মাছির গুঞ্জনের মতো শব্দটা আসছে টানা ৫ মিনিট ধরে। যান্ত্রীক শব্দটা শুনে যে কেউ বলে দিতে পারে এ মাছির পালের পাখার সৃষ্ট শব্দ নয় কিন্তু ঝক ঝকে নীলাভ আকাশের কোথাও দেখা যাচ্ছে না কাঙ্খিত যানটিকে। সামাদ, কলিম আর রাসু; তিনজনে মিলে অবসর সময় কাটাচ্ছিল যে যার মতো মাঠের এক কোনে। সামনে বিশার ঘন বন। পেছনে উচু নিচু মাটির ঢিবি। আশে পাশে নেই কোন জনবসতি। সামাদ এবং রাসু দুই ভাই বোন। সামাদের বয়স ১১ আর রাসুর কেবল ৫ বছর। কলিম পাশের বাড়ির এক অনাথ বালক, মুখে কোন ভাষা নেই। কোথা থেকে এসেছে কেউ জানে না। একদিন মজিদ মিয়া মাঠের কাজ করছিল, এসময় কাদায় মাখা মাখি অবস্থা কুড়িয়ে পায় কলিম কে। কথা কলতে পারে না। কিছু বোঝাতেও পারে না। বয়স বড় জোড় ৬ বছর হবে। তার খাওয়া দাওয়ার খুব বেশি চাহিদা নেই। কাউেক কোন রকম জালা যন্ত্রনাও করে না। যতক্ষন বাইরে থাকে সামাদ এবং রাসুর সাথেই তার ভাল দিন কাটে। বড়িতে থাকলে চুপ চুপ উঠানে বসে থাকে। খুব ভাল করে তাকালে মনে হতে পারে তার কান গুলো একটু একটু নড়ছে। যদিও তা সম্ভব নয়। বাড়িতে ছেলের আদরে না থাকলেও মজিদ মিয়া বা তার বউ কলিমের সাথে খারাপ ব্যাবহার করে না।
দুই
সামাদ রাসু এবং কলিমের মধ্যে সামাদ বয়সে বড় হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই বাকিদের অভিভাবক সেই। অবশ্য এ নিয়ে তার মধ্যে কোন গর্ব বা অহঙ্কার নেই। সে বড় ভাই এবং বন্ধুর মতোই রাসু একং কলিমের সাথে আচরণ করে। যান্ত্রিক শব্দটা নিয়ে সামাদ কিছুটা চিন্তত। কারন তার বয়স কম হলেও বাবার সাথে রেডিও টিভির যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে করতে যান্ত্রিক ব্যাপার গুলোর প্রতি প্রচন্ড আকর্ষন অনুভব করে। সামাদের বাবা একজন মেকানিক। গ্রামের বাজারে তার একটি যন্ত্রপাতি মেরামতের দোকান আছে। তার কাজের হাতও বেশ ভাল। ছেলেকে এ কাজে নেয়ার ইচ্ছে না থাকলেও সামাদের আগ্রহের কারনে তিনি অনেক কিছুই তাকে শিখিয়েছেন। সামাদ মোটামুটি নিজে নিজে সার্কিট ডায়গ্রাম দেখে অনেক ছোট খাট জিনিস বানাতে পারে। ৫/৬ টি স্টেশন এর রেডিও, কলিং বেল, রেইন এ্যালার্ম, মিউজিক লাইট এসব তার ছেলে খেলা। এই বয়সে এসব কাজ করতে দেখে গ্রামের মানুষরা তাকে অনেক ভাল চোখে দেখে। গ্রামে ভদ্র ছেলে হিসেবেই সবাই তাকে চেনে। পড়াশুনার পাশা পাশি বাবাকে সাহায্য করা ছারও সেই বিস্তৃত মাঠটিতে সময় কাটাতে সামাদের বেশ ভাল লাগে। এখানে থাকলে 'মা' বার বার খাবার জন্য ডাকা ডাকি করতে পারে না। আপন মনে নিজের যন্ত্রপাতি গুলো নিয়ে সময় কাটাতে পারে। একটু দূরে রাসু আর কলিম আপন মনে খেলা করে। মাঝে মাঝে সে তাকিয়ে দেখে ওরা ভাল আছে কি না। এরই ফাকে একদিন শুনতে পায় সেই গুঞ্জনের শব্দ। শব্দটা শুনলে মনে হয়; কোন একটু যান কাছে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে; কোন কারনে বাধা পেয়ে আবার ফিরে চলে যাচ্ছে। এভাবে টানা ১০ দিন থেকে একই শব্দ একই ভাবে শুনতে পাচ্ছে। এটাও লক্ষ করেছে, কলিম অনেক আগে থেকে এই শব্দ শুনতে পায়। তখন তাকে একটু অস্থির দেখায়। শব্দটা মিলিয়ে যাবার সাথে সাথেই কলিমের মনটা খারাপ হয়ে যায়। সামাদ ভাবে, ছোট মানুষ বলে শব্দটা হয়তো তার ভাল লাগে। তাই সেটা মিলিয়ে যেতেই তার মন খারাপ হয়। যতই দিন যাচ্ছে ততই সামাদ চিন্তিত হয়ে পরছে। কোন সমস্যা বা বিষয় নিজে সমাধান না করা পর্যন্ত সে কখনও বাবাকে জানায় না। কারন তার বাবা ছোট খাট সমস্যাগুলোকে নিজেই সমাধান করতে শিখিয়েছেন।