপর্ব আর দীর্ঘায়িত করতে চাইলেন না মহামান্য সিমথন।' যাত্রার প্রারম্ভে তোমার কি আর কিছু জানার আছে রু? প্রশ্ন করলেন সিমথন।
'আছে মহামান্য সিমথন।'


এরকম উত্তরের প্রত্যাশায় ছিলেন না মহামান্য সিমথন। বিজ্ঞান একাডেমি যখন পৃথিবীর কল্যানে কোন সিদ্ধান্ত নেয় তার বিষয়ে বাকী বিশ্বকে ও সংশ্লিষ্টদের কে যা জানানো প্রয়োজন মনে করা হয় তা জানিয়ে দেয়া হয়। আর কিছু জানার অধিকার থাকে না কারো।
একটু থমকে গেলেন মহামান্য সিমথন। কিন্তু প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বললেন, 'বল নির্ভয়ে।'
'ক্লুটনবাসীরা কেন আমাকেই বেছে নিল মহামন্য সিমথন?' থমথমে হয়ে উঠেছে রু'র মুখ।' কেন আমার এতগুলো প্রায় অসম্ভব শর্ত মেনে নেয়া হল অবালীলায়, যা আমার দেশের একাডেমি চেষ্টা করেও এতদিনে পারেনি?'

রু'র শর্তগুলো অবান্তর ধরনেরই ছিল। সে তার গরীব দেশের বিনিময় রিজার্ভ বাড়িয়ে দেবার শর্ত দিয়েছিল তিরিশগুন। বিজ্ঞান একাডেমির সহায়তা তালিকায় উপরের দিকে নিয়ে যাবার দাবী করেছিল, প্রক্সিমা সেন্টারাইেত নতুন আবিস্কৃত বাসযোগ্য দুটি গ্রহের বিশাল অংশ তার দেশের অধিকারে দেবারও দাবী ছিল তার, তাতে তার দেশের আবাসনের আর কোন সমস্যাই থাকবে না। সব মেনে নেয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে যা কল্পনারও অতীত।

একটুও চমকালেন না মহামান্য সিমথনঅ।'কারন ক্লুটনবাসী তোমাকেই চেয়েছে, ওরা পৃথিবীর নিখুততম লোককে চায়।'
'না , মহামান্য সিমথন।'বজ্রের মত শোনাল রু'র কন্ঠ।' আসল সত্যটা আমি জানি।'
এবারে অপ্রস্তুত হলেন মহামান্য সিমথন। মরিয়া হয়ে ভাবলেন তিনি, কী জানে রু?



এ কাহিনী শুরু কয়েকদিন আগে। যখন পৃথিবীর প্রধান মুথখপাত্র বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মহামান্য সিমথনের প্রধান দুত মাননীয় থিপান প্রথম মানুষ দুত হিসেবে ক্লুটন গ্রহে যান। ক্লুটনগ্রহের স্বল্পসংখ্যক অথচ ভীষন ক্ষমতাধর অধিবাসীরা তখন হয়ে উঠে চরম হতাশাগ্রস্ত। আর তা মানুষের কারনেই।

ক্লুটন গ্রহের অধিবাসীদের বুদ্ধিমাত্রা ৮১ স্কেলের যা ৯ জন অতি বুদ্ধিমান মানুষের সমান। এত বিপুল পরিমান বুদ্ধি একসাথে কাজ করার ফলে তাদের মস্তিস্ক মানুষের চাইতে হাজারগুন বেশী কাজ করে। এটা তাদের জণ্য কোন সমস্য না, বরং সুবিধা। কিন্তু বুদ্ধির পাশাপাশি তাদের সবকিছুই একটু বেশী বেশী। রাগ, হিংসা, বিদ্বেশ সবই। এসব কমিয়ে আনার জন্য ওর ওদের অতি ক্ষমতাধর প্রায় অলৌকিক মস্তিস্কে কিছু নিয়ন্ত্রন চিপ বসিয়ে দিয়েছে কয়েকশ বছর আগে। কিন্তু একটা জিনিসে তাদের অপুর্নতা। এটা হল তাদের চেহারা। অতি কু্ৎসিত ক্লৃটনগ্রহের প্রানীদের শরীরাকৃতি।তারা কখনও সুন্দর আকৃতি দেখেনি। তাই এতদিন এই অপুর্নতা তাদের জন্য কোন সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়নি। কিন্তু মাননীয় থিপান ওই গ্রহে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখার পর ওরা বুঝতে পারে ওদের শরীরাকৃতি আর চেহারা কতটা কুৎসিত, আর তখনই জন্ম নেয় দ্বিতীয় সমস্যা। আর তা হল বিষাদ। সুদর্শন থিপানকে দেখেই অধিবাসীরা তাদের শারীরিক অপুর্নতা লক্ষ করে আক্রান্ত হয় সম্পুর্ন অচেনা বিষাদে। যা কিনা মানুষের বিষাদবোধের চেয়েও অনেক অনেক প্রবল। ফলে তাদের পুরো জাতি অপরিচীত বিষাদের সম্মূখীন হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিষাদে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে সাত হাজার ক্লুটনবাসীর মধ্যে দেড় হাজার তাদের সমস্ত নিয়ন্ত্রন প্রোগ্রাম নিস্ক্রিয় করে দিয়ে আত্বহত্যা করে । এ অবস্থায় জাতি বিলুপ্তির আশংকায় মাথায় নিয়ে চিন্তা করে সেখানকার প্রধান বৈজ্ঞানিক চিঁচিঁ সমাধানের পথ খুজে পান। তিনি কয়েকদিনের জন্য থিপানকে ক্লুটনগ্রহে থাকতে আহবান জানান। তার পরিকল্পনা মানুষকে নিয়ে গবেষনা করে প্রথমেই বিষাদবোধ কমানো তারপর ক্লুটনবাসীকে মানুষের মত বানানো। কেননা তিনি চমকৃত হয়ে লক্ষ্য করেছেন মানুষের মাঝে সবকিছুই পরিমিত। কেবল বুদ্ধিটুকু ছাড়া। আর থিপানের তো তুলনাই হয় না। যেমন সুদর্শন তেমন চৌকষ। তাকে নিয়ে গবেষনা করাই ভাল।
কিন্তু একজন মানুষকে নিয়ে এমনতর গবেষনার পর তার স্বাভাবিক থাকা বা বেচে থাকার কোন নিশ্চয়তা তো নেই। ক্লুটনবাসী থিপান ছাড়া আর কাউকে নিয়ে গবেষনা করতেও নারাজ। তাদের আবার চটানোও যাবে না। তাতে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। এ অবস্থায় পৃথিবীর প্রধান মুখপাত্র মহামান্য সিমথন তার একমাত্র পুত্র মাননীয় দুত থিপানকে বাচাতে ক্লুটনবাসীর কাছে প্রস্তাব করেন থিপানকে ফিরিয়ে দিতে, বদলে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুত মানুষ ''রু''কে দেবেন।




'আপনার বোঝা উচিত ছিল মহামান্য সিমথন। আমি সত্যিই পৃথিবীর নিখুততম লোক। আমার পক্ষে লুকানো সত্য জানা কঠিনতম কাজ নয়।' ক্রুর হাসি রু'র ঠোটে। কেন জানি নিষ্টুর আচরন করে মজা পাচ্ছে রু।
'তুমি কি জান রু?'
' আমি জানি যে ক্লুটনবাসীরা অন্য কোন গ্রহে আক্রমন করতে পারে না। তাদের মস্তিস্ক নিয়ন্ত্রন প্রোগ্রামে এ বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে।'
সিমথনের প্লাস্টিকের মত ত্বকে একটু ঘামের আভাস।
'আমি এও জানি তারা হিংসা পরায়ন জাতি নয়।একজন মানুষের জন্য তারা পুরো একটা গ্রহকে ধ্বংশ করবে না।' অত্যন্ত শান্ত রু।
'কিন্তু ওরা হুমকি দিয়েছে।' ব্যাকুল সিমথনের কন্ঠ।
'না।মহামান্য সিমথন, ওরা এমন অন্যায় হুমকি দেয়নি।' একুট হাসল রু।' এরা পৃথিবীর নিখুততম লোককে চায় না।'
'তুমি কি বাকীটুকুও জান?' অত্যন্ত বিমর্ষ দেখাল মহামান্য সিমথনের চেহারা।
'হ্যা। আমি মাননীয় দুত আপনার পুত্র থিপান এর বন্দীত্বের কথাও জানি।' লোকটার জন্য করুনা হচ্ছে রু'র। বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক। সারা পৃথিবীর প্রধান মুখপাত্র। তার এক কথায় কোটি মানুষের প্রান যেতে পারে। প্রচন্ড ক্ষমতাবান।অথচ বাবা হিসেবে এই মুহুর্তে কত অসহায়!

মহামান্য সিমথনের মনে হল তিনি হাত জোড় করে ভিক্ষা চাইবেন রু'র কাজে তার ছেলের জীবন। কিন্তু রু ও তে তার ছেলের মতই। এই পৃথিবীর সবাই তার সন্তানের মত। এমন অন্যায় আবদার তিনি করতে পারেন না। রু'র মাথা থেকে হাত সরিয়ে নিলেন লজ্জায়।

একজন স্নেহশীল অথচ অসহায় পিতার অসহায়ত্বের কাছে হার মানল রু নিজেই। এবার তার কন্ঠ আর্দ্র হল। ' আমি যাব মহামান্য সিমথন।' কাপাঁ কাপাঁ কন্ঠে বলল ও।

রু'র কথা শুনে হুড়মুড় করে কেদেঁ ফেললেন মহামান্য সিমথন। রু অবাক হয়ে দেখল পৃথিবীর সবচাইতে ক্ষমতাবান মানুষ একটা গরীব দেশের তারমত একজন সামান্য মানুষের মহানুভবতায় আকুল হয়ে কাদছেন। কান্না আটকাতে পারল না রু নিজেও।




(মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বাংলা সায়েন্স ফিকশনে এমন একটা সতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন যে এর থেকে বেরুতে চাইলে গল্পটাতে সায়েন্সফিকশনের আমেজটাই আসে না। তাই এ গল্পেও চরিত্রের নামে রু, সিমথন, থিপান, সায়েন্স একাডেমি না হয়ে বিজ্ঞান একাডেমির ব্যবহার।)