ক্রুশ | অ ন ন্ত নি গা র

Home 

ডা.রবার্ট ফ্রস্ট যখন নিজের গাড়িতে ছড়ে বাসায় ফিরছিল তখন রাত অনেক গভীর। রাতের কালো আঁধারীর সঙ্গে যোগ হয়েছে ঝড়ের তান্ডবলীলা। ঝড়ের তান্ডবলীলা। প্রচন্ড বৃষ্টির ঝাপটা যখন গাড়ির কাঁচে এসে আঘাত হানছে তখন বিরক্তিতে নাক কুচকানো ছাড়া করার আর কিছুই নেই ফ্রস্টের।
পেশায় একজন সাইকিয়াট্রিস্ট সে। বয়স মাঝামাঝি, খ্যাতিমান এক ডাক্তার। নিজের বিশ্বাসের সাথে অন্যকিছুর আপোষ তার চলে না। সে বিশ্বাস করে স্রষ্ঠা বলে কিছু নেই। তাই সে নাস্তিকতায় বিদ্ধ। লোকে নাস্তিক বললেও তার পসারের কোন কমতি নেই। প্রায় প্রতিদিন তাকে ব্যস্ততার মাঝে ব্যস্ত থাকতে হয়। যদিও আজ একটু বেশীই দেরী হয়ে গেছে বাসায় ফিরতে। এজন্য তার নিজের কোন চিন্তা নয় বরং মাকে নিয়ে চিন্তাটা কাজ করছে। নিশ্চয় মা এখনও ওকে ফেলে রেখে খাননি! কেন যে মায়েরা এমন হয়!
ডানে মোড় নিলো ফ্রস্টের গাড়ি। তুমুল বেগে ছুটছে গাড়িটা। রাস্তায় একটা কুকুরেরও অস্তিত্ব নেই। ফ্রস্টের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে গা-ছমছমে একটা ভাব চলে আসত। কিন্তু ওর মনে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া নেই। নিজের গলায় ঝুলানো ক্রুশের লকেটটার দিকে একবার নজর ফেলল ফ্রস্ট। ওর মা ওকে সময় এটা পরতে বলেছেন, বৃদ্ধ মায়ের কথা রাখতে নয়-তাকে স্রেফ খুশি করতে এ কাজটা করেছে ফ্রস্ট। নচেৎ কবেই এসব ছুড়ে
লকেট-ফকেট ছুড়ে ফেলে দিত ও।
ফ্রস্টের গাড়ির হেডলাইটের প্রবল আলোটা এই দূর্যোগময় রাতের অন্ধকার দূর করতে যথেষ্ট নয়। তাই গাড়ির গতি কিছুটা কমাল ও। দূরে কোথাও যেন বজ্রপাত হল। বজ্রপাতের একছটাক আলোয় দিনের মত পরিস্কার হয়ে যাওয়া রাস্তার কিছু দূরে যেন কারো দাঁড়িয়ে থাকার অবয়ব নজরে এলো ফ্রস্টের। অবয়বটার পাশে এসে গাড়ি থামাল ফ্রস্ট। একটা মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। অন্ধকারে চেহারাটা চেনা গেল না তবে ফ্রস্ট গাড়ির দরজা খুলে দিল। মেয়েটিও দেরী না করে তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়ল ভেতরে।
‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমার গাড়িটার কি হয়েছে কে জানে। আপনি না এলে...’ অন্ধকারে মেয়েটার চেহারা কিছুটা আন্দাজ করল ফ্রস্ট।
‘সান্দ্রা! তুমি এতরাতে এখানে...’ প্রায় চেচাঁলো ফ্রস্ট।
মেয়েটি এবার ভালো করে ফ্রস্টকেও ল্য করল,‘আরে ফ্রস্ট! তুমি, মাই লর্ড!’
‘আবার কি ঝামেলা বাধিয়েছো তুমি সান্দ্রা?’ ভুরু নাচালো ফ্রস্ট।
‘না ফ্রস্ট, আসলে ভাইয়া না একটু বেশীই বাড়াবাড়ি করছে আমার সাথে। তা তুমি নিশ্চয় কাজ থেকে ফিরছো?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু এতরাতে তুমি এখানে কিভাবে?’
‘আহ্ ফ্রস্ট, তুমি কি শুরু করলে বল তো? আমি রওনা হয়েছিলাম রিনাদের বাসায়। তারপর তো দেখলেই...’
গাড়িটা চলতে শুরু করেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল ফ্রস্ট, মেয়েটাকে ও পেয়ে গেছ্ েতা না হলে এতরাতে কি না কি দূর্ঘটনা ঘটত বলা যায় না। তবে এখন আর সান্দ্রাকে ওর বাসায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বরং দেখা যাক নিজের বাসায় নেয়া যায় কিনা।
‘তুমি তো দেখতে পাচ্ছো আমাদের বাসায় প্রায় এসেই পড়েছি, আপাতত আমার ওখানেই ওঠ। তারপর সকাল হলেই...’
‘আমার কোন আপত্তি নেই ফ্রস্ট। অন্তত এই মুহূর্তে আমি আবার ঘরে ফিরে যেতে চাই না।’
‘যাক বাঁচালে! ওদিকে মা আমার জন্য অপো করছেন।’
নিরবে বসে রইল সান্দ্রা। যেন আর কিছু বববব
বলার নেই ওর, কথা শেষ।
এদিকে বাতাসের মাত্রা যেন বাড়ছে তো বাড়ছেই। ভয়ংকর ঝড়ো বাতাসের দাপট বইছে চারিধারে। ফ্রস্টের মনে হচ্ছে ওর গাড়িটাই না উড়ে যায়! হঠাৎ ফ্রস্টের মনে এলো সান্দ্রার ভাই আন্দ্রের কথা। বেচারা যদি রীনার বাসায় ফোন করে সান্দ্রার খবর না পায় তবে ঝামেলা হয়ে যাবে। ব্যাপারটা ওকে জানো দরকার। এই ভেবে হঠাৎ ফ্রস্ট বায়ে গাড়িটা একটু থামিয়ে নিজের মোবাইলটা পকেট হাতড়ে বের করল, সান্দ্রার দিকে না তাকিয়ে বলল, ‘তোমার ভাইয়ার কাছে একটা ফোন করা উচিৎ।’ কোন জবাব না পেয়ে হাসল ফ্রস্ট। আন্দ্রের নাম্বারে ডায়াল করল ও। কলটা রিসিভ করল একটা মেয়েলী কন্ঠ। অবাক হল ফ্রস্ট! আন্দ্রেরা কেবল দু’জন। ওরা দু’ভাইবোন ছাড়া তৃতীয় কারো ওদের বাসায় থাকার কথা নয়।
‘আন্দে কে একটু দেয়া যায় প্লীজ!’
‘আপনি কে বলছেন?’
‘আমি ড.রবার্ট ফ্রস্ট।’
‘আরে ফ্রস্ট! আমাকে চিনতে পারছো না! আমি সান্দ্রা, কেমন আছো তুমি?’
আশ্চর্য হল ফ্রস্ট। কি বলে মেয়েটা?
কিন্তু...চমকে উঠল ফ্রস্ট! সান্দ্রের কন্ঠটা মুখস্থ ওর, এবং এই মেয়েটার কন্ঠটাও হুবুহু...ঝট্ করে পাশ ফিরে তাকালো ফ্রস্ট। দেখল কেমন এক রহস্যময় দৃষ্ঠি নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে পাশে বসা মূর্তিটা!
‘হ্যালো...হ্যালো ফ্রস্ট!’
‘হ্যাঁ, সান্দ্রা...’ কিছু একটা বলতে চাইল ফ্রস্ট কিন্তু অবাক বিস্ময়ে দেখল কখন যে ওর গাড়িটা আপনা-আপনি চলতে শুরু করেছে! সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল ফ্রস্টের। গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারানোর আগেই কিছু একটা করা উচিত...


ড.রবার্ট ফ্রস্ট জীবনে এই প্রথমবারের মত প্রবল বিশ্বাস আর অগাধ আস্থা নিয়ে নিজের গলার ক্রুশটাকে প্রবলভাবে চেপে ধরল। এই প্রথমবারের মত ওর দেহের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল-‘সাহায্য কর ঈশ্বর!’
চারিদিক থেকে ভেসে আসা অসংখ্য মৃতমানবীর অট্টহাসিতে কেঁপে উঠল প্রকৃতি!!


খ্যাতিমান সাইকিয়াট্রিস্ট ড.রবার্ট ফ্রস্ট হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল পুরো একদিন পর। সবাই জানে গতদিন রাতে ড. ফ্রস্ট ঝড়ের মুখে গাড়ি সামলাতে না পেরে একটা ছোট দূর্ঘটনায় পড়েছিলো, এখন সে সুস্থ। তবে কেবল সান্দ্রা আর ওর ভাই জেনেছে ওই রাতের ঘটনা। ওরা বিশ্বাস করেছে এজন্যেই যে ঘটনাটা ড.রবার্ট ফ্রস্টের জীবনে ঘটেছে।
এ ঘটনার ক’দিন পর ফ্রস্ট একদিন রোববার সকালে ওর মাকে বলল,‘মা, আমি গীর্জায় যাব!’