আমজাদের সেই গা-ছমছম-করা গল্পটার নামকরণ আমিই করেছিলাম। লেন, বাই লেন, তস্য লেন-এরকম একটা লেনের ভেতর ভয়ংকর সব কান্ডকারখানার গা-শিউরানো এক নিঝুম বাড়ির গল্প। আমজাদ আমাকে বলেছিল, রুপু, মুশকিলে পড়েছি গল্পটার নাম নিয়ে, মনপুঃত নাম খুঁজে পাচ্ছি না। আমি কিছুমাত্র চিন্তা না করেই বলেছিলাম, তাহলে একটা কাজ র্ক না, এটার নাম দিয়ে দে ‘এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন’। আমজাদ আমার কথা রেখেছিলো। গল্পটা একটা দৈনিকে ছোটদের পাতায় ছাপাও হয়েছিলো।
তারপর অনেকদিন পার হয়ে গেছে। ইন্টারমিডিয়েট পরীায় উত্তীর্ণ হবার পর রাশিয়ায় স্কলারশিপ পেয়েছে আমজাদ। দিন সাতেকের ভেতর ও চলে যাবে। কতোদিন পর যে দু’বন্ধুতে আবার দেখা হবে, তার ঠিক নেই। তাই একদিন দুজনে মিলে আমাদের চির পরিচিত শহরটা ঘুরে বেড়াতে বেরোলাম।
শহরের অলি-গলি, বাজার মার্কেট ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হয়ে শেষে আমাদের এক পাঠশালার বন্ধু জহুরের ইটালি হোটেলে গিয়ে ঢুকলাম চা আর নানকাতাই খাওয়ার জন্যে। জহুরের দোকানের নানকাতাই আর ফিকে চায়ের একটা আলাদা সুনাম আছে। অনেকদিন পর আমাদের পেয়ে জহুর কি যে খুশি হলো। খাবার পর চা আর বিস্কিটের পয়সা নিতে চায় না, শেষে জোড় করে তার ক্যাশ-বাক্সে পয়সাটা ঢুকিয়ে দিতে হলো। দোকান থেকে বেরোনোর সময় জহুর বললো,‘এতোদিন পর তোদের পেয়ে ভালো লাগলো, আবার আসিস, ভাই।’ জহুরের মুখে-‘আবার আসিস, ভাই’ কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। এই কথাটা আমি কোথায় যেন পেয়েছি, কোন কাগজে বোধহয়। আমজাদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি ও একটু অন্যমনস্ক। আমি বললাম,‘এখন কোথায় যাওয়া যায় বল তো?’
ও বললো,‘চল্, এই গলি দিয়ে আরেকটু এগিয়ে যাই। কিছুদূর গেলেই দেখতে পাবি খুব সুন্দর গির্জা আছে ওখানে, সাইমন টে¤প্লারের বাংলোবাড়ির কাছেই।’
আমার মাথাটা হঠাৎ কেমন ঝিম্ঝিম্ করে উঠলো। সাইমন টে¤প্লারের বাংলোবাড়ি! একটা ক্যাসেটের রীল যেন খুব ধীরভাবে আমার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। শুনি কে যেন বলছে- সাইমন টে¤প্লারের নিঃসঙ্গ বাংলোটাকে বাঁয়ে রেখে গির্জার বাউন্ডারী ওয়ালের দণি –পুব ঘেঁষে চলে যাওয়া ছোট্ট লেনের দিকে হেঁটে যায় ওরা...ওরা কারা? কারা হেঁটে গেছিলো ঔই লেন দিয়ে? কিছুতেই মনে করতে পারি না। মাথার ভেতর ক্যাসেটের রীল কখন আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গেছে।
আমজাদ বলল,‘দেখ রুপু, কি সুন্দর গির্জা! এত হৈচৈ আর লোকবসতির ভেতরও কেমন চুপচাপ। ফ্যানটাস্টক।’ দেখলাম এই নিঃসঙ্গতার ভেতর সুন্দর একটা পুরোনো কাঠের বাংলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আমজাদ হাত ইশারায় সেটা দেখিয়ে বললো,‘ সাইমন টেম্পলারের বাংলো।’
আমার বুকের ভেতরটায় কেন জানি ড্রাম বাজতে লাগলো। ঘামে হাতের তালু ভিজে উঠেছ্ েআমজাদকে বললাম,‘চল্ ফিরে যাই।’
ও অন্যমনস্কভাবে আমার হাত চেপে ধরে একটা ছোট্ট অচেনা গলির ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বললো,‘বোকা, এখুনি যাবো নাকি রে, মোটে এখন সোয়া বারোটা বাজছে।’
ঘিঞ্জি গলির ভেতর দিয়ে আমরা যেন যুগ শতাব্দী হাজার বছর ধরে হাঁটতে থাকি। আমাদের ডানে-বাঁয়ে নোংরা স্যাত-পড়া ঘরবাড়ি, দর-দালান। দালানগুলোর ইঁট-মাটি-সিমেন্ট য়ে গিয়ে দরজা-জানালার কাঠ-টাঠ পোকায় খেয়ে ফেলেছে। ফাটা দেয়ালের ভেতর থেকে বটগাছ আর আমঘুরুজের লতা জড়াজড়ি করে আসমানে ডালপালা মেলে দিয়েছে। দোকান-কোঠা, প্রেস,বুক বাইন্ডিং,জিঞ্জিরশাহ্ও মাজার আর তার লাগোয়া দফতর, চামড়ার ট্যানারি আর জুতোর গুদাম, মিয়াচান ব্যাপারির চালের আড়ত, চিত্রকর-এর ‘চিত্রলেখা’ চিত্রহাউজ, চায়ের স্টল, ধুন্ধুমার রেস্তরাঁ, আর ‘খাসির মাংস চাটনি কাবাব হোটেল’, মাসিক উত্তরায়ন অফিস, কপিধ্বজ ব্রাঞ্চ সংঘ ইঃ লিঃ; ফুলুরি-পেয়াজুঁ হাউজ-হেনো তেনো হাজার কোঠার গলির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার ভীষণ পিপাসা পেয়ে যায়। আমজাদকে বলি। দুজনেই এবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোন টিউবওয়েল বা হাইড্রেন্ট খুঁজতে থাকি। পানি খাওয়ার মতোন অনেক হোটেল আর রেস্টুরেন্ট আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। এদিকে, পিপাসায় আমার জিভ শুকিয়ে আসছে। আমজাদ বললো,‘চল, ওই পাঁচিল ঘেরা বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ি, ওখানে নিশ্চয় পানি পাওয়া যাবে।’ এতো ব্যস্ত গলির ভেতরও বাড়িটা আশ্চর্য এক নির্জনতায় আচ্ছন্ন। আমরা গেট খুলে বাড়িটার উঁচু বারান্দায় উঠে কলিংবেলের লাল বোতাম টিপে অপো করতে লাগলাম। আমজাদ ফিস্ ফিস্ করে বললো,‘বাড়িতে কেউ নেই বোধহয়, দেখছিস, কেমন নিঝ্ঝুম এখানটা!’
হঠাৎ আমার চোখে পড়ে বারান্দার ডানদিকের বিশাল কাঠের দরজার মাথার ওপর পোকাধরা কাঠের বোর্ড। তাতে স্পস্টভাবে গোটা গোটা হরফে লেখা ঃ এইচ/১২, হাজী মুহম্মদ গুলু খাঁ লেন।
এই লেনের নাম তাহলে গুলু খাঁ লেন। আমার কেমন শীত শীত করতে থাকে। কপালে চিনচিন ঘাম দেখা দেয়। বিদ্যুৎচমকের মতোন মনে পড়ে যায় আমজাদের সেই গল্পের কথা। গল্পটায় এই লেনেরই উল্লেখ আছে। আর- আর ‘স্বপ্ন-কুটির’ বলে একটা বাড়ির কথাও।
এতোণে আমজাদও দেখতে পেয়েছে বোর্ডটা। ও বিস্ফোরিত চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার কাধেঁর কাছটা খামচে ধরে ফিস্ফিসিয়ে ওঠে,‘ রুপু, বিশ্বাস কর-
জীবনে আমি এ গলি দিয়ে আসিনি, এখানকার কিছুই আমি চিনি না, অথচ হুবুহু-’
কলিংবেলের আওয়াজ কাউকে বাড়ির ভেতর থেকে এদিকে টেনে আনছে বুঝতে পারি। স্যান্ডলের চটাশ্ চটাশ্ শব্দ কাছে এগিয়ে আসছে-
আমজাদের গল্পের শেষদিকটা মনে পড়ে যেতেই একটা হিমস্রোত বয়ে যায় আমার সারা শরীরে।
গল্পের ছেলেদুটো কোনোদিনই আর এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না।